নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

শুণ্যতার নিচে পিয়ানো শুনি...

রাজসোহান

প্রিয় অন্ধকার, আমার পুরোনো বন্ধু তুমি...

রাজসোহান › বিস্তারিত পোস্টঃ

গল্পঃ কংকাবতী ও অ্যাফ্রোদিতি

২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৩৯



এই গলিতে সকাল আসে আলোর বদলে গন্ধ হয়ে। বাসি তেলের গন্ধ, নর্দমার গন্ধ, সারারাত জ্বলে শেষ হওয়া মশার কয়েলের গন্ধ, আর ঘুমিয়ে পড়া মানুষের মুখের গন্ধ। বাতি নেভে না, বাতির আর কোনো কাজ থাকে না বলে শুধু হলুদ হয়ে ঝোলে। মুরগিঅলা খাঁচা নামায়, খাঁচার ভিতরে মুরগিগুলি জানে না আজ কী হবে। তারা কোনো দিনই জানে না, তারা প্রতিদিন নতুন করে বাঁচে; এই একটা গুণের জন্যে মুরগি মানুষের চেয়ে সুখী।

এক রিকশা গলির মুখে থামে। দুইটা মেয়ে নামে। ভাড়া মিটিয়ে তারা হাঁটতে থাকে, পাশাপাশি, কিন্তু কেউ কারো দিকে তাকায় না। লালমাটিয়া থেকে এতোটা পথ তারা কোনো কথাই বলে নাই।

কংকাবতীর ব্লাউজের ভিতরে টাকা। অ্যাফ্রোদিতির ব্লাউজের ভিতরেও টাকা। টাকা তাদের বুকের উপর গরম হয়ে আছে, টাকা ঘামে ভিজে গেছে, টাকা তাদের শরীরের অংশ হয়ে গেছে, যেমন প্রতিদিন হয়। কিন্তু আজ টাকা অন্য রকম লাগছে। আজ টাকা যেনো কারো ভুলে রেখে যাওয়া, যা তাদের ফিরিয়ে দেয়া দরকার ছিলো, কিন্তু কাকে ফিরিয়ে দেবে তা তারা জানে না।

ঘরে ঢুকে অ্যাফ্রোদিতি দরোজা লাগায়। কংকাবতী চৌকির উপর বসে পড়ে, তারপর শুয়ে পড়ে, তারপর আবার উঠে বসে।

কংকাবতী বলে, ছবিরন।

অ্যাফ্রোদিতি চমকে ওঠে। এই নামে তাকে কেউ ডাকে না; সাত বছর হইলো কেউ ডাকে না। সে বলে, অ্যাঁ?

কংকাবতী বলে, কিছু না। ডাকলাম।

দুইজন চুপ করে থাকে। বাইরে একটা কাক ডাকে, ডাকতেই থাকে, যেনো কাকেরও কিছু বলার আছে এবং সারা জীবনেও তা বলা হবে না।

অ্যাফ্রোদিতি বলে, জরিনা।

কংকাবতী বলে, হ।

অ্যাফ্রোদিতি বলে, কাইল রাইতে কী হইছে?

কংকাবতী অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, কিছুইতো হয় নাই।

অ্যাফ্রোদিতি বলে, কিছু না হইলে আমার এমুন লাগতাছে ক্যান?

কংকাবতী জবাব দেয় না। কারণ জবাব তার জানা নাই; কারণ পৃথিবীতে যে ঘটনা ঘটেছে তার একটা নাম থাকতে হয়, আর যে ঘটনার নাম নাই সেই ঘটনা ঘটে নাই। তারা দুইজনই সারা জীবন ধরে জেনেছে, দুনিয়ায় ঘটনা একটাই। যা শরীরের ভিতরে ঢোকে। যা শুধু চোখের ভিতর দিয়ে ঢোকে, তা ঘটনা না; তা মিথ্যা, তা চুরি, তা পাগলামি।

তারা ঘুমানোর চেষ্টা করে। ঘুম আসে না। ঘুম না আসা তাদের কাছে নতুন; এই পেশায় যারা টিকে থাকে তারা যে কোনো সময় যে কোনো অবস্থায় ঘুমাতে পারে, ঘুম তাদের একমাত্র সম্পত্তি, একমাত্র ঘর, একমাত্র দেশ। আজ সেই দেশের সীমান্ত বন্ধ।

দুপুরের দিকে সুফিয়া খালা আসে।
খালা বলে, ফিরছস তাইলে? কতো দিছে?

কংকাবতী টাকা বের করে দেয়। খালা গোনে। গুনতে গুনতে খালার মুখ বদলায়; বেশি টাকা মানুষকে সন্দেহপ্রবণ করে তোলে, কম টাকার চেয়েও বেশি।

খালা বলে, এতো ক্যান?
আফ্রোদিতি বলে, হ্যায় দিছে।
খালা বলে, ব্যাডায় কয়বার করছে?
কংকাবতী বলে, একবারও না।

খালা প্রথমে বোঝে না, তারপর হো হো করে হেসে ওঠে, হাসতে হাসতে তার চোখে পানি এসে যায়, হাসতে হাসতে সে চৌকির উপর বসে পড়ে, হাসতে হাসতে সে বলে, একবারও না? তয় ট্যাকা দিল ক্যান? বাতাসের লাইগ্যা? দ্যাশে কি ব্যাডা আর নাই, বাতাস কিনতাছে?

আফ্রোদিতি বলে, খালা, হ্যায় অন্য রকম।

খালা হাসি থামিয়ে বলে, অন্য রকম ব্যাডা হয় না। ব্যাডা একটাই রকম। তোরা লুকাইতাছস। তোরা চুরি করছস।

তারা কিছু বলে না। কারণ বললেই বলতে হয় কী হয়েছিলো, আর কী হয়েছিলো সেটা বলার মতো ভাষা তাদের নাই, খালার নাই, এই গলির নাই, এই শহরের নাই, এই ভাষার নাই।

খালা টাকা নিয়ে যায়, যাওয়ার আগে বলে, দুইটা পাগল হইছে।

সন্ধ্যায় ঘরের অন্য মেয়েরা এসে জড়ো হয়। তারা শুনতে চায়। যে কোনো জায়গায় যে কোনো মানুষ আরেকজনের রাত শুনতে চায়, কারণ নিজের রাত সহ্য করার জন্যে অন্যের রাত দরকার হয়।

একজন জিজ্ঞেস করে, বাত্তি জ্বালানো আছিল?
আফ্রোদিতি বলে, হ।
সবাই একসাথে শব্দ করে, কারণ বাতি জ্বলা মানে অভদ্রতা, বাতি জ্বলা মানে লজ্জা, বাতি জ্বলা মানে দেখা।

আরেকজন জিজ্ঞেস করে, তারপর?
কংকাবতী বলে, তারপর হ্যায় কতা কইছে।

— খালি কতা?
— খালি কতা।
— কী কতা?

কংকাবতী মুখ খোলে, আবার বন্ধ করে। তার মনে আছে সব; একটা শব্দও সে হারায় নাই; কিন্তু শব্দগুলি এই ঘরের ভিতরে আনলে মারা যাবে, সে বুঝতে পারে। মানুষ যা বোঝে না তাকে খুন করে, এবং খুন করে হাসে।

সে বলে, মনে নাই।

মেয়েরা বিরক্ত হয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় একজন বলে, ভাত পাইলে খায় না, বাতাস খায়।

কিন্তু কংকাবতীর মনে ছিলো।

লোকটা বলেছিলো, তোমাগো চোখের নিচে যে কালি, ওইটা কালি না, ওইটা ছায়া; ছায়া পড়ে গাছের নিচে, তার মানে তোমাগো ভিতরে গাছ আছে।

লোকটা বলেছিলো, এই হাড্ডির নাম কী তোমরা জানো না, আমিও জানি না, আমি নাম দিলাম — সাঁকো। এইটা দিয়া মানুষ এক পার থিকা আরেক পারে যায়, তোমার কান্ধে একটা সাঁকো আছে জরিনা, তোমার শরীরের মইধ্যে দিয়া মানুষ পার হইয়া যায়, আর কেউ তোমারে ধন্যবাদ দেয় না।

লোকটা বলেছিলো, তোমার গলার ভিতরে গান আছে, আমি শুনতে পাইতাছি। তুমি গাও না ক্যান? গাইলে খদ্দের কমে? তাইলে গাইয়ো না, আমার সামনে একবার গাও, খদ্দের কমবো না, আমি খদ্দের না।

কংকাবতী গায় নাই। সারা রাত সে গাইতে চেয়েছিলো এবং সারা রাত সে গায় নাই। এখন, এই সন্ধ্যায়, না-গাওয়া গান তার গলার ভিতরে মাছের কাঁটার মতো বিঁধে আছে, এবং সারা জীবন বিঁধে থাকবে।

তিনদিন পর কংকাবতী কথা বলা শুরু করে।

এক খদ্দের এসে তার শরীরে হাত রাখলে সে বলে, এইটা সাঁকো।
খদ্দের বলে, কী?
সে বলে, এই হাড্ডির নাম সাঁকো। আপনে পার হইয়া যাইতাছেন।

খদ্দের প্রথমে থমকে যায়, তারপর রেগে ওঠে। মানুষ যা বোঝে না তাতে প্রথমে থামে, তারপর রাগে। খদ্দের বলে, ট্যাকা দিছি নাটক দেখতে? খদ্দের নিচে নেমে খালার কাছে চিৎকার করে, খালা উপরে এসে কংকাবতীকে ধরে ঝাঁকায়, কংকাবতী তখন খালার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, খালা, আপনের চোখের নিচেও ছায়া আছে, আপনের ভিতরেও গাছ আছে।

এরপর যা হয় তা বর্ণনা করার দরকার হয় না। সব দেশে সব কালে যারা ভুল ভাষায় কথা বলে, তাদের পরিণতিও একই।

মাসখানেক পর কংকাবতী চলে যায়। কেউ জানে না কোথায়। খালা বলে, পাগল মরছে। মেয়েরা বলে, কে জানে।

অ্যাফ্রোদিতি কিছু বলে না। অ্যাফ্রোদিতি চুপ করে থাকে সাত বছর, তারপর আরো এগারো বছর।

সে কাউকে কিছু বলে না। সে শিখে গেছে যে কিছু কথা আছে যা বললে থাকে না। সে ওই রাতকে শরীরের ভিতরে এমন এক জায়গায় রেখে দেয় যেখানে খদ্দের পৌঁছায় না, খালা পৌঁছায় না, পুলিশ পৌঁছায় না, ভাঙা ঘরের ভাড়াটে পৌঁছায় না। মাঝে মাঝে রাতে, একলা, সে অন্ধকারে নিজের কাঁধের হাড্ডির উপর হাত রাখে এবং কিছু বলে না, শুধু হাত রাখে।

বয়স হলে এই গলি মানুষকে বের করে দেয়, নিষ্ঠুরভাবে না, শুধু আস্তে আস্তে, যেমন ভাটা নামে। অ্যাফ্রোদিতি এখন আর অ্যাফ্রোদিতি না, এখন সে ছবিরন। সে একটা মেসে বাসন মাজে, সিঁড়ি ধোঁয়, ছাদে কাপড় শুকাতে দেয়। কেউ তার দিকে তাকায় না। তার ভালোই লাগে। সারা জীবন তাকিয়ে থাকা চোখ সহ্য করার পর না তাকানো চোখ কেমন ছুটির মতো।

এক শীতের বিকালে ফুটপাতে পুরান বইয়ের দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ছবিরন একটা মুখ দেখে। বইটার পিছনে ছাপা ছবি, সাদাকালো, ঝাপসা। লোকটার চুল পাকা। কিন্তু ছবিরন থেমে যায়, কারণ শরীর মুখ ভোলে না, শরীরের মগজ আলাদা।

সে বই হাতে নেয়। উলটায়। কালো অক্ষর, সাদা কাগজ, লাইনের পর লাইন। সে অক্ষর চেনে না। সে কোনো দিন অক্ষর চেনে নাই। এই কথা তার জীবনে আজ পর্যন্ত কোনো দিন এতো বড়ো মনে হয় নাই।

দোকানের ছেলেটা বলে, নিবেন খালা? আশি ট্যাকা।
ছবিরন বলে, বাবা, একটা লাইন পইড়া শোনাও ত।

ছেলেটা বিরক্ত হয়, তারপর কী মনে করে পড়ে। ছবিরন শোনে। নদীর কথা, পাখির কথা, শীতের কথা। নেই তার কথা। নেই তাদের কথা। নেই ওই রাতের কথা।

ছবিরন মাথা নাড়ে। সে বলে, হ। এইটাই।

কারণ সে আঠারো বছর পর, এই ফুটপাতে দাঁড়িয়ে, আজ বুঝতে পারে, দেখা মানে লেখা না। সেই লোক তাদের লেখে নাই, তাদের দেখেছিলো। পৃথিবীতে এই দুইটা আলাদা। দ্বিতীয়টা দুর্লভ, আর তার কোনো প্রমাণ থাকে না।

আশি টাকা তার একদিনের ভাত। সে আশি টাকা দেয়।

রাতে, মেসের সিঁড়ির নিচে তার তোশকের নিচ থেকে বইটা বের করে সে খোলে। পাতার উপর হাত রাখে। কালো অক্ষরগুলি সাদা কাগজের উপর পড়ে আছে ঘাসের মতো। ঘন, ছোটো, অগুনতি, একটার সাথে আরেকটা লাগানো।

ছবিরন হাত বুলায়। মাঠটা এইখানে।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:৫৮

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: পড়লাম

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.