| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
অগ্রহায়ণের এক ভোরে, খেজুরগাছ থেকে রস নামাতে যাওয়ার পথে গাছি ছইমুদ্দিন দেখে, গোরস্থানের শিমুলগাছ তলায় কুয়াশার ভেতর মাটি উড়ছে। কেউ মরল নাকি, ভাবতে ভাবতে সে বাঁশের বেড়ার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় এবং দেখে, আধখোঁড়া একটা কবরে কোমর পর্যন্ত নেমে গেছে মন্তাজ আলী। উপরে খাটিয়া নাই, লোকজন নাই, কান্নাকাটির শব্দ নাই; আছে শুধু কোদালের কোপের চাপা থপ থপ আওয়াজ আর কাঁচা মাটির সোঁদা গন্ধ। ছইমুদ্দিন গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করে, ক্যাডা মরছে রে মন্তাজ?
মাটি থেকে চোখ না তুলে মন্তাজ বলে, কেউ মরে নাই।
ছইমুদ্দিন দ্বিতীয় প্রশ্ন করে না। রসের ভাঁড় যেখানকার সেখানে রেখে সে উল্টা পথে বাজারের দিকে হাঁটা দেয়, এবং দুপুর হওয়ার আগেই নলডহরের প্রতিটি উঠানে খবর পৌঁছে যায়, মন্তাজ কোদাল ধরছে।
তারপর চার দিন পুরো গ্রাম নিঃশ্বাস চেপে থাকে। মানুষ কাজে যায়, ধান ভানে, গরুর জাব দেয়, কিন্তু সবই যেন কান খাড়া করে; কার বাড়িতে কার কাশি, কার জ্বর কয় দিনের, এই হিসাব নিঃশব্দে চলতে থাকে উঠান থেকে উঠানে। ওসমানের বউ সালেহার জ্বর অবশ্য আগেরই, তিন দিনের পুরানা; কবিরাজের পানিপড়া চলছিল, মাথায় জলপট্টি চলছিল। চতুর্থ দিন শেষরাতে সালেহা মারা যায়। সকালে মেয়েরা যখন গোসলের পানি গরম করে, পুরুষেরা তখন বাঁশ কাটতে কাটতে গোরস্থানে গিয়ে দেখে, কবর প্রস্তুত। ভেতরে ঝরঝরে শুকনা, বগলি কাটা, তোলা মাটি এক পাশে সমান করে রাখা। সাড়ে তিন হাত, মাপে মাপ।
এই মাপের কথাই নলডহরের মানুষ সবচেয়ে নিচু গলায় বলাবলি করে। কারণ মন্তাজকে মাপ দেয়নি কেউ, কোনোদিন দেয় না। লম্বা আফাজউদ্দিন যেবার মরল, দেখা গেল তার জন্য আগেই খোঁড়া কবর অন্যবারের চেয়ে দেড় বিঘত লম্বা, পা মুড়তে হয়নি; আর সরু কুলসুম বুড়ির বেলায় কবর এত সরু ছিল যে নামানোর সময় ধরাধরি করা জোয়ানদের হাত ঢুকতে চায় না, অথচ বুড়ি নেমে গেল পানের খিলির মতো, দুই পাশে এক আঙুল জায়গাও বাড়তি রইল না। কার জন্য খোঁড়া হচ্ছে, এই প্রশ্ন তাই নলডহরে কেউ মুখ ফুটে করে না; মাপ দেখে আন্দাজ করার চেষ্টা করে, আর আন্দাজ করতে করতে নিজের শরীরের দিকে তাকায়।
লোকে আরো জানে, খোঁড়া শেষ হলে মন্তাজ একবার কবরের ভেতর চিত হয়ে শুয়ে দেখে। গভীর হলো কি না, কাত করে শোয়ানোর জায়গা আছে কি না, এসব সে দড়ি দিয়ে মাপে না, হাত দিয়েও না; শরীর দিয়ে মাপে। শুয়ে সে খানিকক্ষণ ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকে, শিমুলের ডালের ফাঁকে আকাশ দেখে, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের মাটি ঝাড়ে। এই দৃশ্য যারা দূর থেকে দেখেছে, তারা সেদিন বাড়ি ফিরে ভাত খেতে পারেনি।
যে কয় দিন আগাম কবর খালি পড়ে থাকে, সে কয় দিন মন্তাজের ভিটার পাশ দিয়ে লোক হাঁটে না, হাঁটলেও পা চালিয়ে পার হয়। মায়েরা সন্ধ্যার আগে ছেলেপুলে ঘরে তোলে। জ্বর হলে মানুষ লুকায়, কাশি এলে গিলে ফেলে; বুড়ারা ভোরবেলা উঠানে বের হয়ে জোরে জোরে হাঁটাহাঁটি করে, যেন পাড়াকে দেখানো দরকার, আছি। অথচ মরণ হয়ে গেলে সবার আগে তারা মন্তাজের দুয়ারেই আসে। রাতবিরাতে কপাট ধাক্কায়, মন্তাজ ভাই, ও মন্তাজ ভাই। মন্তাজ কোনোদিন না করে না, দেরিও করে না। আগাম খোঁড়া কবরের জন্য সে বাড়তি পয়সা নেয় না; একবার ওসমান জোর করে গুঁজে দিতে চাইলে সে হাত সরিয়ে বলেছিল, আগে খোঁড়া আর পরে খোঁড়ায় মাটির কুনো কম-বেশ নাই।
অভ্যাসটা কবে থেকে, এ নিয়ে নলডহরে কথার শেষ নাই।
কেউ কেউ বলে, শুরু সেই বন্যার বছরে। শ্রাবণ আর ভাদ্র, এই দুই মাসে এগারোজন গিয়েছিল সেবার; কেউ পানিতে ডুবে, কেউ সাপের কামড়ে, শেষ দিকে ওলাওঠায় এক বাড়ির তিনজন। রোজ রোজ ভেজা মাটি কাটা যায় না, কাটলেও পানি সেঁচে কূল পাওয়া যায় না; মন্তাজ তখন গোরস্থানের যে দিক একটু উঁচা, বালুমেশানো, সেই দিকে আগেভাগে দুটা তিনটা কবর কেটে রাখত, ওপরে চাটাই চাপা দিয়ে রাখত যাতে বৃষ্টি না ঢোকে। সে বছর কেউ কিছু মনে করেনি; বরং যে বাড়ির মরা, সে বাড়ির লোক তার হাত ধরে দোয়া করেছিল। তারপর আশ্বিনে পানি নেমে গেল, অভ্যাস নামল না। এ হলো এক দলের কথা, এবং এ দলে তারাই আছে, যারা দুনিয়ার সব কিছুর একটা সোজা কারণ থাকা পছন্দ করে।
আবার কেউ কেউ, বিশেষ করে মেয়েরা, বলে অন্য কথা। বলে, শুরু হালিমার থেকে। হালিমা মন্তাজের বউ; শক্ত গড়নের, কম কথার মানুষ; ধানের মৌসুমে সে-ও মানুষের খলায় কাজ করত। কার্তিকের এক জ্বরে সে পড়ল, আর উঠল না। যে রাতে হালিমা যায়, মন্তাজ তার পায়ের কাছে বসা ছিল; ভোরে লোকজন এসে কবরের কথা তুলতেই সে নাকি উঠানের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, অহনো না। বেলা চড়ল, সে ওঠে না; শেষে পাড়ার মানুষই খুঁড়ে দিল। তাড়াহুড়ার খোঁড়া; এক পাশ বাঁকা, তলায় ঢিবি, মাথার দিক চাপা। দাফনের পরের রাতে কে যেন দেখল, গোরস্থানে কুপি জ্বলে। কাছে গিয়ে দেখা গেল, মন্তাজ নতুন কবরের গায়ের মাটি দুই হাতে চাপড়ে চাপড়ে সমান করছে, যেমন করে মায়েরা ঘুমের ভেতর ছেলের কাঁথা ঠিক করে দেয়। সেই থেকে, মেয়েরা বলে, মন্তাজ আর কোনো মরণকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা দিতে দেয় না। কোন কথা সত্য, বন্যা না হালিমা, তা নিয়ে মাঝেমধ্যে তর্ক ওঠে, মীমাংসা হয় না। দুটাই সত্য হতে পারে, এ কথা বলার মানুষ নলডহরে কম।
বুড়া মোবারক মুয়াজ্জিন আরো পুরানা কথা টানে। বলে, মন্তাজকে কোদাল ধরা শিখিয়েছিল যে ওস্তাদ, সেই দরাজ গোরখোদকও শেষ বয়সে আগাম কাটত, আর তার বেলাতেও নাকি মিলে যেত। অন্য বুড়ারা মানে না; বলে, মোবারকের মনে রাখার বয়স গেছে, সে এখন যা মনে করতে চায় তা-ই মনে করে।
আবেদ মাস্টার এক সময় খাতা রাখত। কোন তারিখে কোদাল ধরা হলো, কোন তারিখে জানাজা, মাঝখানে কয় দিন। খাতায় দেখা যায়, কোনোবার এক দিন, কোনোবার চার দিন, একবার উনিশ দিন; আবার হাসু পাগলা যেবার দহের পানিতে ডুবে মরল, সেবার কোদালই ধরা হয়নি, মন্তাজ নিজে জ্বরে পড়া ছিল। খাতা কিছুই প্রমাণ করে না, না এদিকে, না ওদিকে। মাস্টার শেষে খাতা রাখা ছেড়ে দেয়, তবে কথায় কথায় বলে, কাকতাল, সব কাকতাল। যারা শোনে তারা মাথা নাড়ে, মুখে বলে হ মাস্টার, ঠিক কথা, আর ঘরে ফিরে দুয়ারের খিল আরেকবার টেনে দেখে।
মন্তাজকে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করার সাহস বেশি মানুষের হয়নি। মোবারক মুয়াজ্জিন একবার মসজিদের ঘাটলায় বসে জিজ্ঞেস করেছিল, তুই টের পাস ক্যামনে রে? মন্তাজ বলেছিল, ঘুম ভাঙি যায়। আরেকবার একই প্রশ্নে বলেছিল, হাতের তালু চুলকায়। আরেকবার, মাগরিবের পরে, অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কী মনে করে বলেছিল, মাটি হা কইরা থাকলে ঘুমান যায় না। কোনটা ঠাট্টা আর কোনটা সত্য, মোবারক আলাদা করতে পারেনি, এবং এরপর থেকে সে-ও আর জিজ্ঞেস করেনি।
নলডহরে মন্তাজের দিন কাটে একরকম করে। হাটবারে সে মাছ কিনতে গেলে নিবারণ মাছওয়ালা পয়সা হাত থেকে নেয় না, বলে, মাচায় থো। চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে গেলে বেঞ্চিতে জায়গা থাকে, তবু লোকে চাপাচাপি করে বসে জায়গা ভরাট করে ফেলে। তার এক মেয়ে আছে, ভাটির দিকে বিয়া দেওয়া; বছরে একবারও আসে না। জামাইবাড়ির ধারণা, বাপের ছায়া মেয়ের সঙ্গে সঙ্গে যায়। মন্তাজ কারো দোষ ধরে না। ধান ভাঙানোর মিলের পেছনে তার এক চিলতা ভিটা, একটা ঘর, ঘরের বেড়ায় ঝুলানো কোদাল, এই নিয়ে সে থাকে। কোদাল সে নিজে বাঁধে; হাতল ক্ষয় হলে জামগাছের ডাল চেঁছে নতুন হাতল বসায়, ফলা সেই পুরানাই থাকে। কামারশালায় ধার দিতে নিয়ে গেলে কামার জিনিসটা ছোঁয় খুব সাবধানে, যেন গরম।
মানুষের দিকে মন্তাজ সোজা তাকায় না। কথা বলার সময় মাটির দিকে চেয়ে থাকে, নয় নিজের হাতের দিকে। এরতো কোনো কারণ আছে, যা সে কাউকে বলেনি। বহু বছর আগে, হাটের ভিড়ের মধ্যে, সে হঠাৎ টের পেয়েছিল, সে একটা অচেনা লোকের কাঁধ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত চোখ বুলাচ্ছে; যেমন করে সুতা ফেলার আগে করাতি গাছের গুঁড়িটা দেখে নেয়, তেমন করে। লোকটা তখন মিহি সুরে শুঁটকির দরদাম করছিল, কিছুই জানত না। সেই দিন থেকে মন্তাজ হাটে গেলে চোখ নামিয়ে হাঁটে।
ইউনুস এসবের ধার ধারে না। বাপমরা ছেলে, মা মানুষের বাড়ি কাজ করে; স্কুলের পথ গোরস্থানের পাশ দিয়ে, আর ইউনুস স্কুলের চেয়ে পথই বেশি চেনে। প্রথমে সে বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখত। তারপর একদিন ভেতরে ঢুকে মাটির ঝুড়ি টেনে সরিয়ে দিল, মন্তাজ কিছু বলল না; সেই থেকে সে মাঝে মাঝে আসে, মাটি টানে, ঝুড়ি ধরে, কবরের কিনারে উবু হয়ে বসে প্রশ্ন করে। মন্তাজ তাকে কোদাল ধরতে দেয় না। একদিন বলেছিল, এইটা ধরনের জিনিস না রে, এইটা ধরা পড়নের জিনিস। কথার মানে ইউনুস বোঝেনি, মন্তাজ বুঝিয়েও দেয়নি। ইউনুসের মা টের পেলে ছেলের কান ধরে নিয়ে যায়, দুই দিন পরে ছেলে আবার আসে। এভাবে চলে।
পৌষের শেষে মন্তাজ আবার কোদাল ধরে।
এবার দেখে খড়ি কুড়ানো দুই ছেমড়ি, এবং সন্ধ্যার আগে খবর রটে যায় যথারীতি। নলডহর নিঃশ্বাস চেপে অপেক্ষা করে। কিন্তু কেউ মরে না।
সাত দিন যায়। দশ দিন। জ্বর হলে মানুষ লুকায়, কাশি এলে বালিশে মুখ গোঁজে; ছেলেপুলেরা গাছে ওঠা বন্ধ করে, সাঁকো পার হয় হামাগুড়ি দিয়ে। বুড়া রহিমুদ্দিনের বুকে ব্যথা উঠেছিল এক রাতে, সে বাড়ির কাউকে বলেনি, পাছে কথাটা বাইরে যায়; ভোরে ব্যথা নামলে সে উঠানে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে গলা খাঁকারি দিয়েছে, যাতে পাড়া শোনে। মাপ নিয়েও কথা চলে। কেউ বলে এবারেরটা লম্বায় বেশি, তাহলে লম্বা মানুষ; কেউ বলে না, মাঝারি, বরং চওড়ায় কম; আর যে যা বলে, শুনে অন্যরা আগে নিজের ঘরের মানুষগুলার গড়ন মনে করে নেয়, তারপর স্বস্তি বা অস্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে যায়। কেউ কেউ ঘুরপথে হাটে যায়, গোরস্থানের ধার মাড়ায় না; আবার কেউ কেউ না গিয়ে পারে না, বেড়ার ফাঁকে উঁকি দিয়ে দেখে। খালি। কবর হা করে পড়ে আছে, ভেতরে দুপুরে রোদ নামে, বিকালে ছায়া। এক রাতের বৃষ্টিতে তলায় এক আঙুল পানি জমেছিল, মন্তাজ ভোরে তা সেঁচে দিয়েছে, যেন ঘরদোর নিকানো হচ্ছে।
তেইশ দিনের দিন আফসার মোল্লা দলবল নিয়ে মন্তাজের উঠানে আসে। সঙ্গে ইমাম, আবেদ মাস্টার, আরো জনা দশেক। ইমাম নরম গলায় শুরু করে; বলে, আগাম কব্বর কাটনের হুকুম শরায় নাই মন্তাজ, মউতের খবর গায়েবের খবর, ওই খবর লয়া টানাটানি ভালা না। আফসার মোল্লা অত ঘোরে না; বলে, গেরামের মাইনষে ঘুমাইতে পারে না। পোলাপান ইশকুলে যায় না। তুই কাইলের মইদ্যে ভরাট কর।
মন্তাজ উঠানের মাটির দিকে তাকিয়ে সব শোনে। তারপর বলে, আইচ্ছা।
পরদিন ভোরে সে একলা গিয়ে কবর ভরাট করে। তোলা মাটি যেমন করে সাজানো ছিল তেমনি করে নামায়, পায়ে চেপে চেপে সমান করে, ওপরে চাটাই বিছিয়ে রাখে, যেন কিছু ছিলই না। তবু জায়গাটা একটু উঁচা হয়ে থাকে, নতুন কবর যেমন থাকে; এবং সেই উঁচার দিকে তাকালে কারো কারো গা শিরশির করে। কী নাই সেখানে ভাবলে, নাকি কী আছে ভাবলে, তা অবশ্য তারা ঠাহর করতে পারে না।
তারপর যা ঘটে, তা নলডহরের কেউ ভাবেনি। কিছুই ঘটে না।
মাঘ মাস পার হয়ে যায়, কেউ মরে না। এমন মাস নলডহরে আগে যে আসেনি তা না, কিন্তু এবারের না-মরা যেন আলাদা জিনিস; এটা যেন প্রমাণ। মাস্টার দোকানে বসে গলা উঁচায়, কইছিলাম না, কাকতাল। এবার মানুষ মুখে হ বলার সঙ্গে সঙ্গে মনেও খানিক মানে। যা রটে তার সব ঘটে না, এই সোজা কথা গ্রামের বাতাসে ফিরে আসে, এবং বাতাস হালকা হয়।
মকবুলই প্রথম ডাকে। মন্তাজ দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, মকবুল কেতলি নামিয়ে বলে, ও মিয়া, খাড়ায়া গেলি ক্যা, ব। বেঞ্চির কিনারে মন্তাজ বসে; কাপ হাতে নিয়ে টের পায় হাত কাঁপছে, চা ছলকে পড়ে; মকবুল না দেখার ভান করে আরেক কাপ ঢেলে দেয়। এরপর হাটবারে নিবারণ একদিন মাছ সোজা তার হাতে তুলে দেয়, ভাংতি পয়সাও হাতে গুনে দেয়, এবং দিয়ে নিজেই কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। ইউনুসের মা আর ছেলের কান ধরে না। রহিমুদ্দিনের নাতনির আকিকায় মন্তাজের দাওয়াত হয়, সে শেষ বেলায় গিয়ে এক কোণে বসে দুই লোকমা খায়, কেউ উঠে যায় না। সন্ধ্যার দোকানে তার বসার জায়গাও দাঁড়িয়ে যায়, বেঞ্চির পুবের কোণা; কেউ তাকে কথায় টানে না বটে, তবে তার সামনে অন্যদের কথা চলে, ধানের দর, বান্ধের কাজ, কার গরু হারাল; এবং এই চলাই মন্তাজের কাছে অনেক।
রাতে শুয়ে মন্তাজ হিসাব মেলায়। যদি সবই কাকতাল, তাহলে এতগুলা বছর সে কী বহন করল; মানুষের এড়িয়ে চলা, মেয়ের না-আসা, হাটে নামানো চোখ, এসবের তাহলে কোনো মানে ছিল না। ভাবনা তাকে হালকা করে না। কেমন খালি করে দেয়, খালি কবরের মতো।
এক সন্ধ্যায় দোকানে ভিড় ছিল। মকবুল উনানের ওপর ঝুঁকে বড় কেতলি উঁচা করে চা ঢালছিল; আগুনের আলোয় তার ঘাড়, পিঠের লম্বা রেখা; এবং মন্তাজ টের পায়, সে মাপছে। ঘাড় থেকে কোমর, কোমর থেকে, সে চোখ টেনে নামিয়ে ফেলে, কিন্তু ততক্ষণে মাপ নেওয়া হয়ে গেছে, সে জানে। পয়সাটা বেঞ্চির ওপর রেখে সে উঠে পড়ে। মকবুল পেছন থেকে ডাকে, আরে চা-টা খায়া যা। সে ফিরেও তাকায় না। সে রাতে সে ভাত খায়নি।
দিন পাঁচেক পরে, ফাল্গুনের মাঝামাঝি, শেষরাতে তার ঘুম ভেঙে যায়।
বুকের ওপর ভেজা মাটির মতো ভার; হাতের তালুতে সেই চুলকানি, চামড়ার নিচে, নখ দিয়ে যেখানে পৌঁছানো যায় না। বাইরে কুয়াশা পড়ছিল, টিনের চালে শিশিরের টুপটাপ। মন্তাজ ওঠে না। পাশ ফিরে দুই হাত রানের নিচে চাপা দিয়ে শুয়ে থাকে এবং ফজরের আজান পর্যন্ত জেগে থাকে। আজানের গলা বুড়া মোবারকের; এত বছরে গলা ক্ষয়ে সরু হয়ে গেছে, তবু ভোরের ঠান্ডা বাতাসে ওই সরু সুতাই গ্রামের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত টান টান হয়ে থাকে। মন্তাজ শুয়ে শুয়ে শোনে, আর ভাবে, আজ কিছু করবে না, আজ কোথাও যাবে না।
তবু ভোরে সে বেড়া থেকে কোদাল নামায়। হাতলে একবার হাত বুলায়, যেমন করে মানুষ পোষা গরুর গলায় হাত বুলায়। তারপর সেটা কাঁধে নিয়ে সে মরা গাঙের দিকে যায়; গ্রামের গা ঘেঁষে যে গাঙ, বর্ষা ছাড়া যাতে পানি থাকে না, থাকে শুধু কালো কাদা আর কচুরির শুকনা দাগ। সেই কাদায় নেমে সে কোদাল পুঁতে দেয়। খাড়া করে না; লম্বা করে, শুইয়ে, যেমন করে মানুষকে শোয়ায়। ওপরে কাদা চাপা দিয়ে দুই হাতে সমান করে সে উঠে আসে এবং পেছন ফিরে তাকায় না। কেউ দেখেনি ভাবলে ভুল হবে; খেজুরগাছের মাথা থেকে ছইমুদ্দিন দেখেছিল, তবে সে কাউকে বলেনি, কারণ কী বলবে সে নিজেই ঠিক করতে পারেনি। মানুষ কোদাল পোঁতে, এ কথার কোনো মানে হয় না, আর মানে হয় না বলেই কথাটা তার ভেতরে কাঁটার মতো আটকে ছিল বহুদিন।
সেই দিন আর তার পরের দুই দিন মন্তাজ ঘরের কাজ করে। চালের ফুটা বাঁধে, বেড়ার দড়ি পাল্টায়, উঠানের ঘাস চাঁছে; যে কাজগুলা বছরের পর বছর পড়ে ছিল, কারণ যে মানুষের হাতে কোদাল থাকে তার হাতে অন্য কাজ ওঠে না। রাতে ভার নামে, তালু জ্বলে; সে ওঠে না। খুঁড়লে যদি হয়, তাহলে না খুঁড়লে হবে না; এই একটা কথা সে দুই হাতে ধরে রাখে, যেমন ডুবন্ত মানুষ খড় ধরে। তৃতীয় রাতে ভার এত নামে যে তার মনে হয় বুকের ওপর কেউ মাটি ফেলছে, এক ঝুড়ি, আর এক ঝুড়ি; সে উঠানে বের হয়ে দাঁড়ায়, আকাশে কাটা চাঁদ, শিশিরে ভেজা ঘাস, কোথাও কিছু না। সে নিজেকে বলে, কিছু না। ঘরে ঢুকে সে দুয়ারে খিল দেয়, জীবনে যা সে কোনোদিন দেয়নি।
চতুর্থ দিন সন্ধ্যায় মকবুল দোকানের ঝাঁপ ফেলছিল। ফেলতে ফেলতে সে উবু হয়ে বসে পড়ে, আর ওঠে না। লোকজন ধরাধরি করে তাকে ভেতরে নেয়, চোখেমুখে পানি দেয়, বুকে ডলা দেয়; মাগরিবের আজানের আগে সব শেষ।
সেই রাতেই আকাশ ভাঙে। অসময়ের বৃষ্টি, সঙ্গে বাতাস; ফাল্গুন মাসে এমন পানি নলডহরের বুড়ারাও বেশি দেখেনি। মন্তাজের দুয়ারে যখন ধাক্কা পড়ে, মন্তাজ ভাই, ও মন্তাজ ভাই, সে জেগেই ছিল। কপাট খুলতে দেখা যায় ওসমান আর জনা তিনেক মানুষ, মাথায় ছালা, হাতে হারিকেন; আলো নিচ থেকে তাদের মুখে পড়েছে, মুখগুলা তাতে অচেনা লাগছে। ওসমান বলে, মকবুল গেছে গা। তারপর মন্তাজের খালি হাতের দিকে তাকিয়ে বলে, তর কোদাল কই?
নাই, মন্তাজ বলে।
নাই মানে?
নাই।
এই কথার মানে বোঝার সময় সে রাতে কারো ছিল না। মকবুলের বাপ-দাদার কবর গোরস্থানের গাঙের দিকের নিচু কোণায়; নিয়মমতো তার জায়গা সেখানেই, বাপের পাশে। খেতের কোদাল, শাবল, বেলচা, যার হাতে যা ছিল তা-ই নিয়ে চারজন নামে, এবং দুই কোপ যেতে না যেতে বোঝা যায়, মাটি কথা শুনবে না। পানি ওঠে। দেয়াল ধসে। এক পাশে বাঁশের চটা ঠেকা দিয়ে, টিনের কৌটা দিয়ে পানি সেঁচতে সেঁচতে তারা খোঁড়ে, আর বৃষ্টি নামতেই থাকে। চাটাইয়ের নিচে খাটিয়ার ওপর মকবুল ভিজতে থাকে। হারিকেনের আলো কাঁপে। মন্তাজ কিনারে দাঁড়িয়ে ছিল সারা রাত; দড়ি এগিয়ে দিয়েছে, বাঁশ ধরেছে, নিজের চাদর খুলে চাটাইয়ের ওপর বিছিয়ে দিয়েছে; কিন্তু গর্তে নামেনি, কেউ তাকে নামতে বলেওনি। উঁচু দিকের শুকনা জায়গা সে চেনে, অন্ধকারেও হাত দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারত; কিন্তু বাপের পাশ ছেড়ে মরা মানুষকে অন্য জায়গায় শোয়ানোর কথা সে রাতে কে শোনে, আর শুনলেও মন্তাজের মুখের কথা সে রাতে কার গলা দিয়ে নামত। ফজরের পরে, আধা-অন্ধকারে, কাদার ভেতরে মকবুলকে শোয়ানো হয়। মাটি চাপা দেওয়ার শব্দটা অন্যদিনের মতো শুকনা থপথপ না; ভেজা, চটচটে, যেন মাটি নিজেই নিতে চাইছে না।
ফেরার পথে, অন্ধকারে, ভিড়ের ভেতর থেকে কে যেন নিচু গলায় বলে, তুই তো জানতি।
কে বলল মন্তাজ দেখেনি। না দেখাই ভালো হয়েছে; কারণ পরে তার বারবার মনে হয়েছে, গলাটা যে কারোরই হতে পারত।
এরপরের নলডহর আগের নলডহর না। আগে তারা ভয় পেত, সে খোঁড়ে বলে। এখন তারা ক্ষমা করতে পারে না, সে খোঁড়েনি বলে। খবরের ধরনও পাল্টে গেছে; আগে রটত, মন্তাজ কোদাল ধরছে; এখন ফিসফিস চলে, মন্তাজ কোদাল ছাড়ছে, এবং এই ছাড়ার ভেতরে যে কী আছে, কার ওপর কোন রাগ, কোন পুরানা হিসাব, তা কেউ ভেঙে বলে না। মকবুলের বউ মন্তাজের সামনে পড়লে ঘোমটা টেনে মুখ ফিরিয়ে নেয়। দোকান এখন মকবুলের ভাই চালায়; বেঞ্চির পুবের কোণা খালিই পড়ে থাকে, কেউ বসে না, মন্তাজও না, মন্তাজ ওই পথেই আর যায় না। নিবারণ আবার পয়সা মাচায় রাখতে বলে; বলতে গিয়ে তার গলা একটু নামে, এই যা। মাস্টার আর কাকতালের কথা তোলে না; একদিন শুধু আপনমনে বলেছিল, খাতাটা রাখলে এখন কাজে লাগত। কী কাজে লাগত, সে নিজেও জানে না; হিসাব তো দুই দিকেই সমান।
মন্তাজ রাতে শুয়ে দুই হিসাব মেলাতে পারে না। খুঁড়ে রাখলে মানুষ মরে, এ কথা যদি মিছা হয়, তাহলে না খুঁড়লেও মরে; মকবুল তো মরেছেই। তাহলে সে নির্দোষ; তাহলে এতকালের সব আগাম খোঁড়া শুধু মাটি কাটাকাটি, আর কিছু না। এই পর্যন্ত এসে হিসাব সোজা থাকে। কিন্তু তারপরই মনে পড়ে উনানের আলোয় কেতলির ওপর ঝুঁকে থাকা পিঠটা, আর নিজের চোখের সেই মাপ নেওয়া; এবং তখন আরেকটা হিসাব মাথা তোলে, যে হিসাবে কোদাল লাগে না, চোখই যথেষ্ট। কোনটা আগে, চোখ না মরণ, মরণ না চোখ। এই জায়গায় এসে মন্তাজ প্রতি রাতে আটকে যায়, এবং ভোরের দিকে তার মনে হয়, নলডহরের মানুষ যা জানে না, সে নিজেও তা জানে না; তফাত শুধু এই যে, তাদের না-জানাটা তাদের ঘুমাতে দেয়, তারটা দেয় না।
চৈত্র মাসে মরা গাঙ ফাটে। কালো কাদা শুকিয়ে সাদাটে হয়, চৌকা চৌকা ফাট ধরে, ফাটের ভেতর দিয়ে নিচের ভেজা অন্ধকার দেখা যায়। এক ভোরে মন্তাজ গাঙে নামে। যেখানে পুঁতেছিল, সেখানে কোদালের হাতলটা জেগে উঠেছে, হাড়ের মতো সাদা। সে দুই হাতে ধরে টান দেয়; শুকনা কাদা কড়কড় করে ছাড়ে। ফলার গায়ে মরচে ধরেছে, লালচে, পুরানা ঘায়ের মতো। গাঙের এক গর্তে যেটুকু ঘোলা পানি জমে আছে, তাতে সে ফলাটা দুইবার চুবিয়ে নেয়। ধোয়া হয় না, সে জানে; মরচে ধুইলে যায় না, ক্ষয় হলে যায়।
গোরস্থানে শিমুল ফুটেছে। ডালে ডালে লাল, আর তলায় খানিক পরপর ঝরা ফুলের ভারী শব্দ, থপ, থপ, কোদালের কোপের মতো। মন্তাজ উঁচু দিকটায় গিয়ে দাঁড়ায়, জায়গা দেখে, পা দিয়ে মাটি টিপে দেখে, তারপর কোপ দেয়।
ইউনুস আসে ক্লাস পালিয়ে, কাঁধে বইয়ের ব্যাগ। মায়ের নিষেধ আছে, এখন আগের চেয়ে কড়া নিষেধ; তবু সে বেড়া ডিঙায়। কিনারে উবু হয়ে বসে সে খানিকক্ষণ মাটি তোলা দেখে। তারপর জিজ্ঞেস করে, ক্যাডা মরছে?
কেউ মরে নাই, মন্তাজ বলে।
তাইলে কার লাইগা?
জানি না, মন্তাজ বলে, এবং কোপ দেয়। থপ। কাঁচা মাটির গন্ধ উঠছে, ঠান্ডা, ভেজা, সেই পুরানা গন্ধ, যে গন্ধ নলডহরের মানুষের কাছে ভয়ের, আর মন্তাজের কাছে শুধু কাজের।
খোঁড়া শেষ হলে সে ভেতরে নামে, চিত হয়ে শোয়। মাথার ওপরে শিমুলের ডাল, ডালের ফাঁকে চৈত্রের সাদা আকাশ, অনেক উঁচায় একটা চিল, ডাকে না, শুধু ঘোরে। মাটির ঠান্ডা পিঠ বেয়ে উঠছে। আরামের ঠান্ডা, না অন্য কিছুর, সে ভাবে না; সে শুধু শুয়ে থাকে, আর এতকালের অভ্যাসমতো শরীরটা নিজে নিজেই মাপ নিতে থাকে, লম্বায়, পাশে, গভীরে।
কিনার থেকে একটা ছায়া এসে পড়ে তার মুখের ওপর। ইউনুস ঝুঁকে আছে, আকাশ আড়াল করে।
উঠবা না? ছেলেটা জিজ্ঞেস করে।
©somewhere in net ltd.