নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

নাজমুল জর্জ

নাজমুল জর্জ › বিস্তারিত পোস্টঃ

শাহেদদের গল্প

৩০ শে আগস্ট, ২০১৪ বিকাল ৫:২১

সেই দিনটাও ছিল আর সব দিনের মত খুবই সাধারণ একটা দিন। শুধু মাঝে মাঝে থেমে থেমে একটু-আধটু বৃষ্টি হচ্ছিল; কিন্তু সে-ও তো কতদিনই হয়। দিনটাকে মহিমান্বিত ভাবে মহিমামণ্ডিত করার মত আলাদা কোন বিশেষ বিশেষায়িত বৈশিষ্ট্য আদতে কোথাও ছিল না। তারপরও দিনটা ছিল খুবই বিশেষ একটা দিন। সেদিনই যে ওদের প্রথম দেখা হল!



তারা দু’জন রিক্সাতে পাশাপাশি বসে কোথাও যাচ্ছিল। এটাও বলার মত কোনকিছু নয়। ওদের মত এরকম কত যোটকবদ্ধ ছেলেমেয়েই তো রিক্সায় পাশাপাশি বসে ঘোরাঘুরি করছে। তবে হ্যাঁ, ওদের রিক্সার একটা ব্যাপার একটু আলাদা, একটু বিসদৃশ ছিল। ওদের রিক্সার সামনের দিকে বৃষ্টির পানি থেকে বাঁচার জন্য যে পলিথিনের আড়াল দেয়া হয়- সেটা ছিল না। রিক্সাওয়ালা অবশ্য জিজ্ঞাসা করেছিল যে, “ভাইজান, পলিথিন নামায়ে দিমু?” কিন্তু তার উত্তরে শাহেদ যেভাবে আঁতকে উঠে হাত নেড়ে “না না” করে উঠেছিল তাতে মনে হয়েছিল যে রিক্সাওয়ালা মনে হয় পলিথিন না, ওদের উপর পুরো গজব নামিয়ে দেয়ার কথা বলেছে! ওটা করলে মনে হয় বিরাট কোন অনর্থ ঘটে যাবে। রিক্সাওয়ালা বেশ অবাকই হয়েছিল। এ কেমন ভাইজান? অন্য ভাইজানেরা তো আকাশে মেঘ দেখলেই পলিথিন নামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে! এ ভাইজান মনে হয় একটু পাগলা কিসিমের আছে!



হ্যাঁ, তা বটে! শাহেদ একটু আলাভোলা ধরনের ভদ্র ছেলে। বিশেষ করে মেয়েটার সাথে রিক্সায় ওঠার পর তার “ভদ্রতাবোধ” তীব্রভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে! এই যে এখন সে যেভাবে রিক্সার একেবারে কোণায় মিশে গিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে তাতে মনে হতে পারে যে এটা আসলে রিক্সা নয়- এটা বাসরশয্যা! আর এই বাসরে জিন্স, টি-শার্ট পরা জড়সড় শাহেদ হল নববধূ আর ওপাশে গোলাপি সালোয়ার-কামিজ পরে সহজ সাবলীল ভঙ্গিতে বসে থাকা সন্ধ্যা হল তার পৌরুষদীপ্ত গম্ভীর রাগী বর!



ও হ্যাঁ, শাহেদের পাশের মেয়েটার নাম সন্ধ্যা। জুকারবার্গের আলসেমিভরা বোকা বাক্সের কৃপায় ওদের পরিচয় ঘটে। তারপর তুমুল চ্যাটিং। এভাবে গাঢ় বন্ধুত্ব। তারপর সেই গাঢ় বন্ধুত্ব কিভাবে কিভাবে যে সামনে এগিয়ে আজ ওদের এখানে এনে এক রিক্সায় পাশাপাশি বসিয়ে দিয়েছে সে ব্যাপারে দুজনের কারোরই পরিষ্কার ধারণা নেই!



সাক্ষাত পর্বের প্রথমাংশ শাহেদের চূড়ান্ত গাধামির উদাহরণ হয়ে আছে। এর আগে সন্ধ্যা শাহেদকে নিজের বর্ণনা দিয়েছিল এভাবে, “আমার জীবনের লক্ষ্য হল ‘মহিলা সুমো’ হওয়া। তাই বাসে ট্রেনে আমাকে সবসময় ডাবল টিকিট কাটতে হয়। আর গায়ের রঙ? - একবার এক আফ্রিকান ছেলে আমার প্রোফাইল পিকচার দেখে বলেছিল, “তুমি এত কালো কেন?’ দেখ না – সেই জন্যই তো আমি প্রোফাইলে নিজের ছবি দিই না। আমার নাকটাও না সামান্য বোঁচা। তবে আমার দাঁতগুলো খুব সুন্দর। কি সুন্দর কোদালের মত বড় বড়!”

সন্ধ্যার এ হেন বর্ণনা শুনে শাহেদ খুব একটা না ভড়কালেও ভেবে নিয়েছিল, একটু মোটা আর কাল বলেই হয়তো মেয়েটা ওইভাবে বলেছে। তাই সে আজ স্টার কাবাবের সামনে দাঁড়িয়ে যথারীতি একটা কালো আর মোটা মেয়েকে খুঁজছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের অনেক পরেও যখন সে কোন ‘কোদাল-দন্ত’বিশিষ্ট কৃষ্ণাঙ্গী, স্থুলাঙ্গীকে খুঁজে পেল না তখন সে চরম হতাশায় মুষড়ে পড়েছিল। বেচারা তখন উদভ্রান্তের মত একবার এদিকে, একবার ওদিকে তাকাচ্ছিল। ওদিকে সন্ধ্যা কিন্তু অনেক আগেই এসেছে। আর সে শাহেদকে ঠিকই চিনতেও পেরেছে। দুষ্টুমিভরা মজা নিয়ে শাহেদের কর্মকাণ্ড দেখতে ভাল লাগছিল বলে ও আর সাথে সাথে নিজের পরিচয় দিতে এগিয়ে যায় নি। কিন্তু শেষমেশ বেচারার অতি করুণ মুখ দেখে সন্ধ্যার খুব মায়া লাগল। তাই সে শাহেদকে আর না ভুগিয়ে পরিচয় দেয়ার জন্য এগিয়ে যায়। এরপর একটা সুললিত নারীকণ্ঠের “এক্সকিউজ মি” শ্রবনের মধ্য দিয়ে শাহেদের গাধামি শুরু হয়! সন্ধ্যার “আপনি কি কাউকে খুঁজছেন” প্রশ্নের উত্তরে সে যেভাবে হাতে নাতে ধরা খাওয়া চোরের মত “আরে না না, আমি কেন কাউকে খুঁজতে যাব” বলেছিল তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে কাউকে খোঁজা মনে হয় সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ কোন অতি গুরুতর অপরাধ! তবে তখনও পর্যন্ত শাহেদ স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সামনে দাঁড়ানো ইন্দ্রাণীর মত মেয়েটা যখন বললো যে, “আমি সন্ধ্যা” তারপর থেকে শাহেদ পুরো জম্বি হয়ে গেছে। দু’একবার কথা বলার চেষ্টা করে আরও বেশি বেকুবির পরিচয় দিয়ে ফেলায় বেচারা এখন মরমে শরমে মৃতপ্রায়!



মেয়েটা সেই প্রথম থেকেই চুপ করে আছে। শাহেদ বুকে একরাশ ঢিপঢিপানি নিয়ে নিজেও চুপচাপ বসে আছে। কি বলবে, কি করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না! শালার প্রেম করা যে এত কঠিন তা কি আর ও আগে জানত? মেয়েটা কিন্তু বেশ সাবলীল ভাবেই বসে আছে। শাহেদের মত কোন উল্টাপাল্টা আচরন সে এখন পর্যন্ত করে নি। না সে চা এর কাপকে পানির গ্লাস মনে করে চুমুক দিয়ে খেতে গিয়ে জিভ পুড়িয়ে ফেলেছে, না সে সিগারেটে মুখাগ্নি করতে গিয়ে ফিল্টারে আগুন দিয়ে ফেলে "হে হে" করে বেকুব এর মত হেসেছে। শাহেদের ওইসব কাণ্ড-কারখানায় মেয়েটা শুধু মিটিমিটি হেসেছে, কিছুই বলে নি। তাতে শাহেদের অস্বস্তি আরও বেড়েছে। এখন রিক্সায় পাশাপাশি বসে পাংশু মুখে ভাবছে, কিভাবে কোন গাধামি না করে সন্ধ্যাকে কিছু প্রণয়সূচক মধুর বাক্য শোনানো যায়! কিন্তু এখন এই হ্যাং হয়ে যাওয়া মাথাই কোন ডায়লগই আসছে না! “হে প্রভু, তুমি এত বেরসিক কেন?!” ওদিকে আবার অনেকক্ষণ ধরেই শাহেদের ইচ্ছা করছে সন্ধ্যার হাত ধরতে। আর তো একটু পরেই পুতুলের মত সুন্দর এই মেয়েটা চলে যাবে! কিন্তু ফেসবুকের মাত্র তিন মাসের মিথস্ক্রিয়ায় কারো সাথে প্রেম হয়ে গেলে এবং এভাবে প্রথম দেখার একঘণ্টার মধ্যে তার হাত ধরা যায় কি না তা নিয়েও বেচারা যথেষ্ট টেনশনে আছে। ইস......, তবে কি কপালে এই পুতুলটার একটু স্পর্শও জুটবে না?! যা থাকে কপালে, এবার হাতটা ধরেই ফেলব! কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফল হোল উল্টো, শাহেদ বৃষ্টিভেজা ঠাণ্ডা আবহাওয়াতেও ঘামতে লাগল! 'পুতুল'টার মুখের দিকেও আর তাকাতে পারছে না!



ওদিকে সন্ধ্যা কিন্তু বেশ মজা নিয়ে আপাত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে অবিশ্রান্ত বর্ষণ ধারার মাঝে রিক্সার দুলুনি উপভোগ করছে। তবে শাহেদের সব কার্যকলাপই সে তীক্ষ্ণ মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করে চলেছে। একটু আগে যে পাগলটা তার হাত ধরতে গিয়ে হাত বাড়িয়েও শেষ মুহূর্তে সাহস হারিয়ে ফেলে হাত সরিয়ে নিয়েছে তাও সে খেয়াল করেছে। মনে মনে খুব একচোট হেসেছে সন্ধ্যা।এখন অসহায়ের মত মুখ করে হাবা’টা পাশে বসে আছে। ছাগলটা হাতও ধরতে পারলো না!



সন্ধ্যা বসেছে শাহেদের বাম পাশে। বাম হাতে নিজের ছোট ব্যাগ আর ডান হাতে রিক্সার বাম দিকটা ধরে আছে। ফলে যদিও বা রিক্সার দুলুনিতে কখনো হাতটা বা কাঁধটা শাহেদের হাতে বা কাঁধে লাগতে পারত এখন আর তারও কোনও সুযোগ নেই। দুজনের মাঝে এখন প্রায় আধ হাত ফাঁক! শাহেদ বারবার করুণ দৃষ্টিতে সেই ফাঁকটুকুর দিকে তাকাতে থাকল। এই অতি সামান্য দূরত্ব টুকুই এখন ওর জন্য খাইবার পাস, পুলসিরাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। “হায়, এত কাছে তবু কত দূর!!!”



শাহেদের বুকের ছটফটানি ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছে। আর একটু পরেই সন্ধ্যা চলে যাবে! ‘হেই খোদা, প্লীজ কিছু একটা কর!’ কিন্তু এসব যায়গায় খোদা কিছু করে না। যা করার নিজেই করতে হয়। শাহেদ আর থাকতে পারলো না। খুব করুণ মুখে সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে বলল, "সন্ধ্যা, কিছু মনে না করলে তোমার ব্যাগ টা একটু ডান হাতে নিয়ে বসবা প্লীজ?"

"কেন?" সন্ধ্যা বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করে।

শাহেদ কাঁচুমাচু করে উত্তর দেয়, "দেখ, অনেকক্ষণ ধরে তোমার হাত ধরতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ধরতে পারছি না! তুমি যদি ওভাবে বস তাহলে তোমার হাতের ছোঁয়াটা অন্তত আমার গায়ে লাগবে। অন্তত সেটুকুই না হয় আমায় দাও?"

সন্ধ্যা অবাক হয়ে কয়েক মুহূর্ত শাহেদের দিকে তাকিয়ে থাকে।শাহেদের কথা শুনে এবার সন্ধ্যার বেকুব হবার পালা, অবাক বিস্ময় নিয়ে ও কয়েক মুহূর্ত শাহেদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর তখনই সন্ধ্যা শাহেদের চোখে-মুখে পরিস্ফুট হয়ে ওঠা আর্তিতে ওর বুকের হাহাকার’টা টের পায়। "আহারে আমার বেকুব রে--" সন্ধ্যার নিজের বুক’টাও কেমন যেন এক অদ্ভুত মমতায় টনটন করে ওঠে। তারপর ডান হাতে ধরা রিক্সার হুড ছেড়ে দিয়ে শাহেদের হাতটা ধরল। খুব শক্ত করেই ধরল।



চারপাশে তখন কিছুই ঘটলো না। না কোন হিন্দু নববধু উলুধ্বনি দিলো, না বাজলো দুন্দুভি ঢাক, না হল পুষ্প বৃষ্টি , না হল চারপাশ স্থবির। কিন্তু শাহেদের দুনিয়া তখন মুহূর্তের মধ্যে রঙিন হয়ে উঠলো। ওর চারপাশে ফুল ফুটলো, পাখি গাইলো, রক্তের ভিতর কিসের যেন বান ডাকলো। শাহেদ অনেক চেষ্টা করেও নিজের ভাললাগাটুকু লুকিয়ে রাখতে পারলো না। কখন যে সন্ধ্যার হাতটা ওর ঠোঁট স্পর্শ করলো ও বুঝতেই পারলো না। মুখে পুতুলটার হাতের ছোঁয়া লাগতেই শাহেদের সম্বিত ফিরলো। আর সাথে সাথেই ও থতমত খেয়ে হাতটা ছেড়ে দিল। কিন্তু বুকের ভাললাগার রেশ তাতে কিছুমাত্র কমলো না। শাহেদ বুঝতে পারছে না ওর এত ভাল লাগছে কেন?...। কেন "হৈমন্তী"র অপুর মত চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, "আমি পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম!" শাহেদ নিজেকে সামলানোর জন্য মাথা নিচু করে। বৃষ্টির পানি এসে ওদের পা ভিজিয়ে দিচ্ছে। শাহেদ সন্ধ্যার পায়ের দিকে তাকায়। দেখে সন্ধ্যার শঙ্খরঙা পদ্মসম পদযুগলে পড়ে বৃষ্টির পানি যেন ধন্য হচ্ছে! শাহেদের কেমন যেন ঈর্ষা হতে লাগল। ওই পায়েও যেন শুধু শাহেদেরই অধিকার! কেন বৃষ্টি ওর পা স্পর্শ করবে?! শাহেদের খুব ইচ্ছা হচ্ছিল নিচু হয়ে সন্ধ্যার ধবধবে শঙ্খ-সাদা পা থেকে বৃষ্টির পানিটুকু মুছে দিতে। শালার বৃষ্টি!!



২।

এক বছর পর। ফিসফিসয়ে বৃষ্টি পড়ছে। শাহেদ আর সন্ধ্যা আবারো রিক্সায় পাশাপাশি বসে বাসায় ফিরছে। ওরা গিয়েছিল শাহেদের মায়ের অথবা সন্ধ্যার শাশুড়ির বার্থডে গিফট কেনার জন্য। শাহেদ ‘না না’ করছিল। বলেছিল, “মা সেকেলে মানুষ। এগুলো ওনার কাছে আদিখ্যেতা মনে হতে পারে।” কিন্তু সন্ধ্যা কোন কথাই শোনে নি। সে-ই জোর করে শাহেদকে ধরে এনেছে। এখন এই প্রায়ান্ধকার সময়ে গোধূলি-রঙা আকাশের ফিসফিস বৃষ্টি দেখতে দেখতে শাহেদের মনে হচ্ছিল, না এলে বিরাট বড় একটা ভুল হয়ে যেত! হঠাৎ শাহেদের চোখ গেল সন্ধ্যার পায়ের দিকে। মুক্তোদানার মত বৃষ্টির জল জমেছে সন্ধ্যার মোহিনী পদ্মসম পদযুগলে। শাহেদ আপনমনে একটু হাসে। আজ আর কোন বাঁধা নেই। পরমুহূর্তে দেখা যায়, একটা চলন্ত রিক্সার উপরে একটা তরুণ পরম মমতায় একটা পুতুলের মত তরুণীর পায়ে হাত দিয়ে পানি মুছে দিচ্ছে! তরুণীটি তখন বুকে কেমন ঝনঝন শব্দ আর চোখে ছলছল জল নিয়ে মনে মনে ভাবছে – “আমি এখনই কেন মরে যাচ্ছি না! ইস, আমি এখনই কেন মরে যাচ্ছি না?!!এই রকম একটা চরম ক্ষনের পরে, এইরকম পরম প্রনয়োত্থিত ভালবাসার পরে পরিপূর্ণ তৃপ্তি নিয়ে মরতেও যে ভীষণ সুখ!!!"



৩।

আরও পাঁচ বছর পরের কথা। এবং আমাদের গল্পের প্রয়োজনেই সেদিনও বৃষ্টি! আজ শাহেদ আর সন্ধ্যার সাথে রিক্সায় আরও একজন রয়েছে। অবশ্য যদি চার বছরের কাউকে “জন” হিসেবে ধরা হয় তো তবেই!



পিচ্চিটার মুখে সারাক্ষণ প্রশ্নের খই ফুটছে; সবসময় শুধু " বাবাই, এটা কেন, ওটা কি,সেটাতে কি হয়" দিয়ে শাহেদকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। আর সন্ধ্যা তখন পরম মমতা নিয়ে দু'জনের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে শাহেদের নাজেহাল অবস্থা দেখে সন্ধ্যা দুষ্টুমিপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে মিটিমিটি হাসে- ঠিক যেরকমভাবে তাদের পরিচয়ের প্রথমদিনে সন্ধ্যা স্টার কাবাবের সামনে দাঁড়িয়ে শাহেদের উদ্ভ্রান্ত অস্থিরতা দেখে হেসেছিল। ওরকম সময়ে সন্ধ্যার খুব ইচ্ছে করে সেই প্রথমদিনের মত করেই শাহেদের হাতটা ধরতে। কিন্তু এই বিচ্ছু পিচ্চিটার সামনে ওরকম কিছু করার উপায় আছে? সাথে সাথে হাজারটা প্রশ্ন করে বসবে। এই যেমন একটু আগে শাহেদ যখন তার পায়ে হাত দিয়ে বৃষ্টির জল মুছে দিচ্ছিল তখন কোলে বসে বসে সে গভীর মনযোগ দিয়ে পুরো ব্যাপারটা খেয়াল করেছে। আর পরক্ষনেই শাহেদ কে প্রশ্ন করেছে, "বাবাই তুমি আম্মুমনির পায়ে হাত দিলে কেন?" শাহেদও একটুও না দমে পালটা উত্তর দিয়েছে," দেখছো না বাবাই, কত বৃষ্টি পড়ছে! তোমার আম্মুমনির পায়ে বৃষ্টি পড়ছে। না মুছলে তো জ্বর আসবে, তাই মুছে দিলাম।"

ঠোঁট গোল করে মেয়েটা অতি সমঝদার বিজ্ঞের মত বলেছে,"ওওওওও..." পর মুহূর্তেই সে নিজের কচি পা'টা শাহেদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে প্রায় দেখা যায় না এমন বৃষ্টিকণা দেখিয়ে ছটফটিয়ে বলে ওঠে "বাবাইসোনা দেখ, আমার পায়েও বৃষ্টি পড়েছে। মুছে দাও।"

মেয়ের এমন আদুরে ডাক শাহেদের অতি চেনা, অতি পরিচিত। মেয়ের বুকে যখন অনেক সোহাগ জমে, মেয়ের যখন শাহেদের সাথে আহ্লাদ করতে শখ হয়, তখন ও এভাবে “বাবাইসোনা” ডাকে। শাহেদের বুকে স্নেহ বাৎসল্যের বান ডাকে। ও নিচু হয়ে আপন আত্মজার দুধসাদা পায়ে ঠোঁট দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটাটুকু মুছে দেয়। ঠিক যেভাবে সে প্রথমদিন সন্ধ্যার হাতে ঠোঁট ছুঁইয়েছিল ।পিতৃস্নেহের প্রাবল্যে শাহেদ ক্ষণিকের জন্য কেমন যেন দিশেহারা হয়ে যায়। মেয়েটাও তখনই কেন জানি চুপ মেরে যায়। আর মেয়ের মা তখন অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করে। আর মনে মনে ভাবে ‘সুখ! সুখ! একি অসহ্য সুখ! ইশ যদি এখনি মরতে পারতাম তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মা, স্ত্রী - সর্বোপরি সবচেয়ে সুখী নারী হয়ে মরতাম।





অ- মধুরেন সমাপেয়ন্তী ঃ দুঃখিত, স্বপ্নভঙ্গ ঘটাতে বাধ্য হচ্ছি। এই গল্পের প্রথম পরিচ্ছেদ সবাস্তব হলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় পরিচ্ছেদ সম্পূর্ণ কাল্পনিক। সেখানে শাহেদের কোন অস্তিত্ব থাকে না। এখানে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের বাস্তবতা হলো এমন যে, কোন এক বড় চাকুরের গৌরব বর্ধিত কারিনী সুন্দরী, বিদুষী ‘ওয়াইফ’ হিসেবে সন্ধ্যা স্বামীর সাথে ঈদের শপিং সেরে বাসায় ফেরার সময় রাস্তার ঝামেলা এড়াতে ট্যাক্সিকেই বেছে নেয় - অবিশ্রান্ত বর্ষণধারায় রিক্সার দুলুনি সন্ধ্যার আর কখনোই উপভোগ করা হয়ে ওঠে না। আর ফেরার পথে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে বৃষ্টির জলের ছোঁয়া নিতে গিয়ে সদাগম্ভীর স্বামীর যে কড়া ধমকটা সে খায় তা না হয় উহ্যই থাক। আর তৃতীয় পরিচ্ছেদটাও উহ্য রাখা যেতে পারে; যেখানে কর্পোরেট স্বামীর ভীষণ ব্যস্ততার দরুন সন্ধ্যাকেই মাঝে মাঝে বাজারের ব্যাগ আর বৃষ্টির ছাতা নিয়ে বাজারে ছুটতে হয়। এবং সেখানে সন্ধ্যার শঙ্খ রঙা পায়ে কেবল বৃষ্টির পানিই না, কাঁদা-জল কিংবা নর্দমা উপচানো নোংরা পানিও লাগে। আর শাহেদ এখানেও অস্তিত্ববিহীন বলে সেই নোংরা কাদাজল কেউ আর পরম মমতায় মুছিয়ে দেয় না। সন্ধ্যাদের মত পুতুলদের পাশে শাহেদদের মত মধ্যবিত্ত বেকুবরা আসলে কখনোই. শেষ পর্যন্ত থাকেনা, থাকতে পারেনা। তাদের প্রণয় গাধামীতে শুরু হয়। আর শেষ হবার পর তারা চুড়ান্ত গাধাতে পরিনত হয় তখন, যখন দেখে যে কেউ একজন এসে তার পুতুলটাকে নিয়ে যাচ্ছে আর সে কিছুই করতে পারছে না।



এই গল্পটা আসলে শাহেদের না, এমনকি সন্ধ্যার ও না। এই গল্প আসলে সন্ধ্যার কর্পোরেট স্বামীর; যার নামটাও পাঠকের অজ্ঞাত রয়ে যায়।

মন্তব্য ২ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ৩০ শে আগস্ট, ২০১৪ বিকাল ৫:৪০

গোল্ডেন গ্লাইডার বলেছেন: ভালোলাগলও গল্প +++

২| ৩১ শে আগস্ট, ২০১৪ রাত ৯:১৭

নাজমুল জর্জ বলেছেন: ধন্যবাদ ভাই।
অনেক দৌড়ের উপরে থেকেও চেষ্টা করেছি করেছি গুছিয়ে লিখতে।
পাঠকদের ভালোলাগা'টাই আমার তৃপ্তি ও প্রাপ্তি।
অসংখ্য ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.