| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

সিনেমা শুরু হয় সবুজ দিয়ে। ওয়াইড ফ্রেমে পাহাড়, গা বেয়ে নেমে যাওয়া রাস্তা, আর রাস্তায় ছোট্ট একটা গাড়ি। ক্যামেরা কাটে গাড়ির ভেতরে। দুইজন মানুষ কথা বলছেন, নিতান্ত সাধারণ কথা। আবার কাট, আবার সেই বিস্তীর্ণ সবুজ, আর তার ভেতরে গাড়িটা আরও ছোট হয়ে আসছে।
ক্রেডিট ঢেকে রেখে এই তিনটা শট আজকের যেকোনো দর্শককে দেখান। সে বলবে, মালয়ালম সিনেমা। গত এক যুগে মালয়ালম ইন্ডাস্ট্রি এই ব্যাকরণকেই নিজের সিগনেচার বানিয়ে ফেলেছে। ল্যান্ডস্কেপ কথা বলে, রাস্তা কথা বলে, গাড়ির ভেতরের সংলাপ ইচ্ছা করেই তুচ্ছ রাখা হয়, আর দর্শক টের পায় গল্পটা মানুষের চেয়ে বড় কিছুর ভেতর এগিয়ে যাচ্ছে।
গল্পটা সংক্ষেপে এমন। ডাক্তার ওমরের স্ত্রী রুমাকে যুদ্ধের সময় ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনী। স্ত্রী আর শিশুপুত্রের খোঁজ না পেয়ে ওমর যুদ্ধে চলে যান। যুদ্ধের ভেতরে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান পাহাড়ি মেয়ে, পেশায় ডাক্তার, নাম মাথিন। যুদ্ধ শেষে দুজন সংসার পাতেন। বছর দুয়েক পর এক নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে বসে রুমা জানতে পান, তাঁর স্বামী বেঁচে আছেন এবং সুখে আছেন। রুমা আর নিজেকে কারও সামনে আনেন না। সুযোগ বুঝে ছেলে আদনানকে ওমরের বাড়িতে রেখে আসেন, তারপর আত্মহত্যা করেন। পুনর্বাসন কেন্দ্রে এক নারীর আত্মহত্যার খবর পেয়ে ওমর সেখানে যান, রুমার মৃতদেহ শনাক্ত করেন, আর বুঝতে পারেন বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া ছেলেটি তাঁরই।
গল্পটা শেষ করার জন্য রুমাকে মরতেই হয়। তিনি বেঁচে থাকলে এই সিনেমার কোনো সমাপ্তি সম্ভব ছিল না।
স্বাধীনতার পর সুভাষ দত্ত, ১৯৭২ সালের ১০ নভেম্বর মুক্তি দিয়েছিলেন অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী সিনেমা, যেখানে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুকে বরণ করে নেওয়ার একটা আহ্বান ছিল। ঠিক চার বছর পর, নভেম্বরেই, হারুনর রশীদ একই প্রশ্ন নিয়ে ফিরে এলেন। তবে আহ্বান নয়, তিনি নিয়ে এলেন তার কঠিন বাস্তবতা।
হারুনর রশীদের নিজের পথও অদ্ভুত। জন্ম ১৯৪০ সালের ১৫ মার্চ, কুষ্টিয়ায়। চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি ১৯৬৩ সালে, সালাহউদ্দিনের ধারাপাত সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে। এরপর সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন জহির রায়হান ও বশীর হোসেনের সঙ্গে, দুয়েকটা সিনেমায় অভিনয়ও করেছেন। স্বাধীন পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে তাঁর লেগে গেল তেরো বছর। আর প্রথম সিনেমাতেই তিনি এমন গল্প বেছে নিলেন, যেটা তখনকার বাজারে কেউ ছুঁতে চাইছিল না।
হেলেন কখনো ট্রয়ে যাননি
গ্রিক কবি স্টেসিকোরাস আর তাঁর পরে নাট্যকার ইউরিপিদিস হেলেনের একটা বিকল্প কাহিনি লিখেছিলেন। সেখানে ট্রয়ে হেলেন কখনো যাননি। দেবতারা আকাশের মেঘ দিয়ে হেলেনের অবিকল প্রতিমূর্তি বানিয়ে প্যারিসের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, আর আসল হেলেন দশ বছর মিশরে বসে ছিলেন। অর্থাৎ দশ বছরের ওই মহাযুদ্ধ, হাজার জাহাজ, অ্যাকিলিসের রাগ, হেক্টরের মৃত্যু, সব ঘটেছিল একটা মেঘকে ঘিরে।
গ্রিকদের কাছে মেঘ শুধু আবহাওয়া ছিল না। জিউস একবার হেরার অবিকল আদলে মেঘ দিয়ে নেফেলি নামের এক নারীমূর্তি বানিয়ে ইক্সিয়নের সামনে রেখেছিলেন, ইক্সিয়ন সেই মেঘকেই হেরা ভেবে জড়িয়ে ধরেছিল। নেফেলি শব্দের অর্থই মেঘ। গ্রিক কল্পনায় মেঘ হলো সেই বস্তু, যা মানুষ বানায় যখন আসল শরীরটার দিকে তাকানো তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে।
যুদ্ধ শেষে মেনেলাউস হেলেনকে ফেরত নিয়ে যান। কোনো অগ্নিপরীক্ষা নাই, কোনো নির্বাসন নাই। কারণ গ্রিকরা আগেই একটা মেঘ বানিয়ে রেখেছিল, যাতে হেলেনকে দোষী সাব্যস্ত করতে না হয়। নিজের নায়িকাকে বাঁচানোর জন্য গ্রিকরা একটা উপায় বের করে নিয়েছিল। তার নাম মেঘ।
ভারতবর্ষ অন্য কৌশল বেছে নিয়েছিল। রামায়ণে রাবণবধের পর সীতাকে ফিরিয়ে নেওয়ার আগে রাম তাঁকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে বলেন। সীতা আগুনে নামেন, অক্ষত ফিরে আসেন। তারপরও অযোধ্যায় লোকমুখে কথা ওঠে, আর সন্তানসম্ভবা সীতাকে বনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বছরের পর বছর পর যখন আবার প্রমাণ চাওয়া হয়, সীতা এবার আর আগুনে নামেন না। দুই পুত্র লব ও কুশকে রামের হাতে তুলে দিয়ে তিনি মাটিকে ডাকেন, মাটি দুই ভাগ হয়ে তাঁকে ভেতরে নিয়ে নেয়।
সীতার শেষ দুই কাজ একটা নির্দিষ্ট ক্রমে ঘটে। আগে সন্তান হস্তান্তর, তারপর নিজের অন্তর্ধান। রুমাও ঠিক এই ক্রমেই কাজ দুটো করেন। আগে আদনানকে বাবার আশ্রয়ে পৌঁছে দেন, তারপর নিজেকে সরিয়ে নেন। আড়াই হাজার বছর পর দুই নারী একইভাবে কাজ করেন। আগে সন্তানকে বাবার কাছে পৌঁছে দেন, তারপর নিজের জীবন থেকে সরে যান।
হারুনর রশীদ সচেতনভাবে সীতার কাঠামো ব্যবহার করেছিলেন কি না, জানি না। তবে ফিরে তাকালে মনে হয়, তাঁর হাতে আসলে বিকল্প ছিল না। ১৯৭৬ সালের বাংলাদেশে এমন কোনো স্ক্রিপ্ট লেখা সম্ভব ছিল না যেখানে রুমা বেঁচে থাকেন। রুমা বেঁচে থাকলে সিনেমা শেষ হয় না, শুধু একটা প্রশ্ন দাঁড়িয়ে থাকে। একজন পুরুষ, দুইজন স্ত্রী, এবং তাঁদের একজনকে রাষ্ট্র বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়েছে অথচ সমাজ চোখ তুলে তাকাতে পারে না। এই সমীকরণের কোনো সমাধান তখনকার বাংলাদেশের হাতে ছিল না। ফলে সমাধান হিসেবে এলো মৃত্যু।
মেঘের অনেক রং এতদিন পড়া হয়েছে জীবনের নানা রঙের রূপক হিসেবে। কিন্তু মেঘ তো সেই বস্তুও, যা বানানো হয় আসল মানুষকে ঢেকে দেওয়ার জন্য। রুমাকে দেখতে না চাওয়া একটা দেশ তাঁর জায়গায় বসিয়ে দিয়েছিল উপাধি, পুনর্বাসন কেন্দ্র, ভাতার তালিকা। শরীরের বদলে ধোঁয়া।
হারুনর রশীদের কৃতিত্ব এখানেই। তিনি মেঘ সরিয়ে দিয়ে রুমাকে পর্দায় নিয়ে এসেছিলেন। তাঁকে কোনো প্রতীক বানাননি, একজন মানুষ হিসেবেই দেখিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই গল্পেই রুমার বেঁচে থাকার জায়গা ছিল না। এটাই সিনেমাকে আরও করুণ করে তোলে। পরিচালক রুমার জীবনের দিকে তাকাতে পেরেছিলেন, কিন্তু তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার মতো একটা সমাজ তখনও তৈরি হয়নি।
পাহাড়ী মেয়ের নাম মাথিন
প্রধান নারী চরিত্রের জন্য হারুনর রশীদ একজন পাহাড়ি মেয়ে খুঁজছিলেন। রাঙামাটিতে তখন নাটক আর সাংস্কৃতিক কাজে যুক্ত ছিলেন মাথিন। তাঁর মেসো পরিচালককে ধরে নিয়ে গেলেন মহড়ায়। মহড়া দেখে হারুনর রশীদ সেখানেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন।
এই সিনেমার প্রায় কেউই পেশাদার অভিনয়শিল্পী ছিলেন না। ওমর এলাহী, মাথিন, শিশু আদনান, সবার জন্যই এটি প্রথম কাজ। পর্দায় মাথিনের চরিত্রের নাম মাথিন, ওমর এলাহীর চরিত্রের নাম ওমর, আদনানের চরিত্রের নাম আদনান। ভিত্তোরিও দে সিকার বাইসাইকেল থিভস যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা এই পদ্ধতি চিনবেন। রাস্তা থেকে মানুষ তুলে এনে তাকে তার নামেই চরিত্র বানিয়ে দেওয়া, ইতালীয় নিওরিয়ালিজম বহু আগে এই কাজ করেছিল। ঢাকায় ১৯৭৬ সালে দাঁড়িয়ে এই কাজ করার জন্য যে সাহস লাগে, সেটা কম নয়। তখন সিনেমা মানে ছিল তারকা, আর তারকা মানে ছিল টাকা।
নামটার আলাদা একটা ইতিহাস আছে।
টেকনাফ থানার আঙিনায় আজও একটা পুরোনো কূপ আছে, নাম মাথিনের কূপ। কিংবদন্তি বলে, টেকনাফের রাখাইন জমিদার ওয়াংথিন প্রু চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে মাথিন প্রতিদিন ওই কূপে পানি নিতে আসতেন। কলকাতা থেকে বদলি হয়ে আসা দারোগা ধীরাজ ভট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর প্রেম হয়। তারপর ধীরাজ কলকাতায় ফিরে যান আর ফেরেন না। মাথিন খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেন, শুকিয়ে মারা যান। ধীরাজ ভট্টাচার্য পরে পুলিশের চাকরি ছেড়ে সিনেমার নায়ক হয়ে যান, দুইশোর বেশি সিনেমায় অভিনয় করেন, আর ১৯৩০ সালের পর যখন পুলিশ ছিলাম নামে আত্মজীবনী লিখে নিজেই এই গল্প ফাঁস করে দেন।
কিংবদন্তির গল্প সরল। সমতলের বাঙালি পুরুষ পাহাড়ে আসে, পাহাড়ি মেয়ে তাকে ভালোবাসে, পুরুষ ফিরে যায়, মেয়ে মরে যায়।
মেঘের অনেক রং-এ গল্প উল্টে যায়। সমতলের বাঙালি পুরুষ পাহাড়ি মেয়েকে ভালোবাসেন, এবার আর ফেলে যান না, ঘর বাঁধেন। পাহাড়ি মাথিন এবার বাঁচেন। মরেন সমতলের রুমা। মৃত্যুর দায় যেন এক নারীর ঘাড় থেকে আরেক নারীর ঘাড়ে সরে যায়।
হারুনর রশীদ টেকনাফের কিংবদন্তি মাথায় রেখে নাম বেছেছিলেন কি না জানি না, নামটা অভিনেত্রীর নিজেরই ছিল বলে হয়তো ঘটনাটা নিছক কাকতাল। তবু একটা কথা থেকে যায়। যে ধীরাজ ভট্টাচার্য মাথিনকে ফেলে গিয়েছিলেন, তিনি সিনেমার লোক হয়ে গিয়েছিলেন, আর সিনেমার লোক হিসেবেই তাঁর ভাষ্য টিকে গিয়েছিল। প্রায় অর্ধশতক পর সিনেমাই মাথিন নামের এক পাহাড়ি মেয়েকে তার পুরুষ ফিরিয়ে দিল। তবে সেই গল্পে বেঁচে থাকার সুযোগ হলো না আরেকজনের।
চিঠি বাঁধা ছিল ছেলের হাতে
যুদ্ধের পর রুমা আর ওমর একটিবারের জন্যও মুখোমুখি কথা বলেন না। স্বামী-স্ত্রীর পুনর্মিলন, কান্নাকাটি, অভিমান, ব্যাখ্যা, কোনো দৃশ্যই এখানে নাই। রুমা স্বামীকে দেখেন, স্বামী রুমাকে দেখেন না। আর যখন দেখেন, তখন রুমা লাশ।
রুমার কথা বলার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায় একটা চিঠি, যা ছেলের হাতে বাঁধা থাকে। ছেলেকে নিয়ে নদীর ধারে বেড়াতে গিয়ে ওমর সেই কাগজ খুঁজে পান।
এই মোটিফ আমাদের অচেনা নয়। মহাভারতে কুন্তী বিয়ের আগেই সূর্যের বরে পুত্র লাভ করেন। সমাজের ভয়ে সদ্যোজাত শিশুকে একটা ঝাঁপিতে ভরে নদীতে ভাসিয়ে দেন। সেই শিশু কর্ণ হয়ে ওঠেন, আর নিজের জন্মপরিচয় জানতে পারেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ঠিক আগে, যখন আর কিছুই বদলানোর ছিল না। কুন্তীর সিদ্ধান্ত ভালোবাসার ছিল না, ছিল সম্মান বাঁচানোর।
রুমা কুন্তীর কাজ করেন, তবে উল্টো দিক থেকে। কুন্তী সমাজের ভয়ে সন্তানকে সরিয়ে দিয়েছিলেন নিজের কাছ থেকে। রুমাও সমাজের ভয়েই সন্তানকে সরিয়ে দেন, কিন্তু সরান বাবার কাছে, নদীতে নয়। ভাসিয়ে দেওয়ার বদলে পৌঁছে দেওয়া। মহাভারত যেখানে মায়ের অপরাধবোধের গল্প বলে, মেঘের অনেক রং সেখানে মায়ের হিসাবনিকাশের গল্প বলে। রুমা জানেন তাঁর ছেলের একটা পরিচয় দরকার, আর সেই পরিচয় দিতে পারবেন কেবল বাবা। মায়ের নাম ওই পরিচয়ে কোনো কাজে লাগবে না, বরং ক্ষতি করবে।
আদনান চরিত্রে শিশুশিল্পী আদনান ওই বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন, বাচসাস পুরস্কারে পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার স্বীকৃতি। সমালোচকেরা তখন থেকেই লিখে আসছেন, শিশুটি এই গল্পের প্রাণ, দুই প্রান্তের যোগসূত্র।
আমি একটু অন্যভাবে দেখি। আদনান যোগসূত্র নয়, আদনান প্রমাণ। মেঘ বানিয়ে যাকে ঢেকে দেওয়া যায় না। উপাধি দিয়ে, কেন্দ্র বানিয়ে, তালিকা করে একজন নারীকে বিমূর্ত করে ফেলা যায়। কিন্তু একটা বাচ্চা ছেলে দরজায় এসে দাঁড়ালে তাকে বিমূর্ত করা যায় না, তার শরীর আছে, খিদে আছে, প্রশ্ন আছে। তাই এই সিনেমার গল্প কোনো নারীর ক্ষমা পাওয়ার নয়। একজন পুরুষের সামনে এমন এক সত্য এনে দাঁড় করানো হয়, যেটা তিনি আর এড়িয়ে যেতে পারেন না।
গান নাই
সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন ফেরদৌসী রহমান। এই সিনেমায় প্রচলিত অর্থে কোনো গান নাই। ১৯৭৬ সালের ঢাকার বাজারে এই সিদ্ধান্তকে আত্মহত্যা বললেও কম বলা হয়। তখন একটা বাংলা সিনেমায় ছয়-সাতটা গান থাকা ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক, আর গানই ছিল সিনেমা বিক্রির প্রধান হাতিয়ার।
সিনেমার সবচেয়ে চেনা সুরও তাই ধার করা, নতুন করে বানানো নয়। গ্রামবাংলার মন্তাজে বাজে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের প্রায় সত্তর বছরের পুরোনো গান। নিজের সিনেমার জন্য একটা দেশাত্মবোধক গান লিখিয়ে নেওয়া হারুনর রশীদের পক্ষে কঠিন ছিল না। তিনি সেটা করেননি। যে গান বাঙালি এক শতাব্দী ধরে গলা ছেড়ে গেয়ে আসছে, সেটাকেই তিনি ছেড়ে দিলেন সমতলের দৃশ্যের উপর, আর তারপর ওই একই সমতলে রুমার গল্প বসিয়ে দিলেন। দর্শক গানটা আগে থেকেই চেনে বলেই দৃশ্যটা আরও বেশি মনে ধরে। অচেনা সুর দিয়ে এই কাজ হতো না।
ফেরদৌসী রহমান পল্লীগীতির সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদের মেয়ে। বাংলাদেশের প্রথম নারী সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তাঁর নাম আসে। জীবনভর গান গেয়েছেন, প্লেব্যাক করেছেন, আর যে সিনেমার জন্য তিনি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেন, সেখানে তাঁকে একটা গানও বানাতে হয়নি। শুধু আবহ। শুধু নীরবতার ভেতরে ছড়িয়ে দেওয়া কয়েকটা সুর।
গান বাদ দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত আমার কাছে নিছক নান্দনিক মনে হয় না। বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমার সবচেয়ে পুরোনো কৌশল হলো, কষ্টকে সুরে রূপান্তর করে ফেলা। নায়িকা কাঁদলে গান বাজে, দর্শক কাঁদে, আর কান্না উপভোগ্য হয়ে ওঠে। রুমার ঘটনায় ওই কৌশল ব্যবহার করা মানে হতো ধর্ষণকে উপভোগ্য করে তোলা। সুর দিয়ে ঢাকলে ওটাও এক ধরনের মেঘ হতো। হারুনর রশীদ আর ফেরদৌসী রহমান সেই মেঘ বানাতে রাজি হননি।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সিনেমাটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ পরিচালক, শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক, শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক ও শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী বিভাগে জিতে নেয়। চিত্রগ্রহণে ছিলেন হারুন-অর-রশিদ। বাচসাস পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ সম্পাদক হন আতিকুর রহমান মল্লিক। এই সিনেমার কলাকুশলীদের প্রায় সবার জন্যই এটি ছিল প্রথম জাতীয় পুরস্কার। প্রথম সিনেমা বানিয়ে একটা দল পুরস্কারের টেবিল সাফ করে দিলো, এমন ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে বেশি ঘটেনি।
ভূত হওয়ার নিয়ম
পৃথিবীর প্রায় সব লোকবিশ্বাসে ভূতের আচরণের কয়েকটা নির্দিষ্ট ধাপ আছে। ভূত এমন একজন, যে মরে গেছে অথচ শেষ হয়নি। সে পুরোনো বাড়ির চারপাশে ঘোরে। জীবিতরা তাকে দেখতে পায় না। সে ঘরে ঢোকে, একটা চিহ্ন রেখে যায়। আর জীবিতদের সংসার আবার স্বাভাবিক হয় কেবল তখনই, যখন তার দেহ শনাক্ত হয় এবং তাকে যথাযথভাবে সমাহিত করা হয়।
রুমার গল্পও অনেকটা এমন।
সিনেমার বর্তমান সময়ে রুমা সামাজিকভাবে আগেই মৃত। তিনি থাকেন একটা প্রতিষ্ঠানে, যেটা তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে কিন্তু নাম দেয়নি। তিনি স্বামীর পিছু নেন, স্বামী টের পান না। তিনি স্বামীর বাড়িতে যান, কেউ তাঁকে দেখে না। তিনি একটা চিহ্ন রেখে আসেন, যার নাম আদনান। তারপর তিনি নিজেকে মুছে ফেলেন। আর সিনেমা শেষ হয় সেই দৃশ্যে, যেখানে ওমর রুমার লাশ শনাক্ত করেন।
মেঘের অনেক রং তাই কাঠামোগতভাবে একটা ভূতের গল্প। তবে ভয়ের নয়, লজ্জার।
আর এখানেই ইতিহাস এসে দাঁড়ায়। ১৯৭২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন বোর্ড। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্যাতিত নারীদের বীরাঙ্গনা উপাধি দেন, জনসভায় বলেন, কেউ পিতার নাম জিজ্ঞেস করলে বলে দিও তাদের পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, ঠিকানা ধানমন্ডি ৩২। একই বছরের ১৯ জুলাই পনেরোজন যুদ্ধশিশুর প্রথম দলটি কানাডার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া। ১৯৭৪ সালের মধ্যেই এই অভিবাসন প্রক্রিয়া প্রায় শেষ হয়ে যায়।
উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ করার কারণ নাই। বহু নারীর জীবন ওই ব্যবস্থাগুলো বাঁচিয়েছিল, বহু শিশু ঘর পেয়েছিল। কিন্তু কার্যত যা ঘটেছিল, সেটাও অস্বীকার করা কঠিন। উপাধি দেওয়া হলো, ঠিকানা দেওয়া হলো ঢালাওভাবে, বিয়ের ব্যবস্থা করা হলো, শিশুদের সাত সমুদ্র পার করে দেওয়া হলো। সমাজ যাতে চোখ তুলে তাকাতে বাধ্য না হয়, তার সব বন্দোবস্ত করে ফেলা হয়েছিল। পুনর্বাসনের ভেতরে একটা অদৃশ্য করে দেওয়ার প্রক্রিয়াও ছিল।
মেঘের অনেক রং ঠিক এই প্রক্রিয়াকেই গল্পে রূপান্তর করে ফেলে। আর রূপান্তর করতে গিয়েই ফাঁস করে দেয়। রুমা যা করেন, রাষ্ট্র মোটামুটি তাই করতে চেয়েছিল। শিশুটিকে অন্যের ঘরে পৌঁছে দাও, তারপর নিজে সরে যাও। পার্থক্য একটাই। রাষ্ট্র বলেছিল সরে যাও, আর রুমা সরে যাওয়ার সবচেয়ে চূড়ান্ত রূপ বেছে নিয়েছিলেন।
হারুনর রশীদ এতটা বিশ্লেষণ মাথায় রেখে চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, এমন দাবি করব না। তবে শিল্পের একটা স্বভাব আছে। শিল্পী যা লুকাতে চান, শিল্প তা বলে দেয়। আর শিল্পী যা বোঝেন না, শিল্প সেটাও ধরে রাখে।
পুরস্কার আছে, হল নাই
১৯৭৭ সালের আগস্টে ত্রৈমাসিক চলচ্চিত্রিক পত্রিকায় এই সিনেমা নিয়ে লিখেছিলেন শুকদেব বসু। লেখাটি পরে ১৯৮৭ সালে অনুপম হায়াতের বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস বইতে সংকলিত হয়। ওই লেখা থেকে দুটো তথ্য পরিষ্কার জানা যায়।
প্রথমত, সিনেমাটি বানানোর সময় প্রযোজক আনোয়ার আশরাফ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সে ভর্তি ছিলেন এবং প্রায়ই ক্লাস কামাই দিতেন। ফিরে এসে সহপাঠীদের রুদ্ধশ্বাসে তাঁর ভালো ছবির গল্প শোনাতেন। তাঁর ভাষায়, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে একটা পরিচ্ছন্ন ছবি করছি, ব্যাস।
দ্বিতীয়ত, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল, বাংলাদেশের প্রথম রঙিন ছবি মেঘের অনেক রং। কিন্তু প্রথম হওয়া হলো না। মুক্তির দৌড়ে আগে চলে গেল আকবর কবির পিন্টুর বাদশা। মেঘের অনেক রং হয়ে গেল বাংলাদেশের দ্বিতীয় রঙিন সিনেমা, আর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম রঙিন সিনেমা।
তারপর যা হলো, সেটা এই দেশের স্মৃতি সংরক্ষণের ইতিহাসে একরকম উপমা হয়ে আছে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠত্ব পেয়ে গেল সিনেমাটি, চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি ও চলচ্চিত্রকার সমিতির বিচারেও সম্মান পেলো, অথচ প্রেক্ষাগৃহ পেলো না। শুকদেব বসু প্রদর্শকদের ভূমিকাকে ঐক্যবদ্ধ বদমায়েশি বলে বর্ণনা করেছিলেন। দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত ঢাকার ছোট নাজ প্রেক্ষাগৃহে এক সপ্তাহের জন্য সিনেমাটি ফিরে এলো, বর্ষার ভেজা ঢাকায়, প্রায় নীরবে।
রুমা রাষ্ট্রের কাছ থেকে উপাধি পেয়েছিলেন, ঠিকানা পাননি। মেঘের অনেক রং রাষ্ট্রের কাছ থেকে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছিল, পর্দা পায়নি। দুটোর পরিণতিই যেন একই রকম।
ব্যবসায়িক ব্যর্থতার ধাক্কা হারুনর রশীদ কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় নিয়েছিলেন। পরে তিনি রঙিন গুনাইবিবি, ভাগ্যবতী, ধনবান, অসতীর মতো মূলধারার সিনেমা বানিয়েছেন, সেগুলো জনপ্রিয়ও হয়েছে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির স্বল্প আয়োজনে বানিয়েছেন আমরা তোমাদের ভুলবো না, এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার গল্প, আবারও ফেরদৌসী রহমানের সঙ্গীতে। কিন্তু চলচ্চিত্রকার হিসেবে তাঁকে টিকিয়ে রেখেছে ওই প্রথম সিনেমাই।
চলচ্চিত্র সমালোচক শৈবাল চৌধুরী তাঁর সম্পর্কে একটা স্মৃতি লিখে গেছেন। ১৯৯০ ও ১৯৯৪ সালে কলকাতার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল গিয়েছিল। নন্দনের আশপাশের দামি রেস্তোরাঁয় সবাই খেতে যেতেন, হারুনর রশীদকে সেখানে পাওয়া যেত না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তিনি আর তাঁর চিত্রগ্রাহক পংকজ পালিত সস্তার ঝুপড়ি হোটেলে খেয়ে টাকা বাঁচাচ্ছেন, আর সেই টাকায় উৎসবের বুকস্টল থেকে বই কিনছেন। মৃদু বকুনি দিয়ে হারুনর রশীদ বলেছিলেন, এত বিলাসিতা করলে সংস্কৃতি চর্চা হয় না।
ক্যান্সারে ভুগে ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা গিয়েছেন। ভাষার মাসের প্রথম দিনে।
আর যে সিনেমা তিনি রেখে গেছেন, তার ভেতরে আজও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান বাজে, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। তারপর ওই দেশের ভেতর থেকে একটা মেয়ে উঠে আসেন, যাঁর নিজের কোনো বাসা আর অবশিষ্ট নাই।
আকাশে মেঘের অনেক রং থাকে, এই কথা সত্য। কিন্তু মেঘ মানুষ বানিয়েও নেয়। বানায় তখনই, যখন সামনের মানুষটার দিকে সরাসরি তাকানোর সাহস তার হয় না। ১৯৭৬ সালে হারুনর রশীদ তাকিয়েছিলেন। প্রেক্ষাগৃহগুলো তাকায়নি।
©somewhere in net ltd.