| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সোহানুল হক
সত্য বলো, যদিও তা তিক্ত হয়। কারণ, সত্যই হৃদয়কে মুক্তি দেয়। মিথ্যা ক্ষণিক স্বস্তি দিলেও, তাতে আত্মা দগ্ধ হয়।
১৯৪৭ সালে বঙ্গদেশকে দু’ভাগে ভাগ করে পূর্বাংশ দেয়া হয় পাকিস্তানকে। পশ্চিমাংশ দেয়া হয় ভারতকে। পূর্বাংশ ‘পূর্ববঙ্গ’ নামে পাকিস্তানে যোগদান করে। অন্যদিকে, পশ্চিমাংশ ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামে ভারতে যোগদান করে। ১৯৪৭ সালে বঙ্গদেশে বিভাগ ছিল ৫টি এবং জেলা ছিল ২৮টি। জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং সমতল বঙ্গদেশের অংশ ছিল না। একইভাবে কুচবিহার ও ত্রিপুরা রাজ্যও প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশদের শাসনাধীনে ছিল না। উল্লেখিত দু’টি জেলা ও দু’টি রাজ্যের জনসংখ্যা ছিল প্রদেশের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ। বঙ্গদেশে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং পার্লামেন্টে তারা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। সরকারের নেতৃত্বে ছিল মুসলমানরাই। পার্লামেন্টে বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অধিকাংশ সদস্য ভোট দেন। কিন্তু মুসলমানদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
অখণ্ড ভারতে বিশ্বাসীরা জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের সমালোচনা করেন। তারা বলেন, দ্বিজাতি তত্ত্বের জন্য ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মোটেও তা সত্যি নয়। অবিভক্ত বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন পরিষদের হিন্দু সদস্যদের বঙ্গভঙ্গ বিভক্তির প্রস্তাব গ্রহণ তার প্রমাণ। বঙ্গীয় আইন পরিষদের হিন্দু সদস্যরা পৃথক অধিবেশনে মিলিত হয়ে বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ভোট না দিলে কখনো হিন্দু ও মুসলমানদের মিলনভূমি বঙ্গদেশ বিভক্ত হতো না। বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের সংখ্যালঘু হিন্দু সদস্যরা বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব সমর্থন করে নীতিগতভাবে জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের যৌক্তিকতাকে সঠিক বলে প্রমাণ করেছেন। সংখ্যালঘুরা বরাবরই সংখ্যাগরিষ্ঠ স¤প্রদায়ের শাসনাধীনে যেতে ভয় পায়। ব্রিটিশ ভারতের বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষিতে সংখ্যালঘু মুসলিম স¤প্রদায়ের নেতা হিসাবে জিন্নাহ এ সত্য উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ স¤প্রদায়ের নেতা হলে তার ভূমিকা হতো বিপরীত। গান্ধী, নেহরু ও প্যাটেলের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। সংখ্যাগুরু হিন্দু স¤প্রদায়ের নেতা হওয়ার পরিবর্তে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সংখ্যালঘু মুসলিম স¤প্রদায়ের নেতা হলে তাদের ভূমিকা হতো জিন্নাহর অনুরূপ। সে ক্ষেত্রে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রবক্তা হতেন তারাই।
গণতন্ত্রের প্রতি সুবিচার করা হলে পুরো বঙ্গদেশ পাকিস্তানের অংশে পরিণত হতো। ১৯৪৭ সালে অখণ্ড বঙ্গদেশ পাকিস্তানে যোগদান করলে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সীমানা হতো প্রায় দ্বিগুণ। পূর্বাঞ্চলীয় ভারতের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলীয় ভারতের ভৌগোলিক যোগাযোগ অবিচ্ছিন্ন রাখার স্বার্থে বঙ্গদেশকে বিভক্ত করা হয়। নয়তো ভারতের জন্ম হতো পাকিস্তানের মতো বিচ্ছিন্ন দু’টি ভূখণ্ড নিয়ে। বাংলাদেশের রংপুর সীমান্ত থেকে নেপাল পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সংকীর্ণ ভূখণ্ড পূর্বাঞ্চলীয় ভারতের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলীয় ভারতের ভৌগোলিক সংযোগ অক্ষুণ্ণ রাখছে। লাহোর প্রস্তাব এবং বঙ্গদেশের আইনসভার অধিকাংশ সদস্যের রায় অনুযায়ী অবিভক্ত বাংলার যাত্রা শুরু হলে ভারত পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে বিভক্ত হয়ে পড়তো। সেদিন ঘটনা যদি তাই দাঁড়াতো তাহলে ভারতের পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের স্বাধীনতা অর্জন ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
বাংলার ইতিহাসে এটা একটি দুঃখজনক অধ্যায় যে, বাঙ্গালি হিন্দুরা ১৯০৫ সালে বঙ্গমাতা বিভক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করলেও ১৯৪৭ সালে তারাই বঙ্গদেশকে বিভক্ত করে। বাঙ্গালি হিন্দুরা স্বেচ্ছায় জাতি হিসাবে তাদের রাজনৈতিক পরিচিতি বিসর্জন দেয় এবং ভারতীয় জাতীয়তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।
বঙ্গদেশ প্রশ্নে তাদের এ দ্বৈত মানসিকতার কোনো জবাব নেই। ১৯৪৭ সালে বঙ্গদেশ অখণ্ড থাকলে ১৯৭১ সালে শুধু পূর্ব পাকিস্তান নয়, পশ্চিমবঙ্গও একটি স্বাধীন দেশের অংশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারতো। ১৯০৫ সালে বঙ্গদেশ বিভক্তির ৪২ বছর পর ১৯৪৭ সালে আবার বঙ্গদেশ বিভক্ত হয়। ১৯০৫ সালে যে ভৌগোলিক সীমানা বরাবর বঙ্গদেশ বিভক্ত করা হয়েছিল, তার সামান্য রদবদল করে উপমহাদেশ বিভক্তিকালে সা¤প্রদায়িক পরিচিতি সাপেক্ষে বঙ্গদেশ বিভক্ত করা হয়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও ১৯৪৭ সালের বঙ্গদেশ বিভক্তি হলো আমাদের ইতিহাসের দু’টি মাইলফলক। এ দু’টি ঐতিহাসিক ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের হিন্দু ও মুসলমানদের চিন্তা ও ভাবধারা ছিল পরস্পরবিরোধী। ভাষা অভিন্ন হলেও আজও সে ভাবধারার পরিবর্তন হয়নি। ধর্ম এ দু’টি অঞ্চলের জাতীয় পরিচয় নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে নয়তো পশ্চিমবঙ্গ হাসিমুখে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগ দিতো অথবা বাংলাদেশ পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে একাকার হয়ে যেতো। বঙ্গভঙ্গের দায়—দায়িত্ব সম্পর্কে নিউ ওয়ার্ল্ড এনসাইক্লোপিডিয়ায় বলা হয়েছে, It was the Hindu who voted for partition. The government of Bengal supported a unified, independent Bengal as a third state. The British vetoed this option. Other provinces would also want independence, resulting in too many non-viable states. The majority of Muslims did opt to join Pakistan but wanted to take the whole province with them. They did not choose partition.'
অর্থাৎ ‘হিন্দুরাই বঙ্গদেশ বিভক্তির পক্ষে ভোট দিয়েছিল। বঙ্গীয় সরকার তৃতীয় একটি রাষ্ট্র হিসাবে একটি ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন বঙ্গদেশের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। ব্রিটিশরা তাতে অসম্মতি জানায়। কেননা, বঙ্গদেশকে স্বাধীন হওয়ার সুযোগ দেয়া হলে অন্য প্রদেশগুলো স্বাধীনতা দাবি করতো। তাতে অনেকগুলো ভঙ্গুর রাষ্ট্রের জন্ম হতো। মুসলমানদের অধিকাংশ পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষে অভিমত প্রকাশ করে। তবে তারা গোটা প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তানে যোগদান করতে চেয়েছিল। তারা বঙ্গদেশ বিভক্তি চায়নি।’
১৯৩২ সালে প্রবর্তিত সা¤প্রদায়িক ভিত্তিতে নির্বাচনে আইন পরিষদে মুসলমানদের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ১৯৩৭ সাল থেকে আইন পরিষদে মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তারা ছিল সরকারে। বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন পরিষদে ২৫০টি আসনের মধ্যে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ছিল ১১৯টি আসন। সংরক্ষিত আসনের বাইরেও অন্যান্য আসনে মুসলমানরা বিজয়ী হয়। ১৯৪৬ সাল নাগাদ বঙ্গদেশে মুসলিম লীগ সরকার গঠন করতে পারেনি। মুসলিম লীগ সরকার গঠন করলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদীর্ মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পাকিস্তান প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ডাইরেক্ট অ্যাকশন দিবস পালনের ঘোষণা দেন। ডাইরেক্ট অ্যাকশনে কলকাতায় হিন্দু—মুসলিম দাঙ্গায় প্রায় ১০ হাজার লোক নিহত হয়। সা¤প্রদায়িক দাঙ্গার পরিকল্পনার জন্য শহীদ সোহরাওয়াদীর্কে অভিযুক্ত করা হয়। তবে এ অভিযোগ সত্ত্বেও তিনি সকল বাঙ্গালির জন্য একটি একক ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রস্তাব করেছিলেন এবং এ ব্যাপারে হিন্দুদের সমর্থন কামনা করেন। জিন্নাহ স্বাধীন বঙ্গদেশ প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে ছিলেন না। ব্রিটিশদেরও কিছুটা সহানুভূতি ছিল। কিন্তু গান্ধী ও কংগ্রেসের সমর্থন না পাওয়ায় সোহরাওয়াদীর্র বঙ্গদেশ অখণ্ড রাখার প্রচেষ্টা বাঞ্ছাল হয়ে যায়।
১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বঙ্গদেশে ক্ষমতাসীন মুসলিম নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন সরকারের প্রতি হিন্দুরা ছিল বৈরি। হিন্দুরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অখণ্ড বঙ্গদেশ ডোমিনিয়ন কিংবা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান ডোমিনিয়নে যোগদানের বিপক্ষে ছিল। একইভাবে মুসলমানরাও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু নিয়ন্ত্রিত অখণ্ড ভারতে বসবাসে অনিচ্ছুক ছিল। পরস্পরবিরোধী এ মানসিকতাই বঙ্গদেশ বিভক্তির মূল কারণ। ১৯৪৬ সালের কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা ছিল ভারত ও বঙ্গদেশকে অখণ্ড রাখার একমাত্র রক্ষাকবচ। কিন্তু কংগ্রেসের সা¤প্রদায়িক মনোভাবের জন্য এ পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। কেবিনেট মিশন বাতিল হয়ে গেলে ১৯৪৭ সালের ২ জুন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সভাপতিত্বে লীডার্স কনফারেন্সে ভারত বিভক্তির প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। এ বৈঠকে অংশগ্রহণকারী সাতজন বড় নেতা ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, মুসলিম লীগ সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, কংগ্রেস নেতা সরদার বল্লবভাই প্যাটেল, কৃপালানি, মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী খান ও আবদুর রব এবং শিখ আকালী দলের বলদেব সিং।
৩ জুন প্রকাশিত এ পরিকল্পনা ‘৩ জুন পরিকল্পনা’ হিসাবে পরিচিত। এ পরিকল্পনায় ভারত বিভক্তি এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করার বিস্তারিত বিবরণ ছিল। ভারত বিভক্তির পরিকল্পনায় অন্যান্যের মধ্যে ছিল: (ক) বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন সভার হিন্দুপ্রধান ও মুসলিমপ্রধান অঞ্চলের সদস্যদের পৃথক অধিবেশনে মিলিত হয়ে ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা এবং পাঞ্জাবেও একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ (খ) আসামের সুরমা উপত্যকার সিলেট এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে গণভোট অনুষ্ঠান (গ) প্রস্তাবিত দু’টি রাষ্ট্রের সন্নিহিত অঞ্চলের সীমান্ত চিহ্নিতকরণে একটি বাউন্ডারী কমিশন গঠন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০ জুন বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের হিন্দু সদস্যদের অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে বঙ্গদেশ বিভক্ত করা হয়। সেদিন পরিষদে তিন দফা ভোট গ্রহণ করা হয়। বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের মুসলিম সদস্যরা ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে তা বঙ্গদেশ বিভক্তির জন্য নয়, গোটা প্রদেশের পাকিস্তানে যোগদানের নিমিত্তে।
(১)পরিষদের সকল সদস্যের যৌথ অধিবেশনে বঙ্গদেশ বিভক্তির প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট পড়ে ১২৬ টি এবং পক্ষে ৯০ টি। (২) তারপর বঙ্গদেশের মুসলিমপ্রধান অঞ্চলের সদস্যরা আরেকটি অধিবেশনে মিলিত হয়ে ১৬৬—৩৫ ভোটে বঙ্গদেশ বিভক্তির প্রস্তাব নাকচ করে দেন। (৩) তবে হিন্দুপ্রধান অঞ্চলের সদস্যরা পৃথক একটি অধিবেশনে মিলিত হয়ে ৫৮—২১ ভোটে বঙ্গদেশ বিভক্তির প্রস্তাব গ্রহণ করেন।
১৯৪৭ সালের ৮ মার্চ কংগ্রেস পাঞ্জাব বিভক্তির আহ্বান জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। কংগ্রেস সভাপতি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এ প্রস্তাব গ্রহণের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, প্রস্তাবে শুধুমাত্র পাঞ্জাবের উল্লেখ থাকলেও তা বঙ্গদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কংগ্রেসের এ প্রস্তাব ছিল তাদের অনুসৃত আদর্শ থেকে একটি বিচ্যুতি। ১৯২৯ সাল থেকে দলটি অখণ্ড ও স্বাধীন ভারত কায়েমের দাবি জানাচ্ছিল। কিন্তু শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের উত্থান রোধে তারা তাদের নীতি নৈতিকতাকে বিসর্জন দেয়।
মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনায় জাতিগতভাবে বিভক্ত পরিষদের কোনো একটি পক্ষের অর্ধেক সদস্যের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বঙ্গদেশ বিভক্তির প্রস্তাব পাস করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। বঙ্গদেশ যাতে স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে না পারে সেজন্য এমন অদ্ভুত ব্যবস্থা রাখা হয়। এ ব্যাপারে নিউ ওয়ার্ল্ড এনসাইক্লোপিডিয়ায় বলা হয়, `Mountbatten did not allow the legislature to vote for independent Bengal, because he feared others would also want independence
অর্থাৎ ‘মাউন্টব্যাটেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন পরিষদকে স্বাধীন বঙ্গদেশ প্রতিষ্ঠার পক্ষে ভোটদানের সুযোগ দেননি। কারণ তিনি আশংকা করতেন যে, বঙ্গদেশ স্বাধীন হলে অন্যরাও স্বাধীনতা দাবি করবে।’
সকল পক্ষ সম্মত হয় যে, তারা র্যাডক্লিফ রোয়েদাদ মেনে নেবে। তাদের মতামতের ভিত্তিতে নবগঠিত দু’টি প্রদেশের সীমান্ত চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০ জুন হিন্দুপ্রধান অঞ্চলের সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনপুষ্ট একটি প্রস্তাবের আলোকে বঙ্গদেশ বিভক্ত হয়ে যায়। বঙ্গদেশের একটি অংশ ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামে ভারতে এবং অন্য অংশ ‘পূর্ববঙ্গ’ নামে পাকিস্তান ডোমিনিয়নে যোগদান করে।
১৯৪৭ সালে বঙ্গদেশে বিভাগ ছিল ৫টি। বিভাগগুলো হলো প্রেসিডেন্সি বিভাগ, বর্ধমান বিভাগ, রাজশাহী বিভাগ, ঢাকা বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিভাগ। প্রেসিডেন্সি বিভাগে ছিল চব্বিশ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, যশোর ও খুলনা জেলা। বর্ধমান বিভাগে ছিল হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর, বাঙ্কুরা, বর্ধমান ও বীরভূম জেলা। রাজশাহী বিভাগে ছিল রাজশাহী, পাবনা, মালদহ, দিনাজপুর, বগুড়া, রংপুর, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলা। ঢাকা বিভাগে ছিল ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল ও ময়মনসিংহ জেলা। চট্টগ্রাম বিভাগে ছিল চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও তিপারা জেলা।
১৪টি জেলা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ গঠন করা হয়। জেলাগুলো হলো বাঙ্কুরা, বীরভূম, বর্ধমান, কলকাতা, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, হুগলি, হাওড়া, মালদহ, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, পশ্চিম দিনাজপুর ও চব্বিশ পরগনা। যশোরকে বিভক্ত করে বনগাঁও এবং গাইঘাটা পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৫টি জেলা নিয়ে গঠন করা হয় পূর্ববঙ্গ। জেলাগুলো হলো যশোর, খুলনা, রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুর, বগুড়া, রংপুর, ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ত্রিপুরা (কুমিল্লা)।
১৯৪৬ সালের গণপরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগ সিলেটে বিজয়ী হয়। কিন্ত নেহরু এ বিজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানীর নেতৃত্বাধীন জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দ ছিল কংগ্রেসের পক্ষে। গোটা সিলেটে তার প্রচুর ভক্ত ও মুরীদ ছিল। তিনি সিলেটের নয়া সড়কে নামাজ পড়াতেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগের বিপক্ষে প্রতিটি আসনে প্রার্থী দেন। তবে একটি আসনেও তার প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেনি। মুসলিম লীগকে বিজয়ী হতে দেখে নেহরু বললেন, মুসলিম লীগকে বাহ্যত বিজয়ী মনে হলেও কংগ্রেস ও জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দের মনোনীত প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট বিজয়ী মুসলিম লীগ প্রার্থীদের চেয়ে বেশি। তাই সিলেটকে ভারতে যোগদান করতে দেয়া হোক। নেহরুর দাবির বিরোধিতা করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চ্যালেঞ্জ ছঁুড়ে দিয়ে মাউন্টব্যাটেনের সুপারিশের ভিত্তিতে বললেন, তাহলে গণভোটের মাধ্যমে জনমত যাচাই করা হোক। তার প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ৭ জুলাই সিলেট জেলায় গণভোট হয়। তাতে পূর্ববঙ্গে যোগদানের পক্ষে ভোট পড়ে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ এবং বিপক্ষে এক লাখ ৮৪ হাজার ৪১ ভোট। ৫৫ হাজার ৫৭৮ টি ভোট বেশি পড়ায় সিলেট পূর্ববঙ্গে যোগদান করে। তারপরও পুরো সিলেট পূর্ব বাংলা পায়নি। সিলেটের করিমগঞ্জ মহকুমা ও কাছারকে কেটে রেখে দেয়া হয়।
বঙ্গদেশ বিভক্ত হলে মুসলিম লীগ ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পূর্ব বাংলায় সরকার গঠন করে। খাজা নাজিমুদ্দিন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের নিরাপত্তা রক্ষায় সোহরাওয়াদীর্ সেখানে অবস্থান করতে থাকেন। পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল তার। লর্ড মাউন্টব্যাটেন মনে করতেন যে, তিনি নিশ্চিত পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। কিন্তু তার পরিবর্তে মুখ্যমন্ত্রী পদে নিয়োগ পান খাজা নাজিমুদ্দিন। লিয়াকত আলী খানের আনুকূল্যে পূর্ববাংলার মুসলিম লীগ নেতা নির্বাচিত হওয়ায় নাজিমুদ্দিনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী নিবার্চিত হওয়ার পথ সুগম হয়। সোহরাওয়াদীর্ প্রথম মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হলে আরো সুষ্ঠুভাবে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সম্পদ ভাগাভাগি হতো। জিন্নাহ বাংলার মুসলমানদের অবিসংবাদিত নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদীর্ ও শেরে বাংলা একে ফজলুল হককে নয়া দেশের নাগরিক হিসাবে সেবা করার সুযোগ দানে ব্যর্থ হন। ১৯৪১ সালে শেরে বাংলা একে ফজলুল হককে মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে সোহরাওয়াদীর্ কলকাতায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগের একটি সম্মেলন আহ্বান করেন। এ সম্মেলন শেষে পাকিস্তানে ফিরে এলে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন তাকে ‘ভারতীয় চর’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন এবং তাকে ঢাকা ত্যাগের নির্দেশ দেন। এমনকি তার নাগরিকত্ব খারিজ করার হুমকিও দেয়া হয়েছিল।
১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল নাগাদ পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগ ক্ষমতায় ছিল। পাকিস্তানের ডোমিনিয়ন মর্যাদার অবসান ঘটার পর পূর্ব বাংলা শাসন করতেন একজন অনির্বাচিত গভর্নর। ১৯৫৫ সালে পূর্ব বাংলার নামকরণ করা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান।’
©somewhere in net ltd.