নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

নিজের সম্পর্কে বলার মত তেমন কিছুই এখনও অর্জন করতে পারি নি।

ডি এইচ তুহিন

মোঃ দেলোয়ার হোসেন তুহিন

ডি এইচ তুহিন › বিস্তারিত পোস্টঃ

যে গল্পটি বদলে দিয়েছিল কোটি মানুষের অভ্যাস

২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩০

এডনা দেখতে খুব সুন্দর মেয়ে, মিষ্টি কণ্ঠে কথা বলে, কখনও কারও সঙ্গে ঝগড়া করেনি। পাড়ার মানুষ বলত, "এমন মেয়ে ঘরে এলে তো ঘর আলো হয়ে যাবে।" তার বান্ধবীরা কিছু হলেই তার কাছে ছুটে আসত। যে কোনো অনুষ্ঠানে কে কোন শাড়িটা পরবে, কাকে কী মানাবে, সবকিছুতে এডনার মতামত চাই। তারপর তার বেস্টফ্রেন্ডের বিয়ে ঠিক হলো। বিয়েতে সে খুব মজা করল, কনের মতো সেজে নেচে গেয়ে মাতিয়ে রাখল পুরো অনুষ্ঠান। কিছুদিন পর আরেক বান্ধবীর বিয়ে ঠিক হলো, তারপর তৃতীয়জনের, তারপর চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ। এদিকে পাড়ার সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে এডনার বিয়ে হচ্ছে না, বাকি সবার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বয়স তিরিশের দিকে গড়াচ্ছে। প্রস্তাব যে একেবারে আসে না তা নয়, কিন্তু কথা এগোতে এগোতেই কীভাবে যেন থেমে যায়। কেউ কিছু বলে না, কারণও জানায় না। শুধু চুপচাপ সরে যায়।

রাতে একা ঘরে বসে এডনা আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকায়। কী নেই তার? রূপ-গুণ সব আছে। তাহলে ভুলটা কোথায়?

আসলে তার বান্ধবীরা সত্যটা জানত, কিন্তু মনে কষ্ট পাবে ভেবে কেউ বলত না। এডনার মুখে একটা গন্ধ ছিল, যা সে নিজে টেরই পেত না। সবাই জানত, কিন্তু কষ্ট দিতে চাইত না বলে কেউ মুখ খুলত না। আর সেই চুপ করে থাকাটাই এডনার জীবনটাকে আটকে দিল…

গল্পটা বেশ কষ্টের, তাই না? ওহ, আচ্ছা, একটা কথা বলা হয়নি। এডনা কোনো সত্যিকারের মানুষ ছিল না। সে ছিল ১৯২০-এর দশকের একটা মাউথওয়াশ কোম্পানির বিজ্ঞাপনের কাল্পনিক চরিত্র (গল্পটা এখানে একটু সাজিয়ে বলা হয়েছে)। কোম্পানিটির নাম ছিল লিস্টারিন।

আমরা আজ যে লিস্টারিনকে মাউথওয়াশ নামে চিনি, সেটা কিন্তু শুরুতে মাউথওয়াশ ছিল না। ১৮৭৯ সালে সেন্ট লুইসের চিকিৎসক জোসেফ লরেন্স একটি অ্যান্টিসেপ্টিক বা জীবাণুনাশক তরল তৈরি করলেন। নাম দিলেন জোসেফ লিস্টারের নামে, যিনি অস্ত্রোপচারে জীবাণুনাশক ব্যবহারের পদ্ধতি চালু করে অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সাহায্য করেছিলেন। ১৮৮১ সালে স্থানীয় ফার্মাসিস্ট জর্ডান হুইট ল্যাম্বার্ট ফর্মুলাটির অধিকার নেন এবং ল্যাম্বার্ট ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি গড়ে তোলেন।

শুরুতে এটা ডাক্তার আর হাসপাতালে ঘা ধোয়া ও অস্ত্রোপচারের পর জীবাণুমুক্ত করার জন্য ব্যবহার হতো। আবার খুশকি, গনোরিয়া, ঘর মোছা, এমনকি খাবার টেবিল পরিষ্কার করার জন্যও এটা ব্যবহার করা হয়েছিল। মানুষ কিনছিল, কিন্তু সেলস খুব একটা ভালো নয়। এরপর জানা গেল এটি মুখের ভেতরের সাধারণ জীবাণু মারতে কার্যকর, আর ১৮৯৫ সালে কোম্পানি এটিকে মুখের অ্যান্টিসেপ্টিক হিসেবে ডেন্টিস্ট বা দন্তচিকিৎসকদের কাছে বাজারজাত করা শুরু করল। ১৯১৪ সালে এটি আমেরিকায় অন্যতম প্রথম প্রেসক্রিপশন-পণ্য হিসেবে সাধারণ মানুষের জন্য দোকানে বিক্রির (Over-the-counter) অনুমতি পায়। এত কিছুর পরও সেলস তেমন বাড়েনি। কোম্পানি এটাকে নানা কাজে বিক্রির চেষ্টা করেও সেভাবে সফল হয়নি।

১৯২০-এর দশকে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতার ছেলে জেরাল্ড ল্যাম্বার্ট (Gerald Lambert) এই পণ্যের বিজ্ঞাপনে নতুন পথ ধরলেন। ১৯২১ সালে তিনি 'হ্যালিটোসিস' (Halitosis) নামের একটি চিকিৎসা-শব্দকে বিজ্ঞাপনের কেন্দ্রে নিয়ে এলেন। তিনি বুঝতে পারেন, মানুষকে যদি শুধু বলা হয় "আপনার মুখের গন্ধ দূর করুন", তবে কেউ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবে না। কিন্তু এটিকে যদি একটি 'ভয়াবহ রোগ' বা মেডিকেল কন্ডিশন হিসেবে উপস্থাপন করা যায়, তবে মানুষ ভয় পাবে এবং পণ্যটি কিনবে। (শব্দটা তিনি পুরোনো লেখা থেকে খুঁজে পান, না নিজে বানান, তা নিয়ে সূত্রে মতভেদ আছে।)

তখনকার দিনে মুখে দুর্গন্ধ হলে মানুষ সাধারণ ব্রাশ করত, আলাদা করে মাউথওয়াশ কেউ কিনত না। কোম্পানি তখন এই শব্দটাকে জনসমক্ষে নিয়ে এল একটি ভয়ের বিষয় হিসেবে, এবং শুরু হলো দুর্দান্ত প্রচারণা।

বিজ্ঞাপনগুলোর ভাবটা ছিল এরকম (ভাবানুবাদ):

"তুমি হয়তো জানো না, কিন্তু তোমার মুখে দুর্গন্ধ আছে। বন্ধুরা জানে, লজ্জায় বলে না। এই কারণেই তোমার বন্ধুত্ব, সম্মান, এমনকি বিয়ে পর্যন্ত আটকে যেতে পারে।"

এখানে প্রোডাক্টের উপাদান বা দাম নিয়ে কোনো কথা ছিল না। বিক্রি করা হচ্ছিল একটি অনুভূতি: লজ্জা থেকে মুক্তি পাওয়ার তাগিদ। আর এই ক্যাম্পেইনের সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞাপনটি ছিল এডনার গল্প (১৯২৫ সালের কাছাকাছি সময়ে), যার স্লোগান ছিল: "Often a bridesmaid, but never a bride."

ফলাফল? ১৯২১ সালে লিস্টারিনের বার্ষিক বিক্রি ছিল প্রায় ১,১৫,০০০ ডলার। কয়েক বছরের মধ্যে তা লাফিয়ে পৌঁছাল ৪০ লক্ষ থেকে ৮০ লক্ষ ডলারে। সূত্রভেদে শেষ সংখ্যাটা আলাদা, তাই এটাকে আনুমানিক ধারণা হিসেবে নেওয়াই ভালো। ৮০ লক্ষ ধরলে বৃদ্ধি প্রায় ৭০ গুণ, যাকে অনেক জায়গায় "৭০০০% বৃদ্ধি" বলা হয়। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার: ভয় দেখিয়েও পণ্য বিক্রি সম্ভব। প্রোডাক্ট কিন্তু একই রইল, বদলে গেল শুধু মানুষের মানসিকতা।

বিজ্ঞাপন-জগতে এই কৌশল এতই পরিচিত হয়ে গেল যে একে বলা হয় "halitosis appeal", অর্থাৎ ভয় দেখিয়ে পণ্য বিক্রির কৌশল। (কাছাকাছি ধারণাকে সমালোচকরা বলেন "manufactured need" বা "disease mongering"।) আমরা সহজ ভাষায় একে বলতে পারি Problem Creation Strategy।

এর তিনটি ধাপ আছে:

- কাস্টমারের মনে একটি সমস্যা তৈরি করো, বা ঘুমন্ত সমস্যাকে জাগিয়ে তোলো।
- সমস্যাটাকে এত বড় করে দেখাও যে মানুষ ভাবে, এটি সমাধান করা জরুরি।
- তোমার প্রোডাক্টকে একমাত্র সমাধান হিসেবে সামনে আনো।

একই কৌশল অন্য জগতেও দেখা যায়। যেমন ১৯৩০-এর দশকে মহামন্দার সময় ডায়মন্ডের চাহিদা কমে গেলে কোম্পানি ডি বিয়ার্স (De Beers) ১৯৩৮ সালে বিজ্ঞাপন সংস্থা N.W. Ayer-কে নিয়োগ দেয়। এরপর ১৯৪৭ সালে সংস্থার কপিরাইটার ফ্রান্সেস গেরেটি লেখেন সেই বিখ্যাত স্লোগান: "A Diamond is Forever." ফলে ভালোবাসা মানেই ডায়মন্ড রিং, এই ধারণা মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে গেল। ডিওডোরেন্টের বিজ্ঞাপনগুলোতেও ঘামের প্রাকৃতিক বিষয়টিকে লজ্জার বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে একই কাজ করা হয়েছে।

তিনটি গল্পের প্যাটার্ন এক: আগে সমস্যা তৈরি, তারপর ভয় বাড়ানো, শেষে প্রোডাক্ট বিক্রি।

মার্কেটিংয়ের সবচেয়ে মজার দিকটি হলো, অনেক সময় ব্র্যান্ড কোনো প্রোডাক্ট বিক্রি করে না, বিক্রি করে একটা ধারণা বা ভয়, যা ছাড়া আমাদের জীবন অচল বলে আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করি।

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৫০

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: "তুমি হয়তো জানো না, কিন্তু তোমার মুখে দুর্গন্ধ আছে। বন্ধুরা জানে, লজ্জায় বলে না।
...........................................................................
এই অসত্য ধারণা গুলো একসময়ে কাজ করত
এখন সচেতন মানুষ মাত্রই প্রমাণ দেখতে চায়,
অথবা ডাক্তারের শরনাপন্ন হয় ।
তাই পণ্য বিক্রির কৌশল ইউরোপে অন্য রকম !
এখানে বিশ্বস্ততা অর্জনের প্রতিযোগিতা চলে ।

২| ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০০

ডি এইচ তুহিন বলেছেন: ঠিক বলেছেন ভাই, এখন মানুষ আগে প্রমাণ চায়। তবে লজ্জা বা ভয় দিয়ে বিক্রির ধরনটা পুরোপুরি হারায়নি তবে রূপ বদলেছে। ডিওডোরেন্ট, ফেয়ারনেস ক্রিম বা ওজন কমানোর বিজ্ঞাপনে আজও "তোমার মধ্যে সমস্যা আছে" বার্তাটা চোখে পড়ে।

৩| ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩

রাজীব নুর বলেছেন: স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: "তুমি হয়তো জানো না, কিন্তু তোমার মুখে দুর্গন্ধ আছে। বন্ধুরা জানে, লজ্জায় বলে না।

এজন্য আমি দুবার করে ব্রাশ করি।

২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৯

ডি এইচ তুহিন বলেছেন: এজন্য আমিও দুইবার ব্রাশ করি

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.