| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
পত্রিকার মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম, কোরবানির বিশুদ্ধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে মামলা করেছেন বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্ট দেব নারায়ণ মহেশ্বর। পত্রিকার বিবরণ থেকে আমরা জেনেছি, তিনি নিম্নের বিষয়গুলো লিখেছেন :
(১) ইবরাহিম আ: ও ইসমাইল আ:-এর স্মৃতিবিজড়িত কোরবানির ঘটনায় কাকে কোরবানি করতে নেয়া হয়েছিল তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন তিনি। (২) ইসমাইল আ: নয়, বরং ইসহাক আ:-কেই কোরবানি দিতে নেয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। (৩) তিনি দাবি করেছেন : আল্লাহর কিতাব হাতে নিয়ে যারা ১৪০০ বছর যাবৎ লোকদের শিক্ষা দিয়ে এসেছে, ‘স্বপ্ন পূরণ করার জন্য ইবরাহিম আ: কোরবানি দিতে ইসমাইল আ:-কে শুইয়েছিলেন’ তারা কাফির, জালিম ও ফাসিক। (৪) সূরা আস-সাফ্ফাতের ৯৯-১২২ আয়াতের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেছেন, এসব আয়াতে ইসমাইলকে নয়, বরং ইসহাককে কোরবানির কথা বলা হয়েছে। (৫) ইবরাহিম আ: যে জন্তুটি কোরবানি করেন তা দুম্বা ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। (৬) এ বিষয়টি পাঠ্যবইয়ে ভুলভাবে উপস্খাপন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এ বিষয়ে ভুল রয়েছে। বিষয়টি শুদ্ধ করে প্রকাশ করার জন্য তিনি আদালতের নির্দেশের আবেদন জানান।
বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্ট মহোদয়কে ধন্যবাদ। তবে আমরা বুঝতে পারছি না যে, মুসলিমদের একান্তই ধর্মীয় একটি বিষয় নিয়ে মামলা মোকদ্দমা করে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ কত দূর এগোবে। কোনো মুসলিম যদি এভাবে আদালতে রিট করেন যে, বাইবেলের কোথাও ত্রিত্ববাদ (ঞড়মষময়ী) কথাটি নেই বা যিশুখ্রিষ্টকে মূর্তিমান ঈশ্বর (এসন ওষধথড়ষথয়প) বলে কোথাও বলা হয়নি, কাজেই এ কথাগুলো খ্রিষ্টধর্মীয় বইপুস্তক থেকে তুলে দেয়ার জন্য আদালতের নির্দেশ দেয়া হোক, অথবা বেদে কোথাও মূর্তিপূজার কথা নেই বা গোমাংস অবৈধ হওয়ার কথা নেই কাজেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ করা হোক, আইন করে গোমাংস খাওয়ানোর ব্যবস্খা করা হোক, অথবা এসব কথা যেসব পাঠ্যপুস্তকে আছে তা পরিবর্তন করা হোক.... তাহলে বিশ্ব শান্তি কত দূর এগোবে? ধর্মীয় বিশ্বাস আইন করে চাপিয়ে দেয়া বা নিষেধ করার মাধ্যমে বিশ্ব শান্তি কতটুকু শক্তিশালী হবে?
কুরআনে কোরবানির ঘটনায় ইসমাইল আ:-এর নাম নেই? তাহলে কি ইসহাক আ:-এর নাম আছে? যদি নাম না থাকার কারণে ইসমাইল আ:-এর নাম বলাতে কাফির, জালিম ও ফাসিক হতে হয়, তাহলে ইসহাক আ:-এর নাম বললে কাফির, জালিম ও ফাসিক হবে না কেন?
বস্তুত কুরআনের বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট যে, ইবরাহিম আ: তাঁর প্রথম পুত্র ইসমাইল আ:-কেই কোরবানি করেছিলেন। যে বিষয়টি দেব নারায়ণ মহেশ্বরকে বিভ্রান্ত করেছে তা হলো পবিত্র বাইবেলের বক্তব্য। তার আগেও অনেকেই এভাবে প্রতারিত ও বিভ্রান্ত হয়েছেন। আমরা জানি, বাইবেল ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ। কাজেই ইহুদি-খ্রিষ্টান বিশ্বাস মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দেয়া বা বাইবেলের বর্ণনা দিয়ে মুসলিমদের বিশ্বাস সংশোধনের প্রবণতা কাণ্ডজ্ঞানের পরিচায়ক নয়। তা সত্ত্বেও অনেক ইহুদি-খ্রিষ্টান পরিচায়ক পণ্ডিত ও প্রচারক এ বিষয়টি নিয়ে অনেক পানি ঘোলা করেছেন। এ ছাড়া অনেক মুসলিম-অমুসলিম পণ্ডিতও তাদের এসব প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়েছেন। এ জন্য আমরা আগে এ বিষয়ে পবিত্র বাইবেলের বক্তব্য পর্যালোচনা করে এরপর কুরআনের বক্তব্য পর্যালোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
পবিত্র বাইবেলের আদিপুস্তকের ২২ অধ্যায়ের বক্তব্য নিুরূপ : “১. এই সকল ঘটনার পরে ঈশ্বর অব্রাহামের পরীক্ষা করিলেন। তিনি তাঁহাকে কহিলেন, হে অব্রাহাম; তিনি উত্তর করিলেন, দেখুন, এই আমি। ২. তখন তিনি কহিলেন, তুমি আপন পুত্রকে, তোমার অদ্বিতীয় পুত্রকে, (কোনো কোনো আরবি বাইবেলে : তোমার প্রথমজাত পুত্রকে) (য়ভমষপ সষলী ঢ়সষ) যাহাকে তুমি ভালোবাস, সেই ইসহাককে লইয়া মোরিয়া দেশে যাও, এবং তথাকার যে এক পর্বতের কথা আমি তোমাকে বলিব, তাহার উপরে তাহাকে হোমার্থে বলিদান করো। ... ১০. পরে অব্রাহাম হস্ত বিস্তার করিয়া আপন পুত্রকে বধ করণার্থে খড়গ গ্রহণ করিলেন। ১১. এমন সময়ে আকাশ হইতে সদা প্রভুর দূত তাঁহাকে ডাকিলেন, কহিলেন, অব্রাহাম, অব্রাহাম। তিনি কহিলেন, দেখুন, এই আমি। ১২. তখন তিনি বলিলেন, যুবকের প্রতি তোমার হস্ত বিস্তার করিও না, উহার প্রতি কিছুই করিও না, কেননা এখন আমি বুঝিলাম, তুমি ঈশ্বরকে ভয় কর, আমাকে আপনার অদ্বিতীয় পুত্র দিতেও অসম্মত নও। ১৩. তখন অব্রাহাম চক্ষু তুলিয়া চাহিলেন, আর দেখেন, তাঁহার পশ্চাৎ দিকে একটি মেষ, তাহার শৃঙ্গ ঝোপে বদ্ধ; পরে অব্রাহাম গিয়া সেই মেষটি লইয়া আপন পুত্রের পরিবর্তে হোমার্থ বলিদান করিলেন। .... ১৫. পরে সদাপ্রভুর দূত দ্বিতীয়বার আকাশ হইতে অব্রাহামকে ডাকিয়া কহিলেন, সদাপ্রভু বলিতেছেন, ১৬. তুমি এই কার্য করিলে, আমাকে আপনার অদ্বিতীয় পুত্র দিতে অসম্মত হইলে না, এইহেতু আমি আমারই দিব্য করিয়া কহিতেছি, ১৭. আমি অবশ্য তোমাকে আশীর্বাদ করিব...।”
এভাবে বাইবেলে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইবরাহিম আ: তাঁর একমাত্র ও অদ্বিতীয় পুত্রকে এবং কোনো আরবি বাইবেলে : তাঁর প্রথমজাত পুত্রকে কোরবানি করতে নিয়ে যান। এখানে আমরা আরো দেখছি, পুত্রের অদ্বিতীয় হওয়ার বিষয়টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং এর ওপরই মূল আশীর্বাদের ভিত্তি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি এ কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, এ পুত্রটি ছিলেন ইসহাক। যেকোনো বাইবেল পাঠক বুঝবেন যে, কথাটি ‘সোনার পাথর-বাটি’ ছাড়া কিছুই নয়। কারণ ইসহাক আ: কখনোই ইবরাহিমের আ:-এর ‘অদ্বিতীয় পুত্র ছিলেন না, তিনি জন্ম থেকেই ইবরাহিম আ:-এর দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন। এ বিষয়ে বাইবেলের বক্তব্য দেখুন।
আদিপুস্তকের ১৬ অধ্যায়ে ইসমাইলের জন্ম বিবরণের মধ্যে রয়েছে : “১. অব্রাহামের স্ত্রী সারী নি:সন্তান ছিলেন, এবং হাগার নামে তাঁহার এক মিসরীয়া দাসী ছিল। ... ৩. এইরূপে কনান দেশে অব্রাহাম দশ বৎসর বাস করিলে পর অব্রাহামের স্ত্রী সারী আপন দাসী মিসরীয়া হাগারকে লইয়া আপন স্বামী অব্রাহামের সহিত বিবাহ দিলেন। ... ১৫. পরে হাগার অব্রাহামের নিমিত্তে পুত্র প্রসব করিল; আর অব্রাহাম হাগারের গর্ভজাত আপনার সেই পুত্রের নাম ইশ্মায়েল রাখিলেন। ১৬. অব্রাহামের ছিয়াশি বৎসর বয়সে হাগার অব্রাহামের নিমিত্তে ইশ্মায়েলকে প্রসব করিল।”
এবার ইসহাকের জন্ম বিবরণ দেখুন : আদিপুস্তকের ১৭ অধ্যায়ে বলা হয়েছে : “১. অব্রাহামের নিরানব্বই বৎসর বয়সে সদাপ্রভু তাঁহাকে দর্শন দিলেন... ১৫. আর ঈশ্বর অব্রাহামকে কহিলেন, তুমি তোমার স্ত্রী সারীকে আর সারী বলিয়া ডাকিও না; তাহার নাম সারা [রানী] হইল। ১৬. আর আমি তাহাকে আশীর্বাদ করিব, এবং তাহা হইতে এক পুত্রও তোমাকে দিব; আমি তাহাকে আশীর্বাদ করিব, তাহাতে সে জাতিগণের [আদিমাতা] হইবে ... অব্রাহাম ঈশ্বরকে কহিলেন, ইশ্মায়েলই তোমার গোচরে বাঁচিয়া থাকুক (ঙ য়ভথয় ওঢ়ভশথপল শমবভয় লমংপ দপফসড়প য়ভপপ!) ১৯. তখন ঈশ্বর কহিলেন, তোমার স্ত্রী সারা অবশ্য তোমার নিমিত্তে পুত্র প্রসব করিবে, এবং তুমি তাহার নাম ইস্হাক [হাস্য] রাখিবে। আর আমি তাহার সহিত আমার নিয়ম স্খাপন করিব, তাহা তাহার ভাবী বংশের পক্ষে চিরস্খায়ী নিয়ম হইবে। ২০. আর ইশ্মায়েলের বিষয়েও তোমার প্রার্থনা শুনিলাম; দেখ, আমি তাহাকে আশীর্বাদ করিলাম, এবং তাহাকে ফলবান করিয়া তাহার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করিব; তাহা হইতে দ্বাদশ রাজা উৎপন্ন হইবে, ও আমি তাহাকে বড় জাতি করিব।...”
এরপর ২১ অধ্যায়ে বলা হয়েছে : “... ৫. অব্রাহামের একশত বৎসর বয়সে তাঁহার পুত্র ইসহাকের জন্ম হয়। .... ১২. আর ঈশ্বর অব্রাহামকে কহিলেন, .... সারা তোমাকে যাহা বলিতেছে, তাহার সেই কথা শুন; কেননা ইসহাকেই তোমার বংশ আখ্যাত হইবে।”
এরপর আদিপুস্তকের ২৫ অধ্যায়ে বলা হয়েছে : “৮. পরে অব্রাহাম বৃদ্ধ ও পূর্ণায়ু হইয়া শুভ বৃদ্ধাবস্খায় প্রাণত্যাগ করিয়া আপন লোকদের নিকটে সংগৃহীত হইলেন। ৯. আর তাঁহার পুত্র ইসহাক ও ইশ্মায়েল মম্রির সম্মুখে হেতীয় সোহরের পুত্র ইফেন্সানের ক্ষেত্রস্খিত মকপেলা গুহাতে তাঁহার কবর দিলেন।”
ওপরের বক্তব্যগুলো থেকে আমরা নিশ্চিত হই যে, ইবরাহিমের প্রথম পুত্র ইসমাইল। ইসমাইলের বয়স ১৪ বছর হলে দ্বিতীয় পুত্র ইসহাকের জন্ম হয়। ইসমাইল ১৪ বছর পর্যন্ত অদ্বিতীয় পুত্র ছিলেন। আর ইসহাক জন্মের মুহূর্ত থেকেই দ্বিতীয় পুত্র হয়ে জন্মেন। ইসহাকের জন্মের আগে ইসমাইল ইবরাহিমের প্রিয়তম পুত্র ছিলেন। তাঁর জন্য তিনি হৃদয় দিয়ে দোয়া করতেন। ইসমাইলকে দূরে ‘বনবাসে’ পাঠালেও ইবরাহিমের সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। তার বড় প্রমাণ যে, পিতার মৃত্যুর সময় তিনি উপস্খিত ছিলেন এবং ছোট ভাই ইসহাকের সাথে একত্রে তাঁকে দাফন করেন।
এ থেকে আমরা বুঝতে পারছি, এখানে কিছু ভুল আছে। হয় ‘অদ্বিতীয়’ কথাটি ভুল অথবা ‘ইসহাক’ কথাটি ভুল। কোনটি ভুল সেটি নির্ধারণ করার আগে আসুন, আমরা বাইবেলের এ বিষয়ক সামান্য কয়েকটি দৃষ্টান্ত আলোচনা করি। সেগুলোর আলোকে আমরা সুনিশ্চিতভাবে জানতে পারব যে, প্রচলিত বাইবেল কখনোই আক্ষরিকভাবে ঐশ্বরিক বাণী নয় এবং বাইবেলের আক্ষরিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে সত্যাসত্য নির্ণয় সম্ভব নয়।
লুক তার সুসমাচারের তৃতীয় অধ্যায়ে যিশুর বংশ তালিকা প্রসঙ্গে লিখেছেন : ‘ইনি শেলহের পুত্র, ইনি কৈননের পুত্র, ইনি অর্ফকষদের পুত্র’ (লুক ৩/৩৬)। অথচ পুরাতন নিয়মে বা তাওরাতে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, শেলহ নিজেই অর্ফকষদের পুত্র ছিলেন, তিনি অর্ফকষদের পৌত্র ছিলেন না। আদিপুস্তক ১০/২৪ : ‘আর অর্ফকষদ শেলহের জন্ম দিলেন।’ আদিপুস্তক ১/১২-১৩ : ‘অর্ফক্ষদ পঁয়ত্রিশ বৎসর বয়সে শেলহের জন্ম দিলেন।’ ১. বংশাবলি ১/১৮-তেও এ কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও অর্ফকষদ ও শেলহের মধ্যে কৈননের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
বাইবেলের ১ বংশাবলির (বংশাবলি ১ম খণ্ড) ৭ম অধ্যায়ের ৬ শ্লোকে বলা হয়েছে : ‘বিন্যামিনের সন্তান- বেলা, বেখর ও জিদিয়েল, তিনজন।’ পক্ষান্তরে ১ বংশাবলিরই ৮ম অধ্যায়ের ১ শ্লোকে বলা হয়েছে : ‘বিন্যামিনের জ্যেষ্ঠ পুত্র বেলা, দ্বিতীয় অস্বেল, তৃতীয় অহর্হ, চতুর্থ নোহা ও পঞ্চম রাফা।’ কিন্তু আদিপুস্তক ৪৬ অধ্যায়ের ২১ শ্লোকে বলা হয়েছে : ‘বিন্যামিনের পুত্র বেলা, বেখর, অস্বেল, গেরা, নামন, এহি, রোশ, মুপ্পিম, হুপ্পিম ও অর্দ।’
দায়ুদের নির্দেশে তার সেনাপতি জোয়াব লোকসংখ্যা গণনা করেন। এ বিষয়ে বাইবেলের শমুয়েলের দ্বিতীয় পুস্তকের ২৪ অধ্যায়ের ৯ম শ্লোকটি নিóíরূপ : “পরে জোয়াব গণিত লোকেদের সংখ্যা রাজার কাছে দিলেন; ইস্রায়েলে খড়গ-ধারী আট লক্ষ বলবান লোক ছিল; আর জিহুদার পাঁচ লক্ষ লোক ছিল।’ অপর দিকে বংশাবলি প্রথম খণ্ডের ২১ অধ্যায়ের ৫ম শ্লোক নিুরূপ : ‘আর জোয়াব গণিত লোকদের সংখ্যা দায়ুদের কাছে দিলেন। সমস্ত ইস্রায়েলের এগার লক্ষ খড়গধারী লোক, ও জিহুদার চারি লক্ষ সত্তর সহস্র খড়গধারী লোক ছিল।’
এরূপ বৈপরীত্য ও সাংঘর্ষিক বর্ণনা বাইবেলের মধ্যে হাজার হাজার, যেগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে, বাইবেলের মধ্যে শব্দ, বাক্য, শ্লোক, অধ্যায় ইত্যাদি অবলীলায় সংযোজন, বিয়োজন বা পরিবর্তন করা হয়েছে। কাজেই এখানে কোরবানির বর্ণনায় দু-চারটি শব্দ সংযোজিত হওয়া অসম্ভব নয়।
এখন প্রশ্ন হলো কোনটি সংযোজিত? ‘অদ্বিতীয়’ বিশেষণটি না ‘ইসহাক বিশেষ্যটি? বাইবেলের ইতিহাস, বিবর্তন এবং বর্তমান বাইবেলের বক্তব্য নিরীক্ষার মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, এখানে ‘ইসহাক’ নামটিই সংযোজন করা হয়েছে। কারণ ইসমাইল ছিলেন ইবরাহিমের প্রথমজাত, একমাত্র ও অদ্বিতীয় পুত্র। তাঁকেই তিনি কোরবানি করতে নিয়েছিলেন। কিন্তু ইসমাইল আরব জাতির পিতা। পক্ষান্তরে ইসহাক ইহুদি জাতির পিতা। এ জন্য ইহুদিরা এখানে ইসমাইলের নামের পরিবর্তে ইসহাকের নাম সংযোজন করেন। প্রাচীনকাল থেকেই ইহুদিরা এবং এরপর খ্রিষ্টানরা নিজেদের মানসিকতার বিপরীত অনেক বিষয় বাইবেল থেকে মুছে দিয়েছেন অথবা নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক বিষয় সংযোজন করেছেন। সামান্য কয়েকটি নমুনা দেখুন।
বাইবেলের নতুন নিয়মের লেখকরা বিভিন্ন সময় দাবি করেছেন, পুরাতন নিয়মে যিশুর বিষয়ে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান। কিন্তু বর্তমান হিব্রু বাইবেলে সে কথাগুলো নেই। খ্রিষ্টান পণ্ডিতরা দাবি করেন, ইহুদিরা এগুলো পুরাতন নিয়ম থেকে মুছে ফেলেছে। এর একটি নমুনা মথির সুসমাচারের ২য় অধ্যায়ের ২৩ শ্লোক। মথি লিখেছেন : ‘এবং নাসরৎ নামক নগরে গিয়া বসতি করিলেন; যেন ভাববাদিগণের দ্বারা কথিত এই বচন পূর্ণ হয় যে, তিনি নসরতীয় বলিয়া আখ্যাত হইবেন।’ এভাবে মথি দাবি করেছেন যে, যিশুর বিষয়ে পুরনো নিয়মের পুস্তকে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, তাকে নসরতীয় বলে আখ্যা দেওয়া হবে। কিন্তু পুরনো নিয়মের কোনো পুস্তকেই এ কথাটি নেই। হয় খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষের কারণে এ বাক্যগুলো সুসমাচারের মধ্যে সংযোজন করেছেন ইহুদিদের বিকৃতি প্রমাণ করতে। অথবা ইহুদিরা এ কথাগুলো মুছে দিয়েছেন খ্রিষ্টানদের বিভ্রান্ত প্রমাণ করতে।
এবার খ্রিষ্টধর্মের সপক্ষে বিকৃতির মাত্র দু’টি নমুনা দেখুন।
যিশুখ্রিষ্ট তার শিষ্যদের কিয়ামত বা মহাপ্রলয়ের আগমন এবং সে জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পর্কে কিছু উপদেশ প্রদান করেন বলে মথি, মার্ক ও লুক উল্লেখ করেছেন। মথির বর্ণনানুসারে এ প্রসঙ্গে যিশু বলেন : (মথি ২৪/৩৪-৩৬) ‘৩৪. আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, এই কালের লোকদের লোপ হইবে না, যে পর্যন্ত না এ সমস্ত সিদ্ধ হয়। ৩৫. আকাশের ও পৃথিবীর লোপ হইবে, কিন্তু আমার বাক্যের লোপ কখনো হইবে না। ৩৬. কিন্তু সেই দিনের ও সেই দণ্ডের কথা কেউই জানে না, স্বর্গের দূতরাও জানেন না, কেবল পিতা জানেন।’ এই হলো অথোরাইজড ভার্সন বা কিং জেমস ভার্সন
আধুনিক গবেষণা প্রমাণ করেছে, এখানে ইংরেজিতে তিনটি শব্দ বাদ দেয়া হয়েছিল। শব্দগুলো নিóíরূপ (ষপময়ভপড় য়ভপ ঝসষ) : ‘পুত্রও জানেন না।’ রিভাইজড স্টান্ডার্ড ভার্সন(জপংমঢ়পন ঝয়থষনথড়ন ঠপড়ঢ়মসষ : জঝঠ)-এ শব্দগুলো সংযোজন করা হয়েছে। সংযোজিত বাক্যাংশটুকুসহ শ্লোকটির অর্থ হচ্ছে : ‘কিন্তু সেই দিনের বা সেই দণ্ডের তত্ত্ব কেউই জানে না, স্বর্গস্খ দূতরাও জানেন না, পুত্রও জানেন না, কেবল পিতা জানেন।’ বাংলা কেরির বাইবেলে এরূপই আছে।
এ বাক্যাংশসহ এ শ্লোকটি প্রমাণ করে যে, যিশু ঈশ্বর ছিলেন না, এমনকি কিয়ামত কখন হবে, সে জ্ঞানও তাঁর ছিল না। যিশুকে ঈশ্বর বলে যারা বিশ্বাস করেন, তাদের জন্য কথাটি মেনে নেয়া কষ্টকর। এ জন্য বাইবেল লেখকরা এ বাক্যাংশটুকু বাইবেল থেকে মুছে দিয়েছিলেন। আরো মজার ব্যাপার হলো, লুকের বাইবেল থেকে এ শ্লোকটি পুরোই ফেলে দেয়া হয়েছে। লুকলিখিত সুসমাচারের ২১/৩২-৩৪ শ্লোক নিóíরূপ : ‘৩২. আমি তোমাদেরকে সত্য বলিতেছি, যে পর্যন্ত সমস্ত সিদ্ধ না হইবে সেই পর্যন্ত এই কালের লোকদের লোপ হইবে না। ৩৩. আকাশের ও পৃথিবীর লোপ হইবে, কিন্তু আমার বাক্যের লোপ কখনো হইবে না। ৩৪. কিন্তু আপনাদের বিষয়ে সাবধান থাকিও, পাছে ভোগপীড়ায় ও মত্ততায় এবং জীবিকার চিন্তায় তোমাদের হৃদয় ভারগ্রস্ত হয়, আর সেই দিন হঠাৎ ফাঁদের ন্যায় তোমাদের ওপর আসিয়া পড়ে।’
সংযোজনের একটি নমুনা দেখুন। কিং জেমস ভার্সন বা অথোরাইজড ভার্সন অনুসারে জোহনের প্রথম পত্রের ৫ম অধ্যায়ের ৭-৮ শ্লোক নিóíরূপ : “৭. কারণ স্বর্গে তিনজন রহিয়াছেন যাঁহারা সাক্ষ্য সংরক্ষণ করেন : পিতা, বাক্য ও পবিত্র আত্মা; এবং তাঁহারা তিন একই। ৮. এবং পৃথিবীতে তিনজন রহিয়াছেন যাঁহারা সাক্ষ্য প্রদান করেন: আত্মা, জল ও রক্ত, এবং সেই তিনের সাক্ষ্য একই।
এভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী বাইবেল পাঠ করা হয়েছে। এখন খ্রিষ্টান পণ্ডিতরা একমত যে, একথাগুলো প্রায় সবই ত্রিত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য মূল বাইবেলের মধ্যে সংযোজিত। এখানে মূল কথা ছিল ‘তিনজন সাক্ষী রয়েছেন : আত্মা, জল ও রক্ত, এবং এ তিনজনের সাক্ষ্য একই।” ত্রিত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য ধার্মিক বাইবেল লেখকরা ওপরের অতিরিক্ত কথাগুলো সংযোজন করেন। বাইবেলের কোথাও ত্রিত্ববাদের কথা নেই; এখানে যেহেতু আত্মা, জল ও রক্ত: তিন জিনিসের কথা রয়েছে, এখানে ‘পিতা, পুত্র ও পবিত্র’ এ তিনটি যোগ করে ত্রিত্ববাদ প্রমাণের ব্যবস্খা করা প্রাসঙ্গিক হবে বলে মনে করেছেন তারা। রিভাইজড স্টান্ডার্ড ভার্সনের ভাষ্য নিóíরূপ : "ঞভপড়প থড়প য়ভড়পপ াময়ষপঢ়ঢ়পঢ়, য়ভপ ঝহমড়ময়, য়ভপ াথয়পড় থষন য়ভপ দলসসন; থষন য়ভপঢ়প য়ভড়পপ থবড়পপ." কেরির বাইবেলের বাংলা অনুবাদ : ‘বস্তুত তিনে সাক্ষ্য দিতেছেন, আত্মা, জল ও রক্ত, এবং সেই তিনের সাক্ষ্য একই।’
এরূপ ইচ্ছাকৃত সংযোজন, বিয়োজন ও পরিবর্তনের নমুনাও বাইবেলের নতুন ও পুরনো নিয়মের মধ্যে হাজার হাজার। এখানে ইহুদি বা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে দায়ী করা অথবা আইন করে কিছু চাপিয়ে দেয়াও উদ্দেশ্য নয়। বিষয়টি তাদের ধর্মীয় বিষয়। তাদের ধর্মে হয়তো ধর্মগ্রন্থের মধ্যে এরূপ সংযোজন, বিয়োজন বা পরিবর্তন বৈধ। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু এতটুকুই প্রমাণ করা যে, বাইবেলের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে ইসহাককে কোরবানি দেয়া হয়েছিল বলে দাবি করার কোনো উপায় নেই। আমরা দু’টি বিষয় সুনিশ্চিত বুঝতে পারছি : প্রথমত, ইসহাকের কোরবানির প্রসঙ্গে বাইবেলের বর্ণনায় ‘অদ্বিতীয়’ এবং ‘ইসহাক’ দু’টি কথার একটি ভুল।
দ্বিতীয়ত, ‘অদ্বিতীয়’ বিশেষণটিই সঠিক; কারণ বাইবেলে এ বিশেষণের ওপরই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, ‘ইসহাক’ শব্দটি ইহুদিদের সংযোজিত, আরবদের মর্যাদা খর্ব করে নিজেদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তারা এটি সংযোজন করেন। এরূপ সংযোজন, বিয়োজন বা পরিবর্তন বাইবেলের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক।
বস্তুত মহান আল্লাহ ইবরাহিমকে তার একমাত্র, অদ্বিতীয় ও প্রথমজাত প্রিয় পুত্রের বিষয়ে বারবার পরীক্ষা করেন এবং ইবরাহিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মহাপিতা হওয়ার উপাধি লাভ করেন। প্রথম পরীক্ষা ছিল, শিশু বয়সেই এ প্রিয় পুত্রকে ‘বনবাসে’ বা ‘মরুবাসে’ পাঠানো। বাইবেলের বর্ণনা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে, ইসহাকের জন্মের অনেক আগে, অতি অল্প বয়সে মায়ের কাঁধে বা কোলে থাকার সময়ে ইবরাহিম তাঁর এ পুত্রকে ‘মরুবাসে’ পাঠান। আদিপুস্তক ২১ অধ্যায়ের বর্ণনা : ‘১৪ পরে অব্রাহাম প্রত্যুষে উঠিয়া রুটি ও জলপূর্ণ কুপা লইয়া হাগারের স্কìেধ দিয়া বালকটিকে সমর্পণ করিয়া (হৎয়য়মষব ময় সষ ভপড় ঢ়ভসৎলনপড়, থষন য়ভপ ধভমলন) তাহাকে বিদায় করিলেন। তাহাতে সে প্রস্খান করিয়া বের-শেবা প্রান্তরে ঘুরিয়া বেড়াইল। ১৫ পরে কুপার জল শেষ হইল, তাহাতে সে এক ঝোপের নিচে বালকটিকে ফেলিয়া রাখিল; ১৬ আর আপনি তাহার সম্মুখ হইতে অনেকটা দূরে, অনুমান একতীর দূরে গিয়া বসিল, কারণ সে কহিল, বালকটির মৃত্যু আমি দেখিব না।...’
এখানে সুস্পষ্ট যে, ইসমাইলকে যখন মরুবাসে প্রেরণ করা হয়, তখন তিনি হাঁটতে-দৌড়াতে পারতেন না। এত ছোট ছিলেন যে, তাঁর মা তাকে রুটি ও পানির সাথে একত্রে কাঁধে নিতে পেরেছিলেন। তাঁকে ফেলে রেখে মা দূরে গিয়ে বসে ছিলেন, কিন্তু দৌড়ে বা হেঁটে একতীর দূরে মায়ের কাছে যাওয়ার মতো বড়ও ইসমাইল হননি। নি:সন্দেহে একমাত্র শিশু পুত্রকে এভাবে দূরে রেখে আসা ইবরাহিম আ:-এর জন্য মহাপরীক্ষা ছিল। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে আল্লাহ তাঁকে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা করলেন কোরবানি দেয়ার নির্দেশ দিয়ে। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরেই ইবরাহিমের জীবনের মোড় ঘুরল। তাঁর এ পুত্রের বিষয়ে সুসংবাদ লাভের পাশাপাশি দ্বিতীয় পুত্র ও তাঁর বংশধরের সুসংবাদ লাভ করেন।
এখানে আরো লক্ষণীয় যে, আমরা ওপরে ইসহাকের জন্মবিষয়ক বিবরণ থেকে দেখেছি যে, ইসহাকের জন্মের আগেই সদাপ্রভু তার বিষয়ে প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, তিনি তাঁর বংশ বৃদ্ধি করবেন এবং ইসহাকের মাধ্যমেই ইবরাহিমের বংশ আখ্যাত হবে। যে পুত্রের জন্মের আগেই ঈশ্বর প্রতিজ্ঞা করলেন যে, তাঁর বংশধর বৃদ্ধি করবেন, সে পুত্রকে তিনি বিবাহ ও বংশবৃদ্ধির আগেই কোরবানির নির্দেশ দিয়ে নিজের প্রতিজ্ঞা নিজেই ভঙ্গ করবেন, তা কি সম্ভব?
আমরা আরো দেখেছি যে, কোরবানির স্খান হিসেবে ‘মোরিয়া দেশ’ (গসড়মথভ)-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে সুস্পষ্ট যে, মক্কার ‘মারওয়া’ নামক স্খানকেই বোঝানো হয়েছে। এতেও প্রমাণিত হয়, মক্কায় অবস্খানরত ইসমাইলকেই কোরবানির নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
এভাবে আমরা বাইবেলের আলোকে ইবরাহিমের আ: কোরবানির বিষয়টি দেখলাম। এবার দেখা যাক কুরআনের বিবরণ। কুরআন মাজিদের ৩৭ নং সূরা ‘আস-সাফ্ফাত’-এ ইবরাহিম আ:-এর দাওয়াত, তাঁর দেশের মানুষদের বিরোধিতা, আগুনে নিক্ষেপ ইত্যাদি বর্ণনা করে মহান আল্লাহ বলেন : “তারা তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্তের সঙ্কল্প করেছিল; কিন্তু আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম। এবং সে বলল, ‘আমি আমার প্রতিপালকের দিকে চললাম, তিনি আমাকে অবশ্যই সঠিক পথে পরিচালিত করবেন। হে আল্লাহ, আমাকে এক সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করো। তখন আমি তাঁকে এক স্খিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অত:পর সে যখন তাঁর পিতার সাথে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হলো তখন ইবরাহিম বলল, ‘বৎস, আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি, এখন তোমার অভিমত কী বল?’ সে বলল, ‘হে আমার পিতা, আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন, তাই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহিম তাঁর পুত্রকে কাত করে শায়িত করল, তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললাম, ‘হে ইবরাহিম, তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করলে।’ এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয় এ ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাঁকে মুক্ত করলাম এক মহান কোরবানির বিনিময়ে। আমি একে পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি। ইবরাহিমের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করে থাকি। সে ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। এবং আমি তাঁকে সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের, সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত একজন নবী হিসেবে। ...” সূরা সাফ্ফাত ৯৮-১১২।
কুরআনের এ বিবরণ থেকে যেকোনো পাঠক সহজেই বুঝবেন যে, প্রথম পুত্রকেই কোরবানি দেয়া হয়েছিল এবং কোরবানির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরেই ইবরাহিম আ:-কে ইসহাকের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছিল। ইবরাহিম তাঁর দেশবাসীর অত্যাচার থেকে ফিলিস্তিনে হিজরত করার পর নি:সন্তান হিসেবে আল্লাহর কাছে সন্তান প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাঁকে স্খিরবুদ্ধি পুত্র ইসমাইলের সুসংবাদ প্রদান করেন। এরপর তিনি তাঁকে এ প্রিয় পুত্রের কোরবানির নির্দেশ দেন। নির্দেশ পালন করার কারণে তিনি ইবরাহিমের প্রতি তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন, তাঁকে করুণা করেন এবং তাঁকে দ্বিতীয় পুত্র ইসহাকের সুসংবাদ প্রদান করেন।
এ ছাড়া কুরআনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে, ইসহাকের জন্মের সুসংবাদের সাথে সাথে আল্লাহ তাঁর বংশধরের বিষয়েও সুসংবাদ প্রদান করেন। যেমন আল্লাহ বলেন : “আমি তাঁকে সুসংবাদ প্রদান করলাম ইসহাকের এবং ইসহাকের পরে ইয়াকুবের” সূরা (১১) হুদ : ৭১ আয়াত। আর যার বংশধরের সুসংবাদ প্রদান করছেন তাঁকে তিনি বংশধর জন্মের আগেই জবাই করার নির্দেশ দেবেন তা কখনোই সম্ভব নয়।
এখানে প্রশ্ন হলো প্রথম পুত্রের নাম আল্লাহ বললেন না কেন? কুরআনের বোদ্ধা পাঠকদের কাছে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট। কুরআনের অলৌকিক ভাষাশৈলীর অন্যতম দিক স্বল্পতম কথায় ব্যাপক অর্থ প্রকাশ। এ জন্য সর্বদা বাহুল্য পরিহার করা হয়েছে। কুরআনে ঐতিহাসিক ঘটনাবলি উল্লেখের মূল উদ্দেশ্য, এগুলো থেকে ঈমান ও সৎকর্মের প্রেরণা লাভ। ইসমাইলের কোরবানির বিষয়টি আরবদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিল। এখানে মহান আল্লাহর একত্ব, তাঁর মহত্ত্ব, তাঁর প্রেম অর্জনের পথে পরীক্ষা, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার গুরুত্ব ইত্যাদি বিষয়ের শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা প্রদানই কুরআনের বর্ণনার মূল উদ্দেশ্য; নাম, সময়, বয়স, স্খান ইত্যাদির উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক বাহুল্যমাত্র।
ইসমাইল আ:-এর পরিবর্তে কী কোরবানি দিয়েছিলেন ইবরাহিম আ:? আরবি বাইবেল এবং আরবি তাফসির ও হাদিসের বর্ণনায় ‘কাবশ’ বলা হয়েছে। এর ইংরেজি অর্থ ৎধস, সধষব ংযববঢ়। আর দুম্বা মূলত একটি ফার্সি শব্দ। এর অর্থও বিশেষ জাতের ভেড়া। বাংলা অভিধানে বলা হয়েছে : ‘চর্বিযুক্ত মোটা লেজওয়ালা একরকম ভেড়া।’
ইসমাইলের কোরবানির বিষয়টিই যে আরবদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিল, তা-ই নয়, উপরন্তু ইসমাইলের পরিবর্তে যে মেষ বা দুম্বা ইবরাহিম কোরবানি করেছিলেন তার শিং দু’টি রাসূলুল্লাহ (সা
-এর সময় পর্যন্ত মক্কায় কাবাগৃহে সংরক্ষিত ছিল। ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বাল বিশুদ্ধ সনদে উদ্ধৃত করেছেন, কাবাগৃহের মুতাওয়াল্লি পরিবারের শাইবার কন্যা সাফিয়াহ বলেন, আমাদের পরিবারের ধাত্রী মহিলা আমাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা
কাবাগৃহের মুতাওয়াল্লি উসমান ইবনু তালহাকে ডেকে পাঠান। পরে জিজ্ঞাসা করি, তিনি কেন তোমাকে ডাকলেন? উসমান বলেন : রাসূলুল্লাহ (সা
আমাকে বলেন, ‘আমি যখন বাইতুল্লাহর মধ্যে প্রবেশ করি, তখন সেখানে দুম্বার শিং দু’টি দেখতে পাই। তোমাকে শিং দু’টি আবৃত করে রাখতে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। এ জন্য তোমাকে ডেকেছি যে, তুমি শিং দু’টিকে আবৃত করে রাখবে। কারণ মসজিদের মধ্যে এমন কিছু থাকা উচিত নয়, যা সালাত আদায়কারীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।’ হাদিসের বর্ণনাকারী সুফিয়ান ইবনু উআইনা বলেন : শিং দু’টি কাবাগৃহে সংরক্ষিত ছিল। পরে আব্দুল্লাহ ইবনু জুবাইরের সময়ে (৬০-৭০ হি/৬৮০-৬৯০খ্রি) একবার কাবাগৃহে আগুন লাগলে শিং দু’টি পুড়ে যায়। (মুসনাদ আহমদ ৪/৬৮ ও ৫/৩৮০)।
উল্লেখ্য, বাইবেলের বর্ণনা ও ইহুদিদের গল্পকাহিনী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কোনো কোনো মুসলিম মুফাস্সির বলেছেন, ‘ইসহাক’কে কোরবানি করা হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা
-এর নামে প্রচারিত যেকোনো হাদিস গ্রহণের আগে তার বিশুদ্ধতা যাচাই করা সাহাবিদের যুগ থেকে মুসলিম উম্মাহর বৈশিষ্ট্য। নিরীক্ষার মাধ্যমে এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলো পরীক্ষা করে তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, সেগুলো অগ্রহণযোগ্য, দুর্বল বা জাল।
তবে কুরআনের নির্দেশনা এ বিষয়ে সুস্পষ্ট যে, প্রথম পুত্র ইসমাইল আ:-কেই কোরবানি করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। যুক্তি ও মনোবিজ্ঞানও তাই বলে। সত্যিকার পরীক্ষা তো অদ্বিতীয় সন্তানের কোরবানির মধ্যে, দ্বিতীয় সন্তানের কোরবানির মধ্যে নয়।
এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা তাফসিরে ইবন কাসির ও অন্যান্য প্রাচীন তাফসিরে পাঠক দেখতে পারবেন। কিন্তু শান্তিবাদী শান্তিপ্রিয় দেব নারায়ণ মহেশ্বরের মতো এরূপ ব্যাখ্যার কারণে কেউ কাউকে ‘কাফির, জালিম ও ফাসিক’ বলেননি।
জ্ঞানবৃত্তিক গবেষণার ক্ষেত্রে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও পরমত সহিষäুতা মুসলিম সমাজ ও মুসলিম আলিমদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আইন করে মত প্রকাশের স্বাধীনতাহরণ মূলত খ্রিষ্টান দেশগুলোতেই ব্যাপক ছিল। ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট কনস্টানটাইন খ্রিষ্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা দেন। সে দিন থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত খ্রিষ্টান চার্চ, পোপ ও রাষ্ট্রগুলোর ইতিহাস রক্তের ইতিহাস। অধার্মিকতা বা ভপড়পঢ়ী দমনের নামে বা ইনকুইজিশনের (ওষক্ষৎমঢ়ময়মসষ) নামে পরধর্ম অসহিষäুতা, পরমতের প্রতি বিষোদ্গার, অন্য মতাবলম্বীকে হত্যা, নির্যাতন বা জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করা ইউরোপের খ্রিষ্টান দেশগুলোর সুপরিচিত ইতিহাস। ক্যাথলিকরা প্রটেস্টান্টদের বিরুদ্ধে, প্রটেস্টান্টরা ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধে এবং খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের বিরুদ্ধে আইন করে জোরপূর্বক ধর্মান্তর, ধর্মীয় মত প্রকাশ নিষিদ্ধকরণ বা অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন অত্যাচার চাপিয়ে দিয়েছে। এখনো আমরা ‘এন্টিসেমিটিজম’ (অষয়ম-ঝপশময়মঢ়শ) আইনের নামে হলোকাস্টের বিষয়ে গবেষণা ও মত প্রকাশের নিষেধাজ্ঞা এসব দেশে দেখতে পাই। আইন করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, পোশাক পরিধানের স্বাধীনতা বা সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় নির্মাণের স্বাধীনতা হরণের নমুনা আমরা আধুনিক পাশ্চাত্যেও দেখতে পাচ্ছি। তারা সর্বদা তাদের সহনশীলতা, উদারতা, পরমতসহিষতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদ (চলৎড়থলমঢ়শ) নিয়ে গর্ব ও গৌরব করেন। কিন্তু তারপরও এগুলো তাদের মধ্যে বিদ্যমান।
আমরা এশীয় ও ভারতীয়রা এরূপ অদ্ভুত বহুত্ববাদ (চলৎড়থলমঢ়শ) থেকে মুক্ত ছিলাম। আমরা মতের বিপরীতে মত পেতে অভ্যস্ত, মতের বিপরীতে আইন বা লাঠি নয়। কিন্তু মনে হচ্ছে, আমরাও আজকাল পাশ্চাত্য মানসিকতায় আক্রান্ত হয়েছি। বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্ট মহোদয় পাশ্চাত্য শান্তি পিপাসায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে মনে হয়। তাঁর কোনো গবেষণা থাকলে তা পেশ করতে পারেন। কিন্তু অন্য মতের মানুষকে কাফির, জালিম, ফাসিক ইত্যাদি বলে আমাদের মুসলিমদের পরিভাষাগুলোকে কলঙ্কিত করা কিছুতেই উচিত হবে না। অথবা তার মতটিকে আইন করে সবার ওপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় যেন লিপ্ত না হন। মহান আল্লাহ আমাদেরকে শান্তি ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করুন।
©somewhere in net ltd.