নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

বাংলায় কথা বলি৷তাই বাংলাকে প্রচন্ড রকম ভালোবাসি৷দু\'চার কলম লিখবো বলে, বলা যায় শিখবো বলে এ জগতে কদম ফেলা৷ সহযোগিতা কাম্য!

সাদ ফাইয়ায

নিজেকে সর্বপ্রথম মুসলিম— তারপর বাঙালী ভাবতে পছন্দ করি৷ মুক্ত হয়ে নয়, ধর্মীয় শেকলাবদ্ধ থাকাতেই মুক্তি খুঁজি৷

সাদ ফাইয়ায › বিস্তারিত পোস্টঃ

পরিশেষে চিঠি এলো

২৫ শে আগস্ট, ২০১৬ রাত ১১:৩৩

সেদিন ডিসেম্বরের পাঁচ। পাঁচতলার বারান্দায়
আনমনা দাঁড়িয়ে আছি। আমার বারান্দাটা
পূর্বমুখী। সামনে খোলা জায়গা। বামপাশে
কতগুলি নারকেল গাছ৷ গাছের ওপাশে হিম
কুয়াশা। কুয়াশার দেয়াল ঘেঁষে আবছা মতো দারে আবু বকরটা দেখা যায়। কপাল কুচকে তাকালে দারে তালহাও কিছুটা বোঝা যায়৷ রুমে তখনও নিজের সিট বুঝে পাই নাই। রুমে রুমে উদ্বাস্তুর মতো কাটিয়ে দিছি কিছুদিন। কখনো ইফতায়, কখনো দাওরায়৷ শেষমেশ দারে আবু বকরের চারতলার রুমটা ছাড়তে ইচ্ছে করছিলো না, কিন্তু পুরনোদের সাথে পেরে উঠলাম না৷ অগত্যা সিট পেলাম দারে উমরের পাঁচতলায়৷ তবে মনমতোই৷ জানালাসমেত কর্ণারঘেষা৷ গত তিনমাস ধরে এখানেই আছি।

তখনও আম্মা চিঠি পাঠাতো৷ মোবাইলের যুগ শুরু হইছে বহুদিন, কিন্তু তাই বলে চিঠির যুগতো শেষ হয়নি৷ আম্মার যুক্তি৷ আইসা ঠিকানা দিলাম যুবাইর ভাইর৷ গত তিন মাসে চিঠিপত্র যা আইছে, সব যুবাইর ভাইর ঠিকানায়। ফরিদাবাদের পরিবেশে যুবাইর ভাই গত পাঁচ বছর ধরে আছেন। থাকবেন অন্তত আরও এক বছর। আমার চিঠিপত্র তার দোতলার রুমের ঠিকানাতেই আসে। উনার সাথে প্রায় দিনই দেখা হয়, তবে শুক্রবার জুমুআর পর বিশেষ সাক্ষাত হয়। আমি আমার একটা দুইটা চিঠি বুঝে নিই।

আম্মা ছাড়া তেমন কেউ চিঠি লেখে না আমাকে। তাঁর চিঠিগুলোও খুব ছোট ছোট। এ মাসে হাজারের বেশি পারছিনে বাবা। কষ্ট করে চলিস। শরীরের যত্ন নিস। আর পড়ালেখা ভালো করে করিস। চিঠি পাওয়া মাত্র উত্তর লিখিস। তাঁর চিঠিতে এরকমই লেখা থাকে। আম্মার অল্প অক্ষরের এই ছোট ছোট চিঠি আমার কাছে অনেক ফুলের সৌরভ নিয়ে আসে।

তবুও কোথায় যেন কিসের অপেক্ষার আক্ষেপ
লেগে থাকে। জীবনের এই উনিশটা বছরে আমি এমন কাউকেই পেলাম না, যে আমাকে একটা দীর্ঘ চিঠি লিখবে। অন্তত দুরু দুরু বুকে চোখে চোখ রেখে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে একখানা চিরকুট দেবার মতো কোন মেঘ বালিকার খোঁজ আজও মেলে নাই। সে নিয়ে আমার অবশ্য তেমন আফসোস নেই। আমি তো অপেক্ষায় থাকি হলুদ খামের উল্টো পাশের লেখার দিকে, যেখানে অতি কাঁচা অক্ষরে নিজের নাম ঠিকানা লিখে দেবে
একজন। আমি তাতে চোখ ঘুরাবো, হাত বুলাবো।

প্রাপক— সাদিক ফারহান ,
দুইশো চৌদ্দ, হরিচরণ রায় রোড,
ফরিদাবাদ আরবী বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রেরক— সুমাইয়া আক্তার সাথী,
গ্রাম ইছামতি, ডাকঘর চানপুর,
উপজেলা রূপসা, জেলা খুলনা।

চিঠিটা খুলতেই শুকিয়ে যাওয়া এক মুঠো গোলাপ পাপড়ি ঝুরঝুর করে হাতের তালুতে এসে জায়গা করে নেবে। চিঠির শুরুতেই আমি ধাক্কা খাবো—
প্রাণের প্রিয় সাদিক ভাই! পত্রের শুরুতেই শ্রাবণের শিশির ভেজা ভালোবাসা নেবেন। পর সমাচার এই যে, আপনি আমাকে চিঠি লিখতে বলিয়াছেন। আমি লিখতে পারি না। আপনার শরীর ভালো রাখবেন।
ইতি—
আপনার চিঠির আশায় তীর্থের কাক হইয়া বসে থাকা আপনার সাথী।

এই যে তার শ্রাবণ মাসে ভোরের শিশির খুঁজে আনার প্রবণতা, সাধু চলিত ভাষা মিশিয়ে লেখা একেকটা বাক্য, এই নিয়ে আমি হয়তো আরও বেশি উদ্ভ্রান্ত হবো।

আমি শুক্রবারে যুবাইর ভাইর রুমে যাই। সাথীর কোনও চিঠি আসে নাই। সাথী কোনও চিঠি লেখে নাই। আমার ঠিক মনে পড়ে যায়, সম্ভবত এবার বাড়ি থেকে বের হবার সময় তানিয়া আপার কাছে ঠিকানা সমেত চার চারটা হলুদ খাম দিয়ে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম সপ্তাহে অন্তত একটা চিঠি আসবেই। চিঠি আসে না। আমি তানিয়া আপার কাছে চিঠি লিখি। তানিয়া আপা উত্তর পাঠান। সেই চিঠির খাম ভারী ভারী লাগে। আমি চনমনে হই। ভেবেই নিই, এবার নিশ্চিত এর ভেতরেই সাথীর চিঠিখানা আছে। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়। মসজিদের তৃতীয় তলার খোলা জায়গায় গিয়ে সেই বড়সড় চিঠি খুলে দেখি। চিঠি একটাই। সাথী লেখে নাই। পুরোটাই তানিয় আপার। তাতে সাথীর কথা কিছু লেখা আছে কি না তা খুঁজে আনবার তাগিদে পাঁচ ছয়বার পড়ি। তাতে শুধু দক্ষিণ পাড়ার মারফি ভাইর কথাই লেখা থাকে। শঙ্খ হলে সিনেমা দেখতে যাবার গল্প লেখা থাকে। সোমা স্টুডিওতে ছবি তোলার গল্প বলা থাকে। মংলা সমুদ্র বন্দরে বেড়াতে যাবার গল্প লেখা থাকে। শহর থেকে মারফি ভাইর জন্য সিল্কের পাঞ্জাবি নিয়ে যাবার গল্প থাকে। আমার সাথীর কথা থাকে না। আমি ছিঁড়ে কুটিকুটি করে সেই চিঠি হাউজের ড্রেনে ফেলে দিয়ে
হনহন করে রুমের দিকে হাঁটা ধরি। আসরের পর যুবাইর ভাইর ডাক আসে৷ আরও একটা চিঠি এসেছে। আমি ভাবি, এটা নিশ্চয়ই মাহমুদের চিঠি। এটা সেই চিঠি হিসাবে ধরি না। মাহমুদ বি এল কলেজে পড়ে, সে ভাবে পাবলিক ভার্সিটির নোট পড়লে সে লীগের ক্যাডার হতে পারবে। তার সব চিঠিতে এক কথা লেখা থাকে। যুবাইর ভাই চিঠিটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিচে মুহতামিম সাহেবের রুমে চলে যান। আমি কী মনে করে যেন চিঠিটা আরেকবার পকেট থেকে বের করি। হাতে নিয়ে তাতে চোখ রাখতেই বুক কেঁপে ওঠে। এইখাম আমিই কিনে দিয়ে এসেছিলাম। এতে সাথীর চিঠি আছে। আমি চিঠি খুলতে যাই। ভারী ভারী লাগে। এই প্রথম সাথীর পাঠানো চিঠি বেশ ভারী মনে হচ্ছে। আমি আবারো চিঠিটা পরম যত্নে পকেটে রেখে দিই। রুমে গিয়ে দু'পিস বিস্কুট খেয়ে শরহেজামি কিতাবের ফাঁকে রেখে চা খেতে খেতে পড়বো বলে চলার গতি বাড়াই। আবারো নারকেল গাছের নিচে দাঁড়াই। খাম বের করি। পড়বো কি পড়বো না, তা আরও দশবার ভাবি। এতো বড় করে লিখেছে। আহা। সময় নিয়ে পড়তে হবে। মাগরীবের আগে শেষ করতে পারবো তো? আমার সন্দেহ হয়৷ সাথীর সাথে দেখা হলে হুম আর উহুঁ জাতীয় কথার বাইরে অন্য কথা বলে না। চিঠিতে নিশ্চয়ই সব কথা একসাথে গুছিয়ে বলে দিয়েছে।

মিলব্যারাকের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা বুড়িগঙ্গার দিকে চলে গেছে, সেই রাস্তা ধরে এগিয়ে যাই৷ নদীর তীরে উলামা পার্কের এক পাশে গিয়ে একলা একা বসি। খামের মুখ খুলে চিঠি বের করতে যাই। একটার পর একটা চিঠি বের হয়। প্রতিটা চিঠিই আমার চিঠি। মানে যেসব চিঠি আমি তাকে লিখেছিলাম। সবগুলো চিঠির পাশে ছোট্ট একটা চিরকুট দেখি। সেটা আর পড়বার আগ্রহ আসে না। নিজে চিঠি না লিখে আমার সব চিঠি কেন ফেরত পাঠালো, সেই অভিমানে আমি আনমনে বুড়িগঙ্গার ইতিহাস ঘেঁটে দেখি। এখানে শুয়ে পড়লেও মন্দ হয় না। জামাটা নষ্ট হবে হয়তো! এই যা৷ শেষবার যখন দেখা হয়, দাঁত দিয়ে তার নখ কেটে দিয়েছিলাম। সেই কেটে ফেলা নখও পকেটে করে নিয়ে এসেছিলাম। চুল আঁচড়াবার কালে চিরুনিতে আটকে থাকা চুলও আনতে ভুলি নাই। রাগিয়ে দিয়ে কাঁদিয়েছিলাম একবার, তার অভিমানি চোখের অশ্রুফোঁটা কাগজে নিয়ে এসেছিলাম৷ ভিজে জ্যাবজ্যাবা হয়ে গেছিলো৷ পরে অবশ্য শুকিয়ে গেছিলো, তবে দাগটা রয়ে গেছিলো৷ সেটাই আমি ইলমুস সীগার ভাজে যতন করে রেখে দিছিলাম৷ আজ এই সাধু চলিত ভাষার মিশ্রন আর ভুল বানানের ছোট্ট চিরকুট অবহেলায় ফেলে রাখি কী করে! আমি পারি না৷ চিরকুট খুলে উপরের দিকে তাকাই। গোল গোল অক্ষরে তারিখ লেখা আছে ২৯-১১-২০১২। তার মানে আজ ডিসেম্বরের পাঁচ হলে সে এই চিঠি পাঠিয়েছে গত সাতদিন আগে। অভিমানে অবশ হয়ে যাবার পরও কী লেখা আছে তা পড়তে চোখ রাখি–
প্রিয় সাদিক ভাই, আপনার সকল চিঠি ফেরত পাঠাইলাম। আমি ছিঁড়তে পারিবো না বলিয়াই ফেরত দিলাম। আমার নিকট আপনার আর কিছু রাখা সম্ভব হইবে না। আব্বা আম্মা জানিয়া গেছে। কপালে থাকিলে চিঠি কেন, আপনাকেই যত্ন করিয়া রাখিতে পারিবো। এখন আমার চিঠি পাইবার পর যত তাড়াতাড়ি পারেন চলিয়া আসেন। আগামিকাল আলাইপুর হইতে পাত্রপক্ষ আমাকে দেখিতে আসিবে। তাহাদের পসন্দ হইলে বিবাহ করিয়া লইয়া যাইবে। আপনি আর এক মুহূর্ত দেরি করিবেন না। আপনার দোহাই লাগে।
ইতি—
আপনার প্রাণাধিক প্রিয়তমা সাথী

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.