| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সাহিত্য বাজার
সাহিত্য বাজার একটি অনিয়মিত সাহিত্য সংস্কৃতি ও রাজনিতীর পত্রিকা। এটি অনলাইনে নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে। আমি এটি চালাচ্ছি। আরিফ আহমেদ।
ধার্মিক (ধারাবাহিক উপন্যাস)
আরিফ আহমেদ
প্রথম পর্ব
(পর্দা বা বোরখার ব্যবহার সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি?
আচমকা এ জাতীয় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে ঈমাম সাহেবকে বিব্রত করে দিতে চাইলেন সাইখুল আশরাফ হুজুরের ভক্তরা। এর আগে তারা এরফান এমপিকে জব্দ করতে অনেকবার চেষ্টা করেছেন, ইমামতি ফেলে রেখে একজন অসুস্থ বিধর্মীকে হাসপাতালে রেখে আসার দায়ে অভিযুক্ত এরফান এমপিকে তারা ইমামতির জন্য অযোগ্য ঘোষণা এবং যারা এরফানের পিছনে নামাজ আদায় করবে তাদেরও মুরতাদ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সরকারের সমর্থন থাকার কারণে এবং এলাকার মানুষের ভালবাসা থাকায় ইসলামী এ গ্রুপগুলো তার কোনো ক্ষতি এ যাবৎ করতে পারেনি।
অনেকদিন পর আজ তারা সুযোগ পেয়েছেন, ‘যত মত তত পথ’ নামের সরাসরি একটি অনুষ্ঠানে স্যাটেলাইট মিডিয়ার সামনে এরফান এমপিকে নাজেহাল করার। দর্শকের সদ্মবেশে তাই তাদের প্রতিটি প্রশ্নই আক্রমাত্বক।
সাইখুল আশরাফ হুজুরের ভক্তরা যে এরফানকে সহ্য করতে পারেন না, এটা এরফান জানতো, কিন্তু তারা যে তাকে এতোটা ঘৃণা কওে, তা এই প্রথম বুঝতে পারে এরফান।
মৃদু হেসে এরফান বলেÑ পর্দাÑ যদি আপনারা বোরখাকে পর্দা বলেন তাহলে আমি বলবোÑ ধর্মীয় ভাবাদর্শে যারা বিশ্বাসী তারা প্রত্যেকেই পর্দাপ্রথাকে গুরুত্ব দেন। পুরুষ-রমণী প্রত্যেকরই পর্দায় থাকা উচিৎ। শুধু নারীই পর্দায় থাকবেন আর পুরুষরা উদোম গায়ে ঘুরে বেড়াবেন আমি এটার পক্ষপাতি নই। তবে সকলের ক্ষেত্রেই মনের পর্দাটাকেই আগে শক্তিশালী করতে হবে। মা বোনদের জন্য বাহ্যিক যে পর্দা রয়েছে সেটাকে বোরখা বলি। প্রচ-ভাবে ধর্মীয় একজন নারী নির্দিধায় বোরখা ব্যবহার করেন, কিন্তু আধুনিক যুগে এর ব্যবহার প্রায় উঠে গেছে। আর প্রচ- গরমে বোরখার ব্যবহার সত্যি খুব কষ্টদায়ক। তারপরও আমি বলবো বোরখা পড়ে একজন মেয়ে হাজারো পুরুষের সামনে যতটা স্বাচ্ছন্দে চলতে পারবেন, ততটা স্বাচ্ছন্দে অন্যকিছু পড়ে চলতে পারবেন না। কিন্তু একজন পুরুষ যদি তার মনের উপর পর্দা তৈরি করতে না পারেন তাহলে শত বোরখা পড়েও কিন্তু একজন নারী ঐ পুরুষটির কুচক্ষু থেকে নিজেকে রক্ষা পারবেন না।
আপনি নারীর সাথে পুরুষের তুলনা করছেন?
কেন করবোনা যুক্তি দিন, ইসলাম ধর্ম সবসময়ই নারীকে সম্মানের আসনে, মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। আপনাদের-ই হুজুরের বক্তব্যে এর অসংখ্য প্রমাণ পাবেন। কোরাণে কী শুধু নারীদেরই পর্দায় থাকতে বলা হয়েছে?
আপনি মসজিদের টাকা, আল্লাহর ঘরের জন্য দানকৃত টাকায় হিন্দু মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন-এটা যে কতটা নাফরমানী কাজ আপনি জানেন? এর জন্য আপনাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। হঠাৎই এভাবে ক্ষুব্দ হয়ে উঠলেন সাইখুল আশরাফ হুজুরের ভক্তরা। তাদের সঙ্গে আরো আছেন আসমত আলী পীর সাহেবের দরগার কিছু মাদ্রাসা ছাত্র। তাদের ক্ষোবের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এখন এই টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে। দেশজুড়ে সরাসরি লাইভ সম্প্রচার চলছে- এই ‘যত মত তত পথ’ নামের ইসলামিক অনুষ্ঠান পর্বে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে এরফান এমপিকে অপছন্দ করে এমন সকল মুসল্লিকেই নিমন্ত্রণ করা হয়েছে এ পর্বে।
আপনারা শান্ত হউন। উত্তেজিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে এরফানের এ গম্ভীর উচ্চারণ। মুহূর্তেই সবাই চুপ। এরফান বলেনÑ আপনারা এ প্রশ্নের উত্তর আগেও পেয়েছেন। আমি আবারও বলছি। আমি আপনাদের মত কোন ধর্মীয় দীক্ষা নিয়ে আসিনি। আরবী ভাষায় আপনাদের মত পারদর্শী নই। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে আমি এ টুকু বুঝি যে, মানুষের মঙ্গলের জন্য, উপকারের জন্য ধর্ম তৈরি হয়েছে। মানুষের মাঝে মানুষের গভীর বন্ধুত্ব, ভালবাসা তৈরিই ধর্মের প্রধান উদ্দেশ্য। পৃথিবীর সব ধর্মেরই মূল উচ্চারণ হচ্ছে শান্তি। শুধু মসজিদ বা মন্দির নয়, পৃথিবীতে যতরকম উপসনালয় আছে এবং সে সব উপাসনালয়ে যত দান ক্ষয়রাত হচ্ছে তার সবই স্রষ্টা বা আল্লাহর নামেই হচ্ছে। আল্লাহ কী কখনো ঐ টাকা বা সম্পদ নিজের জন্য ব্যবহার করেন? ঐ টাকায় আমরা যেটা করি তা হচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়ত মসজিদের বিভিন্ন সংস্কার বা ইমামের বেতন ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করি। কিন্তু আমাদের আহঞ্জিবাড়ির মসজিদের এ জাতীয় কোন সংস্কার বা ইমাম সাহেবের বেতন প্রয়োজন হয়না। তাই আমি সে টাকা মানুষের উপকারে ব্যবহার করি। সে মানুষটা হিন্দু না মুসলমান তা দেখার প্রয়োজন আমার নেই। এতে আপনারা ক্ষুব্দ হন বা আমাকে মুরতাদ বলেন আমি পরোয়া করিনা। আপনারা একটা বিষয় কেন বোঝেন না, ইসলাম ধর্ম শান্তির ধর্ম, এক আল্লাহর ইবাদত যদি সবাই করেন তাহলে আপনাদের মধ্যে এত মতভেদ কেন? কেন ছোট্ট একটি জেলা শহরে এতগুলো ইসলামী দল বলতে পারেন? আমি আরবী জানিনা, তবে শুনেছি- আপনাদেরই নেতারা বিভিন্ন মাহফিলে ওয়াজ করেছেন, বিদায় হজ্বের মহত্ব বলেছেন, হুদায়বিয়ার সন্ধির কথা বলেছেন। আমি আপনাদের অনুরোধ করবো বিদায় হজ্বে হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)-এর বাণীগুলো আবার শুনুন, বুঝুন। তারপর ধর্ম পালন করুন। হুদায়বিয়ার সন্ধি দিয়ে নবীজী কী বুঝাতে চেয়েছেন ভালো করে ভেবে দেখুন। একটি শিশুকে নবীজী মিষ্টি খেতে নিষেধ করবেন, সেইজন্য তিনি কী করেছিলেন তা বারবার স্মরণ করুন, দেখবেন আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর আপনারা পেয়ে গেছেন। আর একটা কথা…….
আচমকা বিকট শব্দে কেঁপে উঠল ময়দান। কেঁপে উঠল টিভি স্ক্রীণ ও সারা দেশ। হৈ-হুল্লোর, চিৎকার আর আর্তনাদে আকাশ বাতাস একাকার হয়ে গেল। দেশের সব টেলিভিশন চ্যানেল এ তখন একটাই ছবি একটাই প্রশ্ন – কে এই এরফান ইমাম এমপি?)
এক
হে স্রষ্টা তুমি, পথ ভ্রষ্টা আমাদের ক্ষমা করো।।
জ্বালো সত্য পিদীম জ্বালো, জ্বালো মঙ্গলশিখা জ্বালো ।
আমাদের মনের গহীনে লুকানো অন্ধ কোঠায়
পাপেরা সেখানে সাঁতার কাটে আর বড় হয়।।
তুমি স্রষ্টা, সব দ্রষ্টা পাপেদের বিনাস করো,
পাপীদের ক্ষমা করো।
জ্বালো সত্য পিদীম জ্বালো, জ্বালো মঙ্গলশিখা জ্বালো।
ফজরের নামাজ শেষে এভাবেই প্রার্থনাসঙ্গীত চলছিল আহঞ্জীবাড়ির মসজিদে। হঠাৎ বাহিরে কান্নার শব্দ পেয়ে ঈমাম সাহেব দ্রুত প্রার্থনা শেষ করলেন। আমীনÑ বলে ঈমাম সাহেবের পিছন পিছন মুসুল্লীরাও বেরিয়ে এলেন মসজিদ থেকে। মুসুল্লী বলতে এই আহঞ্জীবাড়ির বাসিন্দারাই জনাকয়েক। বাহিরের বা আশেপাশের বাড়ির লোকেরা এ মসজিদে আসেনা। কারণ অনেক। এখানে নাকি সব ইসলাম বিরোধী, আল্লাহ’কে নারাজ করার কায়কারবার চলছে। এটা যদি গ্রামের চেয়ারম্যান বাড়ির মসজিদ না হতো তাহলে…….। থাক! সে অনেক কথা, পরে সে বিষয়ে শোনা যাবে, আগে এই কান্নার উৎস কী সেটা জানাই প্রধান বিষয়।
মুসুল্লীরা সবাই নামাজ শেষে বাহিরে এসে কান্নারত দু’জন মহিলা-পুরুষকে ঘীরে ধরেছে। তাদের সাথে তিন-চারটে বাচ্চাও কাঁদছে। মুসুল্লীরা যতই জানতে চায়- কী হয়েছে? ততই কান্নার বেগ বাড়ছে তো বাড়ছেই। তাদের কান্নার একটাই সুর ধ্বনিত হচ্ছেÑ ও চেয়ারম্যানসাব আমাগো বাঁচান। আমরা এহন কই যামু? কী খামু? আমাগোরে বিষ আইনা দেন, আমরা খাইয়া মরি। ও চেয়ারম্যানসাব গো আমাগোরে বাঁচান।
ভিড়ের মধ্যে এবার ভরাট মিষ্ট একটি কণ্ঠ ধ্বণিত হলÑ এই তোমরা কান্না থামাও, কী হয়েছে আগে বল, তারপর দেখি তোমাগোরে বিষ দিমু না অন্যকিছু।
সাথে সাথে কান্না থেমে গেল।
ভিড় একপাশে সরে গেল। কেউ একজন একটা চেয়ার এনে পেতে দিল মসজিদের সামনের দাওয়ায়। ৩৫ কী ৩৬ বয়সের একজন যুবক এসে সে চেয়ারটি সরিয়ে দিয়ে মসজিদের দুয়ারের পাদানীতে বসলো। সৌম্যসুন্দর সে যুবকের মুখাবয়ব। ক্লীনশেভ করা, সে মুখে খেলা করছে যেন কোনো দৈবজ্যোতি। পোড়খাওয়া তামাটে উজ্জল গায়ের রং, লম্বায় প্রায় ৫ফিট ৯ ইঞ্চি হবে। কথা বললে মনে হয় যেন মাউথপিস হাতে নিয়ে মাইকে কথা বলছে, এমনই ভরাট তার কণ্ঠস্বর। সে যখন আযান দেয়, শত্রুরাও তখন থমকে যায়, মনদিয়ে শোনে আযানের সুর। নিজের অজান্তেই বড় বড় আলেম- যারা ফতোয়া দিয়ে আহঞ্জীবাড়ির মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছেন, তারাও বলে উঠেন আহ্! কী দারুণ, একেই বলে আযানের সুর। ইস, বাংলাদেশের সব জায়গায় যদি এমন মিষ্টি সুরের আযান হত!
এই কণ্ঠ ধ্বণিত হওয়া মাত্রই পিনপতন নিরবতা নেমে এল আহঞ্জীবাড়ির মসজিদ সীমানায়। পাখীদেরও বুঝি এখন শব্দ করা নিষেধ। তাই এতক্ষণ যে সব পাখী কিচির মিচির শব্দে ভোরের আগমন ঘোষণা করছিল সেগুলোও যেন চুপ হয়ে গেল।
Ñ হ্যাঁ সুনীল কাকু বল কী হয়েছে? কেন বউ পোলাপান নিয়ে এই ফজরের সময় মসজিদের কাছে এসে কান্না করছো?
সুনীল দাস তখনো ফুঁফিয়ে কান্না চাঁপার চেষ্টা করছে, ওর হাতে-গায়ে কালো কালো কালির ছোঁপ, বউটির শাড়ির বেশ কয়েক জায়গায় পোড়া, কপালের খানিকটা কেটে রক্ত শুকিয়ে জমাট বেধে আছে। হাতে পোড়াক্ষত। বাচ্চাগুলোর চোখেমুখে ক্ষুদা আর কষ্টের ছাপ। ক্রমশ সকালের আলো যতো পরিস্কার হচ্ছে ততই স্পষ্ট হচ্ছে বিভৎস একটা চিত্র।
সুনীল নয়, কথা বলে উঠল সুনীলের বউ। তুমি গ্রামের চেয়ারম্যান। গরিবের মা-বাপ। বিপদে তোমরার কাছে আসমু না তো কই যামু কও বাপ? বলেই আবার কান্না চাঁপার চেষ্টা, এবার সুনীল বলে উঠল- পরশুদিন মাঝরাইতে কে বা কারা যেন আমাগোর ঘর জ্বালাইয়া দিল। বউ বাচ্চা লইয়া পুইড়াই মরতাম, যদি গরুঘর আগে না জালাইয়া বসতঘরে আগে আগুন দিত। গরুগুলোর ডাকাডাকিতে ঘুম ভাউঙ্গা গেল। দেখি দাউ দাউ কইরা আগুন জ্বলছে। কোনমতে জানডা বাচাঁইছি। ঘর-গৃহস্ত কিছু বাঁচে নাই, গরুগুলোর কি হইছে কইবার পারমু না। আশেপাশের লোকজন ছুইটা আইল। আগুন নেভানোর চেষ্টাও করেছে। লাভ হয় নাই।
পাশ থেকে একজন মুরুব্বী ফোঁড়ন কাটলেনÑ এ তো দুদিন আগের কথা। শুনলাম তোমরা বিচার চাইতে শহরে তোমাগো সমিতিতে গেছ। তা এখন আবার চেয়ারম্যানের…?
কাকা? আচমকা বাঁধা পেয়ে থেমে গেলেন মুরব্বী কাকা। তার কথা আর শেষ হল না।
সুনীল ব্যাখ্যা দিলÑ আমরা নিম্নজাতের হিন্দু। তাই কী করমু বুঝবার পারি নাই, প্রথমে আমাগের সংঘ নেতাদের জানাইলাম, তাগোর আচরণ ও কথাবার্তা শুনে তেনারা কিছু কইরবার পারবো বইলা মনে হইল না। উল্টো তাগোর কাছে যাইয়া ছেলেমেয়েরা দুবেলা কিছু খাইবারও পারে নাই। তাই আবার তোমার কাছে ছুইটা আইছি বাজান, তুমি একটা ব্যবস্থা কইরা দেও।
যুবক বলতে শুরু করলেন- তোমাদের ঘরে কারা আগুন দিছে সে খোঁজ দু-একদিনের মধ্যেই জানা যাবে। যারা আগুন দিয়ে তোমাগো সর্বশান্ত করেছে, তারাই তোমাদের সবকিছু আবার আগের মত ফিরিয়ে দেবে। আমি আজ পঞ্চায়েতে তাদের সব নিয়ে ৫দিন সময় দেব, এই পাঁচদিন তোমরা আহঞ্জীবাড়ির কাচারীঘরে থাকবে। নিজেরা রান্না করে খাবে। বাড়ির লোকেরা তোমাদের চাল-ডাল যা লাগে দিয়ে যাবে। কোনো অনিয়ম হলে আমাকে জানাবে। যাও, এখন তোমরা বিশ্রাম নাও।
কাচারীঘরটি মূলত আহঞ্জীবাড়ির ঐতিহ্যের সাক্ষী। এখানে বসে এখনো বিচারাচার ও মেহমানদারীর কাজ পরিচালিত হয়। বাড়ির কোনো গৃহস্তের ঘরে বাড়তি মেহমান এলে তারা এখানে থাকেন। আবার মসজিদের বারান্দায় সকালবেলা বাচ্চাদের আরবী ও বাংলা শেখান যে মৌলভী সাহেব তিনিও থাকেন এই কাচারীঘরে। তাই স্বাভাবিকভাবেই হিন্দু পরিবারকে কাচরীঘরে জায়গা দেওয়া নিয়ে একটা গুঞ্জন উঠলো। গুঞ্জন তুললেন যুবকের বাবা এমাজউদ্দিন আহন স্বয়ং। তিনি বললেন- তোমার সব কাজে আমরা স্বায় দিচ্ছি বলে তুমি যা খুশি তা করতে পার না। কাচারীঘরে ওরা থাকলে মৌলভী সাহেব কোথায় যাবেন?
যুবক- আহ্ বাবা। আমাদের কাচারীঘর কী এত ছোট? যেখানে একসাথে জনা পঞ্চাশেক লোক ঘুমাতে পারে, সেখানে মাত্র একজন লোকের জন্য পাঁচজন লোকের জায়গা হবে না।
এ কথায় বাবার স্বর একটু নরম হল- না না আমি জায়গার কথা বলছি না, আমি মৌলভী সাহেবের দিকটায় ভেবে বলছি, ওখানেতো তার একটা খাট আর একটা আলমিরা রয়েছে, কোন পার্টিশনতো নেই। এমনিতেই আমাদের মসজিদ নিয়ে দূর্ণামের শেষ নেই। তারউপর মৌলভী সাহেব যদি…..
এমনসময় পাগড়িটুপি মাথায, চাপদাঁড়িতে ঢেকে থাকা মুখাবয়বের অনেকটা হাজী হাজী দেখতে একজন যুবক কথা বলে উঠলেন- মাপ করবেন কাকা সাহেব। আপনাদের মসজিদ যখন ইসলামী সংস্থা থেকে অবাঞ্চিত ঘোষিত হয়েছে তারপরই কিন্তু আমি সব জেনে বুঝে এ মসজিদে মোসাহেব হয়ে এসেছি। আমি জানি এখানে এরফান সাহেব কিছু ভিন্নধারার প্রচলন ঘটাবেন এবং আমিও তার সাথে আছি, সবসময়। তাতে যদি আলেম সমাজ আমাকেও অবাঞ্চিত করে আমার কিছু যায় আসে না। সত্যিকার ইসলামের শিক্ষাই হচ্ছে আগে মানুষের হেফাজত, তারপর আল্লাহর ইবাদত। সুনীল কাকু ছাড়াতো আমিও অচল। এই যে আমার এত সুন্দর দাঁড়িমোচ দেখছেন এটা ঐ সুনীল কাকার হাত পড়েছে বলেই না এত সুন্দর হয়েছে। তার সাথে একত্রে থাকায় আমার কোন আপত্তি নাই। চাইলে কাকা তুমি তোমার বউ সন্তান নিয়ে খাটটা ব্যবহার করো, আমি এ পাঁচদিন মসজিদের বারান্দায় কাটিয়ে দেব।
এ কথায় সবাই হেসে উঠলেন।
জয় হোক বাবা তোমার, ভগবান তোমাদের ভাল করবেন। বলতে বলতে সুনীল আবার কান্না শুরু করলেন। বউ, সন্তানদের নিয়ে সুনীলকে কাচারীঘরে তুলে দিয়ে ঈমাম সাহেব অর্থাৎ এরফান চেয়ারম্যান চললেন ভিতর ঘরে, তার নিজের ঘরে।
চাঁপদাড়িতে অনেকটা হাজী হাজী দেখতে এই মৌলভী সাহেবের নাম ফুয়াদুল ইসলাম চৌধুরী। ডাকনাম ফুয়াদ। এ গ্রামের চেয়ারম্যান এরফান সাহেবের বাল্যবন্ধু তিনি এবং তিনি আসলেই একজন হাজী। যদিও নামের আগে তিনি তা ব্যবহার করেন না। একবার দু’বার নয় তিনি সাত সাতবার হজ্ব করেছেন। আসলে দীর্ঘ এগারটা বছর তার কেটেছে ইরাক, ইরান, মিশর ও সৌদী আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে। ইসলাম নিয়ে গবেষণার জন্যই মূলত তার এ সৌদী আরবে অবস্থান। আর এ জন্য এরফানই তাকে উৎসাহ দিয়েছেন। ঘটনার সুত্রপাত যদিও ভিন্ন অঞ্চলে, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। আজকের চেয়ারম্যান ও পেশঈমাম এরফান আহন তখন নিতান্তই কিশোর। ফুয়াদও তখন সবে ১২ বছরে পা দিয়েছে। এই অল্প বয়সে ১৪ বার কোরাণ শরীফ খতম দিতে পারার গর্বে গর্বিত ফুয়াদ প্রথম পরিচয়েই ঢাক্কা খেল এরফানের কথায়Ñ তুমি ১৪ বার কেন, হাজার বারও যদি কোরাণ শরীফ খতম দাও তাতে কারো কোন উপকার হবে না।
এ কথায় অনেকটা ক্ষেপে যায় ফুয়াদÑ জানতে চায় কেন? কেন হবে না? আমার, আমার বাবা-মায়ের তো অনেক সোয়াব হচ্ছে।
এরফান বলেছিল- কচু হচ্ছে। সোয়াব কী জিনিষ, তুমি কী তা দেখতে পারো? তুমি কী পড়লে, কেন পড়লে? যা পড়েছো, তা ভালো না মন্দ এটা যদি তুমি বলতেই না পারো তাহলে এই পড়া তোমার কী উপকারে এল? কোন উপকারেই যদি না এল, তাহলে এখান থেকে কী সোয়াব তুমি আশা কর?
প্রশ্নকটি ছুড়ে দিয়েই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল কিশোর এরফান। জানো বন্ধু, আমাদের মসজিদের ঈমাম সাহেবকে এই প্রশ্ন করেছিলাম বলেই আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এখন হয়তো তোমরাও তাড়িয়ে দেবে, কিন্তু একটু ভেবে দেখতোÑ আমি যা বুঝিনা, সেটা শিখে, মুখস্থ বলে আমার কী লাভ?
এরপরই মূলত এরফানের সাথে বন্ধুত্ব ক্রমশ গভীর হয় ফুয়াদের। একইসাথে পড়াশুনায় মনোযোগী হয় এরফান ও ফুয়াদ। একইসাথে ফুয়াদ বাংলা ও আরবীতে পড়াশুনা চালিয়ে যায়। আর এরফান ওদের একটি রেষ্টুরেন্ট পরিচালনার পাশাপাশি ফুয়াদের কাছে বাংলাটা শিখে নেয়। দু’জনে ঐ বয়সেই একটা লক্ষ্য নিয়ে এগোতে থাকে। তারপর এরফানের পরামর্শে ইসলাম নিয়ে গবেষণা শুরু করে ফুয়াদ। ওরা দু’জনে মিলে প্রথমে বাংলা অনুবাদের কোরাণ শরীফগুলো সংগ্রহ করে। সেখানে অনেক কিছুই ওদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়। অনেক ব্যাখ্যাই মনপূঃত হয় না ওদের।
কোরাণশরীফ নাজিল হয়েছে মক্কার কোরাইশ বংশের ব্যবহৃত আরবী ভাষায়। তাই এরফানের দাবী আগে কোরাইশদের আরবীটা ভালো ভাবে রপ্ত করতে হবে। এরফান বলেÑ কোরাণকে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান বলা হয়। তারমানে পৃথিবীর যাবতীয় জ্ঞান রয়েছে এই কোরাণে। অথচ আমরা যে ব্যাখ্যা পড়ছি সেখানে বেশিরভাগ অংশ জুড়েই শুধু ভয়-ভিতি প্রদর্শন করা আছে। আল্লাহ কোন ভয়ের শব্দ না। ভালবাসা আর শান্তির অনন্য একটি উচ্চারণ হচ্ছে- আল্লাহ্। কোরাণ-এর প্রকৃত মর্ম উদ্ধার করতে হলে প্রতিটি শব্দের সত্যিকার অর্থ উদঘাটন করতে হবে। আমাদের এই বাংলাদেশে যদি রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা ও সিলেটে এক এক অঞ্চলের ভাষা এক একরকম হতে পারে তাহলে আরবী ভাষার ক্ষেত্রেও তা হতে পারে। তাই কোরাইশদের আঞ্চলিক আরবী জেনে তবেই কোরাণ নিয়ে গবেষণায় যাও। এটাই ছিল এরফানের একান্ত অনুরোধ। আর যে কারণেই দীর্ঘ এগারটি বছর বন্ধুকে ছেড়ে থেকেছে ফুয়াদ। ঘুরেছে মক্কা-মদিনা আর কাবা’র পথে পথে। দেখেছে, হেসেছে আর শিখেছে। জেনেছে যতটা ভুল চলছি আমরা তার চেয়েও অনেক বেশি ভুল পথে চলছে আজকের আরব জাতী। ইসলামের দেখানো পথ থেকে হাজারক্রোশ দূরে সরে এসেছে আজকের মুসলিম সমাজ। নিজেদের মধ্যে তৈরি করেছে হাজার হাজার বিভক্তি। এক আল্লাহরই ইবাদত যখন করবো, তখন কেন এত বিভক্তি? কিছুতেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না ফুয়াদ ও এরফান।
এ মুহূর্তে কাচারীঘরে সুনীল দাস পরিবারের বাচ্চাদের সামনে বিস্কুটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে মৌলভী ফুয়াদ আর সুনীল দাস ব্যস্ত একটা পার্টিশন তৈরির কাজে। আপাতত রশি বেঁধে চাঁদর টানিয়েই পার্টিশনের কাজ ছাড়লো ওরা। যেহেতু সুনীলের বউ সাথে রয়েছে তাই এ পার্টিশন। তানা হলে সুনীলকে নিয়ে কোন চিন্তা ছিল না ফুয়াদের। বন্ধুকে সে জানে। খুব ভালো ভাবেই জানে। ও যখন বলেছে পাঁচদিনের মধ্যে সুনীল সমস্যার সমাধান হবে, তখন পাঁচদিনেই হবে।
এদিকে একা পেয়ে সেই যে বকর বকর শুরু করেছে সুনীল কাকা, থামবার নাম নেই। তার বেশিরভাগ কথাই হচ্ছে এমপি সাহেবের বিরুদ্ধে। এমপি সাহেবই ইসলামী সংস্থাকে আহঞ্জীবাড়ির মসজিদের উপর খেঁপিয়ে তুলেছে। গ্রামের লোকদের উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে এই মসজিদে নামাজ পড়তে নিষেধ করেছে। বলে কিনা এরফান চেয়ারম্যান বিদেশে খ্রিস্টানদের সাথে মিশেছে, চুক্তি করে এসেছে খ্রিস্টানদের ধর্ম এনে গ্রামের সব মুসলমানদেরও খ্রীস্টান বানিয়ে দেবে।
: আহ্ কাকা থামোতো। কারো পিছনে কথা বলা ভালো নয় কাকা। তোমাদের ধর্মে কী এটা লেখা নেই?
: থাকবেনা কেন বাবা, আছে। সব ধর্মে ভালো ভালো কথাই লেখা থাকে। আমরা সেগুলো মানলেতো।
তয় কথা কী জানো বাবা, এই এরফান বাবাজী গ্রামে আসার পর থেইকাই গ্রামের মানুষগুলো সব কেমন ভালো হইয়া যাচ্ছিল। দেখলেনা চেয়ারম্যানী ইলেকশনে সবাই কেমন ওরেই ভোট দিল। আমরা অবশ্য দেই নাই, ভোট বেইচা দিছিলাম। নগদ টাকায় বেইচা দিছি বিরোধী পার্টির কাছে। আর এহন বলেই আবার কান্না শুরু করল সুনীল কাকা। এমন ভালো মানুষটারে ভোট দেই নাই অথচ হের দুয়ারেই….।
: থাক কাকা, এই সব কথা থাক। এখন তুমি কী করবা? হাটে যাইয়া বসতে পারবাতো?
: না বাবা, খুর-কাচি কিছুইতো আর খুইজা লইতে পাই নাই। পোড়াবাড়ির মধ্যে খুজলে হয়তো পাইয়া যামু। তয়….।
: তোমার আর খুইজা কাজ নাই। এখন যাওতো, ঘাটে যাইয়া স্নান কইরা আসো। গায়েতো কালি ময়লার অন্ত নাই। নাপিত নাপিত গন্ধ আসতিছে।
: এ কথায় হেসে দিল সুনীল দাস। নাপিতরে কও নাপিত নাপিত গন্ধÑ হাসাইলা বাবা।
: আর হাসতে হবে না, তারাতারি যাও কাকা, সঙ্গে বাচ্চাদের নিয়ে যাও ওরাও বুঝি দুদিন স্নান করে নাই।
: ঠিকই ধরছো বাজান, কিন্তু বাজান তুমি মৌলভী হইয়া যে বড় স্নান স্নান করতেছো? এতে তোমার পাপ হইবো না?
: উহ্ কাকা যাও তো। অত পাপ-পূণ্যের বিচার তোমারে করতে হইবো না। যাও, এক্ষুনি আবার ভিতর থেইকা নাস্তা আইসা পরবো, খাইয়া তোমারে চেয়ারম্যান সাহেবের অফিসে যাইতে হইবো না?
হহ হহ, যাই, বলে ব্যস্ত হলেন সুনীল কাকা।
ঘরতো নয যেন বিশাল একটি অট্টালিকা। এটাই এরফান আহন-এর ঘর। ওর দাদা-পরদাদাদের তৈরি স্মৃতি। সেগুন আর কড়াই কাঠের মিশ্রণে তৈরি দোতলা এই ঘরটিকে ছোটখাট রাজপ্রাসাদ বলাটাও অশোভনীয় হবে না। তবে পুরো বাড়িতে কিন্তু কোন ইটার ছোঁয়া নেই। সবই কাঠ আর টিন দিয়ে ঘেরা। বিশাল বড় এই আহঞ্জীবাড়ি। পুরো বাড়িতে প্রায় ২০/২৫টি ঘর রয়েছে। তারমধ্যে সবচেয়ে বড় ঘর এটি। বাড়ির অন্যান্য বাসিন্দারা সবাই একে অপরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। চাচাত-মামাত-ফুফাত ভাইবোন, চাচা-চাচীদের বাস এ বাড়ী জুড়ে। প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের মিলও প্রচ-। আহঞ্জীবাড়ির প্রধান ব্যক্তি ছিলেন ইয়ারউদ্দিন আহন। তিনি মূলত ইরান থেকে ধর্মপ্রচারের জন্য এ অঞ্চলে এসেছিলেন। এখানের মানুষের সাথে তার এতটাই বন্ধুত্ব হয়ে যায় যে তিনি আর নিজ দেশে ফিরে যান নাই। প্রবাদ আছে যে, জীনের বাদশার সাথেও নাকি তার খুব বন্ধুত্ব ছিল। সেই জ্বীনের বাদশা একরাতের মধ্যে তাকে এই বাড়ি তৈরি করে দেয় ও সূদূর ইরান থেকে তার বউ-সন্তানকে এই দেশে, এই অঞ্চলে এনে দেয়। সেই থেকে এ অঞ্চলে তাদের বসবাস। গ্রামের ধর্মগুরু ও পঞ্চায়েত প্রধান ছিলেন ইয়ারউদ্দিন আহন। আসলে ধর্মপ্রচারকারীদেরকেই তখন আহঞ্জী বলা হত। যে কারণে এ বাড়িটির নাম আহঞ্জীবাড়ি হয়েছে। এরফানের দাদা ইমতিয়াজ উদ্দিনও এ অঞ্চলের ধর্মপ্রধান ও পঞ্চায়েত প্রধান ছিলেন। মাঝখানে অল্পকিছুদিন এরফানের বাবার সময়টা থেকে গ্রামের চেয়ারম্যানী চলে যায় অন্য লোকের হাতে। সে সাথে এ গাঁ থেকে বিদায় নেয় পঞ্চায়েতী ক্ষমতাও। সম্প্রতী এরফান ফিরে এসে গাঁয়ে বসবাস শুরু করায় আবার সে ক্ষমতা ফিরে আসার একটা সম্ভাবনা দেখা দিলেও ধর্মিয় আচার অনুষ্ঠান নিয়ে ছেলের কথাবার্তা ও কার্যকলাপে শুধু গ্রামেরই নয়, জেলা শহরের ধর্মীয় নেতারাও ক্রমশ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছেন। এ নিয়ে রিতীমতো আতংকিত এরফানের বাবা এমাজউদ্দিন আহন।
সুনীলের বিষয়টা নিয়ে ছেলের সাথে কথা বলবেন বলে তিনি নাস্তার টেবিলে অপেক্ষা করছিলেন। আর যাই হোক সুনীল হিন্দু মানুষ, তাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করে আর শত্রু বাড়াতে দেবেন না, অনেকটা এমন প্রতিজ্ঞা করেই বসেছিলেন তিনি।
ঘরে ঢুকেই এরফান বিষয়টা বুঝে নিয়েছে। বাবার সামনে বসে বললÑ বাবা, তুমি মনে হয় খুব দুশ্চিন্তা করছো? বিশ্বাস করো বাবা তোমার ছেলে এমন কোন কাজ করবে না যাতে অধর্ম হয় বা যা ইসলাম ধর্মের পরিপন্থী।
বাবা- তাহলে তুই যে সুনীলকে বললি পাঁচদিনের মধ্যে ওর সব ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করবি। সেটা …?
এরফান : সেটাতো চেয়ারম্যানের কাজ বাবা।
বাবা : কিন্তু সুনীল হিন্দু মানুষ, এমনিতেই মসজিদ ফা-ের টাকা দিয়ে তুই দীনু মাঝিকে নৌকা কিনে দিয়েছিস, ভিখারী রাহেলার মেয়ের বিয়ে দিয়েছিস বলে মুসুল্লীরা সব ক্ষেপে আছে। এমন কী আমাদের বাড়ির অনেকেই আঢ়ালে আবডালে নানান রকম মন্তব্য করছে।
এরফান : আহ্ বাবা, তোমরা কেন বোঝনা, তুমিতো তাদের বোঝাতে পার যে এই টাকাতো আর নষ্ট হচ্ছে না। দীনু মাঝির নৌকাটা ডুবে গেল। ও বেচারা না খেয়ে মরে যেত। আল্লার ঘরে টাকা পড়ে আছে, আর তার বান্দা না খেয়ে মারা যায় এটা ইসলাম ধর্ম কখনো মেনে নেবে না বাবা। তাছাড়া দীনু মাঝিতো প্রত্যেক শুক্রবারের জুম্মায় এসে কিছু কিছু করে টাকাটা ফেরৎ দিচ্ছে। আর রাহেলার মেয়েটার বিয়ে হওয়ায় গ্রামের একটা পূণ্যি হলো না বাবা, তুমিই বল। মেয়েটা বড় হয়েছে, ঠিক সময় ওর বিয়ে না হয়ে একটা কোন অঘটন ঘটলে তখন পুরো গাঁয়ের নাক কাটা যেত না? আমরা তো আর ছেলেকে যৌতুক হিসেবে টাকাটা দেই নাই। ছেলেটা যেন কিছু একটা কাজ করে বউ ও শ্বাশুড়িকে নিয়ে খেতে পারে সেজন্য একটা ভ্যান রিক্সা কিনে দিয়েছি। ওর আয় ভালো হলে ও টাকাটা ফেরৎ দিয়ে যাবে। তুমি কী দেখেছো বাবা রাহেলা খালা এখন আর ভিক্ষা করে না।
বাবা : কিন্তু মসজিদ ফা-ের টাকায় এগুলো করা কী জরুরী ছিল? টাকাটাতো অন্যভাবেও জোগাড় করা যেত।
এরফান : হ্যা বাবা যেত, তবে সেজন্যে অনেকের কাছে হাত পাততে হত। কেউ দিত, কেউ নানান কথা শোনাতো। এতে অনেক সময়ও বাজে খরচ হত। তার চেয়ে কি এটা ভালো নয় বাবা? মসজিদ ফা-ের সব টাকা এ গাঁয়ের প্রতিটি মানুষের দান। তারা আল্লাহর ঘরে দান করেছেন। আল্লাহ’র ঘরের টাকায় সকলের অধিকার আছে, ঐ রাহেলার যেমন আছে, তেমনি তোমার-আমারও আছে।
বাবা : না বাবা তোমার সাথে যুক্তিতে আমি পারবো না তবে বলি কী সুনীলকে নিয়ে আবার যেন এমন কোন কা- করে বস না যা ধরে ধর্মিয় নেতারা তোমার উপর আরো ক্ষেপে যায়।
এরফান : আচ্ছা বাবা সেরকম কিছু হবে না, যদি না ধর্মিয় নেতাদের কেউ ওর ঘর জ্বালানোর সাথে জড়িত না হন।
বাবাÑ তোমার কী ধারণা, ওর ঘর ধর্মিয় নেতাদের কেউ জালিয়েছেন?
এরফানÑ ঠিক জানিনা বাবা, তবে শুনেছি সমাজ সেবা কল্যাণ সংস্থা মসজিদের ঈমাম সাহেবের জন্য সুনীল কাকার জমিটা কিনতে চেয়েছিলেন এমপি সাহেব। হয়ত…
বাবাÑ হয়ত সে সুযোগটাই নিচ্ছে অন্য কেউ, এটা হতে পারে না?
এরফানÑ পারে বাবা, খুব সম্ভব সেটাই হয়েছে। এমপি সাহেবের সাথে আমার একটা বিরোধ তৈরির জন্য এটা কোন ষড়যন্ত্রও হতে পারে। আমি আজই একবার এমপি সাহেবের কাছে যাবো, খোলাখুলি কথা বলবো।
বাবা : যেটা ভালো মনে করো, কিন্তু সাবধান এমপি সাহেব কিন্তু এমনিতেই তোমাকে পছন্দ করেন না। তুমি যাতে চেয়ারম্যান হতে না পার সেজন্য অনেক চেষ্টা তিনি করেছেন। কী করে যে তুমি চেয়ারম্যান হয়ে গেলে সেটা আমার কাছেও খুব রহস্যময় রয়ে গেছে।
শুধু তোমার কাছে কেন বাবা আমার নিজের কাছেও বিষয়টা রহস্যময়ই বটে। বছর হয়নি গ্রামে এলাম অথচ এর মধ্যে এত ভোট আমি পাব আশাই করিনি। এটা সম্ভবত আমাদের পূর্বপুরুষদের ভালো কাজের ফল বাবা।
বাবা : হ্যা তাই হবে। যাও বের হও, তবে তোমার মায়ের কবরটা একবার দেখে যেও। শেয়াল বুঝি আবার গর্ত করেছে।
এই আহঞ্জীবাড়িটির অবস্থান জেলা শহর থেকে নদী পার হয়ে প্রায় মাইল দশেক ভিতরে। গ্রামের নাম ইয়ার গাঁও। মূলত ইয়ারউদ্দীন আহঞ্জীর নামানুসারেই এ গাঁয়ের নাম হয়েছে ইয়ার গাঁও। শহরের অনেকে এ গাঁওটাকে বন্ধুপাড়া নামেও ডাকেন। বিশেষ করে এমপি সাহেবতো তার ভাষণে প্রায়ই বলেনÑ বন্ধুপাড়ার বন্ধুরা।
অনেক বড় বড় লোকের আনাগোনা ছিল এ বাড়িতে। এমনকি মহাত্মা গান্ধি, লর্ড কার্জনও এসেছেন। যে কারণে এ বাড়ির প্রবেশ পথেই আভিজাত্যের নিদর্শন রয়েছে। পাকা রাস্তা শহর থেকে এসে সোজা চলে গেছে আহঞ্জীর হাট স্কুল ও কলেজে। পাশ ঘেষে সেই সড়ক যেন অনেকটাই হেটে ঢুকে পড়েছে আহঞ্জীবাড়ির উঠানে। সাড়ি সাড়ি দেবদারু আর মেহগণি গাছের পাহাড়া এসে থেমেছে বিশাল এক পুকুরের সাণ বাধানো ঘাটে। ঘাটে পথিকের বিশ্রামের জন্য রয়েছে চমৎকার ব্যবস্থা। ঘাটের পাশেই সিমেন্ট দিয়ে তৈরি বেশ কয়েকটি তাক। সেখানে থরে থরে সাঁজানো আছে প্লাস্টিকের বদনা। পুকুরঘাট থেকে পূর্বদিকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে রয়েছে জোড়া পাকা পায়খানা ও পশ্রাব ঘর। সাইনবোর্ডে তীরচিহ্ন দিয়ে লেখা আছে পুরুষদের পায়খানা ঘর। এ রকম বাড়ির ভিতরে আরো দুটি পুকুর রয়েছে। মহিলাদের জন্য পাকা পায়খানা ঘর ও গোসলখানাও আছে সেখানে।
পুকুরঘাটে বসলেই আপনা থেকে চোখ আটকে যাবে পশ্চিমদিকের একটি ঘরে। মার্বেল পাথরের উপর খোদাইকরা আল্লাহু আকবর লেখাটি দৃষ্টি কাড়বেই। এটিই এ বাড়ির মসজিদ। একসময় এটাই ছিল এ গাঁয়ের প্রথম মসজিদ। মসজিদের পাশেই কাচারীঘর এবং মসজিদের সামনে ১০০ গজ এগিয়ে কবরস্থান।
দৃঢ়পায়ে মায়ের কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো এরফান। কবরের পাশে কাঁদতে নেই তাই, নেমে আসা চোখের জল সামলাবার ব্যর্থ চেষ্টায় ও ব্যস্ত হল শেয়ালের তৈরি গর্তটা ভরাট করতে। একহাতে মাটি জড়ো করে গর্ত ঢাকার চেষ্টা করছে অন্য হাতে চোখের জল মোছার চেষ্টা। স্মৃতিজুড়ে মায়ের ঝাপসা মুখাবয়ব। সে মুখে এরফানের জন্য প্রচ- আকুতী। যেন এই কবর থেকেও মা ওকে ডাকছেনÑ বাবা এরফান, ফিরে আয় বাবা।
©somewhere in net ltd.