| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মহিউদ্দিন হায়দার
শব্দে আমার আশ্রয়, লেখায় আমার মুক্তি। এখানে আমি লিখি, ভেবে দেখি, আর খুঁজি মানুষের মনের গল্প।

সম্মান কোনো জোর করে আদায় বা দাবি করার বস্তু নয়, এটি সোপার্জিত। একজন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে জাতীয় স্তরের নেতা—সবার ক্ষেত্রেই আচার-আচরণ, কথাবার্তা, পরিমিতিবোধ এবং উন্নত রুচির বহিঃপ্রকাশই তার প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এই ন্যূনতম ভদ্রতা ও পরিমিতিবোধটুকুও আজ চরম সংকটে।
আজ থেকে প্রায় আড়াই বছর আগে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে এদেশের সাধারণ মানুষ ও তরুণ সমাজ দীর্ঘ দেড় দশকের একটি একচ্ছত্র শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছিল। আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল 'কোটা সংস্কার' তথা বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র গঠন। সেই সময় রাজপথে ধ্বনিত হওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আবেগপূর্ণ স্লোগানগুলো ছিল—"বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই" কিংবা "মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই"। সাধারণ মানুষ করাতল দিয়ে এই আন্দোলনকে স্বাগত জানিয়েছিল, কারণ তারা একটি সাম্যবাদী, মানবিক এবং আইনানুগ রাষ্ট্র চেয়েছিল।
কিন্তু এক চরম নির্মমতার মধ্য দিয়ে সরকার পতনের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা ফিকে হতে শুরু করে। যে স্লোগানকে ধারণ করে সাধারণ মানুষ আন্দোলনে শরিক হয়েছিল, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর পুরো দৃশ্যরপট যেন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যায়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরমপন্থী, ধর্মান্ধ এবং সুবিধাবাদী গোষ্ঠীগুলোর নগ্ন রূপ উন্মোচিত হতে সময় লাগেনি। এই কথিত আন্দোলনের সবচেয়ে অপ্রকাশিত এবং সুদূরপ্রসারী অন্ধকার দিকটি সরকার পতনের আগে সাধারণ জনগণকে বুঝতেই দেওয়া হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলার অপচেষ্টা:
এই পটপরিবর্তনের সবচেয়ে মারাত্মক ও আত্মঘাতী দিকটি ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এদেশের মানুষের মন থেকে ধুয়ে-মুছে ফেলার এক সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা। স্বাধীনতার সংগ্রামের অমর শহীদদের প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে, পদে পদে অপমান ও অপদস্থ করা হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। একটি স্বাধীন দেশের জন্ম-ইতিহাস এবং তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের এভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ধৃষ্টতা এর আগে কখনো দেখেনি বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা ও জাতীয় প্রতীকগুলোর ওপর সুপরিকল্পিত হামলা চালিয়ে মূলত বাঙালির অস্তিত্বের ওপর আঘাত হানা হয়েছে।
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ওপর আঘাত:
আবহমানকাল ধরে চলে আসা বাংলাদেশের মূল শক্তি ছিল এর অসাম্প্রদায়িক সমাজব্যবস্থা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক সুতোয় গাঁথা এই সমাজকে পায়ে দলিয়ে, মাড়িয়ে এদেশকে একটি চরম সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার মরণকামড় দেওয়া হয়েছে। আমরা দেখেছি হাজার বছরের সুফি ঐতিহ্যের প্রতীক শতবর্ষী মাজার ভাঙচুর করা হয়েছে, এমনকি মৃত মানুষের কবর খুঁড়ে লাশ তুলে অবমাননা করার মতো আদিম ও বর্বর ঘটনাও ঘটেছে। এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, উপাসনালয় এবং ব্যবসার ওপর হামলা ও চাঁদাবাজির ঘটনা এদেশের হাজার বছরের সম্প্রীতির ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে।
গুরুজনদের অবমাননা ও ক্ষমতার দাপট:
একটি সভ্য সমাজের মেরুদণ্ড হলো তার শিক্ষা ব্যবস্থা। অথচ আন্দোলনের তথাকথিত সুফল হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ এবং নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরের পর বছর ধরে সেবা দেওয়া প্রবীণ ও সম্মানিত শিক্ষকদের জোরপূর্বক কান ধরে ওঠবস করানো, গলায় জুতার মালা পরানো এবং জোর খাটানোর মাধ্যমে পদত্যাগে বাধ্য করার এক জঘন্য মহোৎসব চলেছে। অন্যদিকে, পরিবর্তনের বুলি আওড়ানো তথাকথিত নেতারা রাতারাতি লিপ্ত হয়েছে চরম আর্থিক অপরাধে—নামে-বেনামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় বড় করপোরেট হাউজে চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের পুরোনো নোংরা খেলা আবারও শুরু হয়েছে।
ভাষার বিকৃতি এবং 'পাটকেলের' আঘাত:
তথাকথিত এই 'নতুন রাজনীতি'র নামে রাজপথে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক চরম অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ ভাষার প্রচলন করা হয়েছিল। ভিন্নমত বা বিরোধী মতের অনুসারীদের দমাতে যে ধরণের অশ্রাব্য গালিগালাজ এবং নারীদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে নোংরা স্লোগান তারা তৈরি করেছিল, তা সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো মানুষ কল্পনাও করতে পারে না।
কিন্তু প্রতারকের দল ভুলে গিয়েছিল যে, প্রকৃতির একটি নিজস্ব বিচার আছে। ইট মারলে যে পাটকেলটি খেতে হয়—আজ তারা সেই অমোঘ সত্যের মুখোমুখি। সেদিন বিরোধী মতকে স্তব্ধ করতে তারা যে গালি ও মব সংস্কৃতির চাষ করেছিল, আজ তারা নিজেরাই সেই একই গালির শিকার হচ্ছে, একই চক্রে পড়ে আজ তাদের শরীর জ্বলছে।
ডিজিটাল যুগের অকাট্য দলিল এবং জনগণের রায়:
আজকের এই তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যুগে কোনো অপকর্মই আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, লাইভ স্ট্রিমিং এবং ভিডিও ফুটেজের কল্যাণে প্রতিটি শিক্ষককে অপমান, প্রতিটি চাঁদাবাজি, মাজার ভাঙচুর এবং নারীদের নিয়ে দেওয়া প্রতিটি অশ্লীল স্লোগানের অকাট্য প্রমাণ আজ জনগণের হাতে হাতে সংরক্ষিত আছে।
যারা আজ এই সমস্ত অপকর্মের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ মদদদাতা, তারা যখন সমাজে এসে নিজেদের জন্য 'সম্মান' বা 'স্বীকৃতি' দাবি করে, তখন তা এক চরম প্রহসনে রূপ নেয়। সমাজ ও রাষ্ট্রকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়ে কখনো সম্মান আদায় করা যায়下 না। সচেতন সাধারণ জনগণ আজ আর বোকা নয়। তারা মূলধারার গণমাধ্যমে ভয় বা সংকচে মুখ না খুললেও, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে অত্যন্ত তীব্র ভাষায়, নিজস্ব কায়দায় এই ভন্ডামি ও চরমপন্থার যথাযথ জবাব দিচ্ছে। একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও উন্নত রুচির বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের এই মব সংস্কৃতি, দখলদারিত্ব এবং প্রতিহিংসার নোংরা রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।
©somewhere in net ltd.