| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সাঈদমোহাম্মদভাই
আমার সম্পর্কে কিছু একটা বলতে হবে। ভাবছি কি বলা যায়। কিছু একটা তো বলতে হবে। ঠিক আছে বলছি, প্রতিটা মানুষই স্বতন্ত্র, আমি আমার মত আর তুমি তোমার মত। তারপরও কারো কারো সাথে আমাদের চেনা জানা হয়ে যায়, একে অপরকে ভাল লাগে, বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।
রঙিন খামে ঊনষাট তম চিঠি
সময়কাল: ১৯৮৭
সকালের ডাকের অপেক্ষায় পোস্ট অফিসে বসে আছি। ডাক পিয়নের ডাকে হাতে পেলাম আরও একটি চিঠি। অপেক্ষার চাদরটা ঝেড়ে ফেলে, দেখে নিলাম খামের এপাশ ওপাশ। নেই, নাম ঠিকানা বিহীন ঊন চল্লিশতম রঙিন খামের চিঠি। পরম যত্নে পকেটে রাখা ছোট্ট হাত কাঁচিটা দিয়ে কেঁটে নিলাম খামের মুখ। লাভ হার্ট সেইপের চির চেনা নকশি করা চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম। আটত্রিশ তম চিঠিতে কি একটা ঝামেলার কথা লিখেছিল সে। সময়ের কারণে পুরোটা জানান সম্ভব হয়নি বলে, ওখান থেকেই লেখাটা শুরু। তবে এভাবেই ঘটনার ধারাবাহিকতায়, একটা নিয়ম মানার নিয়মে লিখে যাচ্ছে প্রতিটি চিঠি আমার কাছে।
পরিচ্ছন্ন, সাদামাটা লেখা। স্বভাবগত, তেমন ভণিতা করে কক্ষনো লিখতে দেখিনি তাকে। চিঠিটা পড়ে মনটা আজ বড্ড খারাপ লাগছে। বুঝতে পারছি না কিভাবে সময়টা কাটবে আমার। কয়েকটা দিন না লিখার কারণটা অবশ্য ব্যাখ্যাও করেছে চিঠিতে। তারপরও নিজেকে মানাতে কিছুটা কষ্টই হচ্ছে আমার। প্রিয় বন্ধু শহীদের, ক্যাডেট কলেজের শীতের ছুটিতে। আমারও দিন ভাল কাটবে, জানি। ওর কলেজ ছুটিতে, এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানো আমাদের যেন একটা প্রচলিত নিয়ম বনে গেছে। অস্থিরতার সময়টায় বন্ধুকে পেয়ে দিনগুলো ভাল কাটবে ভেবেই চিঠিটা দুভাঁজে পকেটে চালান দিয়ে হাটতে থাকলাম বাড়ির দিকে।
দ্বিতীয় কি তৃতীয় চিঠিতে প্রতিজ্ঞায় লিখেছিল, আমার সাথে কোনদিন তোমার দেখা হবে না। সেই শর্তেই আমার কাছে নিয়োমিত চিঠি লেখা। প্রথম চিঠিটার কথা আমার স্পষ্টই মনে আছে। মাত্র এক লাইনের দু’টি শব্দের চিঠিটা, ‘আমি অনামিকা’। সেই থেকে প্রতিদিনই রঙিন খামে চিঠি আসছে। ওয়ান ওয়ে রেডিওর মত শুনে যাচ্ছি ওকে, নিজের কৌতূহল আর অজানা কোন প্রশ্নের জবাব আশা করা বৃথা। অবশ্য অনামিকা সম্পর্কে মোটামুটি সব আমার জানা। ওর প্রিয় কবি, প্রিয় বই, প্রিয় খাবার। গাছের ডালে বসে কাঁচা আম দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে খেতে নাকি ওর খুব ভাল লাগে। এটা কি কার ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হতে পারে? আমি বুঝি, আমার সাথে মাঝে মাঝে ওঁ খুব হেঁয়ালি করে কথা বলতে পছন্দ করে। আমি অবশ্য খুব মজা পাই, ওর সব সিলি কথাগুলো শুনে। নিজের অজান্তেই হেসে ফেলি মাঝে মাঝে।
ইদানীং বেশ ঘন ঘন ডাক্তারের কাছে যেতে হচ্ছে ওকে। চিঠিতে লিখেছে,
বন্ধু, সময়টা যেন আর কাটছে না। আজ কয়টা দিন, সারাদিন জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি দুরের পথে। আর ভাবছি কেউ একজন হয়ত আসবে এই পথে। পথ চেয়ে থাকা আর ভাল লাগে না, জান? মনে হয়, সেই অচেনা মানুষের খুঁজে হাঁটতে থাকি এই পথ ধরে। খুঁজে নিয়ে আসি তাঁকে হাতটি ধরে। কিন্তু পারি না। প্রচণ্ড দুর্বল লাগে ইদানীং। জান? তোমাকে না স্বপ্নে দেখেছি গত রাতে। তুমি আমার পাশে বসে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছ। কি রোমান্টিক না? আমি মনে মনে হাসি আর বলি হুম, রোমান্টিক বটে। কোন একটি চিঠিও সম্পূর্ণ লিখে উঠতে পারে না অনামিকা। কিসের এক ব্যস্ততায় যেন ওর রাজ্যের তাড়াহুড়ো। কয়েক লাইন লিখেই যেন পোষ্ট করার জন্য ছটফট করতে থাকে। আমি বুঝতে পারি। আমাকে ওর মনের কথা গুলো বলার আকুতি থেকে এই অস্থিরতা। আসলে আমি ওর সব বুঝতে পারি ইদানীং। শুধু আমার অনুভূতি গুলোকে বলতে পারি না, ওর মত করে চিঠির ভাষায়। মাঝে মাঝে ভাবি, অনেক লাকি অনামিকা, অন্তত নিজের কথা গুলো প্রকাশ তো করছে আমার কাছে! কিন্তু আমি? প্রথম প্রথম ডাইরি লিখতাম ওর কাছে। কিন্তু এখন সেটা আপাতত বাদ দিয়েছি। বাদ দিয়েছি বললে অবশ্য ভুল হবে। কেন জানি লিখতে পারি না, একটা শব্দও আসে না লিখতে বসলে।
প্রতিটা চিঠি শতবার পড়ে ফেলি এক বসাতেই। পড়াশুনার প্রতি তেমন মন নেই জেনে বাড়ির সবাই ভাবে কিছু একটা হয়েছে আমার। মা’তো রীতিমত দুঃচিন্তায় আছেন। কি হল আমার এই দুষ্ট ছেলেটার? বলতে শুনি সহসাই। আমি বলি, ধেৎ তুমি এত চিন্তা করছ কেন মা’? এমনিতেই মা’ ভীষণ চিন্তায় আছেন আমাকে নিয়ে। দুরন্ত ছেলের হঠাৎ চুপচাপ হতে দেখে মা’ যেন একটু ভাবনায় পড়ে যান। রাত জেগে পড়ার অভ্যাস কখনই ছিল না আমার। কিন্তু ইদানীং শেষ রাত অব্ধি জাগতে দেখে অনেক প্রশ্ন মা’র মনে। অবশ্য দূর হয়ে যায় সকালেই, আমার সাথে পরম কথোপকথনে।
কয়েকটা দিন ভালই যাচ্ছে। ডাকঘরে যাওয়ার তাড়া নেই। প্রিয় বন্ধু রাতেই বলেছে, সকাল সকাল ওর মামা বাড়ি বেড়াতে যাবে আমাকে নিয়ে। সেই জন্যই আজ খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠা। সারাদিন ঘুরেফিরে প্রচণ্ড ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়লাম। মাঝ রাতে ঘুম ভাঙতেই অনামিকার কথা মনে পড়ল। চিঠির বাক্সটা খুলে নিয়ে পড়তে থাকলাম চিঠিগুলো। ভালই লাগছে নিস্তব্ধ এই রাতে একা একা নিঃশ্চুপে চিঠি গুলো পড়তে। প্রায় ছয়, সাত দিন হল অনামিকার কোন চিঠি আসে না। কাল একবার ডাকঘরে যেতে হবে। সচরাচর এমন হয়নি কখনো। এই প্রথম ওঁর চিঠি না লেখার লম্বা বিরতি। আগামীকাল শহীদ চলে যাচ্ছে কলেজে। ওঁর শীতের ছুটিতে আমারও ভালই সময় কেটে গেল। শহীদকে বিদায় দিয়ে আসার পথে পোষ্ট অফিসে যেতেই ডাক পিয়ন আমার হাতে অনেক গুলো চিঠি ধরিয়ে দিল। দেখি মোট আটখানা, সেই রঙিন খামের চিঠি। চিঠি গুলো হাতে পেয়েই মনে হল অনেক কথা জমানো বলতে না পারা অনেক কথার চিঠি।
হরেক রঙের খামে ভরা চিঠি গুলো দেখতে ভালই লাগছে। এর আগে কখনো খেয়াল করিনি সাদা, নীল, হলুদ, সবুজ রঙের খামে লাল হৃদপিণ্ডের শরীরে লেখা চিঠি গুলো। চিঠি গুলো খুলে ভীষণ আশ্চর্য আর বিচলিত হয়েছি। সাতটি চিঠিতেও কিচ্ছু লেখা নেই। শুধু একটি চিঠিতে লেখা,
‘বড্ড দেরি হয়ে গেল। বিশ্বাস কর, তোমাকে ভীষণ মিস করছি।
তোমার কথা খুব মনে পড়েছে কিন্তু শরীরটা তেমন ভাল ছিল না বলে লেখতে পারিনি।
বাড়ি এসেই তোমাকে লেখতে বসেছি। মন খারাপ করোনা।
এখন ভাল আছি। তুমি কেমন আছ?
‘অনামিকা।
এই প্রথম অনামিকা সাত চল্লিশতম চিঠিতে আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি কেমন আছি। উত্তর দেয়ার আকাঙ্ক্ষায় কতবার যে খাম গুলোর এপাশ ওপাশ দেখেছি জানা নেই। তবে যত বার চিঠি গুলো পড়েছি অন্তত ততবার ঠিকানা খুঁজেছি উত্তর লেখার আশায়। কিন্তু সেই যে শুরুতেই না দেখা করার পণে আমাকে লিখে ছিল। ‘আমার সাথে তোমার কখনো দেখা হবে না’। সেই প্রতিশ্রুতি কক্ষন ভাঙেনি অনামিকা।
ক্লাস আর হোম ওয়ার্কের চাপে ভীষণ ব্যস্ত আমি। হঠাৎই যেন চাপটা একটু বেশি মনে হচ্ছে আমার। সামনেই পরীক্ষা, তাই চোখে মুখে কোন পথ দেখতে পাচ্ছি না। অনামিকার কথাও যেন ভুলে যেতে বসেছি। এরই মধ্যে অনেক গুলো চিঠি এসে জমে আছে। ভীষণ পড়াশুনোর চাপে সময় করে উঠতে পারিনি। তাই পড়া হয়নি চিঠি গুলো। মাত্র এক দু’লাইনের প্রতিটা চিঠি। পরীক্ষার মাঝেও চিঠি আসছে বলে মনে মনে একটু বিরক্তও হলাম। কিন্তু ওঁর কথা ওঁ রেখেছে। পঞ্চম চিঠিতে ওঁ লিখেছিল শরীর ভাল থাকলে চিঠি লেখা ঠিক চালিয়ে যাবে, বন্ধ রাখবে না। তাই নিয়মিত প্রতিদিনই আমাকে চিঠি দিয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষা শেষে শহীদের আম কাঁঠালের ছুটিতে আসার কথা আছে। আর অত্যন্ত গরমেও এ সময়টা আমাদের দু’জনের খুব ভাল কাটে। দেখতে দেখতে সেই দিনটাও যেন চলে এল। অনামিকার দেয়া শেষ চিঠিগুলো বারবার পড়ছি। পরীক্ষার সময় তেমন করে পড়া হয়নি। তাই প্রতিটি চিঠি যেন মুখস্থ করে ফেলেছি। আজ আটান্ন তম চিঠিটা এসেছে। ওঁর শরীর ভীষণ খারাপ। নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যেতে হচ্ছে ঢাকাতে, কেমোথেরাপি দিতে। চিঠিটা পড়ে আজ আমার মনটা ভীষণ খারাপ। ওঁ লিখেছে,
বন্ধু, মাঝে মাঝে সব ভুলে যেতে চাই।
ভুলে যেতে চাই আমার অসুস্থতার কথা।
ভুলে যেতে চাই পৃথিবীর সকল যন্ত্রণার কথা।
বিশ্বাস কর এখন তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করে আমার।
মনে হয় একাই চলে যাই সমস্ত দুঃখ আর কষ্টকে আড়াল করে। ভুলে যেতে চাই আমারও একটা কষ্টের জীবন আছে। ভুলে গিয়ে মিশে যেতে চাই তোমার মাঝে। বিশ্বাস কর, নিজেকে আর চালাতে পারছি না। তোমার দেখা পাব বেল মনে হয় না।
সময় চলে যাচ্ছে দ্রুত। কখন যে শেষ ঘণ্টা বেজে উঠবে জানি না।
শেষ বেলায় এসে মনে হচ্ছে, খুব অন্যায় করেছি তোমার সাথে। কি কষ্ট নিয়েই না আছ তুমি। আমি তো আমার মনের কথা গুলো লিখতে পারছি তোমার কাছে।
আর তুমি? কষ্টের সাগরে সাতার কেটে নিশ্চয়ই ঐ পাড়ের দেখা পাচ্ছ না।
মনে হচ্ছে মাঝ দড়িয়াতেই থেমে যাবে তোমার মানব মনের বাঁশি। তাই না?
আমার অপেক্ষায় থেকো না।
অনামিকা।
বন্ধু শহীদ, এসেছে গতকালই। এখনও দেখা হয়নি। আমার হাতে অনামিকার ঊনষাট তম চিঠি। নিজেকে আর সামলে রাখতে পারছি না। মনে হচ্ছে বিষ দংশনে সাড়া শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। শহীদ আমার ঘরে এসে দেখে, আমার মনটা খুব খারাপ। টেবিলের সামনের চেয়ারে বসে আমার দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষন। বুঝতে পারছে না কি বলবে। আমার টেবিলের ড্রয়ারটা খুলতেই চোখে পড়ে হরেক রঙের কাগজের অনেকগুলো খাম আর লাল হৃদপিণ্ডের বর্ণ বিহীন এলোমেলো কাগজগুলো। আমার দিকে তাকিয়ে থাকে অবাক হয়ে। কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়, আমার হাতের চিঠিটা নিয়ে, পড়তে থাকে শব্দ করে।
-‘তোমার সাথে বুঝি আর দেখা হল না’।
‘অনামিকা’।
চিঠিটা পড়েই হো হো করে অট্ট হাঁসিতে জড়িয়ে ধরে আমাকে।
সাঈদ মোহাম্মদ ভাই
[email protected]
©somewhere in net ltd.