নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সত্য বলো, যদিও তা তিক্ত হয়। কারণ, সত্যই হৃদয়কে মুক্তি দেয়। মিথ্যা ক্ষণিক স্বস্তি দিলেও, তাতে আত্মা দগ্ধ হয়।

সোহানুল হক

সত্য বলো, যদিও তা তিক্ত হয়। কারণ, সত্যই হৃদয়কে মুক্তি দেয়। মিথ্যা ক্ষণিক স্বস্তি দিলেও, তাতে আত্মা দগ্ধ হয়।

সোহানুল হক › বিস্তারিত পোস্টঃ

আওয়ামী লুট, দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা এবং বাংলাদেশের সাথে ভারতের চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৫ সকাল ১০:৩৯

১৯৭২ সালে মুজিব সরকার ভারতকে বাংলাদেশের জন্য নোট ছাপানোর টেন্ডার দেয়। সেই টেন্ডারের আওতায় ভারতের সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস (নাসিক) থেকে ছাপানো হয় ১ ও ১০০ টাকা মূল্যমানের নোট। ১৯৭২ সালের ৪ মার্চ এসব নোটকে অবমুক্ত করা হয়।

কিন্তু দেখা গেলো, ১০০ টাকার নতুন নোট আসার পরপরই বাজারে ব্যাপক হারে জাল টাকা ছড়িয়ে পরেছে । তৎকালীন সময় নোট জালিয়াতি করার মত কারিগরি দক্ষতা বা প্রযুক্তি বাংলাদেশে ছিলোনা। তাহলে প্রশ্ন উঠে এসব জাল টাকা এলো কোথা থেকে?

জালিয়াতির রহস্য খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে বাংলাদেশের সাথে ভারতের চরম বিশ্বাসঘাতকতা। ১৯৭২ সালের সেই টেন্ডারে বাংলাদেশের অর্ডারকৃত নোট ভারত ছাপিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি নোটের নম্বর ডুপ্লিকেট করে একই পরিমান জাল নোট ছাপায় তারা। আসল নোটগুলো হস্তান্তর করে মুজিব সরকারের কাছে, আর জাল নোট গুলো পাঠিয়ে দেয় বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চলের প্রতিনিধীদের কাছে।

এরপর সেই জাল নোট ব্যাবহার করে ভারতীয়রা বাংলাদেশ থেকে টন-টন চাল, ডাল,খাদ্যশস্য, শিল্পদ্রব্য, স্বর্ন, তামা, কাসা ও পিতলের মত মুল্যবান দ্রব্য কিনে নিয়ে যেতে থাকে। এভাবে বাংলাদেশিদের হাতে ভুয়া কাগজের টুকরো ধরিয়ে ভারতীয়রা দেশের সম্পদ লুটে নেয়। একসময় দেখা যায় দেশে ব্যাপক হারে জাল মুদ্রা ছড়িয়ে পরেছে এবং বাজারে খাদ্য সহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ব্যাপক সংকট।

এছাড়া মুজিবের আমলে বাংলাদেশে ভারতীয় রুপির ব্যবহারের অনুমোদন ছিল এবং পন্য বানিজ্যের জন্য দুই দেশের সীমান্ত ছিল উন্মুক্ত। ফলে রুপীর মাধ্যমে বৈধ পথেও বিপুল পরিমাণ খাদ্যপন্য ভারতে পাচার হয়ে যায়।

দেশে চলমান মুদ্রা বিপর্যয়ের মুখে ১৯৭৩ সালের ১লা মে ভারত থেকে ছাপানো ১০০, ১০ এবং ৫ টাকার নোট বাতিল ঘোষণা করা হয়। এবং পরবর্তী মুদ্রা ছাপানোর টেন্ডার ব্রিটেনকে দেয়া হয়। কিন্তু ততদিনে দেশের যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে। দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ, খাদ্য পাচার হয়ে গেছে, যার প্রভাব ছিলো ভয়াবহ।

এছাড়া কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মত তৎকালীন সরকারের লাগামহীন দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের খাদ্য অব্যাবস্থাপনা এবং বন্যায় ফসলের ক্ষতি তো ছিলোই। চাল-ডাল সহ অন্যান্ন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কেবল আকাশ ছোয়াই হয়নি, টাকা খরচ করেও পন্য পাওয়া যেতোনা। ধনীরা এক-দু বেলা খেয়ে বেঁচে থেকেছে ঠিকই, তবে বাঁচতে পারেনি গরিবরা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ১৮ টাকায় এক মণ চাল পাওয়া যেত, ১ পয়সায় মিলত চকোলেট। ১৯৭৪ সালে চালের দাম বেড়ে প্রতিমণ ১৬২ টাকায় পৌঁছলে দেশজুড়ে হাহাকার শুরু হয়। বহু মানুষ খালি জাউ খেয়ে বেঁচেছে। মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তদের দেয়া ভাতের মাড় খেয়ে দরিদ্ররা জীবন বাঁচিয়েছে। আমার নানুরা উচ্চ বংশের ছিলো। তিনি বলেছিলেন প্রতিদিন বহু মানুষ আসতো মাড় নেয়ার জন্য, নানু মাড়ের ভেতর অল্প কিছু ভাত মিশিয়ে সবাইকে দিয়ে দিতেন।

সেসময় কাঁচা মরিচের কেজি ছিলো ১৫০ টাকা, অথচ সোনার ভরি ছিলো তখন ১৫০ টাকা। অর্থাৎ এক ভরি স্বর্নের দামে ১ কেজি মরিচ কিনতে হতো। লবনের কেজি ছিলো ১২০ টাকা, অসাধু ব্যাবসায়ীরা লবনের ভেতর চিনি মিশিয়ে বিক্রি করতেন। চারদিকে অভাব আর মানুষের হাহাকার!

এই ক্রান্তিকালের সময় এদেশে প্রচুর রিলিফ সামগ্রী এসেছিলো। এসব রিলিফ বিতরণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণ দুর্নীতি হয়। সরকারী দলের নেতারা রিলিফ পন্য লুটপাটের মহোৎসবে মেতে উঠে। Henry F. mettenry এর “Food Bungle in Bangladesh” এর পৃঃ ৭২-৮৮ তে এ ব্যাপারে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে । সেই বিদেশী গবেষকের ভাষায়, “ রিলিফের খাদ্য সাহায্যের মাত্র শতকরা দশভাগ পৌঁছেছে সেসকল গ্রামীণ দরিদ্রদের হাতে যাদের এ সাহায্য খুবই প্রয়োজন।

আওয়ামী লুটেরা চক্র এতটাই অবাধ্য ছিলো যে শেষমেশ শেখ মুজিবের কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে ‘ওরা পেয়েছে সোনার খনি,আমি পেয়েছি চোরের খনি’র মতন আক্ষেপ !

দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা দেখে কবি রফিক আজদ শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্যে রচনা করেন সেই বিখ্যাত কবিতা "ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো"।

মহিলাদের শাড়ি কাপড় ছিলো না। অনেকে মাছ ধরার জাল পরে লজ্জাস্থান ঢেকেছিলো। এসব ছবি পত্রিকায়ও ছাপা হয়েছিলো। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সাংবাদিক আফতাব আহমেদের তোলা কুড়িগ্রামের মেয়ে বাসন্তীর ছেড়া জাল পরে কলাগাছের থোড় সংগ্রহ করার সেই আইকনিক ছবি দেশ বিদেশি মুজিবের দুঃশাসন চিত্র তুলে ধরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো অভাব ছিলো না। রিলিফ লুটপাটের মাত্রা এতই বেশি ছিলো যে, অতিরিক্ত পন্য সরকার দলীয় নেতা এবং কর্মরারীদের হাত ঘুরে সীমান্ত দিয়ে ভারতেও পাচার হয়।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশে নিশ্চিতভাবে ১.৫ মিলিয়ন (১৫ লক্ষ) মানুষ না খেয়ে মারা যায়, যদিও বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরো বেশি। প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০ লক্ষ মানুষ অনাহারে দিন কাটাতো। শুধু ঢাকা জেলাতেই প্রতিদিন গড়ে ৮৪ জন মারা যেতো। রংপুর, দিনাজপুরের মত উত্তরবঙ্গের জেলা গুলোতে রাস্তা-ঘাটের পাশে মানুষের লাশ পরে থাকতো। এছাড়া দুর্ভিক্ষের পরে রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যায় আরো ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ।

নিজেদের চিরায়ত স্বভাব অনুজায়ী সেই দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশকে ১ কেজি চাল দিয়েও সাহায্য করেনি ভারত। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য চাওয়া হলেও ভারত সহযোগিতা করতে অপারগতা প্রকাশ করে।

বিদেশি ত্রানের প্রভাবে ১৯৭৪ এর নভেম্বর নাগাদ দুর্ভিক্ষের মাত্রা কিছুটা কমে আসে, তবে ততদিনে না খেয়ে এবং অখাদ্য খেয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ কলেরা, আমাশয় এবং ডাইরিয়া সহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পরেছে। চরম দূর্রদশাগ্রস্থ চিকিৎসা ব্যাবস্থার ফলে রোগাক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসার ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আরো ৪ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে।

দেশে যখন হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে, রোগে আক্রান্ত হয়ে, বিনা চিকিৎসার মরছে তখন ১৯৭৫ এর জুলাইয়ে শেখ কামাল এবং শেখ জামালের বিয়ে হলো সোনার মুকুট মাথায় দিয়ে। তৎকালীন ৬৬ লক্ষ টাকা ব্যায়ে গণভবনে ব্যাপক জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের আয়োজন করা হলো। অগনিত অতিথির ভীড়। মনে হচ্ছিল পুরো ঢাকা শহরটাই এসে উপস্থিত হয়েছে বিয়েতে। বিয়ের মন্ডপে কামাল-জামাল দুই ভাইয়ের বউ সোনার মুকুট মাথায় দিয়ে বসেছিল। বিয়ের পরদিন প্রায় সবগুলো দৈনিক পত্রিকায় বড় করে ছাপানো হল সেই ছবি। একই পাতায় ছাপানো হয়েছিল বিনা চিকিৎসার মৃত্যুপথগামী দুর্ভিক্ষপীড়িত, অনাহারক্লিষ্ট, হাড্ডিসার মুমুর্ষ মানুষ নামি কঙ্কালের ছবি।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.