| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মোস্তফা কামাল পলাশ
"সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে"
বেশিরভাগ মানুষ বিজ্ঞানীদের জীবনের সাফল্যটাই দেখে; কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনে কত বছরের শ্রম, ত্যাগ আর ব্যক্তিগত জীবনের কত কিছু বিসর্জন দিতে হয়েছে, সেই গল্পটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের অজানা থেকে যায়।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী Karl Deisseroth ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। Peter Hegemann ও Georg Nagel-এর সঙ্গে তিনি optogenetics নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার পেয়েছেন।
একজন সফল বিজ্ঞানীর জীবনের দিকে তাকালে আমরা নোবেল পুরস্কার, যুগান্তকারী আবিষ্কার কিংবা বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি দেখি। কিন্তু এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে যে হাজার হাজার ঘণ্টার পরিশ্রম রয়েছে, সেটি সাধারণত আমাদের চোখে পড়ে না।
হয়তো ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও একজন নিবেদিত গবেষক তার সন্তানদের বেড়ে ওঠার অনেক আনন্দঘন মুহূর্তে উপস্থিত থাকতে পারেন না। কখনো গবেষণা সম্মেলনে অংশ নিতে হয়, কখনো গবেষণার জন্য গ্রান্ট প্রপোজাল লিখতে হয়, কখনো নিজের ছাত্রছাত্রীদের গবেষণাপত্রের চূড়ান্ত খসড়া দেখতে হয়, আবার কখনো অন্য গবেষকের গবেষণাপত্র পিয়ার রিভিউ করতে হয়। এর সঙ্গে নিজের গবেষণাগারে বছরের পর বছর গবেষণা চালিয়ে যাওয়া, ব্যর্থ পরীক্ষা আবার নতুন করে শুরু করা, গবেষণাপত্র লেখা এবং শিক্ষার্থীদের পড়ানো তো আছেই। সব মিলিয়ে একজন প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী তার কর্মজীবনে গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার পেছনে জীবনের হাজার হাজার ঘণ্টা ব্যয় করেন।
অথচ এই মেধাবী মানুষদের অনেকেই চাইলে অন্য কোনো পেশায় গিয়ে হয়তো অনেক বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারতেন, পরিবারের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটাতে পারতেন কিংবা তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা, নতুন কিছু জানার আকাঙ্ক্ষা এবং মানবজাতির জ্ঞানকে সামান্য হলেও এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন তাদের অন্য একটি জীবন বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
বছর শেষে বিজ্ঞানের মাত্র কয়েকটি ক্ষেত্রের হাতে গোনা কয়েকজন গবেষক নোবেল পুরস্কারের মতো সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পান। অথচ পৃথিবীর হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারে লক্ষ লক্ষ বিজ্ঞানী প্রতিদিন একই ধরনের নিষ্ঠা ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন। তাদের অধিকাংশই হয়তো কোনো দিন নোবেল পুরস্কার পাবেন না, বিশ্বজুড়ে তাদের নামও পরিচিত হবে না। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় তাদের অবদানও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে আরও একটি বিষয় প্রায়ই দেখা যায়, যে আবিষ্কারের জন্য একজন বিজ্ঞানী পুরস্কারটি পান, সেই আবিষ্কারের বহু বছর বা কয়েক দশক পরে তার স্বীকৃতি আসে। ফলে অনেক বিজ্ঞানী কর্মজীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে যাওয়ার পর এই সম্মান পান। সেই বিবেচনায় Karl Deisseroth-কে কিছুটা সৌভাগ্যবানই বলা যায়। নিজের গবেষণার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এই অসাধারণ মুহূর্ত তিনি এমন এক সময়ে উপভোগ করতে পারছেন, যখন তার পরিবারও সেই আনন্দের অংশ হতে পারছে।
এই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি আমার কাছে অন্য জায়গায়।
নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবর জানার পর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দিনটি বদলে গিয়েছিল। সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার, ফোনকল আর অভিনন্দনের মধ্যে দিয়ে কাটছিল সময়। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও তিনি বিরতি নিয়েছিলেন নিজের সন্তানদের স্কুলের জন্য দুপুরের খাবার তৈরি করতে। একজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী, যিনি সেদিন পৃথিবীর বিজ্ঞানজগতের অন্যতম আলোচিত মানুষ, সেই একই দিনে আবার একজন সাধারণ বাবার মতো নিজের সন্তানদের স্কুলের খাবার তৈরি করছেন, এই দৃশ্যটি আমার কাছে অসাধারণ সুন্দর। হয়তো এটাই একজন বিজ্ঞানীর জীবনের আরেকটি দিক। গবেষণাগারে তিনি বিশ্বকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন, আবার বাড়িতে ফিরে তিনি একজন বাবা।
Karl Deisseroth-এর স্ত্রী Michelle Monje-Deisseroth নিজেও Stanford Medicine-এর একজন অধ্যাপক, চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী। অর্থাৎ, এই পরিবারের সন্তানরা এমন একটি পরিবেশে বেড়ে উঠছে যেখানে বাবা ও মা দুজনের জীবনই বিজ্ঞান, গবেষণা, রোগী এবং শিক্ষার্থীদের ঘিরে। একজন বাবার জীবনের এত বছরের গবেষণা, পরিশ্রম ও ত্যাগের এমন একটি স্বীকৃতি তার সন্তানদের জীবনেও নিশ্চয়ই গভীর ছাপ রেখে যাবে।
আজ তারা শুধু একজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর সন্তান হিসেবে বাবাকে উদযাপন করছে না; হয়তো তারা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে, তাদের বাবার জীবনের অসংখ্য ব্যস্ত দিন, দীর্ঘ রাত এবং বিজ্ঞানের পেছনে ব্যয় করা হাজার হাজার ঘণ্টার মূল্য কতটা।
আর আমার কাছে এই গল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো:
একজন বিজ্ঞানীর নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মুহূর্তটি আমরা একদিনে দেখি; কিন্তু সেই একদিনের পেছনে থাকে কয়েক দশকের অদৃশ্য পরিশ্রম, ব্যর্থতা, অধ্যবসায় এবং ব্যক্তিগত ত্যাগ। আর পৃথিবীর অসংখ্য বিজ্ঞানী কোনো দিন নোবেল পুরস্কার না পেলেও, বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার পেছনে তাঁদের ত্যাগের গল্পটাও প্রায় একই।
২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার জন্য অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী Karl Deisseroth, Peter Hegemann ও Georg Nagel কে অভিনন্দন রইল।
ছবি কৃতজ্ঞতা: পোষ্টের ছবিগুলো স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত।
©somewhere in net ltd.
১|
০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৪৯
মুনতাসির বলেছেন: ভাল লাগলো যে আপনি লিখেছেন।