নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

শেরপা

দেখতে চাই ধরনী

মুনতাসির

আমি পাহাড়ে চড়ি,সাগরে ডুবি, পৃথিবী আমার প্রেম

মুনতাসির › বিস্তারিত পোস্টঃ

‘Why you come here?’ সুবিধামতো পরিচয়ের প্রবাসী

১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৬

কারো সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে। প্রতিবাদ করার অধিকারও আছে। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা দিয়েই বোঝা যায় প্রতিবাদকারী কে। “Why you come here?” বা “I fuck your country system” কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এগুলো এক ধরনের দীনতার স্বীকারোক্তি, যা টাকা দিয়ে ঢাকা যায় না।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন নিউ ইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে নামলেন, তখন সেখানে জড়ো হওয়া কয়েকজন বাংলাদেশি আমেরিকান এই বাক্যটি ছুড়ে দিয়েছিলেন। দৃশ্যটি দেখে আমার মনে পড়ল আরেকটি বাক্য, যা ২০২০ সালের মার্চে গোটা দেশে ভাইরাল হয়েছিল।
কোভিডের শুরুতে ইতালি থেকে ফেরা কিছু যাত্রীকে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কোয়ারেন্টিনে নেওয়া হচ্ছিল। তখন একজন চিৎকার করে বলেছিলেন, “I fuck your country system।”

দুটি বাক্যের কোনোটিই শুদ্ধ ইংরেজি নয়। কিন্তু ব্যাকরণ এখানে মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো, এই বাক্যগুলোর পেছনে যে মানসিকতা কাজ করে, সেটা কী?

চল্লিশ বছরের আমেরিকা, এক লাইনের ইংরেজি

নিউ ইয়র্কে এমন বাংলাদেশির সংখ্যা কম নয়, যারা চার-পাঁচ দশক ধরে আমেরিকায় আছেন। পাসপোর্ট আমেরিকার, সন্তানেরা সেখানেই জন্মেছে। তবু তাদের অনেকের ইংরেজি ওই এক লাইনেই আটকে আছে। কাজ চালানোর মতো বলতে পারেন, কিন্তু ভাষাটা কখনো নিজের হয়ে ওঠেনি।
প্রায় কুড়ি বছর আগে আমি এক বন্ধুর খালুর বাড়িতে কিছুদিন ছিলাম। ভদ্রলোক তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর ধরে নিউ ইয়র্কে ইয়েলো ক্যাব চালিয়েছেন। ততদিনে তার নিজের কয়েকটি ট্যাক্সি, আর জ্যাকসন হাইটসের আশেপাশে কয়েকটি বাড়ি। সেই সময়েই সেখানে একেকটি বাড়ির দাম মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
অথচ তিনি কথা বলতেন ঠিক এভাবেই: “Why you come here?” টাকা তাকে বাড়ি দিয়েছে, গাড়ি দিয়েছে। ভাষা দেয়নি, দেয়ার কথাও ছিল না। কারণ ভাষা কেনা যায় না, অর্জন করতে হয়।

টাকা আর রুচি এক জিনিস নয়

আমার এক বন্ধুর বাবা বহু বছর আগে ডিভি লটারি জিতে আমেরিকা গিয়েছিলেন। দেশে কৃষিকাজ করতেন, নিউ ইয়র্কে গিয়ে খাবারের ফুড কার্ট নিয়ে বসলেন। আজ তাদের পুরো পরিবার আমেরিকায়। ফুড কার্টের ব্যবসা খুবই লাভজনক।
ঢাকার ফুটপাতের হকার আর নিউ ইয়র্কের ফুড ভেন্ডরের মধ্যে তফাত কেবল নিয়মে। সেখানে নির্দিষ্ট জায়গায়, নির্দিষ্ট সময়ে, নিবন্ধিত ভেন্ডররাই বসতে পারেন। কিন্তু দুটোই আসলে স্ট্রিট ভেন্ডিং।
আমি জানি, কথাগুলো অনেকের গায়ে লাগবে। তাই পরিষ্কার করে বলি: ট্যাক্সি চালানো বা ফেরি করা সৎ পরিশ্রম, এতে লজ্জার কিছু নেই। আমার আপত্তি পেশা নিয়ে নয়। আপত্তি সেই মানুষটিকে নিয়ে, যিনি মনে করেন ডলারের জোরে তিনি দেশের মানুষের চেয়ে উঁচুতে উঠে গেছেন।

তবে নিজেদের দিকেও আঙুল তুলতে হয়। বাংলাদেশে আমাদের কজনের এমন বন্ধু আছেন, যিনি ফেরি করেন বা ফুটপাতে হকারি করেন? শ্রেণিবিভাজন আমাদের সমাজে যেমন আছে, প্রবাসে তা আরও প্রকট।
নিউ ইয়র্কে এই মানুষদের টাকা আছে, কিন্তু হোয়াইট কলার বাংলাদেশিদের সঙ্গে তাদের ওঠাবসা খুবই কম। আমি নিজে কখনো আমার হোয়াইট কলার বন্ধুদের ব্লু কলার বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে দেখিনি। দুই দল একই শহরে থাকে, একই ভাষায় কথা বলে, তবু দুটি আলাদা জগতে বাস করে।
তাই এরা নিজেদের জগৎ নিজেরাই গড়ে নেন। সভা-সমিতি, জেলাভিত্তিক সংগঠন, আর বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির প্রবাসী শাখা। আমার মনে হয়েছে, এর বড় কারণ আমেরিকান সমাজে তাদের সামাজিক পরিচিতি বা স্বীকৃতি কম। মূলধারায় যে সম্মান মেলে না, তা মেলে সমিতির পদে, দলের ব্যানারে, বিমানবন্দরের ভিড়ে। ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু প্রবণতাটা চোখে পড়ার মতো।
এই অর্থে “Why you come here?” শুধু ঔদ্ধত্য নয়, এক ধরনের স্বীকৃতির খোঁজও। আর সেই খোঁজের দায় শুধু তাদের একার নয়, যে শ্রেণিবিভাজন তাদের আলাদা করে রেখেছে, তাতে আমাদেরও ভাগ আছে।

সুবিধামতো পরিচয়

এখানেই আসল কথা। আমাদের অনেকে আমেরিকায় গিয়ে সুবিধামতো বাংলাদেশি সাজেন, আবার দেশে ফিরে নিজেকে আমেরিকান দাবি করেন। পরিচয় তাদের কাছে পোশাকের মতো, প্রয়োজন বুঝে বদলে নেওয়া যায়। আবার তিনি তার আমেরিকান পাসপোর্ট এ বাংলাদেশ এর গ্রাতিস ভিসা করে নিয়ে আসেন যেন ১০০ ডলার দিতে না হয়। অদ্ভুত না?
ইতালিফেরত সেই ভদ্রলোককেই দেখুন। নিজের দেশের বিমানবন্দরে নেমে তিনি নিজেকে বাংলাদেশি ভাবেননি। “your country” বলে দেশটাকে তিনি ঠেলে দিলেন অন্যের দিকে, যেন তিনি বাইরের কেউ, এখানকার নিয়ম তার জন্য নয়।
জেএফকেতে যারা চিৎকার করলেন, তারাও একই কাজ করলেন উল্টো দিক থেকে। আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে তারা দেশের রাজনীতির দলীয় লড়াই চালাচ্ছেন। অথচ সেই দেশের সমস্যা তাদের রোজকার জীবনে আর বহন করতে হয় না।
দুই ক্ষেত্রেই দেশটা তাদের কাছে দায়িত্ব নয়, প্রদর্শনের মঞ্চ।

দূর থেকে দেশপ্রেম

আমরা নানা পথে দেশ ছাড়ি। কেউ স্টুডেন্ট ভিসায়, কেউ ডিভি লটারিতে, কেউ দালালের হাতে জীবন বাজি রেখে সাগর বা জঙ্গল পেরিয়ে। দেশ ছাড়ার কারণগুলো বেশির ভাগ সময়ই বাস্তব: কাজ নেই, নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যৎ নেই। দেশ ছাড়াটা অপরাধ নয়।
কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। দেশ যত দূরে যায়, দেশপ্রেম তত জোরালো হয়। যিনি যেভাবেই বেরিয়ে থাকুন, বিদেশে গিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের সবচেয়ে বড় অভিভাবক। পতাকা হাতে সমাবেশ, ফেসবুক লাইভে স্লোগান, দলের হয়ে বিমানবন্দরে পাহারা।

রাজনীতিবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন এর নাম দিয়েছিলেন “দূরবর্তী জাতীয়তাবাদ”। এমন দেশপ্রেমে খরচ নেই, ঝুঁকিও নেই। আপনি যে রাজনীতির পক্ষে গলা ফাটাচ্ছেন, তার ফল ভোগ করতে হবে দেশে থাকা মানুষকে, আপনাকে নয়।

আরও তীক্ষ্ণ একটি বৈপরীত্যও আছে। কেউ কেউ বিদেশে আশ্রয় চেয়েছেন এই বলে যে বাংলাদেশে তাদের জীবন নিরাপদ নয়। কয়েক বছর পর সেই মানুষটিই প্রবাসে দেশপ্রেমের সবচেয়ে উঁচু গলা। সত্যিকারের নিপীড়নের শিকার মানুষ অবশ্যই আছেন, তাদের সুরক্ষা প্রাপ্য। কিন্তু যিনি দেশকে শুধু টিকিট হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তার মুখে দেশপ্রেমের ভাষণ মানায় না।

দেশপ্রেম মাপার পরীক্ষা তাহলে কী? স্লোগান নয়। দেশে টাকা পাঠানো হচ্ছে বৈধ পথে, নাকি হুন্ডিতে? সন্তান বাংলা বলতে পারে কি না? ছুটিতে দেশে এসে আপনি দেশের নিয়ম মানেন, নাকি “your country system” বলে উড়িয়ে দেন? এই প্রশ্নগুলো শুধু অন্যদের জন্য নয়। আমরা যারা কোনো না কোনো সময় দেশের বাইরে থেকেছি, প্রশ্নগুলো আমাদেরও নিজেদের করতে হবে।

যে নিয়ম অন্যের বেলায় মানতে হয়, নিজেদের ভেতরে তা ভাঙা স্বাভাবিক। ঠিক যেমন বিমানবন্দরে নেমে দেশের নিয়ম ভাঙা স্বাভাবিক মনে হয়েছিল ইতালিফেরত সেই ভদ্রলোকের কাছে।

শেষ কথা

এই লেখা সব প্রবাসীকে নিয়ে নয়। বহু প্রবাসী বাংলাদেশি নীরবে পরিশ্রম করেন, দেশে টাকা পাঠান, দুই দেশকেই সম্মান করেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সেই এ দেশের অর্থনীতি বহুবার টিকে থেকেছে।

লেখাটা তাদের নিয়ে, যারা বিদেশের পাসপোর্টকে শ্রেষ্ঠত্বের সনদ ভাবেন। যারা দুই দেশের সুবিধা নেন, কিন্তু কোনোটির দায় নেন না। আর যারা দেশের প্রতিনিধিকে বিদেশের মাটিতে অপমান করাকে রাজনীতি মনে করেন।

কারো সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে। প্রতিবাদ করার অধিকারও আছে। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা দিয়েই বোঝা যায় প্রতিবাদকারী কে। “Why you come here?” বা “I fuck your country system” কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এগুলো এক ধরনের দীনতার স্বীকারোক্তি, যা টাকা দিয়ে ঢাকা যায় না।

মন্তব্য ৩ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৩) মন্তব্য লিখুন

১| ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:২৭

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: প্রতিবাদ করার অধিকারও আছে।
......................................................................................
তার চেয়ে বড় কথা ১২০০ শিশু হত্যার বিচার চাইতে বাধা কোথায়?
চোরা না শুনে ধর্মর কথা , কিন্ত আইন একদিন এর বিচার করবেই
মানুষ যখন ক্ষোভে ফেটে পড়ে , তখন আপনার এই যুক্তি বাহুল্যমাত্র ।

১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৩৮

মুনতাসির বলেছেন: কোনোই অসুবিধা নাই :)

২| ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৩৫

কামাল১৮ বলেছেন: পড়লাম।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.