| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মধ্যরাত। ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘর পেরিয়েছে অনেক আগেই। চারপাশ নীরব, নিথর। সুনসান নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে পুরো শহরটাকে। নগরীর দালান কোঠার ইট পাথরগুলোও যেন ঘুমিয়ে আছে। ল্যাম্পপোস্ট এর আলোয় দেখা যায় একটি তরুণ ধীর পায়ে হেঁটে আসছে। তার ধুলামলিন কেডস আর জিন্স বলছে সে অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে। তবুও তার মাঝে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য কোন ব্যাস্ততা দেখা যায় না। দু'হাত পকেটে পুরে আনমনে মৃদু , লঘু পদক্ষেপে সে হেঁটে চলেছে। তার পায়ের চেনা শব্দে পথপাশে শুয়ে থাকা কুকুরটি হঠাত সচকিত হয়। মুখ তুলে তরুণটিকে কিছুক্ষন দেখে। তারপর আবার মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ে। প্রথম প্রথম সে খুব চিৎকার করত, এখন আর করে না। তরুণটি তার চেনা। সে একমনে হেঁটে যায়। থানার সামনে এসে দেখে পরিচিত সেই বৃদ্ধ কনস্টেবলটি ডিউটি করছে। কাছে এগিয়ে এসে সে বলে,"কেমন আছেন, চাচা?" স্মিত হেসে বৃদ্ধ উত্তর দেন,"ভাল বাবা, তুমি ভাল তো?" তরুণটিও হেসে জবাব দেয়,"জ্বি, ভাল।" টুকটাক কিছু কথা বার্তা হয়। তারপর তরুণটি আবার পথের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। পিছনে বৃদ্ধটি তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। আহারে! বৃদ্ধের বুক টনটন করে ওঠে। ছেলেটা এই কচি বয়সে কি ব্যাথায় কেন যে এমন বাউলের মত পথে পথে হেঁটে বেড়ায় কে জানে।
তরুণটি তখন নিবিষ্টমনে পথ চলছে। বাস স্টপেজের কাছে এসে আজ সে কোন পথশিশুকে দেখতে পায় না। তরুণটি একটু মলিন হাসে। পথশিশুদের জানা হোল না যে আজ রাতেও তাদের প্রিয় "রাত্তির ভাইয়া" এসেছিল।
সে আবার পথ চলে। ধীরে ধীরে নগরীর সীমানা ছাড়িয়ে সে শুন্য ফাঁকা পথে এসে পড়ে। সে হেঁটে যায়, হেঁটে যায়। যেন অনন্তের পথে এক দিনান্তের পথিক। তার মনের মাঝের ক্ষ্যাপা, দুষ্টু রাখাল বালকটি প্রাণ - বাঁশিতে ঘরছাড়া তানে টান মেরেছে। সেই বাঁশির সুর ধরে সে হেঁটে চলেছে। যেন এভাবে হাঁটতে হাঁটতে "নিশীথ নিখিল" প্রদক্ষিণ করে ফেলবে। সে পথ চলে আর আপন মনে কথা বলে। অন্তরের অন্তঃ কোণে সঙ্গোপনে সঞ্চিত পুঞ্জীভূত বঞ্চিত ব্যাথাগুলো সে পথচলার সাথী ধুলা, বাতাস, আঁধার, আকাশ আর নিজেকে শোনাতে থাকে। হঠাত মাটিতে নিজের ছায়া দেখে সে আকাশপানে চায়। সেখানে আধখানা চাঁদ অকাতরে ধরণীতে জ্যোৎস্না বিলাচ্ছে। এবার পাষাণ কঠিন, আত্মভোলা পথচলা পথিকের চোখের কোণে অশ্রু চিকচিক করে ওঠে। চাঁদ যে তার বড় প্রিয়। আর সেই চাঁদের মায়াময় জ্যোৎস্না তেই যেন তার বুকের ব্যাথা গলে গলে চোখের জল হয়ে ঝরে পড়ছে।
অশ্রুভরা সজল নয়নে সে আপনমনে ভাবে একদিন এ চোখেও স্বপ্ন ছিল, বুকে ছিল বিশ্বজয়ের দুর্মর সাধনা ও সাহস। আর............তরুনটির ঠোঁটে কান্নার চেয়েও করুণ একটুকরো হাসি ভেসে উঠল; আর ছিল এক দেবী, তার মানসী প্রিয়া, তার ভালবাসা। এই অবস্থায় ছন্নছাড়া বাউন্ডুলের জীবনেও প্রণয় ছিল, ছিল ভালবাসাবাসি। কি তীব্র ছিল তার সেই ভালবাসা। প্রণয়িনী কে সে আসলে ভালবাসেনি, পূজা করেছে। একবার গোপনে সবার চোখ এড়িয়ে তার পায়ে চলার পথের ধুলো সংগ্রহ করেছিল। তারপর থেকে প্রায় প্রতি রাতে সেই ধুলো বুকে চেপে ধরে চুমু খাওয়া আর চোখের জলে ভেজানো তার নিত্যকর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিন তরুণীটি সব জেনে তাকে খুব ধমকেছিল ,"এত পাগল কেন তুমি? এমন কেউ কখনো করে? ফেলো ওটা।" সত্যি সত্যি সে হাত থেকে কাগজে মোড়ানো ধুলোটুকু কেড়ে নিতে গিয়েছিল। তরুণটি তখন সাতরাজার ধন তার এ মহামহিম সম্পদ বাঁচানোর জন্য নতজানু হয়ে বসে পড়েছিল তার চরণ প্রান্তে। নির্বাক তরুনী প্রবল বিস্ময়ে অনেকক্ষণ পাথরের মত দাঁড়িয়ে ছিল। শেষে তার হাত ধরে বলেছিল " এত প্রচন্ড ভাবে কেউ কখনো ভালবাসতে পারে? কেন এত বেশি ভালবাসলে আমাকে? আমি যে এর প্রতিদান দিতে পারব না। অন্ধের মত এত ভালবাসা ভাল না গো।" উত্তরে তরুণটি শুধু মৃদু হেসেছিল। আজ সেই কথাগুলো মনে করে সে হাসছে। সত্যিই তরুণীটি তার ভালবাসার প্রতিদান দিতে পারেনি। আর সেই অন্ধ প্রেমের ফল সে আজ এক নিশাচর পথিক। আজ নিশুত নিশীথে জল ভরা চোখে পথসম্মুখে সে একাকী ধেয়ে যায় ক্ষ্যাপা ঝড়ের মত। তবু তার বুকে জ্বালা জ্বালা বেদনার উপশম হয় না। অশ্রু-বন্যায় তার বুক ভেসে যায়, তবু বুকের আগুন তাতে নেভে না।
অথচ এই চোখেই কী বিশাল বিশাল স্বপ্ন দেখত সে! আজকের অগ্নিদগ্ধ এই বুকে একদা ছিল কী দুরন্ত প্রতিজ্ঞা! সে আকাশটাকে ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেনি তার চেয়েও বড় আকাশটাকে টেনে এনে পায়ের তলায় লুটাতে চেয়েছে। সে যোগ্যতাও তার ছিল। একদিন সে তরুণীটিকে বলেছিল তার স্বপ্নের কথা। ভীষণ অবাক হয়েছিল সে মেয়ে, অদ্ভুত ঘোরলাগা চোখে চেয়ে বলেছিল,"এত বড় স্বপ্ন দেখ তুমি!" তরুণটি হেসে বলেছিল, "হ্যাঁ , দেখো আমি সত্যি পারব"। দুরন্ত স্বপ্নজয়ের সাধনায় পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে তরুণী হাত রেখেছিল তরুণের হাতে, সেদিন ছিল ভ্যালেন্টাইনস ডে। বিশ্ব ভালবাসা দিবসের উপহার লাল গোলাপের কিছু পাপড়ি তরুণের হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিল," হ্যাঁ আমিও জানি তুমি পারবেই।" সত্যি তরুণটি পারছিলও বটে; একে একে সকল দুরাতিক্রম্য পথ বন্ধন গুলো ছিঁড়ে অনায়াসে খুব দ্রুত তরতর করে পৌঁছে গিয়েছিল স্বর্গ -সোপানের শেষ স্বর্গদ্বারে । কিন্তু তারপর......? হায় চিল, হায় সোনালী ডানার চিল। জীবনানন্দের চিলের চেয়েও করুণ পরিণতি হয়েছে তার। তরুণের স্বপ্ন সাধনার সোনালী ডানা ভেঙ্গে চুরে, দুমড়ে মুচড়ে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে স্বর্গ দুয়ার হতে। ধরণীর পাথুরে জমিনে আছড়ে পড়ে তার স্বপ্ন দেখার সুন্দর সেই চোখ দু'টি অন্ধ হয়ে গেছে। আজ সে স্বপ্ন দেখতে পারে না। তার ভাঙ্গা বুকে এখন আর কোন প্রতিজ্ঞা জন্মায় না। সেই স্বপ্ন ভঙ্গের সাথে সে জেনেছিল, স্বজনপ্রীতির এই দেশে স্বজনহীন তাকে কোন স্বপ্ন দেখা যাবে না। তার যোগ্যতা কেবলি তার যন্ত্রণা। তাই এখন সে সযত্নে তার যোগ্যতাগুলি লুকিয়ে রাখে। কিন্তু তবু কি তার যন্ত্রণা কমেছে? তরুণটি আপনমনে মৃদু হাসে। তাকে সবচেয়ে বড় ব্যাথা দিয়েছে তো সে-ই যে কি না তার সকল ব্যাথা ভুলিয়ে দিতে পারত। সেই তরুণী , সেই দেবী।
স্বপ্ন ভঙ্গের পর যেদিন তাদের দেখা হল সেদিন তরুণটির মুখে কোন কথা ছিল না। উদভ্রান্ত তার দৃষ্টি তখন হারিয়ে গিয়েছিল দূরে, বহুদুরে। আর তরুনীটি সেদিন সত্যিই দেবির মত শক্তি দিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। তরুণের বুকের আগুনে সে নিজেও পুড়ছিল। তবু পরম মমতাভরে তরুণের হাত ধরে শান্ত, কোমলকন্ঠে বলেছিল,"এত মন খারাপ কোর না, সোনা। তুমি ঠিকই বিজয়ী হয়েছ। আমি তো জানি তুমি কি; দরকার নেই অতবড় স্বপ্ন পূরণের। দু'জনে একসাথে দু'মুঠো খেয়ে বাঁচতে পারলেই আমাদের চলবে, আর কিছু চাই না। লক্ষীসোনা আমার, ভেঙ্গে পড়ো না। জীবনের এখনো বহুপথ সামনে রয়েছে। চল আমরা এভাবে হাত ধরে থেকে একসাথে পথ চলি।" আশাহত বেদনাতুর বুকে কথাগুলো সত্যিই নতুন উদ্যম এনে দিয়েছিল। সে ফিনিক্স পাখির মত জেগে উঠেছিল ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে। তারপর সর্বহারা সেই ব্যর্থ জীবনটি সে নতুন করে সাজাতে চেয়েছিল। সবকিছু হারিয়ে তরুণটি তখন সেই মেয়েকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছিল। প্রচন্ড রুদ্র রোষে নতুন যুদ্ধসাজে সে নিয়তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেনি, বরং শান্ত সুবোধ বালকের মত সে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল তার হাতে। নিঝুম রাতে অবুঝ শিশু ভূতের স্বপ্ন দেখে ভয়ে ঘুম ভেঙ্গে প্রচন্ড আতঙ্কে যেভাবে মাকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে, সে-ও ঠিক তেমনি মেয়েটিকে দু'হাতে আঁকড়ে ধরেছিল। মেয়েটিও মায়ের মত গভীর ভালবাসায় তরুণকে নিজের কাছে টেনে নিয়েছিল।
এবং এরপর.........? আহ তরুণটি আর ভাবতে চায় না, তার বুক ব্যাথায় বিষিয়ে ছিঁড়ে খুড়ে যায় তবুও ভাবনাগুলো আসতে থাকে। সে জানেনা কেন ধীরে ধীরে তার দেবীটি বদলে যেতে থাকে, কেনই বা সেই মেয়ে তার জীবনের আগের পুরুষটিকে ফিরিয়ে আনে। তরুণটি তীব্র অপমানের জ্বালা আর বুকভরা অভিমান নিয়ে নীরবে সরে দাঁড়িয়েছিল তরুণীর জীবন থেকে। আর দূর থেকে অবাক হয়ে দেখল তার দেবী তাকে ছাড়াই খুব ভালমতোই জীবনপথ চলতে পারছে। ব্যস, সে আর সেই মেয়ের জীবনে অনাহুত কুকুরের মত অনুপ্রবেশ করতে যায়নি। তার মনে ছিল কোন এক প্রণয় লগনে মানসীকে সে বলেছিল, "তোমার জীবনে কখনো যদি বৃহস্পতি না-ও হতে পারি, শনি যে হব না সে ব্যাপারে নিশ্চিত থেকো।" আজো সে তার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করে চলেছে। সে তো এখন মেয়েটির কাছে মূর্তিমান শনি-রাহু। তাই সে তরুনীটির সাথে যোগাযোগের বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করে না।
তরুণটি এসব ভাবতে ভাবতে তার পকেট থেকে কি যেন একটা বের করে, একটা দলা পাকানো শক্ত কাগজ। সেটা সে ধীরে ধীরে খুললো। দু'চোখ ভরা জল নিয়ে ঝাপসা চোখে দেখতে লাগল সেই ধুলোটুকু! আজ এটুকুই তার বাঁচার অবলম্বন। হঠাত একফোঁটা চোখের পানি টপ করে ঝরে পড়ল বহুবার অশ্রুভেজা সেই ধুলোটুকুর উপর। আরো এককনা অশ্রুজল তরুনীর পদধূলিতে বাড়তি যোগ হল। তরুণটি পরম মমতায় কাগজটা ঠোঁটে ছোঁয়াল। তারপর কাগজটা মুড়ে আবার পকেটে ঢুকিয়ে রাখল।
তরুণটি আকাশপানে চায়। চাঁদ ডুবে যেতে বসেছে; প্রভাত হয়ে আসছে, তার ঘরে ফেরার সময় হল। রাতমাতা তার এই নিশি সন্তানকে বিদায় জানায়। মৃদু ঝিরঝির বাতাস এসে যেন তার বুকের ব্যাথাটি কমানোর চেষ্টা করে। তরুণটি এলোমেলো ধীর পায় ফিরতি পথ ধরে। তার পকেটের মিউজিক প্লেয়ারে শেষরাতের আঁধার আর নিস্তব্ধতা চিরে দিয়ে নচিকেতা তখন ভরাট গলায় গেয়ে চলেছেন...
একা একা পথ চলা
একা একা কথা বলা...
©somewhere in net ltd.