নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

এস আমিরুল ইসলাম

এস আমিরুল ইসলাম › বিস্তারিত পোস্টঃ

ফররুখ আহমদের কবিতা ও মানবতাবাদ

১৮ ই জুন, ২০১০ রাত ৩:১১

ফররুখ আহমদের কবিতা ও মানবতাবাদ

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ



মানুষের জন্যই কবিতা। তাই কবি ও কাব্যচরিত্র মানবতাবাদী হওয়াই যুক্তিযুক্ত। মানব কল্যাণের জন্য যিনি চিন্তা করেন কিংবা যিনি মানুষের জন্য তিনিই মুলত মানবতাবাদী। এর দুটি ধারা লক্ষ্যনীয়। একশ্রেণীর মানবতাবাদে এমন কিছু প্রচলিত ধারণা বা বিশ্বাসের উদ্ভাবন ঘটে, যা সমাজের দৈনন্দিন নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজনের উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মানুষের সমস্যা সমাধানে স্রষ্টার উপর বিশ্বাস ও আস্থাশীল থাকার চেয়ে তারা অধিকতর যুক্তিনির্ভর মুক্ত পথের সন্ধানে প্রয়াসী হয়। সে সূত্র ধরেই রাশিয়ান সাহিত্যিক লিউ টলষ্টয় ও বাংলার কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যসহ অসংখ্য কবি সাহিত্যিক এ ধারায় মানবতার গান গেয়ে এগিয়ে গেছেন। পক্ষান্তরে অনেকে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার প্রয়াসে মানুষের কল্যাণে শ্বাশ্বত মুক্তির পথ রচনা করার মধ্যদিয়ে মানবতাবাদের জয়গান গেয়ে চলেছেন; কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন এধারারই মানবতাবাদী কবিপুরুষ। তিনি ইসলামের সুমহান আদর্শ অবলম্বনে রসূল (স.) প্রদর্শিত মানবতাবাদকে বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে মানবতাকে সরাসরি স্পর্শ করেছেন। রাসূলের (স.) মানবতাবাদ অন্য সব দার্শনিকনীতির চেয়ে সন্দেহাতীতভাবে উন্নততর। মূলত তাঁর মানবতা হলো বিশ্বমানবের ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারোলৌকিক মুক্তির জন্যে। তাই কবি ফররুখ আহমদ মানবতাবাদী মহাপুরূষ হিসেবে তাঁকেই গ্রহণ করেছেন।



বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকের শেষভাগে মূলত কবি ফররুখ আহমদের কাব্যবিকাশের সূচনা এবং পূর্ণ বিকাশ ঘটে চল্লিশের দশকে। এ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকালে শহীদ মীর নেসার আলী তীতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ প্রমূখের স্বাধীকার আন্দোলনের সাথে সাথে বালাকোটের রক্তাক্ত ময়দান যেমন চোখে ভাসে তেমনি সৈয়দ আমীর আলী, নবাব আব্দুল লতীফ, মুনসী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ, মাওলানা মুনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজীসহ ঐতিহ্যসচেতন মানবতাবাদী ব্যক্তিদের প্রয়াসে কোলকাতার মোহামেডান লিটারেরী সোসাইটি, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি ও ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজ মানবতার মুক্তির নিশানে অগ্রসর। অন্যদিকে মার্কস, ফ্রয়েড, ইয়েটস, এলিয়ট, বোদলেয়ার প্রমূখ ইউরোপীয় চিন্তাবিদ ও কবি সাহিত্যিকের বিভিন্নমুখী চিন্তা, ভাব বিষয় ও আঙ্গিক চেতনার ঢেউ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এ প্রেক্ষাপটে বিদগ্ধ মানুষকে যেমন হতাশ ও ম্রিয়মান করে তুলেছিল তেমনি আশাপ্রদ ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দ্বারাও উন্মোচিত হচ্ছিল। এসব রাজনৈতিক জটিলতা, নৈরাশ্য ও সম্ভাবনার লুকোচুরি এবং ঘাত প্রতিঘাতের বিচিত্রময় বাতাস সাহিত্যের আকাশেও ব্যাপকভাবে প্রবাহিত হয়েছিল। এমন সন্ধিক্ষণে যারা বুদ্ধিবৃত্তি ও সাহিত্য চর্চা করতে চেয়েছেন তাদেরকে এসব ধারার কোন একটাতে গা ভাসাতেই হয়েছে। বাংলা সাহিত্যেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।



ফররুখ আহমদ আপাদমস্তক একজন মানবতাবাদী কবি। তাঁর জীবনেও কালের বাতাস আচঁড়ে পড়েছে। বঞ্চিত মানবতার কল্যাণের জন্য তিনি মার্কসবাদ ও এম. এন. রায়ের মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রাথমিকভাবে কমিউনিজমের দিকে পা বাড়ান। কিন্তু তিনি যখন বুঝতে সক্ষম হলেন যে, কমিউনিজম যে সাম্যবাদের মন্ত্র শোনাচ্ছে ইসলামের সাম্যবাদ তার চেয়ে উন্নততর; ইসলামে আত্মার যে খাদ্য আছে তা কমিউনিজমে নেই। তাছাড়া সব দিক দিয়ে নির্যাতিত ও বঞ্চিত শ্রেণীই ছিলো মুসলমান। তাদের কল্যাণের জন্য রাসূল (স.) প্রদশিত মানবতাবাদই শ্রেয়। তিনি গভীরভাবে লক্ষ্য করেন যে, পরদেশী বৃটিশের শাসন ও শোষণ মুসলমানদেরকে পৃথক ও শত্রুজাতি বিবেচনা করে হিন্দুদের আত্মকেন্দ্রিক উচ্চাকাংখায় জেগে ওঠা নীতির বঞ্চনা এবং হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধনিক ও স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর শোষণের কষাঘাতে মুসলিম সমাজের কন্ঠ রোধ করেছে। মুসলিম সমাজ সেই ভয়াবহ ছোবল থেকে অব্যাহতি পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। এ প্রেক্ষিতে তিনি বৃটিশ বিরোধী মুজাহিদদের রক্তাক্ত ময়দান, হযরত শাহসুফী আবুবকর সিদ্দিকীর তাসাউফী অন্তর, মুনসী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ ও ইসমাইল হোসেন শিরাজীর প্রতিবাদীকণ্ঠ এবং মহাকবি ইকবাল ও কাজী নজরুল ইসলামের মানবতাবাদী বিদ্রোহী চেতনাকে অবলম্বন করে সামনে অগ্রসর হন। আদর্শবাদীতা, রোমান্টিসিজম এবং মেধা ও মননের প্রখরতায় নির্মিত তীক্ষ্ম কাব্যশক্তিকে তিনি মানবতার জন্য উৎস্বর্গ করেছিলেন। তাইতো তাঁর সাহসী উচ্চারণ



জীবন আমার করে যেন / দুঃস্থ জনে সমর্থন

দুঃখি এবং বৃদ্ধ জয়ীফ / যেন আমার হয় আপন।



মানুষকে খুব আপন করে দেখতেন ফররুখ। পোশাক পরিচ্ছদ খাওয়া দাওয়া চলাফেরা এমনকি চিন্তার দিক থেকেও তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের সাথে একাত্ম করে ফেলতেন। সকল মতাদর্শের কবিবন্ধুদের সাথেই ছিল তার সখ্যতা। সকল মানুষকেই তিনি সম্মান করতেন, শ্রদ্ধা করতেন, এমনকি যথাসাথ্য সাহায্যও করতেন। কিন্তু নিজে যেমন সাহায্য নেয়াটা পছন্দ করতেন না তেমনি নিজেকে সাহায্যকারী হিসেবে গর্বিতও মনে করতেন না। তিনি সমস্ত মানুষকে আত্মার আত্মীয় বলে মনে করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন ‘মানুষকে জন্মাতে হয় বলেই ভিন্ন ভিন্ন মায়ের পেটে জন্মে। কেউ কাউকে পর ভাবা ঠিক নয়। যাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক তারা রক্তীয়, আর যাদের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক- আত্মার সম্পর্ক তারাই আত্মীয়, পরম আত্মীয়। তিনি সকল মানুষের সাথেই একাত্ম হয়েছিলেন বটে, কিন্তু আদর্শকে বিকিয়ে দিয়ে নয়। মাখানো ময়দার মধ্য থেকে চুলকে যেভাবে বের করা হয়, ঠিক সেভাবেই তিনি ঐ সমাজ থেকে নিজের আদর্শকে পংকিলতা মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।



বিংশ শতাব্দীর কুড়ির দশকে কবি কাজী নজরুল ইসলাম মানবতার জয় জয়কারের যে সঙ্গীতের দ্বার উন্মোচন করলেন কবি ফররুখ আহমদ সে ধারাকে চল্লিশের দশকে আরো বেগবান করেন। সে সময় কবিতা, গান, খেলাধুলা রাজনীতিসহ বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছিল এক নবজাগরণের উচ্ছলতা। কবি ফররুখ সে উচ্ছলতায় গতিময়তা সঞ্চার করতে নির্যাতিতদের পক্ষে লড়াই করেছেন। নজরুল যখন ঘোষণা করলেন-



প্রার্থনা করো, যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস

যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ।



তখন ফররুখ আহমদ তাঁর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা.) এর যোগ্য আনুসারীদের ডেকে কাফেলাকে সমৃদ্ধ করে শোষকের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেন। তিনি উচ্চারণ করেন-



আজকে উমর পন্থী পথীর দিকে দিকে প্রয়োজন

পিঠে বোঝা নিয়ে পাড়ী দেবে যারা প্র্ন্তার প্রাণ- পণ,

উষর রাতের অনাবাদী মাঠে ফলাবে ফসল যারা

দিক-দিগন্তে তাদের খুঁজিয়া ফিরিছে সর্বহারা।



কবি ফররুখ আহমদের মানবতাবাদী মনের হাহাকার লক্ষ্য করা যায় তের’শ পঞ্চাশ অর্থাৎ উনিশ’শ তেতাল্লিশ সালের অবিভক্ত বাংলার মন্বন্তরের সময়। মানবতাবাদী কবি সুকান্ত যখন বলেন -



কবিতা তোমায় দিলেম আজকে ছুটি

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়

পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।



এসময় কবি ফররুখ আহমদের চোখে ভেসে ওঠে ক্ষুধিত লাশের সারি। কলকাতার প্রশন্ত কালো পিচঢালা ঝকঝকে পরিস্কার রাস্তায় সন্ধ্যারাতে খুঁজে পান ক্ষুধিত লাশ; মুখগুঁজে পড়ে আছে অভিজাত লোকজনের যাত্রা পথে, কেউ খবর রাখছেনা। তাইতো তাঁর কষ্টের পংক্তিমালা-



যেখানে প্রশস্ত পথ ঘুরে গেল মোড়

কালো পিচ ঢালা রঙে লাগেনাই ধুলির আঁচড়

সেখানে পথের পাশে মুখ গুঁজে পড়ে আছে জমিনের পর

সন্ধ্যার জনতা জানি কোনদিন রাখেনা সে মৃত্যের খবর।

জানি মানুষের লাশ মুখগুঁজে পড়ে আছে ধরনীর পর

ক্ষুধিত আসাড় তনু বত্রিশ নাড়ীর তাপে পড়ে আছে

নিসাড় নিথর

পাশ দিয়ে চলে যায় সজ্জিত পিশাচ, নারী নর

পাথরের ঘর।



হায় বিচিত্র পৃথিবী। মানবতা আজ কোথায়! যেখানে ক্ষুধা দারিদ্রের কষাঘাতে প্রতিনিয়ত আত্মার মৃত্যু ঘটছে সেখানে শোষকশ্রেণি দুয়ার বন্ধ করে ক্ষুধিতের মুখের গ্রাস কেড়ে নিচ্ছে, মানুষের হাড় নিয়ে খেলাঘর রচনা করছে; পৈশাচিক লোভ তাদের মনুষ্যত্বকে হরণ করে নিয়েছে এবং তাদের নৃশংসতা দিনের পৃথিবী ও রাতের আকাশকে বিষাক্ত করে তুলেছে। একদিকে মানুষের আর্তনাদ অন্য দিকে শোষকের অট্টহাসি। একদিকে মৃত্যু ফাঁদ অন্য দিকে পরিহাস, এক দিকে গোলাপের পাপড়ি অন্যদিকে আবর্জনা, একদিকে আকাশে রঙ্গিন খিলান অন্যদিকে বিষাক্ত কামনা। চারদিকে হাহাকার। নারী শিশু কেউ বাদ যায়না মানবতাহীন আচরণ থেকে। কবির ভাষায়-



চলে দল বেঁধে শিশু ওষ্ঠে তুলি জীবনের

পানপাত্র সুতীব্র বিশ্বাদ

মানুষের বুভুক্ষ মুমূর্ষূ আউলাদ

এ কোন পরিক্ষা?

এখানে জ্বলিছে শুধু ক্ষুধাতুর দিবসের শিখা

বিষাক্ত ধোঁয়ার কুজ্ঝটিকা

মৃত্যুর বিকট বিভীধিকা।

মজলুম মনের বোঝা, ভারাক্রান্ত বেদনা আগাধ

তারি মাঝে লাথি খেয়ে চলে আজ আদমের মৃত আউলাদ।



হায়েনারূপী শোষকের বৈদ্যুতিক চাহনিকে ভয় পাননি কবি। আশাবাদী কবি মনে করেন এ শোষণ ত্রাসন নির্যাতন চিরদিনের নয়; ইতিহাস অনুসন্ধানী কবি তাই ইতিহাসের পাতায় চোখ রেখে শান্তনা খোঁজেন। সামুদ, ফেরাউন, নমরুদসহ পরাক্রান্ত উদ্ধত্যবাদীদের পতনের কাহিনীকে সামনে তুলে ধরেন তিনি।



অনেক সভ্যতা জানি মিশেছে ধূলির নীচে, অনেক সামুদ

কত ফেরাউন, কত জালিম পিশাচ নমরুদ

মিশে গেল ধুলি তলে

নতুন যাত্রীর দল দেখা দিল দুর্গম উপলে

উড়ায়ে নিশান

সাথে করে নিয়ে এল জীবনের অ-শ্রান্ত তুফান



তিনি আরো উল্লেখ করেন-



মজলুমানের রক্তে এখনো পৃথি লাল

কোথায় ওড়াবো শান্তি প্রতীক আল হেলাল?

ঘোরে বুভূক্ষু জনগণ পথে পাংশু মুখে

দ্বার থেকে দ্বারে ফেরে তার দাবী ক্লান্ত বুকে

চির পলাতক শিকার সে হোক দৃপ্ত আজ

মানবতা হোক নির্যাতনের মাথার তাজ



শুধু ক্ষুধা দারিদ্রই মানুষকে লাশে পরিণত করে না বরং নৈতিকতা বিধ্বংশী সংস্কৃতি ও চিন্তার বিকৃতি মানুষকে চির দিনের জন্য লাশ বানিয়ে ফেলে। ফররুখ আহমদ তা সহজেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই তিনি সমস্ত নীতি নৈতিকতাহীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উচ্চারণ করেন-



দল বেঁধে চলিছে শিশুরা মড়কের পথে

কুৎসিত কুটিল কালো অন্ধকার শড়কে বিপথে

যেখানে প্রত্যেক প্রান্তে আজাজিল পাতিয়াছে ফাঁদ

তারি পানে দুনিয়ার টানে চলে আজ মানুষের

দূর্বল, বিশীর্ণ আউলাদ।



কবি নিজে ছিলেন নীতিগত দিক থেকে আলিফের মতো খাড়া। স্বার্থন্ধতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। স্বভাবে, অভাবে, সুখে দুঃখে কোন সময়ই তিনি চাটুকারিতার আশ্রয় নিতে যাননি। দুনিয়ার তথাকথিত বৈভব সাফল্য তার কাছে ছিল এক পাশবিক মত্ততা। কবি কামরুল হাসানের ভাষায় ‘আপন বিবেকের দিকে দৃষ্টি রেখে বলতেই হবে, আপত্তি সত্বেও পাকিস্তান আমলের বহু কিছু আমরা মেনে নিয়েছিলাম। আমরা যারা ১৯৭১ সালের সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলাম, তাদের বহু সংখ্যক মহারথীই পশ্চিম পাকিস্তানে বহুবার পাকিস্তান সরকারের আমন্ত্রণে ঘুরে এসেছিলাম। কিন্তু নীতির যুদ্ধে যে লোকটিকে আমরা চিরকাল শত্র“ শিবিরের লোক বলেই চিহ্নিত করে এলাম, সেই ফররুখ ভাইকে গত তেইশ বছরের পাকিস্তান সরকার একটি দিনের জন্যও পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যেতে পারেনি। এটা আপনাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই বাস্তব ঘটনা এবং পর্বত- শিখরের মতই এমনি নিজের একান্ত মতবাদে অটল ছিলেন ফররুখ ভাই।” তাঁর মূল সূর ছিল-



তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে খোদার মদদ ছাড়া

তোরা পরের উপর ভরসা ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়া।



এমনকি যারা স্বার্থ হাসিলের জন্য নীতি বিসর্জন দেয়, তাদের জন্য তিনি শিশুতোষ কাব্য নাটিকায় বাদুরের সাথে তুলনা করেন এবং শেষ পংক্তিতে প্রমাণ করেছেন- ‘সুযোগ মতো যারা ও ভাই মতটা বদল করে / অতি চালাক বাদুরগুলোর মতই তারা মরে।’ নৈতিক অবস্থানকে মজবুত রাখতে শিশু-কিশোরদেরকেও নির্যাতিত অভাবী ও দুঃস্থজনের পার্শ্বে দাঁড়ানোর ছবক দিতেন কবি ফররুখ। তিনি বলেন -



খোকন যাবে কার বাড়ি?

¬খোকন যাবে তার বাড়ি

নাই জামা যার নাই গড়ি।



পাকিস্তানের সমর্থক আখ্যাদিয়ে ফররুখ আহমদকে কেউ কেউ ভিন্ন চোখে দেখার চেষ্টা করেন। সত্যিকার অর্থে তিনি পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন না বরং একজন মানবতাবাদী হিসেবে তিনি ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ। বৃটিশের কবল থেকে মুক্ত হবার জন্য তার স্বাধীনচেতা অন্তর সব সময় অস্থির ছিল। মুসলমানদের হাতে দেশের ক্ষমতা এলে মানবতা বিকশিত হবে এটা তাঁর স্বপ্ন ছিল। কিন্তু পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী জাতিকে হতাশ করেছে। এমনকি এ হতাশাব্যঞ্জক আচরণের কারণে তিনি পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে কোন মোসাহেবী তো দূরের কথা সংস্কারমূলক সমালোচনা ছাড়া তাদের পছন্দসই কোন কথাই বলেননি। এমনকি পাকিস্তানী শাসকদের অনভিপ্রেত কার্যাবলীর প্রেক্ষিতে তিনি ‘রাজ রাজরা’ নামক ব্যঙ্গ নাটকের মাধ্যমে তাদের মুখোশ উম্মোচন করেছেন।



মানুষের সুখ-দুঃখ নিয়েই কবির পথ চলা একথা আগেই বলা হয়েছে। মানুষের অধিকার যার হাতে ক্ষুন্ন হয় সে তাঁর বন্ধু হলেও তিনি তার বিরুদ্ধাচারণ করেছেন। পাকিস্তান স্বাধীন হবার পরই যখন তিনি বাংলা ভাষার ক্রান্তিকালের আভাস পেলেন তখনি তিনি ভাষার পক্ষে প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধের ছত্রে ছত্রে ছিল রাষ্ট্রভাষার দাবী। প্রবন্ধের সূচনাই তিনি করেছিলেন এভাবে “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে এ নিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আলোচনা হয়েছে। জনগণ ও ছাত্র সমাজ অকুন্ঠভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। সুতরাং এটা দৃঢ়ভাবেই আশা করা যায় যে, পাকিস্তানের জনগণের বৃহৎ অংশের মতানুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে।” ভাষা আন্দোলন শুরু পূর্বেই তার এ প্রবন্ধ ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এ প্রবন্ধে তিনি গণতান্ত্রিক ধারাকে মুক্তির মোহনায় এনে প্রমাণ করেছেন যে তিনি একজন গণতান্ত্রিক ও মানবতাবাদী মানুষ।

সত্যিকার অর্থে মানবতার মুক্তির জন্য চাই উমরের মত দরাজ দিলের মানুষ। এ প্রত্যাশায় কবি বলেন;



লুণ্ঠিত হলে মানবতা তুমি / জাগো অনাচার বাধন টুটি

প্রবল লাথিতে ভেঙ্গে ফেলে ছেঁড়ো / সব জালিমের পাপের ঝুটি।

পূর্বসূরী তীতুমীরের আন্দোলন সম্পর্কেও কবির মূল্যায়ন;

তীতুমীরের স্বপ্ন সফল হবে’

যেদিন ধরায় জুলুম নাহি রবে।



জালিমের নিষ্টুরতা, নির্মমতা, অমানবিকতা ও অসাহায়দের চিত্রিত করতে কবি ফররুখ নির্মাণ করেছেন বিরান মড়কের গান, তুলে এনেছেন অসহায় মানুষের ‘আউলাদ, পথে পথে খুঁজেছেন ‘লাশ’ আর মুক্তিকামী মানুষের জন্য খুঁজে ফিরেছেন ‘উমর দরাজ দিল’ সাত সাগরের মাঝি হয়ে সফর করেছেন ‘বার দরিয়ায়’ পরখ করেছেন ‘দরিয়ার শেষ রাত্রি’ সিন্দবাদকে ডেকে হাতেম তায়ীকে সঙ্গী করে ‘হেরার রাজ তোরণে’ পৌঁছতে চেয়েছেন সগৌরবে। এ পথের যাত্রী মজলুম মানবতাকে তাই আয়েশী জীবন ফেলে কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করার জন্য কবির উদাত্ত আহবান-



‘ছিড়ে ফেলে আজ আয়েশী রাতের মখমল অবসাদ

নতুন পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দবাদ।



শেষবাক্যে বলা যায়, কবি ফররুখ আহমদকে ইসলামী রেনেসাঁর কবি, গণজাগরণের কবি, ইসলামী ঐতিহ্যবাদী কবি, মন্বন্তরের কবি, বড় কবি এবং চল্লিশের শ্রেষ্ঠ কবি প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত করা হয়ে থাকে। যিনি যাই বলুন না কেন, দিন যত গড়াচ্ছে গবেষণা যত বাড়ছে ততই কবি ফররুখের খেতাবগুলোকে আংশিক বলেই অনুমিত হচ্ছে। উর্পযুক্ত খেতাবসমূহকে ধারণ করেই বরং বলা যায় ‘সত্যিকারভাবে ফররুখ আহমদ একজন পুরোপুরি মানবতাবাদী কবি’।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.