| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মহিউদ্দিন হায়দার
শব্দে আমার আশ্রয়, লেখায় আমার মুক্তি। এখানে আমি লিখি, ভেবে দেখি, আর খুঁজি মানুষের মনের গল্প।

বুকের অলিন্দ পেরিয়ে প্রত্যেকেরই একটা নিজস্ব সবুজ চত্বর থাকে। একটা শান্ত, থমথমে দিঘি। কিন্তু সেই চত্বরের জানালাটা খুলে ভেতরের মেঘ-রোদ সহজে কেউ কাউকে মেলে দেখায় না। কিছু ব্যথা থাকে একান্তই ব্যক্তিগত, নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে লেপ্টে থাকা। সেখানে একটা চিনচিন করা হাহাকার বহতা নদীর মতো আজীবন স্রোত তোলে। ব্যস্ত নগরীর ভিড়ে, কোনো এক নির্জন মধ্যরাতে মানুষ সেই গোপন নদীটার তীরে গিয়ে বসে, স্মৃতির পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখে। কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কেউ বা আরও গভীর কোনো সিন্দুকে তাকে লুকিয়ে রাখে। সেখানে অন্য কারও প্রবেশাধিকার নিষেধ; বাইরে স্পষ্ট অক্ষরে অদৃশ্য সাইনবোর্ড ঝুলছে—‘অনধিকার প্রবেশ দণ্ডনীয়’।
দূর নক্ষত্রের মতো এই অস্পর্শিত বিষাদের জন্ম হয় কোনো একচিলতে ফ্ল্যাটের বারান্দায়, নিঝুম বিকেলে। কিংবা হঠাৎ নামা ঝুমবৃষ্টিতে উবার বা পাঠাওয়ের কাচে জমা হওয়া বাষ্পে। আবার কখনও এর উৎস হতে পারে কৈশোর পেরোনো প্রথম যৌবনের একতরফা কোনো আকুলতায়। মনের শত জটিলতা আর সামাজিকতার শেকল পেরিয়ে সেই গোপন স্মৃতি কি আজও জনসমক্ষে আসতে পারে? হয়তো পারে, হয়তো পারে না। আর পারলেও তার রূপ হয় ভিন্ন। তেমনই এক ভিন্ন রূপের গল্প এটি।
সেদিন আকাশটা ছিল ম্যাটম্যাটে, সিসার মতো ধূসর মেঘে ঢাকা। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের চিরচেনা যান্ত্রিক কোলাহলের মাঝেও কেমন যেন একটা অলস, মন-খারাপ করা বাতাস বইছিল। সালটা ২০১৮, মাসটা মনে নেই, তবে সময়টা ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের অনার্সের শুরুর দিনগুলোর। সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ এক অদ্ভুত বয়স। হালিশহরের পুরোনো বাড়িটা ছেড়ে তখন আমরা এসে উঠেছি চকবাজারের ওআর নিজাম রোডের এক কোণায়, আধুনিক এক ফ্ল্যাটে। পাহাড়ি খাঁজ আর সাগরের লোনা বাতাস মাখা এই শহরের বুকে ওই নতুন বাড়িটা আমাদের জন্য ছিল এক নতুন অধ্যায়।
সেখানেই প্রথম দেখা। গোলপাহাড় মোড়ের একটা ক্যাফেতে তখন আমরা ক'জন আড্ডা দিচ্ছিলাম। নতুন বন্ধু সায়মন কনুই দিয়ে মৃদু গুঁতো দিয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল, "এই মুরশেদ, দেখ। ওই কোণার উইন্ডো সিটের মেয়েটা কিন্তু তোর দিকেই তাকিয়ে আছে এতক্ষণ ধরে।"
আমি একটু অবাক হলাম। চশমার ফ্রেমটা ঠিক করতে করতে তাকালাম। আমার এই অবাক চাহনির একটা আজব ব্যাখ্যা দিল সায়মন, "আরে বোকা, মেয়েটা তোকে নোটিস করছে। পছন্দ করেছে রে!"
এই ‘পছন্দ’ শব্দটার গভীরতা তখন আমার চটুল বুদ্ধির বাইরে। আমি বোকার মতো শুধালাম, "মানে? ঠিক বুঝলাম না।"
"ধুর, তুই আসলেই আস্ত একটি ব্যাকডেটেড!" সায়মন হেসেই খুন। "ওর নাম শেলী। আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই জুনিয়র। ডিসি হিল বা সিআরবি-তে প্রায়ই দেখিস না?"
নামটা সেদিন বুলেটের মতো বুকে বিঁধেছিল। রাতে পড়ার টেবিলে বসে যখন পি. বি. শেলীর কবিতা পড়ছিলাম, প্রতিবার কবির নাম উচ্চারণে বুকটা ধরাস করে উঠছিল। ‘পারসি বিসি শেলী’ পড়তে গিয়ে বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ক্যাফেটেরিয়ার সেই মায়াবী মুখটা। মনে হচ্ছিল, নামটা জোরে উচ্চারণ করলেই বুঝি চারপাশের মানুষ আমার ভেতরের এই আরক্তিম গোপন জাদুকরি রহস্যটা জেনে ফেলবে।
পরের বছরগুলো কাটল এক অদ্ভুত দোলাচলে। আমাদের সেই আড্ডায়, সিআরবি-র শিরীষতলায় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনের বগিতে বন্ধুরা প্রায়ই দুষ্টুমি করে আমাকে আর শেলীকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিত। এক ধরণের অলিখিত খেলায় আমরা মেতে উঠতাম। ও যখন খিলখিল করে হাসতে হাসতে শাটলের ভিড়ে আমার পাশ কাটিয়ে চলে যেত, আমাদের হাত কিংবা কাঁধের মৃদু স্পর্শে চারপাশের বাতাস যেন জমে যেত। তখন হয়তো কোনো টুংটাং সুর বাজত না, কিন্তু রাত গভীর হলে, চারপাশ নিঝুম হলে সেই আলতো স্পর্শটা অবিকল ফিরে আসত।
সময়ের চাকা ঘুরতে লাগল দ্রুত। শেলীর সেই চপল তরুণী রূপটা বদলে যাচ্ছিল। ওর মধ্যবিত্ত পরিবারে রক্ষণশীলতার দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে শক্ত হচ্ছিল। সিআরবি-র আড্ডায় ওর আসা বন্ধ হলো, ডিপার্টমেন্টের করিডোরেও ও এখন অন্য মেয়েদের দলের ভিড়ে আড়ালে থাকে। আমার কি ওকে দেখার তৃষ্ণা হতো? হয়তো হতো। বন্ধুরা যখন দল বেঁধে ওর বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে বাইক নিয়ে হর্ন বাজিয়ে যেত, আমি দূর থেকে দেখতাম—গোধূলির আলোয় জানালার ভারী পর্দাটা সামান্য দুলে উঠছে। বুঝতাম, পর্দার ওপারে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। আমার বুকের ভেতর তখন দামামা বাজত। নিজের হৃদপিণ্ড যে এত জোরে শব্দ করতে পারে, তা আগে জানা ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট শেষ হওয়ার মুখে চারপাশের পৃথিবীটা বদলে গেল। এক পারিবারিক কারণে আমাদের আবারও বাসা বদলাতে হলো। খুলশীর এক শান্ত গলির ছোট ফ্ল্যাটে এসে উঠলাম আমরা। ২০১৮-এর শেষের দিকের এক তপ্ত দুপুর। জানালার বাইরে শুকনো পাতাগুলো ঘূর্ণি খেয়ে নাচছে।
হঠাৎ একদিন আমাদের সেই ছোট ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে ও এসে হাজির। আমার বোনের সঙ্গে মাস্টার্সের একটা প্রজেক্টের নোট নিতে এসেছে। বইপত্রে ঠাসা, পুরোনো কাগজের গন্ধময় ঘরটায় কত বছর পর আমরা মুখোমুখি! তীব্র এক বিহ্বলতায় আমি ঘরের দেয়ালের সঙ্গে প্রায় সেঁটে গেলাম।
শেলী এখন আর সেই সালোয়ার-কামিজ পরা চঞ্চলা মেয়েটি নেই। ওর অবয়বে এখন এক পরিপূর্ণ নারীর স্নিগ্ধতা, শাড়ির আঁচলটা কাঁধে জড়ানো। সলজ্জ সংকোচে ওড়নাটা একটু টেনে নিল ও। ওর শরীর থেকে ভেসে আসা এক অপরিচিত, মিষ্টি সুবাস পুরো ঘরটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। চার চোখে চকমকি ঠুকে এক পশলা বিদ্যুৎ খেলে গেল যেন। মুহূর্তের মধ্যে শেলীর ফর্সা মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠল।
আমার মন চাইছিল জিজ্ঞেস করি—‘কেমন আছো?’ কিন্তু এক অদৃশ্য আড়ষ্টতা আমাদের দুজনকে পাথর করে রেখেছিল। শ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড়।
অবশেষে নীরবতা ভাঙল শেলীই। অত্যন্ত মৃদু, কবিতার মতো শোনাল ওর কণ্ঠস্বর, "ভালো আছো? শুনলাম কদিন আগে তোমার ডেঙ্গু হয়েছিল? এখন শরীর কেমন?"
ওর গলার গভীর মমতা আমাকে আরও আড়ষ্ট করে দিল। কোনোমতে বললাম, "হ্যাঁ, এখন ভালো।"
আর কিছু বলা হলো না। আমার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছিল। বুকের ভেতরের ধকধক শব্দটা ও শুনে ফেলবে—এই ভয়ে আমি একরকম পালিয়েই অন্য ঘরে চলে গেলাম। কী অদ্ভুত! যে মেয়েটির সঙ্গে এত সহজ বন্ধুত্ব ছিল, সময়ের চোরাবালিতে আজ আমরা এমন দুটি ভিন্ন স্রোতে দাঁড়িয়ে, যেখানে পরস্পর স্বাভাবিক কথা বলাটাও যেন অলঙ্ঘনীয় কোনো পাপ।
এর কিছুদিন পরই, অত্যন্ত নীরবে একদিন শুনলাম—শেলীর বিয়ে হয়ে গেছে। ও কি শুধুই আমার বন্ধু ছিল? নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু? নিজের ভেতরের আমিটাকে প্রশ্ন করেও কোনো উত্তর পাইনি সেদিন।
কৈশোর আর প্রথম যৌবনের সেই সোনালি দিনগুলো পেরিয়ে আরও বেশ কিছু সময় কেটে গেছে। বছরটা ২০২১, একুশে ফেব্রুয়ারি। বসন্ত এলেও চট্টগ্রামের সাগরের ঠান্ডা বাতাস মিশে আছে রাতের আমেজে। থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম (TIC) প্রাঙ্গণে এক বিশাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন। সন্ধ্যার হালকা কুয়াশায় নিয়ন আলোর নিচে শত শত মানুষ ফরাসে বসে আছে।
মঞ্চে তখন গুণীজনদের বক্তৃতা শেষ হলো। হঠাৎ মাইকে জলদগম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করা হলো: *"এবারে ছোটগল্পে প্রথম পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে আমাদের সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ কথাসাহিত্যিক সাকলাইন মুরশেদকে।"
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। করতালি আর করতালিতে চারপাশ মুখরিত। বন্ধুরা আমাকে ঠেলে মঞ্চে তুলে দিল। পুরস্কারটা হাতে নিয়ে যখন দর্শকদের দিকে মুখ করে দাঁড়ালাম, চাদরটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে আমার চোখ চলে গেল পেছনের সারির ভিড়ের দিকে।
শত শত মানুষের ভিড়ে, ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে হাততালি দিচ্ছে মেরুন রঙের সিল্কের শাড়ি আর জমকালো শাল জড়ানো এক অপূর্ব রূপসী নারী। নিয়ন আলোয় ওর মুখটা উদ্ভাসিত। আমার বুকের ভেতর এক তীব্র ভূমিকম্প হয়ে গেল।
শেলী! এ তো আমার সেই শেলী!
ওর পাশে স্যুট পরা এক মার্জিত ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে হাসছেন। নিশ্চয়ই ওর স্বামী। বেশ মানিয়েছে দুজনকে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুহূর্তের জন্য আমার চোখ স্থির হয়ে গেল শেলীর চোখের ওপর। নিয়ন আলোয় ওর চোখের কোণায় এক ফোঁটা অশ্রুর চকমকি আমার চোখ এড়াল না। ওর সেই আনন্দাশ্রু যেন আমাকে এক অপার্থিব উষ্ণতায় আলিঙ্গন করল।
চারপাশের কোলাহল, আলো, মানুষ—সবকিছু যেন মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। স্মৃতিগুলো অণু-পরমাণুতে ভেঙে একাকার হয়ে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে গেল সেই ফেলে আসা দিনগুলোয়, যেখানে কোনো সামাজিকতার দেয়াল ছিল না, শাটল ট্রেনের সেই চঞ্চলতা ছিল, কোনো আড়ষ্টতা ছিল না।
আমি মঞ্চে দাঁড়িয়ে আলতো করে মাথা ঝুঁকিয়ে ওকেই নীরবে বোঝালাম—*আমি তোমার চোখের ভাষা বুঝেছি, শেলী। আমি তোমাকে দেখেছি। আর জেনো, আমার জীবনের প্রথম এই সাহিত্য পুরস্কার, আজ মনে মনে আমি তোমাকেই উৎসর্গ করলাম।*
প্রিয় পাঠক, বিশ্বাস করুন, সেই দূর থেকে চোখের দেখাটা কোনো কল্পনা ছিল না। ওটা সত্যি ছিল। জীবনের ব্যস্ততম চৌরাস্তায় দাঁড়িয়েও অলিন্দের ওপারে থাকা সেই শান্ত দিঘিটা সেদিন মুহূর্তের জন্য হলেও আবার জেগে উঠেছিল।
©somewhere in net ltd.