| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

চোখ। প্রত্যেক প্রাণীরই এক অত্যাবশকীয় দর্শন অঙ্গ। চোখ না থাকলে এ সুন্দর পৃথিবীটাকে দেখা সম্ভবই হতো না। চোখ নিয়ে কবি-সাহিত্যিকরা এতো এতো উদ্ধৃতি লিখেছেন যে, গুগলের সার্চ ইঞ্জিনে এ নিয়ে সার্চ করলে উদ্ধৃতির অভাব পাবেন না। আর তাই আজকালকার অনেক ছেলেরাই প্রিয়তমার চোখ নিয়ে অনায়াসে কোনো উদ্ধৃতি মুখস্থ করেই প্রভাবিত করে ফেলতে পারে প্রিয়তমাকে অথবা প্রিয়তমার সুন্দর সেই চোখ দুটি নিয়ে নিজেই বানিয়ে ফেলতে পারে সুন্দর একটি উদ্ধৃতি।
মিথলজি নিয়ে ঘাটাঘাটি করেন যাঁরা তাঁরা "হোরাস" নামটির সঙ্গে অবশ্যই পরিচিত। মিশরীয় মিথলজির এক অন্যতম চরিত্র দেবতা হোরাসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল, তাঁর চোখ। কিন্তু তিনি দেবতা। তাহলে মানব ইতিহাসে সবচেয়ে সুন্দর চোখের অধিকারী কে?
প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাস "দেয়াল"এ লিখেছেন:
❝পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর চোখ ছিল অশোকপুত্র কুনাল আর ইংরেজ কবি পি. বি. শেলীর❞।
আজ কথা বলব মানব ইতিহাসের সেই সুন্দর চোখের অধিকারীকে নিয়ে, যাঁর নাম কুনাল।
কুনালকে নিয়ে শুরু করার আগে কুনালের পিতা অর্থাৎ, সম্রাট অশোককে নিয়ে প্রথমে আলোচনা করা যাক।
খ্রিস্টপূর্ব ২৬৯। রাজ্যাভিষেক ঘটে ভারতীয় উপমহাদেশের তৃতীয় সম্রাটের, নাম তাঁর অশোক মৌর্য। "দীপবংশ" ও "মহাবংশ" এই দুই বইতে উল্লেখ করা হয়েছে, অশোক গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর ২১৮ বছর পর সিংহাসনে আরোহন করেন এবং শাসন করেন ৩৭ বছর। তবে বিশেষজ্ঞদের মত ভিন্ন। বুদ্ধের মৃত্যু ৪৮৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে অশোক সিংহাসনে আরোহন করেছিলেন বলে ধারণা করেন তাঁরা। এই দুই বইয়ের তথ্য যদি সঠিক হয় তবে অশোক ২৬৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিংহাসনলাভ করেছিলেন। পিতার নাম, বিন্দুসার ও মাতার নাম সুভদাঙ্গী। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তাঁর ছিল পাঁচ স্ত্রী। তাঁদের নাম যথাক্রমে, অসন্ধিমিত্রা, দেবী, কারুবকী, পদ্মাবতী এবং তিষ্যরক্ষিতা বা তিষ্যরক্ষা। "মহাবংশ" ও "দিব্যাবদান" নামক দুটি বইতে তাঁকে "তিষ্যরক্ষা" নামেই অভিহিত করা হয়েছে। গোটা আলোচনায় আমরা তাঁর নামটি "তিষ্যরক্ষা" বলেই আলোচনা করব। তিনি আমাদের আজকের আলোচনায় একটু পরেই আসবেন। কারণ ঐতিহাসিক এই গল্পের উল্লেখযোগ্য একজন হচ্ছেন, তিষ্যরক্ষা।
অশোকের প্রথম দুই সন্তান মহেন্দ্র ও সংঘমিত্রা যাঁদের মাতা ছিলেন রাণী দেবী। অর্থাৎ, সম্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী। এরপর সম্রাটের চতুর্থ স্ত্রী অর্থাৎ, রাণী পদ্মাবতীর ঘরে জন্ম নেয় এক সুন্দর চোখের অধিকারী পুত্র সন্তান। পদ্মাবতী বাচ্চা প্রসবকালীন সময়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুবরণ করেন। সদ্যজাত সন্তানের মুখ দেখা মাত্রই সম্রাট প্রিয়তমা হারানোর শোক ভুলে যান। সন্তানের নাম রাখেন "কুনাল", যার অর্থ সুন্দর নয়নের বা নেত্রের ব্যক্তি। জ্যেষ্ঠ পুত্র মহেন্দ্র বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হয়ে ধর্ম প্রচারের স্বার্থে সিংহলে চলে যাবার পর সম্রাট কুনালকে নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে বাছাই করে রেখেছিলেন। করবেন নাই বা কেন? সুন্দর দুই চোখের পাশাপাশি তিনি ছিলেন, বোদ্ধা। ভবিষ্যৎ সম্রাট হিসেবে তিনিই ছিলেন উপযুক্ত।
পদ্মাবতী সন্তান প্রসবকালীন সময়েই মৃত্যুবরণ করায় কুনালের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন সম্রাটের প্রথম স্ত্রী অসন্ধিমিত্রা। অসন্ধিমিত্রা নিঃসন্তান ছিলেন। ফলে কুনালকে তিনি নিজ সন্তানের মতোই বড় করে তুলেন। কুনালও তাঁর নিজ মায়ের অভাব কখনোই বোধ করেনি।
এদিকে এক ভৃত্যাও অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। এই সন্তানকে দত্তক নেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্ধিমিত্রা নিজের প্রাসাদে এনে রাখেন সেই দাসীকে। ফুটফুটে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন সেই ভৃত্যা। কন্যার নাম রাখা হয়, চারুমতী। ঠিক একই সময় রাণী কারুবকীও অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। সে আলোচনায় একটু পরই আসছি।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে কুনালের সৌন্দর্যও বাড়তে লাগল। সুদর্শন যুবক ও অপরূপ সুন্দর দুটি চোখ। সপ্তম জন্মদিনে রাজকুমার কুনাল 'যুবরাজ কুনাল' হিসেবে অভিষেক ঘটান। এর কয়েক মাস পর সম্রাটের পরিবারে এলো খুশির সংবাদ। সম্রাটের তৃতীয় স্ত্রী রাণী কারুবকী অন্তঃসত্ত্বা। সম্রাট আনন্দের পাশাপাশি এবার চিন্তিত। কারুবকীর সার্বক্ষণিক দেখাশোনা দরকার বিশ্বস্ত পরিচারিকা। তেমন কোনো পরিচারিকা পাচ্ছেন না সম্রাট যে কিনা সেবা ও চিকিৎসাশাস্ত্র দুই বিষয়ে পটু। এমতাবস্থায় রাণী অসন্ধিমিত্রার সঙ্গে আলাপ করলেন। অসন্ধিমিত্রা সমস্যার সমাধান বাতলে দিলেন। জানালেন, তাঁর খাস দাসী শলাকাকে তিনি পাঠিয়ে দেবেন। কথাটা শুনে সম্রাট একদিক থেকে চিন্তামুক্ত হলেও অন্য একটি বিষয় নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন৷ কেন চিন্তিত হলেন? খাস দাসী এখানে চলে এলে অসন্ধিমিত্রার সমস্যা হতে পারে।
কিন্তু অসন্ধিমিত্রা তারও সমাধান করেই রেখেছিলেন। শলাকা এখানে চলে এলে শলাকার ১১ বছরের কন্যাকে তিনি তাঁর খাস দাসী হিসেবে নিযুক্ত করবেন। সেই ১১ বছরের কন্যাটি কে ছিল বলতে পারেন? তিষ্যরক্ষা। অর্থাৎ, যে মেয়েটি বয়সে ছিল অসন্ধিমিত্রারই মেয়ের মতো, সময়ের পরিক্রমায় সেই মেয়ে একদিন হয়ে যায় অসন্ধিমিত্রার সতীন। এই ১১ বছরের মেয়ের নিয়তি সম্পর্কে কারো এমন কোনো ধারণা ছিল কখনো? অসন্ধিমিত্রাও কল্পনা করেছিলেন তা কখনো? যদিও তাঁদের বিয়ের আগেই অসন্ধিমিত্রা পরলোক গমন করেন।
তিষ্যরক্ষা নামক অধ্যায়ের শুরুটা ছিল এখান থেকেই। কুনালের সমবয়সী ছিলেন তিষ্যরক্ষা৷ অর্থাৎ, তখন কুনালের বয়সও ছিল ১১। দুজন প্রায় মুখোমুখি হলেও কখনোই কথা হয়নি তখন।
তো আগেই যেমনটা উল্লেখ করা হয়েছে, বিষ্ণুপ্রিয়া অন্তঃসত্ত্বার সময়েই রাণী কারুবকী অন্তঃসত্ত্বা হোন। চারুমতী জন্মের ঠিক দুই সপ্তাহ পর রাণী কারুবকীর ঘর আলোড়ন করে জন্ম নেন, তীবল। ভাইবোন সকলের সাথেই ছিল কুনালের সুসম্পর্ক। বিশেষ করে, তীবলের সঙ্গে। কনিষ্ঠ পুত্র তীবলকে যথেষ্ট ভালোবাসতেন সম্রাট। কুনাল ও তীবল মধ্যকার সম্পর্ক এতোটাই ভালো ছিল যে, রাজ্য শাসন নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্দের যে আশঙ্কা সম্রাট করেছিলেন তা নিমিষেই গায়েব হয়ে গেল।
কুনালের বয়স তখন ১৬ বছর। এক সন্ধ্যাবেলার কথা। অসন্ধিমিত্রা কখনোই এই অবেলায় শুয়ে থাকেন না। কিন্তু আজ শুয়ে আছেন। চারুমতী ও তিষ্যরক্ষার মনে জেঁকে বসেছে ভয়। কী হয়েছে রাণীর? গত কয়েকদিন যাবত শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছে না অসন্ধিমিত্রার৷ তাঁকে ছুঁয়ে দেখার সাহস হলো না কারোর। পরবর্তীতেই অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে চারুমতী মায়ের শরীরে হাত দিলেন। দেওয়া মাত্রই আঁতকে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলেন বাবার খোঁজে। সম্রাটকে পাওয়া মাত্রই, কাঁদতে কাঁদতে সবটা জানালেন চারুমতী।
রাণীর প্রাসাদে ছুটতে ছুটতে হাজির হলেন সম্রাট। এর পূর্বে ভৃত্যদের আদেশ দিলেন, যতো দ্রুত সম্ভব রাণীর প্রাসাদে যেন রাজবৈদ্যকে পাঠানো হয়। কুনাল তখন ছিলেন না। তাই ভৃত্যদের এও নির্দেশ দেন, কুনালকে যেন দেখামাত্রই তৎক্ষণাৎ রাণীর প্রাসাদে আসতে বলা হয়।
অসন্ধিমিত্রাও কুনালকে দেখার জন্য ছটফট করছিলেন। কিন্তু শেষ দেখা আর হয়নি। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন অসন্ধিমিত্রা। শেষবারের মতো আর কুনালকে দেখা হয়নি তাঁর। এমনকি কুনালও শেষবারের মতো একটা কথাও বলতে পারেনি। এর আক্ষেপ কোনোদিনও ভুলতে পারেননি যুবরাজ।
যেমনটা আগেই বলেছিলাম, কুনাল ও তিষ্যরক্ষা ছিলেন সমবয়সী। স্বভাবতই, তিষ্যরক্ষা পরবর্তীতে কুনালের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। শুধু আসক্তই নয়, এ যেন গভীর এক প্রণয়। বের হয়ে আসার উপায় নেই। ডুবতেই থাকলেন। পালি সাহিত্যে উল্লেখ করা আছে, তিষ্যরক্ষা অতিশয় কামুক ছিলেন। ইংরেজিতে যেই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয়, ‘নিম্ফোম্যানিয়াক’। অর্থাৎ, কুনালের প্রতি তাঁর যে অনুভূতিটি ছিল সেখানে সবচেয়ে বেশি ছিল, কাম বা লাস্য।
কিন্তু বিপত্তি ঘটলো তখন, যখন সম্রাট অশোকই তিষ্যরক্ষার রূপ-যৌবনে কাবু হয়ে পড়লেন। ফলশ্রুতিতে, সম্রাট তিষ্যরক্ষার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। তিষ্যরক্ষা যাঁকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখলেন, সেই কুনালই হয়ে গেলেন তাঁর ছেলে (সৎ)। তিষ্যরক্ষা কখনোই বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। এমনকি কুনাল তাঁকে "মাতা" বলে সম্বোধন করতো। এই সম্বোধনটা কাঁটার মতো বিঁধতো তিষ্যরক্ষার মনে। হজম করবেনই বা কী করে? ভালোবাসার মানুষ যখন আপনাকে এমন সম্মানে সম্মানিত করছে, যে সম্মান আপনি কোনোকালেই সেই মানুষটির কাছে চান না, চান প্রণয়, তবে কি তা হজম করার মতো?
প্রেমের তীব্র নেশা যেন অন্ধ করে দেয় তিষ্যরক্ষাকে। যা কখনোই সম্ভব নয়, তাই তিনি করে ফেললেন। কুনালকে প্রণয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলেন তিনি। পরিণাম নিয়ে মোটেই বিচলিত ছিলেন না। বিস্ময়কর, তাই না? সম্পর্কে যাঁরা মা ও ছেলে, তাঁদের নিয়ে এমন কোনো চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এলে সেটি বিস্ময়কর লাগারই কথা। একই সঙ্গে, অদ্ভুত। বয়সের সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও তিষ্যরক্ষা কুনালের মা ছিলেন। সেটি যে পরিস্থিতির ভিত্তিতেই হোক না কেন। একজন মা তার ছেলেকে পড়ুন, সৎ ছেলেকে এমন প্রস্তাব দিলে সেই প্রস্তাবের কথা জনসম্মুখে সামনে এলে তা নিয়ে "ছিঃ ছিঃ" করারই কথা। কিন্তু তিষ্যরক্ষা ভাগ্যটা বোধহয় ভালোই ছিল। কুনাল তিষ্যরক্ষার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ব্যাপারটি নিয়ে কোনোপ্রকার ঝামেলা চাননি কুনাল। ফলে এ নিয়ে কাউকে কিছু জানাননি, এমনকি সম্রাটকেও নয়।
প্রণয়প্রার্থিনীর জমা প্রেমগুলো যে ডালপালা মেলে এক সুন্দর বৃক্ষে রূপ ধারণ করেছিল, একটামাত্র প্রত্যাখ্যান সে বৃক্ষকে পুড়ে ছাই করতে লাগল। ধোঁয়া আর ধোঁয়া। দাউ দাউ করে জ্বলছে সে হৃদয়ে এবার প্রতিশোধের আগুন।
ব্যর্থ সেই প্রণয়প্রার্থিনী মনাহত হবার পর প্রতিশোধের নেশায় এতোটাই অন্ধ হলেন যে তিনি তাঁর ভালোবাসার ক্ষতি করতেও পিছপা হননি। "Everything is fair in love and war" কিংবা "তুমি আমার না হলে আর কারোর হতে পারবে না" এই ধরনের মতবাদের মূর্ত প্রতীক যেন তিষ্যরক্ষা।
কিন্তু প্রতিশোধ পূরণের আগেই ঘটে গেল আরেকটি অঘটন। তক্ষশীলায় বিদ্রোহ চলাকালীন সময়ে সম্রাট সেটি দমন করতে সেখানে কুনালকে পাঠালেন। কিন্তু সুযোগটা ভালোই কাজে লাগালেন তিষ্যরক্ষা। সম্রাট অশোক এমনিতেও বেশ দূর্বল ছিলেন তিষ্যরক্ষার প্রতি। আর একেই কাজে লাগালেন তিষ্যরক্ষা। সম্রাটের সঙ্গে কনিষ্ঠ রাণীর ছলাকলা শুরু হলো। এটিও ছিল তিষ্যরক্ষার একটি কৌশল। এভাবেই ধীরে ধীরে তিষ্যরক্ষা কৌশলে আদায় করলেন সম্রাটের সীলমোহর। পেলেন তা ব্যবহারের অনুমতি। সময় ক্ষেপণ করেননি আর তিষ্যরক্ষা। তক্ষশীলার শাসকের উদ্দেশে লিখে ফেললেন একটি পত্র। পত্রে উল্লেখ করেছিলেন, শাসক যেন অন্ধ করে দেয় কুনাককে, সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন সেই সীলমোহর। গোপনে বার্তাবাহক সেই পত্র তক্ষশীলার শাসককে পাঠাল। চোখ তুলে ফেলা হলো কুনালের।
তিষ্যরক্ষার ষড়যন্ত্র নিয়ে আরেকটি ঘটনার উল্লেখ আছে। এখানে তিষ্যরক্ষা সম্রাটের সীলমোহর ব্যবহারে অনুমতি পায় না বরং সেটি চুরি করে। সম্রাটের সীলমোহর চুরি করে রাজাদেশ জারি করলেন, কুনালের সুন্দর দুটি চোখ তুলে ফেলতে হবে। না তোলা অবধি সীলমোহর দেওয়া হবে না কখনোই। পালন করাও হলো। সম্রাট পুরো সত্য জানার পর রাগ দমন করতে পারেননি। প্রিয় সন্তানের এই দশা অবশ্যই কোনো বাবা মেনে নিতে পারবেন না। কী করে মানবেন? অত্যন্ত ভালোবাসতেন তিনি কুনালকে।
তিষ্যরক্ষার কৃতকর্মের শাস্তি সম্রাট কী দিয়েছেন তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। কারণ তিনটি কথার উল্লেখ পাওয়া গেছে এ ঘটনায়। চার্লস অ্যালেনের "Ashoka: The Search for India’s Lost Emperor" বইতে উল্লেখ করা হয়েছে, শাস্তিস্বরূপ সম্রাট তিষ্যরক্ষাকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেন এবং সেই নির্দেশ পালন করা হয়। অন্যদিকে এও প্রচলিত আছে, প্রকৃত সত্য জানার পর সম্রাট এতোটাই ক্ষিপ্ত হোন সেই মুহুর্তেই তিষ্যরক্ষাকে প্রাসাদ থেকে টেনে-হিঁচড়ে মাটিতে পুঁতে রাখেন গলা অবধি। দু'দিন পর সেভাবেই মৃত্যু হয় তিষ্যরক্ষার। আরেকটি ঘটনা যা প্রচলিত আছে তা হলো, সম্রাট তিষ্যরক্ষাকে কোনো কঠিন শাস্তি দেবেন তার ঠিক আগ মুহুর্তে বাধা হয়ে দাঁড়ান কুনাল। তিনিই তাঁর পিতাকে বুঝান। তিষ্যরক্ষাকে এবারের মতো ক্ষমা করে দিতে বলেন। পুত্রের কথায় তিনি রাজি হয়ে তিষ্যরক্ষাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু এ তিনটি ঘটনার মধ্যে কোনটি সত্য তা এখনও পরিষ্কার না।
এমনকি এও পরিষ্কার হয়নি কাঞ্চনমালার সাথে কুনালের বিয়ে ঠিক কোন সময়ে হয়েছিল। ধারণা করা হয়, তিষ্যরক্ষার এই ঘটনার আগেই কাঞ্চমালার সঙ্গে কুনাল বিবাহে আবদ্ধ হোন। আবার এও প্রচলিত আছে, তিষ্যরক্ষার এই ঘটনার পর কাঞ্চমালার সঙ্গে কুনালের পরিচয় হয়। এরপর তাঁরা বিয়ে করেন। আরও যেটি প্রচলিত আছে সেটি হলো, কুনাল তিষ্যরক্ষাকে প্রত্যাখ্যান শুধু সম্পর্কের জন্যই নয় বরং কাঞ্চনমালার জন্যও করেছিলেন। নিজ পত্নীকে ভীষণ ভালোবাসতেন তিনি। তাঁকে ধোঁকা দেবার কথা কখনোই ভাবতে পারেননি। তবে যেটাই হোক না কেন প্রত্যেকটি বইয়েই এর উল্লেখ রয়েছে যে, কাঞ্চনমালার সঙ্গে কুনালের সম্পর্ক বেশ ভালোই ছিল। একে অপরকে যেমন ভালোবাসতেন তেমনি সম্মানও করতেন। স্বামী হিসেবেও কুনাল ছিলেন বেশ দায়িত্ববান। দুজনের ভালোবাসা ও সুসম্পর্কের বর্ণনা কমবেশি সকল ঐতিহাসিক বইয়েই উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
কুনালের সুন্দর দুটি চোখ হারানোর পেছনে প্রত্যক্ষভাবে দায়ী তিষ্যরক্ষা। এই তিষ্যরক্ষাকে বিভিন্ন সাহিত্যে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। হিন্দি সাহিত্যে তিষ্যরক্ষাকে সহানুভূতি দেখানো হলেও ঘৃণা পেয়েছেন ভারতীয় বাংলা সাহিত্যে।
শারীরিক বিকলাঙ্গ কেউ কখনো সম্রাট হতে পারে না, এটাই নিয়ম। ফলে যুবরাজ কুনালের কখনোই সম্রাট হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তবে অশোকের উত্তরসূরি দশরথের শাসনামলে কুনালই দশরথকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতেন বলেই জানা যায়। ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ ও রোমিলা থাপারের মতে, অশোকের মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্য তার পুত্র কুনাল ও পৌত্র দশরথের মধ্যে ভাগ করা হয়। তবে অনেক ঐতিহাসিকই একমত হতে পারেননি। তাঁদের মতে, কুনাল নয়, অশোকের দুই পৌত্র দশরথ ও সম্প্রতির মধ্যে সাম্রাজ্য বিভক্ত হয়। দশরথ পাটলিপুত্র নগরীকে রাজধানী করে সাম্রাজ্যের পূর্বভাগ এবং সম্প্রতি উজ্জয়িনী নগরীকে রাজধানী করে সাম্রাজ্যের পশ্চিম ভাগ রাজত্ব করেন। যদিও স্মিথের মতে এই তত্ত্বের ঐতিহাসিক কোনো প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি।
গার্গী-সংহিতা অনুসারে, দশরথের উত্তরসূরি ছিলেন, সম্প্রতি। অর্থাৎ, তাঁরা এক সঙ্গে রাজত্ব করছিলেন না। দশরথের রাজত্বকাল ছিল, খ্রিস্টপূর্ব ২৩২ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২২৪। আর সম্প্রতির রাজত্বকাল ছিল, খ্রিস্টপূর্ব ২২৪ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২১৫। দশরথ ও সম্প্রতি যথাক্রমে ছিলেন, চতুর্থ ও পঞ্চম মৌর্য সম্রাট। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে ভিন্ন তথ্য দেয় বিষ্ণুপুরাণ। বিষ্ণুপুরাণ মতে, কুনাল পরবর্তী ৮ বছর রাজত্ব করেন তবে অধিকাংশ বইতে কুনালের রাজত্বের কোনো উল্লেখ নেই। দশরথ রাজত্ব করাকালীন সময়ে, কুনাল থেকে বিভিন্ন পরামর্শ নিয়ে রাজ্য পরিচালনা করতেন বলে জানা যায়।
প্রশ্ন উঠতে পারে, দশরথ ও সম্প্রতি কে? দশরথ ও সম্প্রতি হচ্ছেন যথাক্রমে তীবল ও কুনালের সন্তান। কুনাল শারীরিক বিকলাঙ্গ হবার ফলে রাজ্য শাসনের ক্ষমতা কখনোই পাননি তিনি। ফলে সম্রাট অশোক মৃত্যুর পর রাজত্বের দায়িত্ব এসে পড়ে দশরথের ঘাড়ে। সম্প্রতি তখন বয়সে ছোটো ফলে তাঁকে এতো বড় দায়িত্ব তখনই দেওয়া হয়নি। আবার অন্যান্য গবেষকদের মতামত অনুসারে, দুই পৌত্রই সাম্রাজ্য বিভক্ত করে দশরথ পাটালিপুত্রকে রাজধানী করে পূর্বভাগ ও সম্প্রতি উজ্জয়িনীকে রাজধানী করে পশ্চিমভাগ রাজত্ব করেন। এমন মতভেদ আজও চলছে।
কুনালকে নিয়ে আরও কিছু ঘটনা প্রচলিত রয়েছে তবে তার সত্যতা আজও মেলেনি। মানব ইতিহাসের এক আকর্ষণীয় চোখের অধিকারী এই যুবরাজের চোখ হারানোর বিষয়টি নাড়া দিয়েছে প্রায় সবার মনেই। কিন্তু নিয়তির লিখন খণ্ডায়ন করা সম্ভব নয়। তবে তিষ্যরক্ষার অধ্যায় থেকে আমরা এই শিক্ষা অবশ্যই পাই, প্রতিশোধের নেশায় নিন্দনীয় কাজে লিপ্ত হওয়া মোটেই সমীচীন নয়। ফলস্বরূপ, খাল কেটে কুমির নিয়ে আসা। দুটি তথ্যসূত্র অনুসারে, তিষ্যরক্ষার করুণ পরিণতির জন্য তিষ্যরক্ষা নিজেই দায়ী। তাই ক্রোধে কখনোই এতোটা অন্ধ হওয়া ঠিক নয়। ক্রোধ কখনোই ভালো কিছু বয়ে নিয়ে আসে না। নিয়ে আসে, কঠিন ও নির্মম কিছু পরিণতি। সকলে মিলে ক্রোধ পরিহার করার চেষ্টা করুন। জীবন সুন্দর ও সহজতর করুন।
©RHR
©somewhere in net ltd.