নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

রেজওয়ানুল হাসান রবিউল

আমি রেজওয়ানুল হাসান রবিউল। পেশায় ব্যবসায়ী। শখে ফটোগ্রাফার, গ্রাফিক ডিজাইননার ও ভিডিয়ো এডিটর। ভালোবাসি বই পড়তে।

রেজওয়ানুল হাসান রবিউল › বিস্তারিত পোস্টঃ

বর্তমান সময়ের সংবাদ ও মিথ্যে

৩১ শে আগস্ট, ২০২৩ রাত ৯:১৬



দিনটা শুক্রবার। তারিখ, ২১শে জুলাই ২০২৩ সাল।

আচমকাই বাংলাদেশের সকল গণমাধ্যমে এমন একটি খবর উঠে এলো, "জাতিসংঘের হিউম্যানিটারিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড পেলেন জায়েদ খান।" "জাতিসংঘ থেকে পুরষ্কার পেলেন নায়ক জায়েদ খান।" দেশের অধিকাংশ প্রথম সারির গণমাধ্যম এটি প্রচার করে এবং সেদিন এই খবরটি রীতিমতো গরম করে তোলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে। এ বিষয় নিয়ে নানান জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনা-সমালোচনা পর্যন্ত আরম্ভ হয় বিশেষ করে সিনেমা প্রেমীদের মধ্যে একপ্রকার উত্তেজনা তৈরি হয়।

এমনকি কালের কণ্ঠের একটি অনলাইন প্রতিবেদনের লিংক শেয়ার করেন স্বয়ং জায়েদ খান। যদিও ক্যাপশনে তিনি লিখেছিলেন, নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অবস্থিত ইন্সটিটিউট অব পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি রিসার্চ হতে ঢাকাই চলচ্চিত্র অভিনেতা জায়েদ খানকে "হিউম্যানিটারিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড" প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু পোস্টের ক্যাপশন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে কি কোনো ঘাপলা চোখে পড়লো না কারো? আদতে কেউই অস্বাভাবিকতা টের পায়নি। এরই মাঝে নিজের প্রফাইল পিকচারে জায়েদ খান ঝোলালেন একটি নতুন ছবি। যেখানে তার একটি হাতে পুরষ্কার ও অন্য হাতে একটি সনদ শোভা পায়। পেছনে স্পষ্ট জাতিসংঘের পতাকা লক্ষ্য করেছে সবাই।

জল্পনা-কল্পনার মাঝেই এ ঘটনার ভেতর হস্তক্ষেপ করে রিউমর স্ক্যানার টিম। তাঁরা জানালেন, গণমাধ্যমে প্রচারকৃত খবরটি পুরোপুরি সত্য নয়। "হিউম্যানিটারিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড তিনি পেয়েছেন ঠিকই কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান হতে পুরষ্কার লাভ করেছেন সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাতিসংঘের কোনো সম্পৃক্ততাই নেই। এমনকি এর সদর দপ্তর পর্যন্ত জাতিসংঘে নেই। অথচ জায়েদ খান তার ক্যাপশনে উল্লেখ করেছিলেন, এটি জাতিসংঘের সদর সদর দপ্তরে অবস্থিত। তাঁরা মূলত পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান জাতিসংঘের হলরুমে তা আয়োজন করেছিলো। এর বাইরে কিছু নয়।

রিউমর স্ক্যান প্রমাণসহ সব উপস্থাপন করার পরপরই ব্যাপারটি হাসি-তামাশায় মগ্ন হয়ে পড়ে সবাই। দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলোকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও সমালোচনাও হয়েছে ঢের।

এখানেই শেষ নয়। দেশে আরও বহু খবরাখবর আমাদের সামনে আসে যার শিরনামগুলো হয় চটকদার কিন্তু তার ভেতরে মেলে ভিন্ন কোনো সত্যের দেখা। দেশের বহু আমজনতা এমনও আছেন, যাঁরা সেই চটকদার শিরোনাম দেখেই গোটা খবরকে বিচার করে বসেন অথচ পুরো খবর জানার জন্য সময় পর্যন্ত ব্যয় করেন না।

এই যেমন, একাত্তর জার্নাল নামক এক লাইভ অনুষ্ঠানে ফারজানা মিথিলার সেই প্রশ্ন, "আপনি মারা গেলেন কী করে" এই ক্লিপকে ক্রপ করে এখানে ওখানে ট্রল, হাসি-ঠাট্টা এবং বিদ্রুপ করারও নজিরও আছে। যদিও ফারজানা মিথিলার মূল বিষয়ে যাবার পূর্বে এই প্রশ্নটি তিনি হালকা চালে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই করেছিলেন কিন্তু তবুও পুরো খবর জানার পূর্বেই আমরা আমাদের বিদ্রুপ করার মস্তিষ্ককে জীবিত করি।

গুজব তো আছেই। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এখন, আংশিক সত্য বজায় রেখে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই মিথ্যে একটি খবর জনগণের সামনে তুলে ধরা। এখনকার গণমাধ্যম শুধু হলুদ সাংবাদিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতই শুধু করছেন না বরং বড্ড আলসেও হয়ে গেছে। এর প্রমাণ এখন অহরহই পাওয়া যাচ্ছে। আর জনগণ তাঁদের ট্রলের খাতা নিয়ে তো বসে থাকছেনই।

১৯২৫ সালে জার্মানির নাজি পার্টির অন্যতম একজন শাসক অ্যাডলফ হিটলার "Mein Kampf" নামে আত্মজীবনীমূলক একটি গ্রন্থ লিখেন। এর অর্থ, আমার সংগ্রাম। এই বইতে হিটলার একটি প্রচারণামূলক কৌশল, পড়ুন কূটকৌশল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন যার নাম Big Lie.

হিটলার লিখেছেন, আমজনতাকে বিভ্রান্ত করতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বড়ো বড়ো মিথ্যে বলতে হবে। এতো বড়ো মিথ্যে শুনলে বিপরীত পাশে থাকা যে কেউই ভাবতে বাধ্য হবে; এতো বড়ো মিথ্যে কি কেউ কখনো বলতে পারে?! এটা অবশ্যই সত্য৷ এতোবার যখন বলা হচ্ছে তখন এর মধ্যে সত্যতা থাকার সম্ভাবনাই বেশি। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বড়ো একটি মিথ্যে জনসাধারণদের জানালে সেই মিথ্যেকে সত্য ভাবতে তখন সবাই বাধ্য।

এই কূটকৌশলের উপর ভিত্তি করে তৎকালীন নাজি পার্টির প্রচারণামূলক মন্ত্রী জোসেফ গোয়েবেলস আরেকটি মতবাদ যুক্ত করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, এই বড়ো মিথ্যেকে বারবার পুনরাবৃত্তি করা জরুরি। যতোবার পুনরাবৃত্তি হবে ততোবার লোকজন তা শুনবে। ভিন্ন ভিন্ন সূত্র থেকেও সেই একই কথাই শুনবে ও জানবে। বিশ্বাস না করে উপায় নেই। বিশ্বস্ত মাধ্যম হতেও মিথ্যে শুনলে সেটি যতো বড়ো মিথ্যেই হোক না কেন বিশ্বাসযোগ্য হবেই হবে।

এরপরই যে মতবাদ চলে আসে সেটি হচ্ছে, Half Truth. মিথ্যের পাশাপাশি হালকা সত্যই সেখানে বলতে হবে। অর্থাৎ, আংশিক সত্য ও মিথ্যের মিশেলে একটি খবর বা কথাকে প্রচার করা।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের দেশের গণমাধ্যম অ্যাডলফ হিটলার ও জোসেফ গোয়েবেলসের এই মতবাদগুলো এখন অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যাচ্ছেন। এমনকি এ দেশের বেশকিছু তারকাও এই তালিকায় যুক্ত আছেন। আপনি অহরহই তা দেখবেন। হোক তা কোনো টক শো, হোক তা কোনো ইন্টারভিউ, হোক তা কোনো প্রেস ব্রিফিং, যে কোনো আয়োজনে তা লক্ষ্য করা যায়।

বিশ্বস্ত বলতে কিছুই নেই। দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমকে পর্যন্ত এখন বিশ্বাস করা যায় না। খালি চোখে যা দেখা যায় তা সত্য নয়। সত্যতা জানতে ও সঠিক সত্যকে প্রকাশ করতে এগিয়ে আসতে হবে আপনাকেই।

একটা অপ্রচলিত তথ্য দিয়ে শেষ করছি, আমি বর্তমানে যে বইটি লিখছি সেই বইয়ের অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক চরিত্রও কিন্তু অ্যাডলাফ হিটলারের এই আংশিক সত্য ও মিথ্যে মিশিয়ে একটি কথা প্রচার করার মতবাদ অনুসরণ করেন। যদিও হিটলারের বই প্রকাশিত হবার কয়েকশো বছর পূর্বে সেই ব্যক্তির অস্তিত্ব পৃথিবীতে ছিলো। তাহলে কি সেই ঐতিহাসিক ব্যক্তির থেকেই কি এই প্রচারণামূলক কূটকৌশল অবলম্বন করার চালাকি হিটলারের মস্তিষ্কে এসেছে? নাকি লেখক হিসেবে এটা আমার কল্পনা ছিলো আদতে এখানে কারো কোনো সম্পৃক্ততা নেই? প্রশ্ন রেখে গেলাম।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.