| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

এক
মোখলেস মিয়াকে আমি বারোবার মরতে দেখেছি। প্রতিবার তাঁকে মেরেছে আলাদা একজন মানুষ।
প্রথমবার কে মেরেছিল, সেই নাম আমি জানি না। আমি জানি নয়জনের নাম। থানায় হাজত খাতার বাঁধাইয়ের গায়ে পেনসিলে লেখা আছে তাদের নাম। প্রত্যেকটির পাশে কারণ লেখা, শুধু একজনের কারণ আমি আজও লিখতে পারিনি।
বাকি তিনবারের হিসাব আমার কাছে নাই, আর ওই তিনের একবার হলো সবার প্রথমবার। কে মেরেছিল, তা জানার জন্যই আমি বাকি এগারোবার দাঁড়িয়ে ছিলাম ওই বারান্দায়।
মোখলেস মিয়াকে প্রথমদিন বিকালে ধরে আনা হয়। নালিশ করেছেন কাঁকরদহের ময়েজ শেখ। তাঁর খোঁয়াড় থেকে একটি ছাগল হারিয়ে গেছে, আর ছাগল হারানোর আগের সন্ধ্যায় মোখলেস মিয়াকে ওই পথে দেখা গেছে। এইটুকুই মামলা। কাগজে এর বেশি কিছু নাই।
কথা হলো, মোখলেস মিয়া ছাগল চুরি করার লোক নন। তাঁর পেশা হল সাক্ষী।
ত্রিশ বছর ধরে তিন থানার আদালতে তিনি কাঠগড়ায় উঠে বলে এসেছেন, আমি স্বচক্ষে দেখিয়াছি। কী দেখেছেন তা মামলা অনুযায়ী বদলাত, বাক্যের গড়ন বদলাত না। উকিলেরা তাঁকে ডাকতেন নাম ধরে, মুহুরিরা ডাকতেন চাচা বলে, আর গ্রামের লোকে তাঁকে ডাকত না, দূর থেকে দেখলে পথ বদলে নিত।
এই লোককে ছাগল চুরির নালিশে ধরে আনা হয়েছে। নাটক আর কাকে বলে!
সন্ধ্যায় তাঁকে ভাত দেওয়া হয়। তিনি ভাত শেষ না করে, অর্ধেক রেখে থালা সরিয়ে রাখেন গরাদের গোড়ায়, তারপর দুই হাঁটু বুকের কাছে তুলে নিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকেন। আমি লণ্ঠন নামিয়ে রাখি বারান্দার শেষ থামের গোড়ায়, যাতে আলো তাঁর মুখে না পড়ে, কারণ আলো মুখে পড়লে হাজতের লোক সারারাত ঘুমাতে পারে না, আর ঘুমাতে না পারলে সকালের জিজ্ঞাসাবাদে সে উল্টাপাল্টা বলে।
থানায় আমার ডিউটি রাতেই আর বরইতলা থানার রাত আমি চোখ বুজেও বলে দিতে পারি। উঠানের মাঝখানে কুয়া, কুয়ার বাঁধানো পাড় সারা বছর শ্যাওলায় পিছল হয়ে থাকে। কুয়ার ওপাশে রান্নাঘর, রান্নাঘরের দাওয়ায় নূরু ছাই ফেলে রাখে। ছাইয়ের গন্ধ রাতের দিকে ভারী হয়ে নেমে আসে উঠানে, আর ওই গন্ধ পেলে বুঝতে পারি রাত কত গভীর হলো, কারণ থানায় ঘড়ি আছে একটিই এবং সেটি বড় ঘরে তালাবদ্ধ।
তিন প্রহরের দিকে আমার তন্দ্রা ছুটে যায় বাইরের কুকুরের ডাকে। আমি উঠে গিয়ে গরাদে লণ্ঠন ধরি।
মোখলেস মিয়া কাত হয়ে পড়ে আছেন মেঝেতে। ডান কানের উপরে, ঠিক যেখানে চুল পাতলা হয়ে এসেছে, সেখানে একটি ভাঙা জায়গা। রক্ত বেশি নাই। যতটুকু বেরিয়েছে ততটুকু মেঝের ঢাল বরাবর গড়িয়ে গিয়ে থেমে আছে চৌকাঠের কাছে।
গরাদের দরজায় তালা লাগানো। চাবি ঝুলে আছে অপর পাশের দেয়ালের পেরেকে।
বাকি রাত কীভাবে কাটে সে বৃত্তান্ত লেখার দরকার নাই। ভোরে দারোগা নেয়ামত আলি আসেন, হরিহর ডাক্তার আসেন, ময়েজ শেখ এসে নালিশ তুলে নিতে চান এবং তাঁকে ধমক দিয়ে বসিয়ে রাখা হয় বারান্দায়। আমাকে কেউ কিছু বলে না। কেউ কিছু না বললে বুঝে নিতে হয়, দোষ কার ঘাড়ে যাবে তা এখনো ঠিক হয়নি।
সকালের হাজিরা বসে বড় ঘরের সামনে। সেপাইরা সারি বেঁধে দাঁড়ায়। মুহুরি নাম ধরে ডাকেন, আর নাম শুনে যে যার মতো এগিয়ে গিয়ে হাজিরা বইয়ে সই দিয়ে আসে।
আমার নাম ডাকা হয়, — মকবুল হোসেন। আমি এগিয়ে গিয়ে কলম তুলে নিই।
কলমের ডগা কাগজ ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদ সরে যায় বাঁ দিক থেকে ডান দিকে।
আমি দাঁড়িয়ে আছি একই জায়গায়, হাতে একই কলম। মুহুরি নাম ডাকছেন। সারিতে রশিদ আমার পাশে দাঁড়িয়ে হাই তুলছে, যে হাই সে গতকাল সকালেও তুলেছিল, এবং হাই শেষে সে গতকালও কপালে হাত বুলিয়ে নিয়েছিল।
বারান্দায় ময়েজ শেখ নাই। হাজতে কেউ নাই। আজ বিকালে মোখলেস মিয়াকে ধরে আনা হবে।
দুই
সারাদিন আমি নিজেকে বোঝাই, স্বপ্ন দেখেছি, রাতের ধকলে মাথা এলোমেলো হয়ে গেছে। তবু দুপুরের দিকে সাহস করে বড় ঘরে ঢুকে দারোগা সাহেবকে বলি,
"স্যার, আজ রাতে হাজতে একজন মারা যাবে।"
তিনি কাগজ থেকে মুখ তোলেন না। জিজ্ঞাসা করেন,
"হাজতে আসামি আছে কয়জন?"
"বলি, একজনও না।"
"তাহলে মরবে কে?"
আমি বলি,
"বিকালে যাকে আনা হবে।"
তিনি এবার মুখ তুলে খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তাকিয়ে থেকে কলমের ঢাকনা লাগিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন, যাকে এখনো আনা হয়নি তার নামে আগাম রিপোর্ট লেখা যায় না। কারণ রিপোর্টে তারিখ বসাতে হয়, আর ঘটনার তারিখ ঘটনার আগে বসে না। তারপর বলেন,
"তুমি বরং একটু ঘুমিয়ে নাও গিয়ে।"
কিছু না বলে আমি বেরিয়ে আসি।
বিকালে রশিদ আর আমি কাঁকরদহে গিয়ে মোখলেস মিয়াকে ধরে আনি। পথে তিনি ঠিক সেই কথাই বলেন যা তিনি কাল বলেছিলেন।
"ছাগল আমি নেই নাই, বাজান। ছাগল গেছে বেড়ার ফাঁক দিয়া।"
তারপর চুপ করে গিয়ে পুরো পথে আর কোনো কথা বলেন না।
স্বপ্ন তো এমন হয় না। স্বপ্নে কথা এত পরিষ্কার থাকে না।
সেই রাতে আমি স্থির বসে থাকতে পারি না। সারারাত বারান্দায় পায়চারি করি গরাদের সামনে দিয়ে, এ মাথা থেকে ও মাথা, ও মাথা থেকে এ মাথা। মোখলেস মিয়া দুই একবার চোখ খুলে আমাকে দেখেন, তারপর আবার চোখ বুজে নেন। লোকটির ভয় নাই। এত বছর মিথ্যা বলে যে লোক পার পেয়ে গেছে, তার ভয় থাকে না।
তিন প্রহরের কিছু আগে আমার প্রস্রাবের বেগ আসে। আমি দ্রুত উঠান পেরিয়ে চলে যাই থানার পিছনে কলতলায়। যেতে আসতে যতটুকু সময় লাগার, ততটুকুই লাগে।
ফিরে এসে দেখি মোখলেস মিয়ার গলায় তাঁরই গামছা পেঁচানো, আর গামছার দুই মাথা বাঁধা গরাদের দুই শিকের সঙ্গে। শরীর ঝুলছে না, বসে আছে, কারণ গরাদ নিচু।
রান্নাঘরের দাওয়ায় ছাইয়ের পাশে পড়ে আছে নূরুর তামাকের ডিব্বা। নূরু থানার রাঁধুনি। ডিব্বা সে কোথাও ফেলে যায় না, রাতে বালিশের নিচে রেখে ঘুমায়।
সকালে হাজিরায় কলম ধরতেই রোদ আবার সরে যায়।
ঘুম আর ফিরে আসে না। দুই রাতের জাগরণ নিয়ে আমি সেপাইদের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকি, অথচ দিন আবার পিছিয়ে গেছে। তখন হিসাবটা বুঝিনি। পরে বুঝেছি, দিন পিছিয়ে গেলেও আমার ক্লান্তি পিছিয়ে যায় না।
তিন
এবার আমি নূরুকে ধরি।
দুপুরে রান্নাঘরের পিছনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি, মোখলেস মিয়াকে সে চেনে কিনা। নূরু হাঁড়ির নিচে কাঠ ঠেলে দিতে দিতে বলে, চেনে।
"চিনুম না ক্যান। উনি আমার বড় ভাইরে ফাঁসিতে উঠাইছেন।"
তারপর হাঁড়ির ঢাকনা নামিয়ে রেখে সে হাত ধুয়ে নেয়, আর কিছু বলে না।
সেই বিকালে মোখলেস মিয়াকে আনার পর আমি তাঁর গামছা কেড়ে নিয়ে ভাঁজ করে তুলে রাখি বড় ঘরের আলমারির উপরের তাকে। কোমরের দড়ি খুলে নিই। সন্ধ্যার ভাত নূরুর হাত থেকে না নিয়ে নিজে বেড়ে দিই। রাতে রান্নাঘরের দরজায় বাইরে থেকে হুড়কা লাগিয়ে দিই, আর নূরু ভিতরে বসে গালাগাল করতে করতে এক সময় থেমে যায়।
তারপরও ঘটে।
শেষরাতে মোখলেস মিয়া পায়খানায় যাবেন বলে ডাকেন। ডাক শুনে আমি এগিয়ে যাওয়ার আগেই রশিদ উঠে পড়ে, দেয়ালের পেরেক থেকে চাবি নামিয়ে নেয়, বলে সে নিয়ে যাচ্ছে, আমি যেন বসি।
মোখলেস মিয়ার মাথা গিয়ে লাগে কুয়ার বাঁধানো পাড়ে।
রশিদ চিৎকার করে ডাকে। আমি লণ্ঠন নিয়ে দৌড়ে গিয়ে দেখি রশিদের চোখে পানি নাই।
"পিছলা খাইছে, ওস্তাদ। আমি ধরতে পারি নাই।"
মিথ্যা কি না জানি না। কিন্তু সত্যিই যদি সে ধরতে না পারত, তার হাত কাঁপত। রশিদের হাতে লণ্ঠনের আলো একটুও নড়ে না।
সকালে আবার সই। আবার রোদ সরে যায়।
এই তৃতীয়বার আমার হাত এত ভারী যে কলম ধরতে কষ্ট হয়। মুহুরি মুখ তুলে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেন,
"শরীর খারাপ নাকি?"
বলি,
"না।"
কী আর করা, না বলা ছাড়া তো উপায় নাই। হ্যাঁ বললে ছুটি হবে। ছুটি হলে রাতে থানায় থাকব না, আর রাতে থানায় না থাকলে মোখলেস মিয়া মরবেন এবং আমি জানব না কে মেরেছে।
চার
চতুর্থ দিনে আমি বুঝে নিই, বাধা দিলে ঘটনা থামে না, শুধু অন্যভাবে ঘটে।
তাই এবার আমি একাই সব করি। গামছা আর কোমরের দড়ি খুলে নিয়ে তুলে রাখি আলমারির উপরে। সন্ধ্যার ভাত নিজে বেড়ে দিই। পায়খানায় নিজে নিয়ে গিয়ে নিজে ফিরিয়ে এনে তালা লাগিয়ে চাবি গুঁজে রাখি কোমরে। রশিদকে বলে দিই,
“আজ তুই ছুঁবি না। ছুঁলে তোর নামে লিখিত দেব।”
এশার পর দারোগা নেয়ামত আলি বড় ঘর থেকে ডাক পাঠান। বলেন,
“আসামিকে একটু পাঠাও, দুইটা কথা জিজ্ঞাসা করব।”
আমি বলি,
“স্যার, এত রাতে?”
তিনি বলেন,
“রাতের বেলাই তো লোকে কথা বলে।”
আমি মোখলেস মিয়াকে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিই বড় ঘরের বেঞ্চে, তারপর দাঁড়িয়ে থাকি দরজার বাইরে। ভেতর থেকে কোনো গলার শব্দ আসে না, চেয়ার নড়ার শব্দও না। কিছুই শোনা যায় না। খানিক বাদে দরজা খুলে যায়। মোখলেস মিয়া হেঁটে বেরিয়ে আসেন, আবার হেঁটে হাজতে ঢুকে দেয়াল ঘেঁষে শুয়ে পড়েন।
তিন প্রহরে তিনি আর নিশ্বাস নেন না।
এবার শরীরে কোনো দাগ নাই। ডান কানের উপরের জায়গা অক্ষত, চুল পর্যন্ত এলোমেলো হয়নি। ভিতরে কী ভেঙেছে তা থেকে যায় ভিতরেই।
সকালে দারোগা সাহেব নিজের হাতে কাগজ লেখেন, আর লিখতে লিখতে আমাকে জিজ্ঞাসা করেন,
"রাতে চোখ লেগে গেছিল, তাই না মকবুল?"
আমি বলি,
"জি স্যার।"
জি বলা ছাড়া তখন আমার আর কিছু বলার ছিল না। এখন হলে বলতাম। কিন্তু এখন বলেই বা লাভ কী? কাল সকালে তো তিনি আবার নতুন করে জিজ্ঞাসা করবেন ওই একই কথা।
পাঁচ
পাঁচ নম্বর দিনে আমার মাথায় সহজ বুদ্ধি আসে। থানায় না রাখলেই তো হয়।
বিকালে মোখলেস মিয়াকে আনার পর আমি তাঁকে হাজতে না ঢুকিয়ে বারান্দায় বসিয়ে রাখি। সন্ধ্যা নামলে ফটক খুলে দিয়ে বলি,
“চাচা, আপনি বাড়ি যান।”
তিনি ওঠেন। ধুলা ঝেড়ে নিয়ে ফটক পেরিয়ে রাস্তায় নেমে কাঁকরদহের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। আমি ফটকে দাঁড়িয়ে দেখি, তাঁর সাদা পাঞ্জাবি অন্ধকারে মিশে যেতে যেতে একেবারে মিশে যায় না, বরং একখানা ফ্যাকাশে দাগের মতো ঝুলে থাকে পথের উপর।
একশো কদমের মাথায় দাগখানা থেমে যায়। তারপর ফিরে আসতে থাকে। মোখলেস মিয়া ফটকের ভিতরে ঢুকে আবার বারান্দায় বসে পড়েন।
"কাগজ ছাড়া বাইর হইলে তো আমি পলাতক, বাজান। পলাতকের ঘর নাই।"
আমি বলি,
"আমি কাগজ লিখে দিচ্ছি।"
তিনি হাসেন। বলেন,
"লেইখা দস্তখত করব কে?"
এই এক প্রশ্নে আমার সব বুদ্ধি লোপ পায়। জামিননামায় দারোগার দস্তখত লাগে, আর দারোগা সূর্য ডোবার পর কাগজে হাত দেন না। এই রেওয়াজ বরইতলা থানায় আমার জন্মের আগে থেকে চলে আসছে। সকাল হলে তিনি দস্তখত দেবেন। কিন্তু সকাল হলে তো রোদ সরে যাবে, আর মোখলেস মিয়া আবার কাঁকরদহে গিয়ে বসে থাকবেন, আর আমি আবার বিকালে গিয়ে তাঁকে ধরে আনব।
সেই রাতে তিনি হাজতের বাইরে মরেন, বারান্দার শেষ থামের গোড়ায়, যেখানে আমি লণ্ঠন রাখি।
ছয়
এরপর আমি থানার হাজত খাতা খুলি।
লম্বা খাতা, মলাট চটে গেছে। ভিতরে ছয়টি ঘরের তালিকা দেওয়া আছে: নাম ও পিতার নাম, সাং, আমদানির তারিখ ও সময়, মামলা নম্বর, ছাড়, মন্তব্য। প্রতিটি ঘর সরু, শুধু মন্তব্যের ঘর চওড়া। আসামির সঙ্গে যা কিছু ঘটে, অথচ নাম, তারিখ বা মামলা নম্বরের ঘরে লেখা যায় না, তা এই ঘরেই লিখতে হয়। ওই ঘরেই লেখা থাকে পলাইয়া গিয়াছে, ওই ঘরেই লেখা থাকে জামিনে খালাস, আর ওই ঘরেই লেখা থাকে মৃত্যুর কারণ।
খাতার ডান পাশে, মন্তব্যের ঘরের বাইরে, বাঁধাইয়ের গা ঘেঁষে খানিক সাদা জায়গা পড়ে থাকে। ওখানে আমি পেনসিল দিয়ে লিখি: নূরু, ভাই, ফাঁসি। রশিদ, বাপের জমি। নেয়ামত আলি, জানি না। লিখে খাতা বন্ধ করে তুলে রাখি টেবিলের নিচের তাকে।
পরদিন হাজিরার পর দৌড়ে গিয়ে খাতা নামিয়ে খুলি। লেখা আছে। তিনজনের নামই লেখা আছে, পেনসিলের আঁচড় ঠিক তেমনই আছে।
তার মানে পিছনে ফেরার সময় সবকিছু ফেরে না। পেনসিলের দাগ থেকে যায়।
এই আবিষ্কারের পর আমার কাজ বদলে যায়। খুন ঠেকানো আর প্রধান কাজ থাকে না, কারণ ঠেকানো যায় না, ঠেকালে শুধু হাত বদলায়। প্রধান কাজ হয়ে যায় নাম তোলা।
আমি জিজ্ঞাসা করতে শুরু করি। দুপুরে, বিকালে, মোখলেস মিয়াকে আনার আগে, যখন থানা ঝিমায় আর যে যার কাজে যে যার মতো ব্যস্ত থাকে, তখন আমি একজন একজন করে ধরি এবং জিজ্ঞাসা করি, মোখলেস মিয়াকে চেনেন কিনা।
কেউ না বলে না।
হরিহর ডাক্তার বলেন, তাঁর ছেলের নামে বিস্ফোরক মামলা হয়েছিল। ছেলে তখন কলেজের ছাত্র, আর সাক্ষী মোখলেস কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন ছেলেকে তিনি বোমা হাতে দেখেছেন। ছেলে সাত বছর পরে ছাড়া পেয়ে গ্রামে ফেরে। ফিরে এসে সে আর কারো সঙ্গে কথা বলে না, শুধু দুপুরবেলা গিয়ে বসে থাকে পুকুরপাড়ে।
হোটেলের জুম্মন বলে, তার বাপ হাজতে মরে গেছে। কোন মামলায়, সে জানে না। শুধু জানে সাক্ষী কে ছিল।
ঝাড়ুদার পঞ্চা বলে, তার নিজের নামে তিনখানা মামলা, তিনটিতেই সাক্ষী মোখলেস, অথচ সে জীবনে গরু চোখেও দেখেনি।
মোখলেস মিয়ার জামাই সফি বলে, শ্বশুরের ভয়ে সে বউকে বাপের বাড়ি পাঠায় না, বছরে একবারও না।
মরিয়ম বিবি কথা বলেন না। শুধু আঁচলের গেরো খুলে একখানা কাগজ বের করে বাড়িয়ে দেন আমার দিকে। পুরানো কাগজ, ভাঁজে ভাঁজে ছিঁড়ে গেছে। উপরে ছাপার অক্ষরে লেখা মৃত্যু পরোয়ানা। নিচে হাতে লেখা যে নাম বসানো, সেই নাম তাঁর স্বামীর।
সব মিলিয়ে নয়জন। নয়খানা নাম, নয়খানা কারণ।
ময়েজ শেখের নাম আমি সবার শেষে লিখি, কারণ তাঁর কথা বুঝতে আমার সময় লাগে। ছাগল তাঁর চুরি যায়নি। ছাগল তিনি নিজে বেচে দিয়ে এসেছেন হাটে, তারপর থানায় এসে নালিশ করেছেন।
"থানার ভিতরে একবার ঢুকলে মানুষ তো আর মানুষ থাকে না, স্যার। আমি খালি দেখবার চাইছিলাম, ঢুকলে উনার চেহারা কেমুন হয়।"
সাত
এরপরের দিনগুলি আমার হিসাবে গোলমাল হয়ে যায়, তবু যতটুকু মনে আছে ততটুকু লিখে রাখি।
জুম্মনের পালার দিন ভাতের ভিতরে কাঁচ ছিল। কাঁচ এত মিহি করে গুঁড়া করা যে ভাতে মিশে গেলে চোখে ধরা পড়ে না। জুম্মনের হাতে মিহি কাজ ভালো হয়, কারণ সে হোটেলে সারাদিন পিঁয়াজ কোটে।
সফির পালার দিন সে বালিশ নিয়ে আসে, শ্বশুরের জন্য বালিশ, আর হাজতে বালিশ নিষেধ নয়। বালিশ আমি ঢুকতে দিইনি। তবু ভোররাতে মোখলেস মিয়ার মুখের উপর ওই বালিশ ছিল, আর কে ঢুকিয়েছে সে কথা কেউ বলেনি।
হরিহর ডাক্তারের পালার দিন তিনি রক্তচাপ দেখতে আসেন। ডাক্তারকে ঠেকায় কে। হাজতের আসামির শরীর খারাপ হলে ডাক্তার ডাকতে হয়, ডাক্তার এলে তাঁকে ভিতরে ঢুকতে দিতে হয়, আর ভিতরে ঢুকে তিনি যা করেন তা তিনিই জানেন।
পঞ্চার পালার দিন দড়ি ছিল। দড়িকে আত্মহত্যা বলে চালানো সবচেয়ে সহজ, কারণ হাজতে আত্মহত্যা হলে কারো জবাবদিহি লাগে না।
মরিয়ম বিবির পালার দিন কলসির পানিতে কিছু মেশানো ছিল। মহিলা মানুষ থানার ভিতরে ঢোকেন না, কিন্তু কলসি ঢোকে।
ময়েজ শেখের পালার দিন কিছুই লাগে না। তিনি শুধু সন্ধ্যা থেকে বারান্দায় বসে থাকেন, আর মাঝরাতে মোখলেস মিয়া গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখতে দেখতে বসে পড়েন, তারপর আর ওঠেন না।
প্রতিবার আমি ঠেকাই। প্রতিবার আসে নতুন একজন। যত ঠেকাই, তত আসে নতুন হাত। আর আমার ফেরার জায়গা ছোট হয়ে আসতে থাকে।
প্রথমে ফিরতাম সকালের হাজিরায়। তারপর একদিন ফিরে দেখি বেলা দুপুর, উঠানের ছায়া খাটো। মোখলেস মিয়াকে ইতিমধ্যে ধরে আনা হয়ে গেছে। তার পরের বার চোখ মেলে দেখি সন্ধ্যা, হাতে লণ্ঠন, আর লণ্ঠনের বাঁট গরম। অর্থাৎ লণ্ঠনখানা আমি কিছুক্ষণ আগে ধরিয়েছি, আর ধরানোর কথা আমার মনে নাই। শেষদিকে ফিরি রাতে, গরাদের ঠিক সামনে দাঁড়ানো অবস্থায়, ডান হাতে লণ্ঠন আর বাঁ হাতে চাবি নিয়ে।
ওই রাতে চাবি বাঁ হাতে নিতে গিয়ে দেখি ডান হাতের গাঁটে চামড়া ছড়ে আছে। ছড়ে যাওয়া জায়গা শুকিয়ে খয়েরি হয়ে এসেছে, অর্থাৎ লেগেছে অনেক আগে। লণ্ঠনের বাঁট গরম দেখে আমি যে হিসাব কষেছিলাম, হাতের গাঁটের চামড়া দেখে সে হিসাব আর মেলে না।
দিন ফুরাতে থাকে দুই মাথা থেকে। যেটুকু বাকি থাকে সেটুকুর ভিতরেই কাজ সারতে হয়।
আমার ঘুম ফেরে না, ক্লান্তিও কমে না। বারান্দার এ মাথা থেকে ও মাথা যেতে এখন আমাকে একবার থামতে হয়। থানার সবকিছু প্রতি সকালে নতুন হয়ে যায়, শুধু আমার শরীরটা হয় না। প্রতিরাতের ক্লান্তি আমার শরীরে জমতে থাকে। যা জমে, তা কোথাও না কোথাও খরচ হয়।
আমার নাম এর মধ্যে হাজিরা বই থেকে মুছে যায়। মুহুরি একদিন নাম ডাকতে ডাকতে থেমে যান। খাতায় আঙুল বুলিয়ে বলেন,
"তোমার নাম তো নাই।"
বলি,
"তাহলে বসিয়ে দেন।"
তিনি বলেন,
"বসানো যায় না, উপরের অনুমতি লাগে।"
সেদিন থেকে আমি ডিউটি করি, বেতন পাই না, আর কেউ আপত্তিও করে না। থানায় একজন লোক যদি কাজ করে যায় এবং বিনিময়ে কিছু না চায়, তাহলে তাকে নিয়ে কে মাথা ঘামাবে।
দুই একজন আমাকে নাম ধরে ডাকা ছেড়ে দেয়। ডাকে, ও সেন্ট্রি।
আট
খাতার সাদা জায়গা ফুরিয়ে আসে।
নয়খানা নাম লেখা হয়ে গেছে, প্রত্যেকটির পাশে কারণ। কারণ লিখতে গিয়ে দেখি একই কয়টি শব্দ ঘুরেফিরে আসে— জমি, ফাঁসি, সাত বছর, মিথ্যা, দস্তখত। শব্দ কম পড়ে যায়, মানুষ কমে না। এই এলাকায় দুঃখের ভাণ্ডার বড় নয়, শুধু বণ্টন চওড়া হয়ে ছড়িয়ে গেছে।
একদিন দুপুরে আমি ফটক পেরিয়ে বেরিয়ে যাই। রাস্তায় নেমে হাঁটতে থাকি বেলতলির দিকে। বাজার ছাড়িয়ে, সাঁকো ছাড়িয়ে, তারপর বাস আসার জায়গায় গিয়ে বসে থাকি ছাউনির নিচে। কোথাও যাব না, শুধু থানায় থাকব না, এইটুকুই ইচ্ছা।
ছাউনির খুঁটিতে চুন দিয়ে কারা যেন নাম লিখে গেছে। সেই নামগুলির উপর দিয়ে নতুন করে আরো নাম লেখা হয়েছে, ফলে কোনোটিই আর পড়া যায় না। আমি ওই দিকে তাকিয়ে বসে থাকি। বাস আসে, লোক বাসে ওঠে, বাস চলে যায়। আমি উঠি না।
সন্ধ্যা নামে। ছাউনির নিচে বসে থাকতে থাকতে আমার হাতে এসে পড়ে লণ্ঠনের বাঁটের ভার। আর চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় হাজতের গরাদ। মানে আমি না গেলেও চলে। আমাকে ওখানে দরকার নাই, আমাকে শুধু বসানো হয় ওখানে। ওই রাতেই ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়। এত সহজ একটা কথা এত দিন বুঝিনি বলে নিজের ওপর রাগ হয়।
লোক তো নয়জনই। নয়জন ফুরালে তারপর কে আসবে?
আর নয়জনের ভিতরে একজনের ঘর খালি। নেয়ামত আলির নামের পাশে আমি কারণ বসাতে পারিনি, কারণ কোনো কারণ নাই। মোখলেস মিয়া তাঁর জমি নেননি, তাঁর ঘরের কাউকে কাঠগড়ায় তোলেননি, তাঁর নামে জীবনে একটি কথাও বলেননি। তবু নেয়ামত আলি রাতের বেলা ডেকে পাঠিয়েছেন, আর সকালে নিজের হাতে কাগজ লিখেছেন। তাঁর কোনো পাওনা ছিল না। তবু তিনিও মোখলেস মিয়ার বিরুদ্ধে গিয়েছেন।
তখন বুঝতে পারি, এটা শুধু খুন নয়। এর পেছনে একটা সারি আছে।
আদালতের বারান্দায় সারি হয়, রেশনের দোকানে সারি হয়, তহসিল অফিসে সারি হয়। সবাই নিজের কাজের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে, একজনের পর একজন সামনে যায়। মোখলেস মিয়ার ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। প্রতি রাতে একজন করে আসে, তার পর আরেকজন। সকালে সারি আবার নতুন করে শুরু হয়। এই কথা বুঝে ফেলার পর আর ঠেকাতে ইচ্ছা করে না। তবু ঠেকাই। অভ্যাস হয়ে গেছে।
নয়
শেষ যে রাত, সে রাতে কেউ আসে না।
আমি ফিরি গরাদের ঠিক সামনে দাঁড়ানো অবস্থায়। বাইরে বাতাস নাই। রান্নাঘরের দাওয়ায় নূরুর ডিব্বা নাই, কারণ নূরুর পালা শেষ। রশিদের বিছানায় কেউ নাই। বড় ঘরের বাতি নিভে গেছে। উঠানে ময়েজ শেখের বসার জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে, আর ওই জায়গার উপর দিয়ে ধীরেসুস্থে চলে যায় একটি বিড়াল।
সারি ফুরিয়ে গেছে।
আমি লণ্ঠন নামিয়ে রেখে গরাদের গোড়ায় বসে পড়ি। বসতে গিয়ে দেয়ালে হাত রাখতে হয়।
অনেকক্ষণ পর মোখলেস মিয়া কথা বলেন। এতগুলি রাতের ভিতরে এই প্রথম তিনি নিজে থেকে কথা বলেন।
"তোমার মামলার নম্বর কত, বাজান?"
আমি বলি,
"আমার কোনো মামলা নাই।"
"মামলা ছাড়া তো কেউ আমার কাছে বইসা থাকে না।"
আমি তখন যে প্রশ্ন এতগুলি রাত ধরে করিনি, সেই প্রশ্ন করি। জিজ্ঞাসা করি,
“আপনি মিথ্যা বলতেন কেন?”
তিনি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে জবাব দেন।
“কাউরে না কাউরে তো লাগত। আমি না খাড়াইলে আরেকজন খাড়াইত, আর তারে তোমরা চিনতা না।”
তারপর ছাদের দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি বলেন একখানা সন, একখানা গ্রামের নাম, আর একজন মানুষের নাম। সন হলো বড় বন্যার পরের বছর, গ্রামের নাম বেলতলি, আর মানুষের নাম আমজাদ হোসেন।
আমজাদ আমার বড় ভাই।
আমার বয়স তখন নয়। ভাইকে বাঁচাতে আমরা জমি বিক্রি করে মামলা চালাই। তবু ভাইয়ের ফাঁসি হয় মোখলেস মিয়ার সাক্ষ্যে। ফাঁসির পর ভিটেমাটিও বন্ধক রাখতে হয়। মা গিয়ে ওঠেন পিসির বাড়িতে। আমি অল্প বয়সে এই থানার বারান্দায় চা দিতে আসি। চা দিতে দিতে বড় হই। বড় হয়ে সেপাইয়ের পোশাক পাই। তারপর পাই এই চাবির দায়িত্ব।
মানে, যে লোক সাক্ষী দিয়ে আমার ভাইকে ফাঁসিতে তুলেছেন, সেই লোকই আমাকে এই বারান্দায় এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সাক্ষ্য না থাকলে আমি চাষ করতাম, কিংবা রিকশা চালাতাম, কিংবা শহরে গিয়ে হারিয়ে যেতাম। তাঁর সাক্ষ্য আছে বলেই আজ রাতে আমি এই চাবি হাতে নিয়ে বসে আছি তাঁর দরজার সামনে।
এই কথা কি আমি এতদিন জানতাম না? জানতাম। কিন্তু জানা আর মনে রাখা তো এক নয়। মনে রাখলে চাকরি হয় না।
মোখলেস মিয়া বলেন,
“ওই সাক্ষী মিথ্যা আছিল, বাজান।”
তারপর বলেন,
“তুমি এতগুলা রাইত ধইরা জিগাইলা না ক্যান।”
আমি কিছু বলি না। লণ্ঠনের তেল কমে এসেছে, শিখা নেমে গিয়ে নীল হয়ে যায়, তারপর নিভে যায়। এর পরের অংশ আমার মনে নাই।
দশ
যা মনে নেই, তা লেখার কথা নয়। তবু লিখতে হয়, কারণ কাগজে খালি রাখা যায় না।
সকালে হাজতের দরজা খোলা পাই। তালা ঝুলছে খোলা অবস্থায়, চাবি ঝুলছে পেরেকে। মোখলেস মিয়া কাত হয়ে পড়ে আছেন মেঝেতে। ডান কানের উপরে সেই এক জায়গা ভাঙা। রক্ত গড়িয়ে গিয়ে থেমে আছে চৌকাঠের কাছে, ঠিক যতদূর পর্যন্ত সেই প্রথম রাতে গিয়েছিল।
প্রথম রাতের মৃত্যু আর শেষ রাতের মৃত্যু এক। মাঝের নয়টি আলাদা। তাহলে সারির শেষ লোক আর সারির প্রথম লোক একই মানুষ।
উঠানে রোদ ওঠে। আমি বসে থাকি বারান্দার শেষ থামের গোড়ায়, ঠিক ওখানেই যেখানে আমি লণ্ঠন রাখি। রশিদ আমার পাশ দিয়ে চলে যায়, কিছু বলে না। নূরু উনুন ধরায়। ময়েজ শেখ আসেন নালিশ তুলে নেওয়ার জন্য, আর তাঁকে ধমক দিয়ে বসিয়ে রাখা হয় বারান্দায়।
হাজিরা বসে। মুহুরি নাম ডাকেন। আমার নাম ডাকা হয় না, কারণ খাতায় নাম নাই। তবু আমি এগিয়ে গিয়ে কলম তুলে নিই। কলমের ডগা কাগজ ছুঁয়ে থাকে। রোদ সরে না।
এগারো
দুপুরে থানা ফাঁকা হলে আমি টেবিলের নিচের তাক থেকে হাজত খাতা নামিয়ে খুলি। মন্তব্যের ঘরে যা লেখার, তা লিখে দিতে হবে। কিন্তু ঘর খালি নাই, লেখা হয়ে গেছে। কালি শুকিয়ে গেছে। হাতের লেখা আমি চিনি।
নাম ও পিতার নাম: মোখলেস মিয়া, পিতা মৃত জোনাব আলি। সাং: কাঁকরদহ। আমদানি: প্রতি বিকাল। মামলা নম্বর: ছাগল সংক্রান্ত, নম্বর বসে নাই। ছাড়: হয় নাই।
মন্তব্য: মৃত্যু হাজতের ভিতরে, রাত আনুমানিক তিন প্রহর। ডান কর্ণের উপরিভাগে আঘাতের চিহ্ন। যেহেতু আঘাতকারী একাধিক, সেহেতু কারণের ঘর খালি রাখা হইল।
নিচের সারিতে তারিখের ঘর খালি, নামের ঘর খালি নয়। ওখানে পেনসিল দিয়ে হালকা করে লেখা আছে, মকবুল হোসেন, পিতা মৃত ইউনুস আলি, সাং বেলতলি।
পেনসিলের আঁচড় সেই একই, যে আঁচড়ে আমি নয়জনের নাম তুলেছিলাম বাঁধাইয়ের গায়ে।
©somewhere in net ltd.