| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সোহানুল হক
সত্য বলো, যদিও তা তিক্ত হয়। কারণ, সত্যই হৃদয়কে মুক্তি দেয়। মিথ্যা ক্ষণিক স্বস্তি দিলেও, তাতে আত্মা দগ্ধ হয়।
পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষতি কার হলো?
টিক্কা খান, ইয়াহিয়া খান, ভুট্টো অথবা মুজিব—কারো ব্যক্তিগত জীবনে তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। তারা সবাই ক্ষমতার ভাগ পেয়েছেন, নিজেদের মতো করে জীবন কাটিয়েছেন। ইয়াহিয়া খানও জীবনের শেষ সময় পশ্চিমে আরামেই কাটিয়েছেন। কিন্তু ক্ষতি হয়েছে দুই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের—যারা যুদ্ধ, বিচ্ছেদ ও অস্থিরতার সবচেয়ে বড় ভার বহন করেছে।
রাষ্ট্রের ভাঙন রোধ করার দায়িত্ব কোনো বেতনভুক্ত সেনা কর্মকর্তার ছিল না—এই দায়িত্ব ছিল আলেম-উলামা ও সাধারণ মুসলমানদের কাঁধে। যদি জনগণ শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারত, তবে হয়তো সেনাবাহিনীও সেই পথেই সমর্থন দিত। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষ সেই জায়গায় ব্যর্থ হয়েছিলাম।
এ বাস্তবতা শুধু অতীতের নয়। আজ যদি পার্বত্য চট্টগ্রাম ভৌগোলিক বা জনবিন্যাসগতভাবে বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়ে, সেখানেও উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত কোনো ক্ষতি হবে না। তাদের অনেকের পরিবার বিদেশে প্রতিষ্ঠিত, এবং অবসরের পর তারা আরামে বিদেশেই জীবন কাটাতে পারবেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষতি হবে সেখানকার সাধারণ মুসলমানদের—নিজেদের ঘর-বাড়ি, জমি-জমা ছেড়ে তাদেরই সীমান্ত পাড়ি দিতে হবে।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—মুসলিম ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা করেছে মূলত আলেম-উলামা ও সাধারণ জনগণ। শাসকরা বরাবরই শেষ মুহূর্তে নিজের নিরাপত্তাকেই বড় করেছেন। যেমন আল-আন্দালুসের শেষ সুলতান আবু আব্দুল্লাহ—তিনি গ্রানাডার চাবি ইসাবেলাকে হাতে তুলে দিয়ে পরিবার-পরিজন ও ধনসম্পদসহ মরক্কো চলে গিয়েছিলেন এবং বাকি জীবন আরামে কাটিয়েছিলেন। কিন্তু অভিশাপ নেমে এসেছিল গ্রানাডার লক্ষাধিক অসহায় মুসলমানের ওপর।
এই কারণেই আমি ১৯৭১ সালের পতনের প্রধান দায় সেনাবাহিনীর ওপর চাপাই না। আমার দৃষ্টিতে, এর বড় অংশের দায় ছিল দুই অঞ্চলের আলেম-উলামা ও সাধারণ জনগণের ওপর—যারা সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছিল। তবে এর সঙ্গে একটি সত্যও অস্বীকার করা যাবে না: পশ্চিম পাকিস্তান দীর্ঘদিন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর যে বৈষম্য, রাজনৈতিক অবিচার এবং দমন-পীড়ন চালিয়েছে, সেটি এই পতনের অন্যতম প্রধান কারণ। এসব অবিচার না হলে জনগণের হতাশা, অসন্তোষ ও বিচ্ছিন্নতার বোধ এভাবে বিস্ফোরিত হতো না।
রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়; ইতিহাস বলে, রাষ্ট্র রক্ষার মূল শক্তি আসে জনগণ থেকেই। প্রকৃত প্রতিরোধ, ঐক্য ও স্থিতিশীলতা গড়ে তোলার দায়িত্ব সবসময়ই জনগণের—কারণ রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের আসল বোঝা তারাই বহন করে।
©somewhere in net ltd.