| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রুমের স্বপ্ন সার্থক হল আমার
১৩/১২/২০০৯
আজ তৃতীয় বর্ষ শেষ হবার পথে। রুমের স্বপ্নটা আমার স্বপ্নই রয়ে গেলে, স্বার্থক হল না। রাতের খাবার খেয়ে বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছি, এমন সময় সুসংবাদটা আমার কর্ণগোচর হলেও, তেমন আমলে নিলাম না। রুমের স্বপ্ন সার্থক হবার নয়, এরকম ধারণা আমার মগজে গেঁথে গেছে। রাত এগারটার দিকে রুমে উঠলাম। এক খাটে দুজন ঘুমাব আমরা। আজব একধরনের তীব্র আনন্দে মন নেচে উঠল। এখন তাহলে ক্লাসের সব খাতা আর বইয়ের কভার পৃষ্ঠার পিছনে লিখতে পারব;
সবুজ সরকার
১৫৯, এসএম হল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নতুন রুম, ঘুম আসছে না। এ নিদ্রাহীনতার কারণ অতিশয় আনন্দ। রুমে থেকেও কী যেন নেই নেই ভাব। রুম থেকে বের হলাম। রিডিং রুমে আলো জ্বলছে। রিডিং রুম পার হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম। সবুজ বিছানার ঘাসে বসে আকাশের দিয়ে তাকিয়ে কত শত যে ভাবনা নিজেকে আচ্ছন্ন করল, বলতে পারি না। বারান্দার স্মৃতি এখনো সজীব। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই রনি, মুন্না, আবীর, তমাল মুখগুলো। হালকা দুষ্টুমি আর মোবাইলে গান বাজানো নিয়ে সাকিব আর সজলের ঝগড়া এখনো মিস করি। ওরা ভাবছে রুম পেয়ে আমি ওদের ভুলে গেছি, তাই কী হয়! কাল সকালেই যাব ওদের ওখানে।
বাবাকে ইদানিং খুব বেশি মনে পড়ছে। বাবার কোন কথাই রাখা হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর। নামায থেকে শুরু করে সকালে ঘুম থেকে ওঠা। মাকে মনে করি না তা নয়। মাকে মনে পড়ে ক্যান্টিনের খাবার টেবিলে বসে অথবা টিএসসি’তে প্রেমিকা তার প্রেমিককে যখন খাওয়াতে দেখি। একাত্তরের চিঠিগুলো পড়ে বাবাকে চিঠি লিখতে মন চাইছে। বাবাকে কখনো চিঠি লেখা হয়নি, অথচ চিঠি নিয়ে তার কারবার। অবশ্য না লেখার অন্যতম কারণ হলো, আমার কোন ঠিকানা না থাকা। বারান্দার কোন ঠিকানা থাকে নাকি, আমার চিঠির ঠিকানা তখন কী হত? কার কাছে আসত আমার চিঠি!
পিয়নকে সারা এসএম হল খুঁজতে হত। রুম পাওয়ার পর বাবাকে চিঠি লেখা শুরু করলাম।
প্রিয় বাবা,
আশা করি ভাল আছ। আজ ২৭ আষাঢ়। বর্ষার একমাস বিদায় নিল।
বাবা, কিভাবে বৈশাখ-জৈষ্ঠ্যের ঝড়ো দিন পার হয় আর কীভাবে বসন্তের ফুলের মেলা পার হয় ইট পাথরের এই শহরে বোঝা যায় না। ষড়ঋতুর এই দেশে প্রকৃতি ছয়টি রূপে-রঙে ধরা দেয় এদেশের মানুষের রোজকার কাজ-কর্মে,
আচার-অনুষ্ঠানে। এক সময় বর্ষা হলে ভেলা বা নৌকা বিচরণ করত, তখন বুঝতাম এখন বর্ষাকাল। অথচ দেখ, শীত কীভাবে বিদায় নিল বুঝতেই পারলাম না। প্রকৃতির যে আবহমান রূপ, তা সে বদলিয়েছে। বাবা, প্রকৃতির মত মানুষও বদলিয়েছে, বদলে যাচ্ছে, আরো দ্রুত। মানুষের কথা শুনে তার ভিতরের ব্যথা বুঝবার উপায় নেই। প্রকৃতি বদলিয়েছে মানুষের বিরূপ আচরণে আর মানুষ বদলিয়েছে তার নিজের কারণে; নৈতিকতা বির্সজন দিয়ে। বন্দে আলী মিয়ার
লেখা- “আমাদের ছোট গ্রাম ছোট ছোট ঘর/ থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর”। একথায় আশ্বস্ত হয়ে বিশ্বাস করার যোগ্যতা আমি হারিয়ে ফেলেছি। মানুষের সাদা চামড়ার ভিতরে একটি কুৎসিত-কালো মন থাকতে পারে তা আমি আজ বুঝি। গ্রামের সেই মেধাবীরা আজ কোথায় বাবা? যারা গ্রাম উন্নয়নের মধ্য দিয়ে সোনালী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখত। পরীক্ষার খাতায় কচি হাত দিয়ে লিখত-“চল গ্রামে ফিরে যাই” সাবলীল ভাষার রচনা। বাবা, প্রকৃতির সাথে আমিও বদলিয়েছি। কিশোর সবুজ রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- “বালাই সবুজ ”এর সাথে এসএম হলের ১৫৯নং রুমে থাকা সবুজের পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে বাবা, আমি একটি দিক থেকে বদলাইনি আর তোমরা আমাকে বদলাতেও দাওনি।
তা হল পরিবারের ভালবাসা থেকে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে সুখ-দুঃখের আলো-আধারির খেলা প্রতিনিয়ত সংসারকে দোলা দিলেও কোন কষ্ট; সেটা হোক আর্থিক বা মানসিক তোমরা আমাকে পেতে দাওনি। যাদের কারণে আজকে আমি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা হয়ত জানে না, হৃদয়ের কতটা গভীর থেকে তাদের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। কোনদিন কষ্ট পাব বলেও চিন্তা নেই আমার। তবে মাঝে মাঝে খুব মন খারাপ হয়, পরিবারকে কিছু দিতে পারিনি এই বেদনা থেকে। মাকে নিয়ে একটা রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলাম এই মাসে। মা’কে কিছু দিতে পারি নাই বাইশ বছরের এই জীবনে। কালি আর কাগজে একটা রচনা লিখেছি তাকে জনতার স্মরণীতে পরিচয় করার ব্যর্থ প্রচেষ্টাতে। বাবা, আমি খুব ভয়-ডর কম করতাম ছোটবেলা থেকে। সেই ছোটসময়ে রাতে চুরি করে অন্য গ্রামে ভিসিআর দেখতে যেতাম একাই; সাপ, বিচ্ছু, ভূতের ভয় উপেক্ষা করে। এ কারণে অবশ্য মার কম খাইনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কাউকে ভয় না পেলেও আমার মত সবাই একটা জিনিসকে চরমভাবে ভয় পায়। সেটা কী জান বাবা, রক্তচোষা ছারপোকা!! ওর ভয়ে আমি ভীত থাকি সবসময়। সত্যি! এক হাস্যকর ব্যাপার বাবা, তাই না? ছারপোকা নিয়ে একটা লেখা লিখলাম গত সপ্তাহে, পত্রিকায় ছাপা হলে তোমাকে জানাব।
ইতি
তোমার স্নেহের
সবুজ
চিঠিটা কেমন হয়েছে তা আমার জানার সুযোগ ছিল না। বাবাকেও আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। আর বাবাও কিছু বলেনি। তবে প্রায়ই লিখতাম। সময় হাতে থাকলেই। কেমন এক আলাদা অনুভূতি এই ডিজিটাল যুগে আমি বলে বুঝাতে পারব না।
২|
০৩ রা জুন, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:১১
এক চিলতে রোদ্দুর বলেছেন: ধন্যবাদ। ভাইয়া মন্তব্য করার জন্য।
৩|
০৩ রা জুন, ২০১৪ রাত ১০:০১
মিনুল বলেছেন: সুন্দর!
©somewhere in net ltd.
১|
০৩ রা জুন, ২০১৪ বিকাল ৫:৪৬
জেরিফ বলেছেন: চিঠি টা পড়ে অন্য রকম এক ভালো লাগা নাড়া দিয়ে গেল ।
ছোট বেলা লিখতাম বাবা কে ,দেশের বাইরে থাকার সুবাদে সেই সৌভাগ্য হয়েছিল , পরে মোবাইল এর আগমনে চিঠি লিখার অভ্যাস টা হারিয়ে গেছে সময়ের বিবর্তনে ।
চমৎকার লিখেছেন ।