নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মিশু মিলন

মিশু মিলন

আমি বর্তমানে ইস্টিশন এবং সামহোয়্যার ইন ব্লগে লিখি। আমার সকল লেখা আমি এই দুটি ব্লগেই সংরক্ষণ করে রাখতে চাই। এই দুটি ব্লগের বাইরে অনলাইন পোর্টাল, লিটল ম্যাগাজিন এবং অন্য দু-একটি ব্লগে কিছু লেখা প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে কিছু কিছু লেখা আমি আবার সম্পাদন করেছি। ফলে ইস্টিশন এবং সামহোয়্যার ইন ব্লগের লেখাই আমার চূড়ান্ত সম্পাদিত লেখা। এমনকি আমার কম্পিউটারের লেখাও চূড়ান্ত সম্পাদিত নয়, কেননা এখন আমি ব্লগেই লেখা সম্পাদন করি। এই দুটি ব্লগের বাইরে অন্যসব লেখা আমি প্রত্যাহার করছি। মিশু মিলন ঢাকা। ৯ এপ্রিল, ২০১৯।

মিশু মিলন › বিস্তারিত পোস্টঃ

মুসলমানরা কাশ্মীরে কি চায়, মানবাধিকার নাকি ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ প্রতিষ্ঠার মুসলমানধিকার? (প্রবন্ধ-১০)

০৮ ই অক্টোবর, ২০১৯ রাত ১০:১৬

ভারত সরকার সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করেছে, খারিজ হয়ে গেছে ৩৫এ অনুচ্ছেদও। ফলে বাতিল হয়ে গেছে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা এবং এর ফলে প্রাপ্ত সকল সুবিধা ।জম্মু-কাশ্মীর থেকে লাদাখকে বিচ্ছিন্ন করে কেন্দ্র শাসিত দুটি অঞ্চল, অর্থাৎ জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উপমহাদেশের মানুষের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কেউ বলছে-কাশ্মীরে ভারত সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, আবার কেউ বলছে-মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই কাশ্মীরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়েছে।

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল হওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতি- রাজনীতি-সংস্কৃতিতে কোনো প্রভাব না পড়লেও মুসলমানদের মনোজগতে যে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে তা বোঝা যায়-সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রাখলে, চায়ের দোকানে কান পাতলে, টেলিভিশনে টকশো দেখলে, ওয়াজ মাহফিল এবং শুক্রবারে মসজিদের মাইকে জাম্মার নামাজের বয়ান শুনলে! সবখানেই কারবালার হাহাকার আর পরাজয়ের ক্ষোভ!



১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী আর্মিদের খেদমতকারী তৎকালীন চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করীমের বংশধর বর্তমান চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেছেন, ‘কাশ্মীরের জন্য প্রয়োজনে সময় দেব, অর্থ দেব। যদি জীবন দিতে হয় তাও দেব।’ তথ্যসূত্র: দৈনিক ইনকিলাব; ৬ আগস্ট, ২০১৯।


এ বছরই অর্থাৎ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, সংবাদ মাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে চরমোনাই পীর ভারতের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ জিহাদের ডাক দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, ‘বিগত কয়েকদিন যাবৎ ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরসহ বিভিন্ন প্রদেশে মুসলমানদের উপর অব্যাহতভাবে নির্যাতন, ধর্ষণ মুসলিমবিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। নির্যাতনের লোমহর্ষক এ ঘটনা কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না। কাশ্মীরে মুসলিম নির্যাতন বন্ধে বিশ্বমুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কাশ্মীরে মুসলিম নির্যাতন বন্ধ না করলে বাংলাদেশের মুসলমানরা নীরবে বসে থাকবে না। প্রয়োজনে বাংলাদেশের মুসলমানরা কাশ্মীর অভিমুখে লংমার্চ করে মুসলমানদের রক্ষা করবে।’ তথ্যসূত্র: দ্যা বাংলাদেশ টুডে; ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯।


কাশ্মীরে মুসলিম শাসন এবং প্রভাব বজায় রাখতে সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম মুসলিমবিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হতে বলেছেন। কাশ্মীরের স্বাধীনতা পর্যন্ত চেয়েছেন। কাশ্মীরের জন্য অর্থ-জীবন দিতেও চেয়েছেন! অথচ কী আশচর্য, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা চালানোর পরও অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন রেজাউল করীমের পিতা তৎকালীন চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করীম। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদারদের অত্যাচার-নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে শত শত বাঙালি নারী ফজলুল করীমের মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছিল। তারা ভেবেছিল মাদ্রাসা একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আর ফজলুল করীমও একজন ধার্মিক মানুষ, তার আশ্রয়ে থাকলে তিনি নিশ্চয় তাদের রক্ষা করবেন পাকিস্তানী বাহিনীর হাত থেকে। কিন্তু নির্মম সত্য হলো, চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করীম ফতোয়া দিয়েছিলেন যে তার মাদ্রাসায় আশ্রয় নেওয়া নারীরা হচ্ছে গণিমতের মাল, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এদের ভোগ করা জায়েজ আছে। পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক ধর্ষিত-অত্যাচারিত সেইসব আশ্রিত মেয়েদের মৃতদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো, মাদ্রাসার পিছনে গণকবরে পুঁতে ফেলা হতো। ফজলুল করীম নিজ হাতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা এবং হিন্দুকে জবাই করেছেন। এইসব মৃতদেহ যাতে ভেসে না ওঠে সেজন্য লাশের পেট কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো।


বর্তমান চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম তার পিতার আদর্শ ধারণ করেই বেড়ে উঠেছেন এবং পীর হয়েছেন। তিনি কখনোই তার পিতার এহেন নৃশংস অপকর্মের কথা স্বীকার করেননি বা এজন্য ক্ষমা প্রার্থণা করেননি। এমন একজন মানুষ কাশ্মীরের স্বাধীনতার কথা বলছেন, কাশ্মীরে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন! অথচ ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে বাংলাদেশে সুন্নী মুসলমানরা ক্রমাগত হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-আদিবাসীদেরকে নির্যাতন, নারীদেরকে ধর্ষণ, তাদের সম্পদ লুণ্ঠন এবং পূর্ব-পুরুষের ভিটে-মাটি থেকে তাদেরকে উচ্ছেদ করছে; এসবের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদী বিবৃতি দেওয়া করা দূরে থাক, একটা কথাও বলেননি মুমিন পীর। চরমোনাই পীরের এই মানবাধিকার সত্যিকার অর্থে মানবাধিকার নয়, বস্তুত তা মুসলমানধিকার! সব জাতি-গোষ্ঠীকে নিয়ে একটি মানবিক সমাজ গড়ার জন্য নয়, অমুসলমান শূন্য ‘দারুল ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার জন্য এই মুসলমানধিকার। আর ‘দারুণ ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার এই মুসলমানধিকার অমুসলমানদের জন্য কতোটা ভয়ংকর হতে পারে তা নিরপেক্ষ মন নিয়ে কাশ্মীরের ইতিহাস কিংবা ইসলামের ইতিহাস পড়া ব্যক্তিমাত্রই জানে!


বাংলাদেশে নেহাত সাধারণ অন্নজীবী থেকে শুরু করে সলিমুল্লাহ খানের মতো ধুর্ত বুদ্ধিজীবী পর্যন্ত প্রায় সকল মুসলমানই এখন চরমোনাই পীরের সঙ্গে কোরাস গাইছে, কেউ একটু ভদ্রস্থভাবে, কেউবা উগ্র-কদর্যভাবে! স্বাধীনতার আটচল্লিশ বছর পর চরমোনাই পীরের মতো মৌলবাদীদের এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন যে তারা অধিকাংশ ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রায় সকল মুসলমানকে এক সুতোয় গেঁথে নিজেদের সুরে কোরাস গাওয়াতে পারছে। এজন্য চরমোনাই পীরদের গত আটচল্লিশ বছর ধরে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে, আজ তারা সফল!


৯ আগস্ট ছিল শুক্রবার, হঠাৎ ‘আল্লাহু আকবর-নারায়ে তাকবীর’ স্লোগান শুনে বারান্দায় গিয়ে দেখি জুম্মার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে মুসল্লিদের বিশাল মিছিল বেরিয়েছে, স্লোগানে তারা মুসলমানদের এক হওয়ার কথা বলছে, ভারতকে সাবধান করছে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার কারণে, কাশ্মীরের মুসলমানদের পাশে থাকার কথা বলছে। একবারও তারা মুসলমান কর্তৃক নির্যাতন-নিপীড়নের মাধ্যমে কাশ্মীরের লক্ষ লক্ষ হিন্দু পণ্ডিতদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে কথা বলেনি। এটাই ‘দারুল ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমানধিকার। বাংলাদেশে এই রকম মিছিল বহুবার বেরিয়েছে শুক্রবারের জুম্মার নামাজের পর মসজিদ থেকে; জ্বালাময়ী স্লোগান এবং বিদ্বেষমুলক বক্তৃতা দেওয়া হয়েছে-ভারত, আমেরিকা, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে সৌদি জোটের বিমান হামলায় ইয়েমেনে নিহত হাজার হাজার মুসলমানদের পক্ষে কিংবা ইয়েমেনের স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসায় সৌদি জোটের বিমান হামলার প্রতিবাদে একটি মিছিলও বের হয়নি মসজিদ থেকে! মুসলমানবতারও তবে রাজনীতি আর শ্রেণিবৈষম্য আছে! মুসলমানবতা কেবল গাজার মুসলমানদের জন্য, কাশ্মীরের মুসলমানদের জন্য, রাখাইনের মুসলমানদের জন্য; ইয়েমেনের মুসলমানদের জন্য নয়! হায় হতভাগ্য ইয়েমেনী মুসলমানগণ, ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ আর ‘মুসলমানবতা’ ইয়েমেনে মৃত!


দুই

কাশ্মীরের ইতিহাস নিয়ে লেখার সময় বা কথা বলার সময় প্রায় সব মুসলমান, ভারতের ডানপন্থী এবং বামপন্থী বিরোধী দলগুলির কিছু রাজনীতিক ও এদের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত ভারতবর্ষের ইতিহাস সম্পর্কে গভীর পাঠ না থাকা সর্বজ্ঞ স্বভাবের কিছু অজ্ঞ, ইতিহাস সচেতন কিন্তু সত্য প্রকাশে অসৎ আর ব্যক্তিস্বার্থে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মুসলমানদের পক্ষালম্বনকারী কিছু ডান ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ভারতের সাথে হরি সিংহের চুক্তি আর ভারতীয় সেনা কর্তৃক কাশ্মীরের মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের (যা অবশ্যই কিছুটা সত্য, বেশিরভাগই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যমুলক অপপ্রচার) কথা বলে। যেহেতু এই লেখায় বারবার এদের প্রসঙ্গ আসবে তাই আলোচনার সুবিধার্থে এদেরকে তাকিয়াপন্থী বলতে বলবো। একজন মুসলমান যখন অন্য মুসলমানের অন্যায়-অপরাধ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে লুকোয় তখন তাকে তাকিয়া বলে। যেহেতু মুসলমানদের এই স্বভাব উপরেল্লিখিত শ্রেণির কিছু অমুসলমানের মধ্যেও ঢুকে গেছে এবং তারাও মুসলমানদের দোষ লুকোতে ব্যস্ত থাকে, তাই এদেরকেও তাকিয়াপন্থী বলাই উত্তম।


আজকে তাকিয়াপন্থীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভারতবর্ষের গায়ে অসহিষ্ণু তকমা লাগাতে চাইছে। কিন্তু ভারতবর্ষ কি সত্যিই ততোটা অসহিষ্ণু, যতোটা তারা প্রচার করছে? ভারতবর্ষ অসহিষ্ণু হলে রাম মন্দির-বাবরি মসজিদ ইস্যু হাইকোর্টে যেতো না আর এতো বছর ঝুলে থাকতা না, একদিনেই বাবরি মসজিদ নিশ্চিহ্ন করে সেখানে রাম মন্দির গড়ে উঠতো। অতীতে সুলতানি এবং মোগল আমলে বহু মন্দির ধ্বংস করে সেখানে মসজিদ-খানকাহ্ গড়ে তোলা হয়েছে, এই ইতিহাস জানার পরও রামমন্দির-বাবরি মসজিদ ইস্যু কোর্টে গড়িয়েছে। এটা যদি কোনো মুসলমানপ্রধান দেশে হতো, তাহলে বিষয়টা নিয়ে কোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার কোনো সুযোগই পেতো না হিন্দুরা, হিন্দুদের কচুকাটা করে মন্দির গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে গড়ে তোলা হতো মসজিদ। তারপরও তাকিয়াপন্থীরা বলে ভারতবর্ষ অসহিষ্ণু! হ্যাঁ, অবশ্যই উত্তর ভারতে মুসলমানদের ওপরে কিছু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। সেটা অবশ্যই নিন্দ্যনীয়। বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তানে যে হারে অমুসলমানদের ওপর নির্যাতন, ধর্মান্তর এবং ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়; তার পাঁচ শতাংশও ভারতের মুসলমানদের ওপর করা হয় না। বরং যেখানে মুসলমানরা সংখায় বেশি বা প্রায় সমান সেখানেই তারা অমুসলমানদের ওপর নিপীড়ন চালায়। এখনো প্রতিবছর বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের বিপুল পরিমাণ নির্যাতিত হিন্দু-শিখ ভারতে আশ্রয় নেয়, কিন্তু ভারতের কতোজন মুসলমান পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়?


যাইহোক, হরি সিংহের চুক্তি আর সেনা কর্তৃক কাশ্মীরি মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, এই দুটি বিয়য়ের বাইরে অন্যান্য আরো অনেক বিষয়ে তাকিয়াপন্থীরা নীরব, যেন এই দুটি বিষয়ের বাইরে কাশ্মীরের আর কোনো ইতিহাস নেই, যেন অতীতে সেখানে কোনো ধরনের নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি! কাশ্মীর প্রসঙ্গ উঠলেই তাকিয়াপন্থীরা ১৯৪৭ সালে থেমে যায়, তার পূর্বে যেতে চায় না। যেন কাশ্মীরের গোরাপত্তন ও ইতিহাস শুরু হয়েছে ১৯৪৭ সালে! এটা তাকিয়াপন্থীদের একটা কৌশল, ১৯৪৭ সালের পূর্বের ইতিহাসকে তারা আড়াল করতে চায়, মানুষকে জানতে দিতে চায় না, কেননা সে-ই ইতিহাস খুঁড়তে গেলেই বেরিয়ে পড়বে ইসলামের বর্বরতার অধ্যায়, হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখদের রক্তে ভূ-স্বর্গকে স্নান করানোর কলঙ্কজনক অধ্যায়!


কাশ্মীরের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরোনো। কাশ্মীরের নামকরণ হয়েছে ব্রহ্মার পুত্র কাশ্যপ মুনির নাম থেকে। কাশ্মীর হিন্দু পুরাণের বহু চরিত্র এবং দেবতাদের বিচরণক্ষেত্র। অনেক প্রসিদ্ধ পণ্ডিত এবং ঋষির বাস ছিল সেখানে, যারা সংস্কৃত ভাষায় লিখেছেন বহু গ্রন্থ, সমৃদ্ধ করেছেন সংস্কৃত সাহিত্য। পুরাণের অনেক গল্পের জন্ম সেখানে। বহু শ্লোক ও শাস্ত্র রচিত হয়েছে সেখানকার পণ্ডিতদের দ্বারা, যা থেকে জানা যায় তৎকালীন কাশ্মীরের মানবসভ্যতার ইতিহাস। কলহনের ‘রাজতরঙ্গিনী’ কাশ্মীরের ইতিহাস ও হিন্দু সভ্যতার এক কালজয়ী গ্রন্থ। কাশ্মীরি পণ্ডিত সোমদেব লিখেছেন-‘কথা সারিৎসাগর’, বিলহন লিখেছেন-‘চৌর পঞ্চাশিকা’, ক্ষেমেন্দ্র লিখেছেন-‘বৃহৎ কথামঞ্জরী’, কাশ্মীরের মন্ত্রী ও কবি দামোদর গুপ্ত লিখেছেন শৃঙ্গাররসাত্মক কাব্যগ্রন্থ-‘কুট্টনীমতম’। এরকম বিভিন্ন সময়ে কাশ্মীরের বহু পণ্ডিত বহু গ্রন্থ রচনা করে সমৃদ্ধ করেছেন সংস্কৃত সাহিত্য। যার কিছু কিছু হয়তো চিরতরে হারিয়ে গেছে পরবর্তীকালে সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিধ্বংসী ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের আগ্রাসনে। কাশ্মীর ছিল হিন্দু পণ্ডিত-সাধু-সন্ন্যাসীদের বসবাস এবং জ্ঞান ও আধ্যাতিকতা চর্চার স্থান; বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জ্ঞানচর্চার জায়গা; সংখ্যায় অল্প হলেও শিখদেরও বসবাসের স্থান। কাশ্মীরে তো কোনো মুসলমান ছিল না, তাহলে সেখানে কী করে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলো? কোন জাদুবলে? সেই ইতিহাস একটু খুঁড়ে দেখা দরকার।


বিগত তিন হাজার বছরে ভারতবর্ষ বারবার বহিরাগতদের আক্রমণের শিকার হয়েছে। গ্রীক, শক, হূণ, দল, মোগল, পাঠান, তুর্কী, ফরাসী, পর্তুগীজ,  ইংরেজ; যারা যেভাবে পেরেছে ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছে, কেউ ভারতের ক্ষুদ্র অংশ আর কেউবা ভারতের বৃহত্তর অংশ শাসন-শোষণ করেছে। কিন্তু হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না যে ভরতবর্ষের কোনো রাজা কিংবা জাতি-গোষ্ঠী ভারতবর্ষের বাইরে গিয়ে অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠীকে আক্রমণ করে তাদের ধন-সম্পদ-নারী লুণ্ঠন এবং তাদেরকে ধর্মান্তর করেছে কিংবা তাদের ভূ-খণ্ড দখল করে শাসন হয়েছে। এটাই সহিষ্ণু ভারতবর্ষ, সহিষ্ণুতাই ভারতবর্ষের সংস্কৃতি। আর এই সহিষ্ণুতার সুযোগই বারবার নিয়েছে বহিরাগতরা। ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম ভাগে মধ্য এশিয়ার হূন জাতি উত্তর ভারতে আক্রমণ চালায় তোরোমান নামক একজনের নেতৃত্বে, তিনি নিজেকে উত্তর ভারতের রাজা বলে ঘোষণা দেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের তখন ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা, গুপ্তরা হূনদের আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়। হূনদের অত্যাচারে তখন জনজীবন বিপর্যস্ত। তোরোমানের মৃত্যুর পর আরেক হূন মিহিরকুল রাজা হন, তিনি অত্যাচারী রাজা হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। জনগণকে নিপীড়ন করে তিনি পুলক অনুভব করতেন। তিনি এতোটাই নৃশংস ছিলেন যে কাশ্মীরের উঁচু পর্বত থেকে হাতি বা অন্য কোনো প্রাণি নিচে ফেলে দিয়ে আনন্দ অনুভব করতেন। এক পর্যায়ে রাজা বলাদিত্যের নেতৃত্বে অন্যান্য ভারতীয় নৃপতিবৃন্দ মিহিরকুলকে আক্রমণ করে পারাজিত করেন। বলাদিত্য মিহিরকুলকে হত্যা করার বদলে ক্ষমা করে দেন এবং তাকে ভারতবর্ষ ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। এটাই ভারতীয় সহিষ্ণুতা এবং উদারতা। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক মিহিরকুল ভারত ত্যাগ না করে কাশ্মীরে চলে যায় এবং পুনরায় রাজা বলাদিত্যকে আক্রমণ করে। মিহিরকুলের এই আক্রমণ অবশ্য ব্যর্থ হয় এবং হূনদের প্রভাব ভেঙে পড়ায় তারা মিশে যায় ভারতীয়দের সঙ্গে। অত্যাচারী হূনরা তাদের রাজত্বের শেষ দিকে কাশ্মীরের জনগণের ওপর অত্যাচার-উৎপীড়নের মাত্রা আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।


১১৮৯ সালে মোহাম্মদ ঘোরী গজনী থেকে যাত্রা করেন দিল্লী ও আজমীর দখলের উদ্দেশে। তখন দিল্লী এবং আজমীর শাসন করতেন চৌহান বংশ। আজমীর শাসন করতেন পৃথ্বীরাজ চৌহান এবং দিল্লী শাসন করতেন পৃথ্বীরাজের ছোট ভাই গোবিন্দ। ঘোরীর বাহিনী চৌহানদের অধিভূক্ত তবরহিন্দ (ভাতিণ্ডা) দখল করে নেয়। গোবিন্দ সেই সংবাদ পৃথ্বীরাজকে জানান। পৃথ্বীরাজ আজমীর থেকে বিরাট সেনাদল পাঠান ঘোরী বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য। পরে পৃথ্বীরাজ নিজেও যুদ্ধে যোগ দেন। ১১৯১ সালের গোড়ার দিকে থানেশ্বর থেকে চৌদ্দ মাইল দূরে তরাইন নামক স্থানে পৃথ্বীরাজ চৌহানের রাজপুত বাহিনী এবং ঘোরীর বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে রাজপুত শক্তির কাছে ঘোরী বাহিনী পরাজিত হয়। পৃথ্বীরাজ চৌহান পরাজিত ঘোরীকে বন্দী বা হত্যা করার পরিবর্তে ক্ষমা করে দেন। পথ্বীরাজের এই উদারতা চৌহান বংশ এবং প্রজাদের জীবনে কাল হয়েছিল। পরের বছরই ঘোরীবাহিনী সংগঠিত হয়ে আবার চৌহানদের রাজ্য আক্রমণ করে। এবারও সেই তরাইনে দুই বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ হয়, কিন্তু এবার পরাজিত হয় চৌহানরা। পৃথ্বীরাজের ভাই গোবিন্দ নিহত হন আর পৃথ্বীরাজকে বন্দী করা হয়। বন্দী পৃথ্বীরাজের চোখ উপড়ে ফেলে তাকে হত্যা করে ঘোরী। এখানেই ইসলামী সংস্কৃতি এবং ভারতীয় সংস্কৃতির পার্থক্য। নিজ রাজ্য আক্রমণ করা সত্ত্বেও পৃথ্বীরাজ পরাজিত ঘোরীকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন, আর ঘোরী পৃথ্বীরাজের রাজ্য অন্যায়ভাবে দখল করে পরাজিত বন্দী ‍পৃথ্বীরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করেছেন। এতোটাই অকৃতজ্ঞ ইসলামী সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনকারীরা। এখানে একটু বলে রাখা দরকার যে ঘোরীর বাহিনীতে ছিলেন তথাকথিত শান্তিবাদী সুফি দরবেশ খাজা মঈনউদ্দিন চিশতি। ঘোরীবাহিনীর বিজয়ের পর আজমীরের আনাসাগর সরোবরের কাছে আস্তানা গড়ে তোলেন তিনি। ঘোরীবাহিনী হিন্দুদের যে-সব সম্পদ লুণ্ঠন করতেন, তা থেকে উপঢৌকন হিসেবে তাকে পাঠানো হতো এবং তিনি খুশি চিত্তে তা গ্রহণ করতেন। তার প্ররোচনায় আশপাশের অগণিত হিন্দুকে ইসলামে ধর্মান্তরিত এবং হিন্দু মন্দির ধ্বংস করা হয়। তিনি যখন জানতে পারেন যে গরু খেলে হিন্দুদের জাত যায় তখন তিনি হিন্দুদের মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের সামনে গরু জবাইয়ের প্রচলন করেন হিন্দুদেরকে অসম্মান এবং ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার জন্য। আহারে, কী শান্তিবাদী সুফি দরবেশ!


এই দুটি ঘটনার উল্লেখ করলাম এজন্য যে বারবার ভারতীয়রা সহিষ্ণুতা এবং উদারতার পরিচয় দিয়েছে, আর বিপরীতে পেয়েছে বিশ্বাসঘাতকতা। বহিরাগতদের হাতে হিন্দুরা অপমানিত, লাঞ্ছিত এবং হত্যার শিকার হয়েছে।


আবার কাশ্মীর প্রসঙ্গে আসি, হূনরা পরাজিত হবার পর সপ্তম শতাব্দীতে কাশ্মীর শাসন করতে শুরু করেন হিন্দু নৃপতিগণ। এই সময়ে কাশ্মীরের মানুষ বেশ শান্তিতেই ছিল। কিন্তু এই শান্তি তাদের জীবনে অধিককাল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ৭৫০ সালে আব্বাসীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পর খলিফা আল মনসুর ভারতবর্ষের হিন্দু ভূ-খণ্ডে ইসলাম প্রতিষ্ঠা এবং শাসন কায়েম করার জন্য হাসাম বিন আমরুকে ভারত অভিযানের জন্য পাঠান। এর আগেই অবশ্য খলিফা আল ওয়ালিদের শাসনামলে বাগদাদের শাসনকর্তা হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নির্দেশে মুহাম্মদ বিন কাশিম ৭১২ সালে ভারতে অভিযান চালায় এবং ব্যাপক হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ চালিয়ে ও স্বাধীন মানুষকে কৃতদাসে পরিণত করার মাধ্যমে সমগ্র সিন্ধু প্রদেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করে। হাসাম বিন আমরু কাশ্মীরে অভিযান চালিয়ে ইসলামী রীতি অনুযায়ী হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ চালান এবং বহু বন্দীকে কৃতদাসে পরিণত করেন। আমার ধারণা কাশ্মীরের নৃপতিদের প্রতিরোধে তিনি এখানে দীর্ঘকাল স্থায়ী হতে পারেননি। কিন্তু গান্ধার, কান্দাহার, সিন্ধু, মুলতান, পাঞ্জাব, উত্তর ভারত প্রভৃতি জায়গায় তখন বহিরাগত মুসলমানদের যে বর্বর তাণ্ডব চলছিল তার কিছুটা ঢেউ নিশ্চয় আছড়ে পড়ছিল কাশ্মীরেও।


বর্বর সুলতান মাহমুদও কাশ্মীরে অভিযান চালিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। পিতার ব্যর্থতার প্রতিশোধ নিতেই হয়তো ১০৩৩ সালে সুলতান মাহমুদের পুত্র সুলতান মাসুদ কাশ্মীর অভিযান চালান। তিনি কাশ্মীরের ‌‘সুরসুতি দূর্গ’ আক্রমণ করে নারী ও শিশু বাদে দূর্গের সকল সৈন্যকে হত্যা করেন এবং নারী ও শিশুদের কৃতদাস হিসেবে বন্দী করে নিয়ে যান।


আগে থেকেই উত্তর-পশ্চিম ভারতে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, ধর্মান্তরসহ ভারতীয়দের ওপর বহিরাগত মুসলমানদের যে তাণ্ডব চলছিল তার প্রভাব কাশ্মীরেও পড়তে শুরু করে। বারবার কাশ্মীরের শাসক পরিবর্তিত হতে থাকে। আর চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি যখন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থায়ীভাবে ইসলামী অপশাসন কায়েম হয়, তখন নতুন করে কাশ্মীরের জনগণের ওপর শুরু হয় অত্যাচার।


কাশ্মীরের সব মুসলমান শাসকই কম-বেশি হিন্দু-বৌদ্ধদের ওপর নির্যাতন করেছে। ১৩৪৭ সালে কাশ্মীরের সিংহাসনে বসা সুলতান আলাউদ্দিনও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। ১৩৫৯ সালে আলাউদ্দিনের মৃত্যুর পর কাশ্মীরের সিংহাসনে বসেন তার জ্যোষ্ঠপুত্র সুলতান শিহাবউদ্দিন। শিহাবউদ্দিন কাশ্মীরের ছোট ছোট অঞ্চলের অমুসলমান শাসককে পদানত এবং হত্যা করে সমগ্র কাশ্মীরকে তার শাসনের অধীনে এনেছিলেন। তিনি যে-সব মন্দির ধ্বংস করেছিলেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিখ্যাত ‘বিজবেহারা মন্দির’।


১৩৭৮ সালে শিহাউদ্দিনের মৃত্যু হলে কাশ্মীরের শাসক হন তার ভাই কুতুবউদ্দিন। কুতুবউদ্দিন ইসলামী আইন প্রয়োগের ব্যাপারে তেমন মনোযোগী এবং কঠোর ছিলেন না। এই সময়ে কাশ্মীরে আসেন সুফি দরবেশ আমীর সাঈদ আলী হামদানী, পূর্বে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি মন্দিরের জায়গায় খানকাহ স্থাপন করেন তিনি। এসময় তিনি দেখতে পান যে কাশ্মীরের হিন্দুরা তো বটেই, মুসলমানরাও হিন্দু সংস্কৃতি এবং আচার-আচরণ দ্বারা প্রভাবিত। আসলে আকস্মিকভাবে জোর করে এবং নানা প্রলোভন দেখিয়ে কাশ্মীরের জনগোষ্ঠীর একটা অংশকে ধর্মান্তর করে ইসলামে দীক্ষা দিলেও তাদের হাজার হাজার বছরের যে সংস্কৃতি তা তারা সহজেই ত্যাগ করতে পারেনি। ধর্ম বদলে গেলেও পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, সংগীত-নৃত্য, সামাজিক রীতি-নীতি, লোকজ বিশ্বাস ও সংস্কৃতি ইত্যাদি থেকে মুক্ত হয়ে তারা রাতারাতি চাপিয়ে দেওয়া আরব সংস্কৃতির সঙ্গে অভ্যস্ত হতে পারেনি। ফলে নব্য মুসলমানদেরকে হিন্দু সংস্কৃতি পালন অর্থাৎ ইসলামের ভাষায় শিরক কর্মকাণ্ড করতে দেখে হামদানী বিরক্ত হন এবং কাশ্মীরে ইসলামের কঠোর অনুশাসন চালু করার জন্য কুতুবউদ্দিনকে প্ররোচিত করেন। কুতুবউদ্দিন হামদানীর কথা অনুযায়ী ইসলামের কঠোর অনুশাসন প্রয়োগের চেষ্টা করেন। ফলে কাশ্মীরের হিন্দু-বৌদ্ধদের ওপর আবারও অত্যাচারের তরোবারি নেমে আসে। কিন্তু কাশ্মীরের ভূমিপুত্র হিন্দু ও বৌদ্ধদের দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি উপড়ে ফেলতে যতোটা হিংস্র আগ্রাসন চালানো প্রয়োজন, ততোটা আগ্রাসন হয়তো চালাতে পারেননি কুতুবউদ্দিন। এর ফলে সুফি দরবেশ সাঈদ আলী হামদানী খুব অসন্তুষ্ট হন এবং ক্ষুব্ধ হয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও আচার-অনুষ্ঠান সমৃদ্ধ কাশ্মীর ছেড়ে চলে যান।


১৩৯৩ সালে সুলতান কুতুবউদ্দিনের মৃত্যুর পর কাশ্মীরের সিংহাসনে বসেন তার পুত্র, কাশ্মীরের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং অত্যাচারী শাসক সুলতান সিকান্দার। সিকান্দার শুরুতে ততোটা ভয়ংকর এবং অত্যাচারী ছিলেন না। সিকান্দারের শাসনামলে কাশ্মীরে আসেন সুফি দরবেশ আমীর সাঈদ আলী হামদানীর পুত্র আমীর সাঈদ মুহাম্মদ, তিনিও তার পিতার মতো সুফি দরবেশ ছিলেন। সাঈদ মুহাম্মদ সম্ভবত তার পিতার মুখে কাশ্মীরের হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতি এবং উক্ত সংস্কৃতি পালনের মধ্য দিয়ে মুসলিমদের শিরক করার কথা শুনেছিলেন। যে কারণে তিনি হয়তো কাশ্মীর থেকে হিন্দু-বৌদ্ধ সংস্কৃতির শিকড় উৎপাটন করার উদ্দেশে মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই কাশ্মীরে আসেন। তার পিতা যেমনি সুলতান কুতুবউদ্দিনকে প্ররোচিত করেছিলেন কাশ্মীরের হিন্দু-বৌদ্ধ সংস্কৃতি ধ্বংস করার জন্য, তেমনি তিনিও প্ররোচিত করেন সুলতান সিকান্দারকে। সাঈদ মুহাম্মদের প্ররোচনায় সুলতান সিকান্দার ভয়ানক হিন্দু-বৌদ্ধ বিদ্বেষী হয়ে ওঠেন, শুরু করেন গণহত্যা। তিনি এক আদেশ জারির মাধ্যমে কাশ্মীরে মুসলিম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীর বসবাস নিষিদ্ধ করেন, মানুষের কপালে চিহ্ন আঁকা (হিন্দু নারীর সিঁদূর-পুরুষের তিলক) নিষিদ্ধ করেন, বিভিন্ন মন্দিরে আক্রমণ করে সোনা ও রূপার তৈরি দেবদেবীর মূর্তি ভেঙে ধাতব মুদ্রা তৈরি করেন। সুলতান সিকান্দারের অত্যাচারে হিন্দুরা কাশ্মীর ছেড়ে পালাতে থাকেন, অনেকে পৈত্রিক ভিটেয় থাকতে এবং জীবন বাঁচাতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, অনেকে আত্মহত্যা করে জীবন বিসর্জন দেন। কিছু সংখ্যক হিন্দু তখনো নানা জায়গায় পরিচয় গোপন করে ছিলো। অধিকাংশ  হিন্দু কাশ্মীর থেকে পালিয়ে গেলে, নিহত হলে এবং অনেকে ইসলাম গ্রহণ করলে সুলতান সিকান্দার কাশ্মীরের সমস্ত মন্দির এবং মূর্তি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। বিপুল সংখ্যক মন্দির এবং মূর্তি ধ্বংসের কারণে তিনি ‘মূর্তি ধ্বংসকারী’ উপাধীতে ভূষিত হন। ‌‘মূর্তি ধ্বংসকারী’ সুলতান সিকান্দার তরাদেগা (৬৯৭ খৃষ্টাব্দ) নামক একজন হিন্দু রাজা কর্তৃক নির্মিত একটি প্রাচীন মন্দির ভেঙে তার ওপর মসজিদ নির্মাণ করেন, যা বর্তমানে জুম্মা মসজিদ নামে পরিচিত।


সুলতান সিকান্দারের পুত্র আমীর থান বা আলী খানও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে অবশিষ্ট অমুসলিমদের ধর্মান্তর এবং হত্যা করেন। এই সময়ে কাশ্মীর প্রায় হিন্দু-বৌদ্ধশূন্য হয়ে যায়। আট বছরের অধিক সময় শাসন করার পর আমীর খান তার পুত্র জয়নুল আবেদীনের ওপর কাশ্মীরের শাসনভার ন্যাস্ত করে মক্কায় যান হজ করতে।


জয়নুল আবেদীন ছিলেন উদার, সহিষ্ণু এবং সুশাসক। সকল ধর্মের প্রতি তার উদার নীতির কারণে ইসলামে ধর্মান্তরিত অনেক হিন্দু-বৌদ্ধ পুনরায় স্ব-ধর্মে ফিরে আসে এবং জরবদস্তিমুলক ইসলামে ধর্মান্তর বন্ধ হয়ে যায়। জয়নুল আবেদীনের অসাম্প্রদায়িকতা এবং উদারতার কথা শুনে পূর্বে যেসব হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বাড়ি-ঘর ফেলে প্রাণভয়ে অন্যত্র পালিয়ে গিয়েছিল, তারা আবার নিজেদের বাড়িতে ফিরতে শুরু করে। বিপুল পরিমাণ নব্য মুসলিম পুনরায় স্ব-ধর্মে ফিরে যাওয়ায় এবং পালিয়ে যাওয়া হিন্দু-বৌদ্ধরা ফিরে আসায় কাশ্মীরে আবার আগের সেই উৎসবমুখর ও ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশ ফিরে আসে। ভাঙা মন্দির আবার উঠে দাঁড়ায়, পূজা-পার্বণ শুরু হয়, হিন্দু-বৌদ্ধ সংস্কৃতি এবং আচার-অনুষ্ঠান পুরোদমে শুরু হয়। এর ফলে ইসলামের শরীয়াভিত্তিক কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল হয়ে পড়ে। অনেকক্ষেত্রে মুসলিমরাও হিন্দু সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। এতে সুফি, আলেম-ওলামাদের কেউ কেউ জয়নুল আবেদীনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। নিশ্চয় তাদের অনেকে জয়নুল আবেদীনকে তার পূর্ব-পুরুষদের অমুসলমানবিদ্বেষী বিধ্বংসী নীতির কথা স্মরণও করিয়ে দেন। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেননি জয়নুল আবেদীন। এইসব সুফি, আলেম-ওলামারা জয়নুল আবেদীনের প্রতি এতোটাই অসন্তুষ্ট ছিলেন যে অমুসলমানদের ওপর কঠোরভাবে শরীয়া আইন প্রয়োগের ব্যাপারে পারস্যের ইসলামী পণ্ডিত মোল্লা আহম্মদ পর্যন্ত তাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন-‘অবিশ্বাসীদের ওপর জিজিয়া আরোপের প্রধান উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে অবমাননা করা। আল্লাহ তাদেরকে অসম্মান করার জন্যই জিজিয়া প্রতিষ্ঠা করেছেন, এর উদ্দেশ্য হলো-তাদেরকে অবমাননা এবং মুসলিমদের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা।’


কিন্তু জয়নুল আবেদীন কারো প্ররোচনায় নিজের উদার ধর্মনীতি থেকে কখনো সরে আসেননি। ১৪৭৩ সালে সু-শাসক জয়নুল আবেদীন মৃত্যুবরণ করেন।


কাশ্মীরে জয়নুল আবেদীনের সু-শাসনের ধারাবাহিকতা খুব বেশিদিন থাকেনি, ফলে হিন্দু-বৌদ্ধরাও খুব বেশিদিন সুখে-শান্তিতে থাকতে পারেনি। ১৫০১ সালে মালিক মুসা রাইনা শাসক হবার পর কাশ্মীরে আসেন সুফি দরবেশ আমীর শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইরাকী, যাকে কাশ্মীরের শ্রেষ্ঠ সুফি দরবেশ বলা হয়ে থাকে। এবার আমরা এই কাশ্মীরশ্রেষ্ঠ সুফি দরবেশের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচিত হবো। জয়নুল আবেদীনের শাসনামলে কাশ্মীরে হিন্দুধর্মের যে পুনর্জাগরণ ঘটেছিল, তা পুনরায় নিমজ্জিত করার জন্য মালিক মুসা রাইনাকে প্ররোচিত করেন শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইরাকী। তাতে তিনি সফল হন, মালিক মুসা রইনা তাকে কর্তৃত্ব দেন বাসনা পূরণ করার। শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইরাকী রাজশক্তিকে কাজে লাগিয়ে হিন্দু-বৌদ্ধদের ওপর অমানবিক নির্যাতন শুরু করেন, মন্দির এবং মূর্তি ধ্বংস করেন, মন্দির ধ্বংস করার পর সেখানে মসজিদ স্থাপন করার নির্দেশ দেন।


শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইরাকীর অনুরোধে মালিক মুসা রাইনা এক আদেশ জারি করেন যে, প্রতিদিন ১৫০০-২০০০ অবিশ্বাসীকে ইরাকীর অনুসারীরা তার বাড়ির সামনে নিয়ে যাবে, অবিশ্বাসীদের পবিত্র সুতা খুলে ফেলবে, তাদেরকে কলেমা পড়াবে, খৎনা করবে এবং গরুর মাংস খাওয়াবে। এমনিভাবে জোরপূর্বক ২৪০০০ হিন্দু পরিবারকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়।


কাশ্মীরের ধর্মান্তরিত নব্য মুসলমানরা যেহেতু ভালবেসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি, তাই সুযোগ পেলেই তাদের অনেকেই আবার হিন্দু ধর্মে ফিরে যেতো, নীরবে হিন্দু ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পালন করতো। কিন্তু সে-সব খবর সর্বদাই গোপন থাকতো না। মালিক মুসা রাইনার সময়ে জোর করে যাদেরকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল সুলতান মুহাম্মদ শাহ’র শাসনামলে তারা অনেকেই আবার হিন্দুধর্মে ফিরে যায়, কিংবা হয়তো মুসা রাইনার শাসনের শেষ দিকেই এই প্রত্যাবর্তন শুরু হয়। কিছু মুসলমান হিন্দুধর্মে প্রত্যাবর্তনকরীদের বিরুদ্ধে মিথ্যে গুজব রটিয়ে দেয় এই বলে যে ইসলামত্যাগী এইসব কাফেররা পাছার নিচে কোরান রেখে বসে ছিল। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে মুসলমানদের এই গুজব ছড়ানো ছিল উদ্দেশ্যমুলক, কেননা তারা জানতো হিন্দুদের ওপর আক্রমণ মানেই ইসলামী রীতি অনুযায়ী তাদের সম্পদ এবং নারী লুণ্ঠন। সুফি দরবেশ শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইরাকীর কানে এই খবর পৌঁছামাত্র তিনি সুলতান মুহাম্মদ শাহ’র সেনাপতি কাজী চককে বলেন, ‘এই মূর্তিপূজারীরা ইসলামী ধর্মবিশ্বাস গ্রহণ এবং ইসলামে আত্মসমর্পণ করার পর এখন আবার ধর্মভ্রষ্টতা এবং ধর্মদ্রোহে ফিরে গেছে। এখন আপনি যদি শৃঙ্খলাভঙ্গ জনিত কারণে তাদেরকে শরীয়ার বিধান অনুযায়ী শাস্তি না দেন, তাহলে আমার স্বেচ্ছা নির্বাসনে যাওয়া প্রয়োজনীয় এবং বাধ্যতামুলক হবে।’


সুফি দরবেশ শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইরাকীকে শান্ত এবং সন্তুষ্ট করতে কাজী চক হিন্দুদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। যেহেতু ইরাকী শিয়া ছিলেন, তাই হত্যার জন্য নির্ধারণ করা হয় আশুরার দিন। ১৫১৮ সালের আশুরার তথাকথিত পবিত্র দিনে হিন্দুধর্মে প্রত্যাবর্তনকারী ৭০০-৮০০ মানুষকে হত্যা করা হয়, হত্যার শিকার হওয়া হতভাগ্যরা ছিলেন হিন্দু সমাজের নেতৃস্থানীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।


এই হলো তথাকথিত শান্তিবাদী কাশ্মীরশ্রেষ্ঠ সুফি দরবেশ শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইরাকীর শ্রেষ্ঠ কীর্তি, শান্তি প্রতিষ্ঠার নমুনা!


দিল্লীর সম্রাট আকবরের শাসনামলে ১৫৮৬ সালে কাশ্মীর মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়। ততোদিনে কাশ্মীরের বুকে ইসলাম ধর্মের জগদ্দল পাথর চেপে বসেছে। তারপরও সম্রাট আকবরের উদার ধর্মীয়নীতির কারণে হিন্দুরা কিছুটা স্বস্তিতে ছিল, এই সময় হয়তো কিছু সংখ্যক নব্য মুসলিম পুনরায় হিন্দুধর্মে প্রত্যাবর্তন করেছিল। কিন্তু হিন্দুদের জীবনে আবার অন্ধকার নেমে আসে বর্বর কুখ্যাত সম্রাট আওরঙ্গজেবের দুঃশাসনামলে। আওরঙ্গজেব ভয়ংকর রকমের অমুসলমান বিদ্বেষী শাসক ছিলেন। তিনি তার সাম্রাজ্যবাদ অমুসলমান শূন্য করতে যতো রকম কৌশল অবলম্বন এবং নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড চালানো সম্ভব, তা করেছিলেন। বস্তুত আওরঙ্গজেবের নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞ এবং হত্যাকাণ্ডের চিত্র ছোট্ট একটি লেখায় তুলে ধরা সম্ভব নয়। আমি সংক্ষিপ্ত একটি ধারণা দেবার চেষ্টা করবো মাত্র। আওরঙ্গজেব বিপুল সংখ্যক হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন মন্দির, শিখদের গুরুদুয়ারা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেন। শুধুমাত্র ১৬৭৯ সালেই দুইশত মন্দির ধ্বংস করেন আওরঙ্গজেব, তার পঞ্চাশ বছরের দুঃশাসনামলে তিনি পাঁচ হাজারের অধিক মন্দির ধ্বংস করেন। তিনি ব্যাপক সংখ্যক অবিশ্বাসী অর্থাৎ হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন হত্যা করেন। এমনকি হিন্দু ধর্মের প্রতি অনুরাগ থাকার কারণে স্বধর্ম ত্যাগী আখ্যায়িত করে নিজের ভাই দারাশিকোকেও তিনি হত্যা করেন, এই হত্যার পিছনে সিংহাসন নিঃকন্টক করাও তার একটি উদ্দেশ্য ছিল। আওরঙ্গজেব জোরপূর্বক এবং নানা কৌশল অবলম্বন করে বিপুল সংখ্যক অমুসলমানকে ইসলামে ধর্মান্তর করেন। ১৬৬৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি রাজসভা এবং প্রদেশের চাকরি থেকে হিন্দুদের বরখাস্ত করে মুসলমানদের নিয়োগ করার এক আদেশ জারি করেন। ১৬৮৫ তিনি ঘোষণা দেন যে, যেসব পুরুষ হিন্দু হবে রাজভাণ্ডার থেকে তাদেরকে চার রূপী এবং নারীদেরকে দুই রূপী দেওয়া হবে। কেবল অর্থের প্রলোভনে নয়, অমুসলমানরা আওরঙ্গজেবের নানা ধরনের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতো। আওরঙ্গজেব ১৬৭৯ সালে অমুসলমানদের অবমাননা করার জন্য তাদের ওপর জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন করেন, অতীতে যা বাতিল করেছিলেন সম্রাট আকবর। জিজিয়া কর সম্পর্কে কোরানের সুরা তওবায় (৯:২৯) বলা হয়েছে-‘যাদের ওপর কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহয় বিশ্বাস করে না ও পরকালেও না এবং আল্লাহ ও তার রসুল যা হারাম করেছেন তা হারাম করে না ও সত্যধর্ম অনুসরণ করে না তাদের সাথে যুদ্ধ করবে যে-পর্যন্ত না তারা বশ্যতা স্বীকার করে আনুগত্যের নিদর্শণস্বরূপ স্বেচ্ছায় জিজিয়া দেয়।’


মিশরের ইসলামী বিশ্লেষক আল-জামাকশারী কোরানের এই আয়াত অনুযায়ী জিজিয়া কর আদায়ায়ের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে-‘তাদের নিকট থেকে জিজিয়া নেওয়া হবে অবমাননা এবং মর্যাদাহানিকরভাবে। (জিম্মিকে) সশরীরে হেঁটে আসতে হবে, ঘোড়ায় চড়ে নয়। যখন সে জিজিয়া প্রদান করবে, তখন কর আদায়কারী বসে থাকবে আর সে থাকবে দাঁড়িয়ে। আদায়কারী জিম্মির ঘাড় ধরে ঝাঁকি দিয়ে বলবে-জিজিয়া পরিশোধ কর। জিজিয়া পরিশোধের পর আদায়কারী তার ঘাড়ের পিছনে একটা চাটি মেরে তাড়িয়ে দেবে।’


হ্যাঁ, এভাবেই অপমান-অপদস্ত করে অমুসলমানদের কাছ থেকে জিজিয়া করা আদায় করা হতো। জিজিয়া করের চেয়েও অমানজনক ছিল খারাজ বা ভূমি কর। ইসলামী পণ্ডিতদের পরামর্শ অনুযায়ী খারাজ আদায়ের পদ্ধতি ছিল অনেকটা এরকম-খারাজ আদায়কারী খারাজ দাতার সুখে থু থু দিতে চাইলে, সে হা মুখ করবে। তার ওপর এ চরম অপমান ও আদায়কারী কর্তৃক তার মুখের ভেতরে থু থু দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো এ শ্রেণির উপর আরোপিত চরম বশ্যতা, ইসলামের গৌরব ও বিশ্বাসের প্রতি মহিমান্যতা এবং মিথ্যা ধর্মের (হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন-শিখ) প্রতি অমর্যাদা প্রদর্শন।’


এই সব করের বোঝা এবং মুসলমানদের অমানবিক নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতেই অমুসলমানরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতো।


আওরঙ্গজেবের শাসনামলে পুনরায় কাশ্মীরের হিন্দু পণ্ডিতদের ওপর নিপীড়ন এবং ধর্মান্তর শুরু হলে সাহায্যের জন্য তারা পাঞ্জাবের শিখ গুরু তেগ বাহাদুর সিং এর কাছে যান। তেগ বাহাদুর পণ্ডিতদের ওপর নিপীড়ন এবং ধর্মান্তরের বিষয়টি সুরাহা করতে সম্রাটের দরবারে গেলে তাকে বন্দী করে কারাগারে পাঠানো হয় এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় দিনের পর দিন তাকে নির্যাতন করা হয়। নিজের আদর্শে অবিচল থাকায় শেষ পর্যন্ত দুই শিষ্যসহ তেগ বাহাদুরকে শিরোচ্ছেদের মাধ্যমে হত্যা করা হয়।


এই হলো মুসলমান শাসনামলে কাশ্মীরের অমুসলমানদের শান্তিতে থাকার চিত্র! মুসলমান শাসনামলে কখনোই মানবাধিকার ছিল না, ছিল অমানবিক ও নিষ্ঠুর একচেটিয়া মুসলমানধিকার।


তিন

সুদূর অতীত থেকে এবার নিকট অতীতে অর্থাৎ স্বাধীন ভারতবর্ষে ফিরে আসি। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়, কাশ্মীর তখনো কোনো দেশের সঙ্গেই অন্তর্ভূক্ত হয়নি, কেননা মহারাজ হরি সিং স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। ২০ অক্টোবর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র নবগঠিত পাকিস্তানের পাহাড়ী সশস্ত্র যোদ্ধারা কাশ্মীর আক্রমণ করে। তাণ্ডব চালাতে চালাতে তারা শ্রীনগরের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে মহারাজ হরি সিং ভারতের শ্মরণাপন্ন হন। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানী যোদ্ধাদের বিতাড়িত করার। ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরের দুই তৃতীয়াংশ দখলে নেবার পর নেহেরু যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দেন, ফলে কাশ্মীরের অবশিষ্ট অংশ আর ভারতের অধীনে আসেনি। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর মহারাজ হরি সিং কাশ্মীরের ভারতভুক্তির চুক্তিতে সই করেন এবং ২৭ অক্টোবর ভারতের গভর্ণর জেনারেল কর্তৃক তা অনুমোদিত হয়। সেই থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত কাশ্মীরের হিন্দু-মুসলমান মিলেমিশেই ছিল, কোনো বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হয়নি। সংঘাতের শুরু ১৯৯০ সালের জানুয়ারি থেকে আর এই সংঘাতের মঞ্চ তৈরি হয় ১৯৮৯ সালের জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে। পাকিস্তানী মদতে আরো আগে থেকেই কাশ্মীরে জঙ্গিবাদের আভাস মিলতে শুরু করে এবং সে-সব জঙ্গিদের গ্রেফতার করে কারাগারেও পাঠানো হয়। কিন্তু তৎকালীন ফারুক আবদুল্লাহ’র সরকার জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে কমপক্ষে ৭০ জন কুখ্যাত জঙ্গিকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দেন। ফারুক আবদুল্লাহ কর্তৃক জঙ্গিদের মুক্তি দেওয়া যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা বোঝা যায় জঙ্গিদের পরবর্তী কর্মকাণ্ডে। ১৯৯০ সালের ৪ জানুয়ারি জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিন গণমাধ্যমে এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে যে-হিন্দু পণ্ডিতদের কাশ্মীর ছাড়তে হবে অথবা ইসলামধর্ম গ্রহণ করতে হবে। কাশ্মীরে থাকতে হলে পণ্ডিতদের ‘আল্লাহু আকবর’ বলতেই হবে। পণ্ডিতদের বাড়ির দরজায়-দেয়ালে কাশ্মীর ছাড়ার নোটিশ টাঙানো হয়, মসজিদের মাইকে তাদের কাশ্মীর ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং কাশ্মীরকে পাকিস্তান বানানোর পক্ষে প্রচার চালানো হয়। পণ্ডিতমুক্ত কাশ্মীরের দাবীর পক্ষে স্লোগান দেওয়া হয়। তাদের স্লোগান ছিল-‘আগর কাশ্মীর মে রেহেনা হোগা, আল্লাহ-উ-আকবর কেহেনা হোগা’, ‘এ জালিমো, এ কাফিরো, কাশ্মীর হামারা ও ছোড় দো’।


১৯৯০ সালের ১৯ জানুয়ারি পূর্বপরিকল্পনা মতো জঙ্গিরা অতর্কিত পণ্ডিতদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, মসজিদের মাইকে আহ্বান জানানো হয় পণ্ডিতদের ওপর হামলা চালানোর। পণ্ডিতদের সম্পদ লুণ্ঠন, নারী ধর্ষণ, নৃশংস হত্যা বাদ যায়নি কোনো কিছুই। প্রাণভয়ে ভীত পণ্ডিতরা যে যেভাবে পারে ঘরবাড়ি ফেলে পালাতে শুরু করে, যেন আবার সেই সুলতানি এবং মোগল আমল ফিরে আসে তাদের জীবনে! কিন্তু যারা পালানোর সময় পায় না বা মৌলবাদী মুসলমানদের হাতে ধরা পড়ে, তাদের জীবনে নেমে আসে বিভীষিকা। কচুবন পরিষ্কার করার মতো পণ্ডিতদের কুপিয়ে-জবাই করে হত্যা করা হয়, লোহার শলাকা দিয়ে উপড়ে ফেলা হয় জীবন্ত পণ্ডিতদের চোখ, পাথর দিয়ে থেতলে মারা হয়, ধর্ষণের পর নারীদের শরীরে সিগারেটের ছ্যাকা দেওয়া হয় আর যৌনাঙ্গ ও স্তন কেটে রাস্তায় প্রদর্শন করা হয়। কতোটা নির্মম ছিল মুসলমানরা  তা বোঝা যায় সমাজের কয়েকজন বিশিষ্ট পণ্ডিতকে হত্যার চিত্র থেকেই। শিক্ষাবিদ সর্বানন্দ কাউল কপালে তিলক পরতেন, সেই তিলকের স্থানে পেরেক ঠুকে তাকে হত্যা করা হয়। বি কে গানজকে কুপিয়ে হত্যা করে তার রক্ত দিয়ে ভাত মাখিয়ে জোর করে খাওয়ানো হয় তার স্ত্রীকে, তারপর গণধর্ষণ করে হত্যা করা হয় সেই হতভাগ্য নারীকে। নার্স শ্রীমতি সরলা ভাটকে রাস্তায় গণধর্ষণ করার পর হত্যা করে তার নগ্ন দেহ রাস্তায় প্রদর্শন করা হয়। বিচারপতি নীলাকান্ত গানজকে হত্যা করে তার রক্তাক্ত-ছিন্নভিন্ন দেহ প্রকাশ্যে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। সোপিয়ানে ব্রিজলাল ও ছোটি নামে দুজনকে হত্যা করে তাদের মৃতদেহ জীপের সঙ্গে বেঁধে দশ কিলোমিটার টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। রবীন্দ্র পণ্ডিতকে হত্যা করার পর তার মৃতদেহের ওপর নেচে উল্লাস করে হিজবুল মুজাহিদিনের জঙ্গিরা। নাম না জানা এরকম আরো অসংখ্য পণ্ডিতের রক্তে তখন ভূ-স্বর্গকে রক্তস্নান করানো হয়। ফারুক আবদুল্লাহ’র সরকার তখন নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল!

তখন থেকেই লক্ষ লক্ষ পণ্ডিত ঘরছাড়া, আজও পণ্ডিতদের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়, আজও পণ্ডিতরা নীরবে কাশ্মীর ত্যাগ করে আর তাদের পরিত্যক্ত বাড়ি-ঘরের দখল নেয় মুসলমানরা। অথচ এই পণ্ডিতরাই কাশ্মীরি মুসলমানদের শিক্ষিত করেছে। যে বর্ণমালায় তারা বিজ্ঞপ্তি লিখেছে পণ্ডিতদের কাশ্মীর ছেড়ে চলে যাবার জন্য, এখনো তারা যে উগ্রবাদী স্লোগান দিচ্ছে, এই বিজ্ঞপ্তি বা স্লোগানের বর্ণমালা তারা শিখেছে পণ্ডিতদের কাছেই। ১৯৪৭ সালেও কাশ্মীরের মুসলমানদের মধ্যে খুব বেশি মানুষ শিক্ষিত ছিল না। বহু এলাকায় পণ্ডিতরা ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষিত মানুষ ছিল না। এই পণ্ডিতদের কাছেই তারা লেখাপড়া শিখেছে। কয়েক মাইল পাহাড়ী পথ পাড়ি দিয়ে পণ্ডিতরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গেছে। অনেক পণ্ডিত নিজের বাড়িতেই মুসলমানদের লেখাপড়া শিখিয়েছে। এখন মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষিতের বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্ডিতদের সেই অবদান তারা ভুলে গেছে। এখন আর পণ্ডিতদের তাদের প্রয়োজন নেই, এখন প্রয়োজন পণ্ডিতদের বাড়ি-ঘর এবং অন্যান্য সম্পদ। সীমাহীন অকৃতজ্ঞ মুসলমান জাতি এখন পণ্ডিতমুক্ত কাশ্মীর চায়।


সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করার পর গ্রেফতার হবার আগে জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা বলেছেন, ‘ভারত সরকারের এই একতরফা সিদ্ধান্তে ১৯৪৭-এ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হতে চাওয়া জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হল।’ তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা; ৬ আগস্ট, ২০১৯।


কী অদ্ভুত! কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কোনো বিশ্বাস ছিলো না? ভূমিপুত্র হিসেবে এইটুকু বিশ্বাস তো তাদের ছিল যে তারা পিতৃপুরুষের ভিটেয় স্বাধীনভাবে সুখে-শান্তির বাস কবে। তাদের সেই বিশ্বাস করা কেড়ে নিলো? কেন তারা গণহত্যার শিকার হলো? কেন তারা আজও নীরবে কাশ্মীর ছাড়ছে? নাকি চুক্তিতে ছিল যে পণ্ডিতদের উচ্ছেদ ও হত্যা করা হবে, নারী ও সম্পদকে গণিমতের মাল হিসেবে ভোগ করা হবে?


আরেক সাবেক মূখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি টুইট করেছেন, ‘ভারতীয় গণতন্ত্রের অন্ধকারতম দিন আজ।  ১৯৪৭-এ যে দ্বিজাতিতত্ত্বে সায় দিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরের নেতৃত্ব ভারতভুক্তিতে সায় দিয়েছিলেন, তা থেকে সরে গেল দিল্লি। কেন্দ্রের একতরফা সিদ্ধান্তে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের বিলোপের পরে ভারত এখন জম্মু ও কাশ্মীরের দখলদারি শক্তিতে পরিণত হল।’তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা; ৬ আগস্ট, ২০১৯।


দখলদার? এই ‘দখলদার’ শব্দটি মুসলমানদের জন্য বড় আত্মঘাতী শব্দ, এই শব্দটি তারা যতোবার ব্যবহার করে, ততোবার নিজেদেরই উলঙ্গ করে; তবু মুসলমানরা না বুঝেই এই শব্দটির ব্যবহার করে! ইসলামের জন্মই হয়েছে দখলদারিত্বের মাধ্যমে, মুহাম্মদ কর্তৃক মদিনা দখলের মাধ্যমে যে ইতিহাসের শুরু, তারপর কাবামন্দির-মক্কা দখল হয়েছে। সমগ্র আরব দখল করেছে মুসলমানরা, আফ্রিকার কিছু ভূ-খণ্ড দখল করেছে, ইয়োরোপের স্পেনও দখল করেছিল যা পরে হাতছাড়া হয়, এশিয়ার অনেকগুলো ভূ-খণ্ড দখল করেছে। আর এই দখল করতে গিয়ে তারা ধর্ষণ-লুণ্ঠন-গণহত্যা করেছে। বারবার মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে।


কাশ্মীরের পণ্ডিতদের কাছে মুসলমানরাও দখলদার। আর গত ত্রিশ বছর যাবৎ দখলদারি চালিয়েই পণ্ডিতদের কাশ্মীর থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। ওমর আবদুল্লাহ এবং মুফতি মেহবুবা দুজনই জম্মু-কাশ্মীরের মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তারা পণ্ডিতদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন; পাকিস্তান ক্রমাগত কাশ্মীরে জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়েছে, তরুণদের জঙ্গি বানিয়েছে; যারা প্রত্যক্ষভাবে জঙ্গিবাদে জড়ায়নি, তাদেরকেও মানসিকভাবে জঙ্গি করে তুলেছে; এর দায় ওমর আবদুল্লাহ এবং মুফতি মেহবুবাকেও নিতে হবে। আবার এমনও হতে পারে কাশ্মীরে জঙ্গিবাদের বিস্তার এবং পণ্ডিতদের উচ্ছেদ করা তাদের ইসলামিক রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।


ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলের রাজনীতিকদের একটা অংশ এবং কিছু বুদ্ধিজীবী কেবলমাত্র বিজেপি’র বিরোধীতা করার জন্য রাজনৈতিক কারণে বলছে জম্মু-কাশ্মীরের মানুষ ৩৭০ ধারা বাতিল চায়নি! এটা অর্ধসত্য কথা।  জম্মু ও কাশ্মীরের মোট জনসংখ্যার ৬৮.৩ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী, ২৮.৪ শতাংশ মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী, বাকিরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। কাশ্মীরের মুসলমানরা ৩৭০ ধারা বাতিল চায়নি, কিন্তু হিন্দু এবং অন্যারা ধর্মাবলম্বীরা তো বাতিল চেয়েছে। তারা মুসলমানদের নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছে। ৩৭০ ধারা বাতিলের খবর শোনার পর বৌদ্ধ অধ্যুসিত জম্মুতে মানুষ রাস্তায় নেমে উল্লাস করেছে, মিষ্টি বিতরণ করেছে। ভারত এবং ভারতের বাইরে যেখানেই পণ্ডিতরা আছে তারা আনন্দে মেতেছে। কাশ্মীরি পণ্ডিতদের একাধিক সংগঠন মোদী সরকারের ৩৭০ অনুচ্ছেদ  বিলোপের সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক’আখ্যা দিয়েছে। বিশ্বের কাশ্মীরি পণ্ডিতদের প্রতিনিধিত্ব করে বলে দাবি করা  গ্লোবাল কাশ্মীরি পণ্ডিত ডায়স্পোরা (জিকেপিডি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‌‌‘৫ আগস্ট, ২০১৯ দিনটি দেশের ইতিহাসে জায়গা পেয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আজ যে বিল পেশ করেছেন, তা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, দীনদয়াল উপাধ্যায়, অটলবিহারী বাজপেয়ীর মতো নেতাদের ভাবনার প্রতিফলন।’ তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা; ৬ আগস্ট, ২০১৯।


গ্লোবাল কাশ্মীরি পণ্ডিত ডায়স্পোরা’র  সভাপতি মনোজ ভান বলেন, ‌‘৩৭০ অনুচ্ছেদের বিলুপ্তি জম্মু-কাশ্মীরকে দেশের অন্যান্য অংশের আরও কাছে নিয়ে আসবে।’ তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা; ৬ আগস্ট, ২০১৯।


উপত্যকা থেকে উৎখাত হওয়া কাশ্মীরি পণ্ডিতদের প্রতিনিধিত্ব করে বলে দাবি করা ‘অল স্টেট কাশ্মীরি পণ্ডিত কনফারেন্স’-এর সভাপতি রবীন্দ্র রায়না বলেন, ‘‘এ বার খোলা হাওয়ায় আশার শ্বাস নিতে পারব।’ তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা; ৬ আগস্ট, ২০১৯।


গত শতকের নয়ের দশকের প্রথম দিকে উপত্যকায় কাশ্মীরি পণ্ডিত বিতাড়ন শুরু হয়েছিল। খুন হয়েছিলেন বহু পণ্ডিত। প্রাণ ভয়ে অনেককে ঘরবাড়ি ছেড়ে দেশের অন্যত্র পালাতে হয়েছিল। তেমনই এক জন পি এল টিকু। গত নব্বইয়ের দশকে জঙ্গিরা হত্যা করেছিল তাঁর বড় ছেলেকে।  ৩৭০ অনুচ্ছেদ  বিলোপের সিদ্ধান্তের পরে তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘ছেলেকে আর ফিরে পাব না। পুত্রশোকে আমার স্ত্রীও চলে গেলেন। বিশাল বাড়ি, বাগান ছেড়ে আমাকে চলে আসতে হয়েছে। ওই সব দখল হয়ে গিয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্তে আশার আলো দেখছি।’ তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা; ৬ আগস্ট, ২০১৯।


কাশ্মীর ছাড়তে বাধ্য হওয়া আর এক জন এ কে ধর। তাঁর কথায়, ‘‘গত সাত দশক ধরে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সুবিধার অপব্যবহার করেছে কিছু রাজনৈতিক দল।’ তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা; ৬ আগস্ট, ২০১৯।


সংগীতশিল্পী আভা হানজুরা, ১৯৯০ সালে মুসলমানরা যখন কাশ্মীরের পণ্ডিতদের হত্যা-নির্যাতন-বিতারণ শুরু করে, তখন তার পরিবারকেও নিজেদের ভিটে-মাটি ছেড়ে প্রাণ নিয়ে পালাতে হয়। সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫এ অনুচ্ছেদ বাতিলের সংবাদ শুনে ব্যাঙ্গালুরুতে বসবাস করা বাস্তুচ্যুত আভা একাধিক টুইট করে জানিয়েছেন তার প্রতিক্রিয়া, ‘‌এটা এমন একটা খবর যা আশাই করিনি! আশায় বুক বাঁধতে চাই আমি। যাঁরা এই বিষয়টায় জড়িয়ে রয়েছেন, আমার আশা, এই পদক্ষেপে তাঁদের সকলের জীবনই উজ্জ্বলতর হবে। তাঁদের আরও ভাল হবে। আমাদের ঘরে ফেরার রাস্তার বাধাটাধাগুলি এ বার হয়তো সরে যাবে। আমরা হয়তো বাড়ির লোকজন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে আবার মিলতে পারব। মিশতে পারব। যে সব কাশ্মীরীরা দীর্ঘ দিন ধরে ঘরবাড়ি ছেড়ে দূরে দূরে কাটিয়েছেন, এখনও রয়েছেন, তাঁরাও হয়তো একই স্বপ্ন দেখছেন। ডাক বিভাগে কাজ করতেন বাবা। সারা জীবন চাকরি করে যা জমিয়েছিলেন, তা দিয়ে একটা বাড়ি বানিয়েছিলেন। এ বার হয়তো সেই বাড়িটায় আবার পা দিতে পারব।’ তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা; ৬ আগস্ট, ২০১৯।

ভারতের বিরোধীদলের কিছু রাজনীতিক এবং বুদ্ধিজীবী এটাও বলার চেষ্টা করছে যে ভারতের মানুষ ৩৭০ ধারা বাতিল চায়নি। প্রায় শতভাগ মিথ্যা কথা, কেননা ভারতের ক্ষমতাসীন এবং বিরোধীদলের অধিকাংশ সমর্থক ৩৭০ ধারা বাতিলকে স্বাগত জানিয়েছে। এমনকি বিরোধী দলের অনেক রাজনীতিকও ৩৭০ ধারা বাতিলকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছে।


কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিংহের পুত্র কংগ্রেস নেতা কর্ণ সিংহ বলেছেন, ‌‌‘আচমকা সিদ্ধান্ত নিলেও জম্মু-কাশ্মীরসহ গোটা দেশের সমর্থন পেয়েছে সরকার। ব্যক্তিগত ভাবে অন্ধ বিরোধিতার পক্ষে নই। কারণ, এর মধ্যে অনেক ইতিবাচক উপাদান রয়েছে। লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত। ‘সদর-ই-রিয়াসত’ থাকার সময় এই প্রস্তাব করেছিলাম। ৩৫এ হটানোও স্বাগত। আসন পুনর্বিন্যাস করে জম্মু-কাশ্মীরের রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রও সুনিশ্চিত করা উচিত।’

কর্ণ সিংহের পুত্র ছেলে বিক্রমাদিত্যও কেন্দ্রের পদক্ষেপকে ‘নতুন যুগের শুরু’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা; ৯ আগস্ট, ২০১৯।


জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া টুইট করেছেন, ‌‘জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ নিয়ে কেন্দ্রের পদক্ষেপকে সমর্থন করি। এটা দেশের স্বার্থে করা হয়েছে।’

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর পুত্র অনিল শাস্ত্রী টুইট করেছেন, ‘‘কংগ্রেসের উচিত ছিল মানুষের মনোভাব বোঝা। দেশের মানুষ সরকারের সঙ্গে রয়েছে।’

মুম্বই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি মিলিন্দ দেওরার মতে, ‘কাশ্মীরি পণ্ডিত ও যুবকদের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলির নতুন করে ভাবা উচিত।’ তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা; ৯ আগস্ট, ২০১৯।


এতোদিন কাশ্মীর ভারতের মূল স্রোতের বাইরে ছিল, ৩৭০ ধারা বাতিল হওয়ায় এখন মূল স্রোতে ফিরতে পারবে। এতোদিন বাইরের মানুষ কাশ্মীরে জমি কিনতে পারতো না, ফলে সেখানে কোনো শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি, তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়নি। কর্মহীন তরুণেরা সহজেই জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে আর সেনাবাহিনীর ওপর পাথর নিক্ষেপ করে জীবনের অপচয় করেছে। এখন সেখানে বাইরের ব্যবসায়ীরা অর্থ লগ্নি করতে পারবে, শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে, তরুণদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। কাশ্মীরের মুসলমান তরুণদের এখন এই উপলব্ধি করতে হবে যে একবিংশ শতাব্দী জঙ্গি হয়ে কিংবা জঙ্গি মতাদর্শী হয়ে পাথর নিক্ষেপ করে মূল্যবান মানবজীবন অবচয় করার সময় নয়, একবিংশ শতাব্দী অন্ধ বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান-সৃজনে নিজেকে জড়িয়ে সামনে ধাবমান সভ্যতায় অবদান রাখার সময়। ভারতের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন ভাবলে তারা পিছিয়ে পড়বে, তাদের উচিত নিজেদের ভারতীয় ভেবে ভারতের অগ্রযাত্রায় অবদান রাখা। ভারত একটি বহুজাতিক এবং বহুভাষিক রাষ্ট্র, কিন্তু ভারতের মাথা ব্যথার কারণ কেবল মুসলমানরা। শুধু ভারত নয়, সারা পৃথিবীর মাথা ব্যথার কারণ এখন মুসলমানরা। কেন? একটি সহি কিতাব-কোরন। এই কোরান-ই পৃথিবীর অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠী থেকে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ফলে এই যে মুসলমান এবং অমুসলমানদের মধ্যে মানসিক ব্যবধান, এই ব্যবধান ঘুচাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে মুসলমানদেরকেই। কাশ্মীরের মুসলমানদেরও উচিত অন্যান্য ভারতীয়দের সঙ্গে তাদের ব্যবধান ঘুচাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করা।


কি সুলতানি আমল, কি মোগল আমল, কি স্বাধীন ভারতবর্ষ, কাশ্মীরে বার বার হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখদের রক্তের বন্যা বইয়ে, মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত করে মুসলমানরা চেয়েছে ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ প্রতিষ্ঠার মুসলমানধিকার। ভারত আজ কাশ্মীরকে স্বাধীন করে দিক, কাল থেকেই কাশ্মীর থেকে পণ্ডিতদের তাড়ানো এবং ধর্মান্তরিত করা শুরু হবে, নারীদের জোর করে ধর্ষণ এবং বিয়ে করা হবে। উদ্বাস্তু হিন্দুদের চাপটা নিতে হবে ভারতকে। পাকিস্তানের আদলে আরেকটি মুসলমান রাষ্ট্র গড়ে উঠবে, যাদের কাজ হবে জঙ্গি উৎপাদন করা আর জঙ্গি অনুপ্রবেশ করিয়ে ভারতে হামলা-অশান্তি সৃষ্টি করা, নিজেদের অর্থনীতি তলানিতে থাকলেও সেদিকে নজর না দিয়ে ভারতের অর্থনীতি বাধাগ্রস্ত করা। ব্যাপারটা এখনেই শেষ হবে না। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে অনেক মুসলমান আছে; একটা সময় পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা হয়তো মুর্শিদাবাদ-মালদার মতো কয়েকটি জেলা নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র চাইবে, কেরলে চাইবে, হায়দ্রাবাদে চাইবে, বিহারে চাইবে। মোটকথা মুসলমানদের চাই নিজের রাষ্ট্র, যেটা তারা নিজেরা শাসন করবে। তাদের এই চাওয়ার কোনো শেষ নেই। যতোদিন না সারা ভারতে তারা ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ প্রতিষ্ঠা করতে না পারবে, ততোদিন তারা চাইতেই থাকবে। সঙ্গত কারণেই শক্ত অবস্থানে যাওয়া ছাড়া ভারতের আর কোনো উপায় নেই।

কাশ্মীরের মুসলমান তরুণদের এখন এই উপলব্ধি করতে হবে যে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে তরবারি নিয়ে যুদ্ধ করার দিন এখন শেষ, এখন ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে সংঘাত অনিবার্য। আর এই সংঘাতে তাদের ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না কিছু। ফলে শান্তির জন্য মুসলমানধিকার নয়, মানবাধিকার; ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ নয়, সব জাতি-গোষ্ঠীকে নিয়ে এক মানবিক ভারত চাওয়াই তাদের কাম্য।

 

আগস্ট, ২০১৯














মন্তব্য ০ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.