| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শুভ্রনীল০০
নিভে যাবো বলেই বার বার জ্বলে উঠি নিভে যাওয়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয় শুধু ছাই দিয়েই শেষ নয় একদিন ঠিকই আবার জ্বলে উঠবো সোনালী আভা ছড়িয়ে!!!
সেইদিন প্রথম কালবৈশাখী নেমেছিল। কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টির সংবাদও পেয়েছিলাম। সকালে ঘুম ভাঙতেই রুমের বামদিকের জানালা দিয়ে দৃষ্টি যায় সকালের সদ্যস্নাত প্রকৃতির দিকে। আজ পুবাকাশের রবিটা যেন আরও উজ্জ্বল, যেন ধর্ম সাগরের বুকে ডুব দিয়ে উঠেছে রবি। ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কের ধাবমান যানগুলো ছুটে চলেছে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে। আগে এই মহাসড়কের অনেক দুর্ঘটনা, অপরাধ প্রবণতা এসবের খবর শুনতাম, দেখতাম। এ পথে আমার অনেক চলাচলও চিল। তবে কখনো কোন বড় দুর্ঘটনা, অপরাধ কখনো দেখা হয়নি। আমি এগুলো দেখতেও চাইতাম না, দেখতে ভালোও লাগতনা। আমার বেশিরভাগ ভ্রমণ আমি করতাম রাতের বেলায়। সবসময় ঈশ্বরকে বলতাম- ঈশ্বর কোনরকম দুর্ঘটনা, রক্তপাত যেন না দেখি। ঈশ্বর আমার কথা শুনতেন। আর এখন আমি সেই মহাসড়কের পাশেই থাকি। এই মহাসড়কের পাশেই আমার অফিস। এখন এর আশেপাশের অপরাধের, কখনো কখনো মহাসড়কের দুর্ঘটনার, অপরাধের গতিপ্রকৃতি জানতেও আমাকে বের হতে হয়। এটাই এখন আমার চাকরি। প্রতিটি সকাল হয় যন্ত্র দানবদের ডাকে। সারাদিনই সেই ডাক। আমার রুমের পেছনের জানালা দিয়ে দেখি সবুজ পেরিয়ে সেই দানব গুলোর ছুটে চলা। সামনের জানালা দিয়ে দেখি হরেক রকমের ফুটন্ত ফুলের সুবাস মাখা হাসি আর পাখির কলকাকলিতে মুখরিত একটা সুন্দর সকাল। মাঝে মাঝে এই ফুল নিয়ে মালি আমাকে উপহার দেন। যেন একপাশে ভালোবাসা মিশ্রিত উদ্যান আর বিপরীত পাশে এক রুক্ষতা মিশ্রিত প্রান্ত। যে প্রান্তে কখনো অপরাধ আর কখনো দুর্ঘটনার খবর শুনি।
প্রতিদিনের মত অফিসে গেলাম। অফিসে যেতেই ওসি বললেন- আজ আমরা বের হবো। ঊর্ধ্বতন স্যাররা আসবেন একটা সাইট দেখতে। এরপর দুপুরে লাঞ্চ করে ফিরবো। বিকালেই মহাসড়কে কিছু চেকপোস্ট ভিসিট করবো। বুঝলাম আজ অনেক ব্যস্ত শিডিউল। কিছুটা অপ্রস্তুত থাকলেও, রাজি হলাম। অপরাধ ও দুর্ঘটনা প্রবণ কিছু এলাকা দেখতে দেখতে আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছালাম। বিকালে নির্ধারিত কিছু স্পটে চেকপোস্ট ভিজিট। অভিজ্ঞতাগুলো আমার জন্য একেবারেই নতুন। কাছ থেকেই কিছু অপরাধের ধরণ, গতিপ্রকৃতি দেখলাম। অপরাধী সনাক্তকরণ দেখলাম। সন্ধ্যার দিকে কালকের মতই আকাশ আঁধার করে বৃষ্টি নামল, বিদ্যুৎ চমকানো শুরু হল। আমরা একটা হোটেলে নাস্তা করে থানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। ওসি বললেন- স্যার, আজ আর হলনা। আপনাকে নিয়ে আরেকদিন বের হবো। আমিও রাজি হলাম। বৈরি আবহাওয়ার মধ্যে আমাদের গাড়ি যখন বিশ্বরোড মোড় ক্রস করল, দেখলাম ভীষণ জ্যাম। জ্যাম তো এমন জ্যাম, গাড়ি একেবারেই স্থির। দুপাশ থেকেই গাড়ি আশা বন্ধ। এদিকে ওসির ফোন আসল, জরুরী থানায় যেতে হবে। সাইরেন বাজিয়ে আমাদের ড্রাইভার ডানপাশ দিয়ে দ্রুত চালিয়ে নিতে লাগলো। বৃষ্টির গতি আরও বেড়ে গেলো হঠাৎ করেই। দেখলাম কিছু লোক পুলিশের গাড়ি দেখে উৎকন্ঠিত ভাবে হাত নাড়াতে লাগলো। বোঝার বাকি ছিলনা, কিছু একটা হয়েছে। বৃষ্টির ঝাপটার মধ্যেই যে পাশটায় আমি বসা, সে পাশে একটা লোক কান্নাজড়িত কণ্ঠে হাতড়াতে লাগলো। অবস্থার আকস্মিকতা দেখে আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। গাড়ির গ্লাসটা নামালাম। লোকটা বলতে লাগলো- স্যার, গাড়িতে দুইটা লোক এক্সিডেন্ট করে আটকা পড়ে আছে, ওদের বাঁচান স্যার। বলতে বলতে আরও কিছু লোক জড়ো হল। আমি একেবারেই নতুন বলে ওদের আবেগ তা আমাকেও আবেগান্নিত করে তুলছিল। আমরা গাড়ি সামনে নিয়ে গেলাম। দুর্ঘটনা কবলিত মালবাহী ট্রাকের পাশে গিয়ে দেখলাম, অন্য একটি কাভার্ড ভ্যানের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। কাভার্ড ভ্যানটির তেমন কিছুই হয়নি, কিছু ট্রাকের ড্রাইভারের পাশটা একেবারে দুমড়ে- মুচড়ে গেছে। বেশ কয়েকজন মিলে ড্রাইভের কে গাড়ি থেকে নামানোর চেষ্টা করছে। বৃষ্টিটা কমছিল না। আমি নামতেই ভিজতে শুরু করলাম। অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পরও ড্রাইভারের নিথর দেহ বের করা যাচ্ছিল না। একজন বলে উঠল- স্যার এখনো জীবিত আছে, শুধু উদ্ধার করে হাসপাতালে নিতে পারলেই বাঁচবে। আমার ওসিও নামলেন। ঠিক কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না! ওসি হাইওয়ে পুলিশকে বার বার কল দিচ্ছিলেন। বৃষ্টি আর ঝড়ের গতি আরও বাড়ল। আকাশে বিজলীর চমক আর বজ্রপাত সহ জোরেশোরে বৃষ্টি পরতে লাগলো। ভিজছে হতভাগা ড্রাইভারের দেহটি, ভিজছে নিঃস্বার্থ প্রাণ কিছু মানুষ, চেষ্টার ত্রুটি রাখছে না কেউই। কিন্তু বৈরি প্রকৃতি কোনভাবেই সাপোর্ট দিচ্ছিল না। বার বার বাতাসের ঝাঁপটা আর বজ্রপাতের শব্দ আমাদের তাড়িয়ে দিতে চাইলো। আবার গাড়িতে গিয়ে উঠলাম ভেজা শরীর নিয়ে। থানা থেকে বার বার কল আসছিল ওসির মোবাইলে। গাড়ি থানার দিকেই চলতে শুরু করল। ওসি ফায়ার সার্ভিসকে ফোন দিলেন। ওনার মধ্যেও চরম উৎকণ্ঠা দেখলাম যা আমাকে আরও আবেগপ্রবণ ও উৎকণ্ঠিত করে তুলছিল। আমরা কি করছি, কই যাচ্ছি??! ওসি কে বললাম- ও হয়তো বাঁচত। আমাদের ড্রাইভার বলল- স্যার, একটু দূরে গ্যারেজ টাইপের একটা ওয়ার্কশপ আছে, মিস্ত্রি পেলে ট্রাকের সামনের অংশটা কেটে বের করা যেত, হয়তো বেঁচে যেত। ওসি রাজি হয়ে গাড়ি সেদিকে নিয়ে যেতে বললেন। দ্রুত সেখানে গিয়ে চার- পাঁচ জন মিস্ত্রি নিয়ে ফিরে আসছিলাম পেছনের ভ্যান অংশে। বৃষ্টি কমার কোন লক্ষন নেই। আমাদের উৎকণ্ঠা দেখে মিস্ত্রিরাও দ্রুত তাদের যন্ত্রপাতি নিয়ে বের হয়ে গেলো। বৈরি প্রকৃতি যেন আমাদেরকেও শাসাচ্ছিল। দমকা বাতাস যেন আমদের গতি রোধ করে দিতে চাইলো। জীবন ও মৃত্যুর একটা লড়াই যেন এক ঝড়-ঝঞ্জা বিক্ষুব্ধ এই আঁধার রাতে।
সব বাঁধা ঠেলে আমরা যখন পৌছালাম সবাই গাড়ি থেকে হুড়মুড় করে নেমে পড়ল। দেখলাম কেউ কেউ কাঁদছে। ইতোমধ্যেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে ড্রিল মেশিন দিয়ে দুমড়ে যাওয়া ট্রাকের অংশ কেটে ড্রাইভারের নিথর দেহটা নামাল। বেশ কয়েক যায়গায় একেবারে থেতলে গেছে। বিজলি চমকানো আলোয় রক্তের প্রবাহ দেখলাম বৃষ্টির পানি ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। যারা উদ্ধার করছিল তাদের হাতে, গায়ে রক্তের দাগ। শরীরের উপরের দিকটা অক্ষত ছিল। আমার মাথাটা চক্কর দিল, চোখ অন্ধকার হয়ে আসছিল । তাড়াতাড়ি গাড়িতে গিয়ে বসলাম। আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো। চোখ দিয়ে যেন আগুন পানি বের হতে লাগলো। পাশ থেকে একজন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী বললেন- বেঁচে নেই। আমি আবার লাফ দিয়ে নামলাম। তাহলে আমরা কি হেরে গেলাম?! এতগুলো অসহায় নিঃস্বার্থ মানুষ হেরে গেলো!! আমি এই হার জানতে পারছিলাম না। পাশে একটা প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ছিল। সেখানে নিয়ে যাওয়া হল। কিন্তু ডাক্তার ও একই মত দিলেন। হাইওয়ে পুলিশের কাছে ঐ হতভাগা লোকটার লাশ দিতে হল। মুখপানে তাকাতেই দেখলাম কত কষ্টের মৃত্যুই না তাকে মেনে নিতে হল। না জানি এ কারো ভাই, কারো স্বামী, কারো সন্তান, কারো বাবা!! বৃষ্টির শীতল পানি সেখানে উপস্থিত অনেকেরই নীরব ভাবে উষ্ণ বারি বর্ষণে উষ্ণ হয়ে উঠছিল। বাকি নই আমি, আমাদের ওসি, ফায়ার সার্ভিস কর্মী, মিস্ত্রি, ড্রাইভার, উপস্থিত সবাই। সবাই যেন মহাযুদ্ধে পরাজিত সৈনিক। ক্ষনিক নীরবতায় চারপাশ ছেয়ে গেলো। খুনি দমকা হাওয়াটা বার বার ঝাঁপটা নিয়ে আসছে, শাসাচ্ছে, বিদ্যুৎ চমকিয়ে তাড়িয়ে দিতে চাইতে। একটা প্রান বাঁচাতে এতগুলো মানুষের আপ্রাণ নিঃস্বার্থ চেষ্টা নস্যাৎ করে মরিয়া যেন আজকের এই আবহাওয়া। যেন আগ থেকে পরিকল্পিত ছিল আজকের এই প্রান কেড়ে নেয়ার মিশন। হঠাৎ এমন বৃষ্টি বা আবহাওয়াতে এইরকম নাকি অনেক দুর্ঘটনাই নাকি ঘটে...।
ভিকটিমের মানিব্যাগ খুলে দেখা গেলো মায়ের কোলে একটা ফুটফুটে কন্যা। বোঝা গেলো তারই স্ত্রী-সন্তানের ছবি। ছবির এই নিস্পাপ মুখগুলো হয়তো পথ চেয়ে আছে, প্রতিক্ষার প্রহর গুনছে। মা হয়তো বৃষ্টি দেখিয়ে শিশুটিকে বাবা আসবে বলে গান শোনাচ্ছেন, বৃদ্ধ মা হয়তো চিন্তা করছেন আর পথ চেয়ে আছেন সন্তানের জন্য। কিন্তু!!!!!!!!! অনেক লড়াই করেও যে হারতে হল মরনের কালো থাবার কাছে। হতেই যে হল ভিন জগতের বাসিন্দা সবাইকে পর করে। শুধু কি তিনিই হারলেন?! আমরাও যে হেরে গেলাম! মনে মনে শুধু এই বললাম- নিরাপদ সড়ক চাই, স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চাই। এই ভাবে চলে যাওয়া মেনে নেওয়া যায় না। আমরা যে যার ঘরে ফিরে এলাম। ফ্রেশ হয়ে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করলাম। সারারাত ঘুমাতে গিয়ে বার বার ঐ হতভাগ্য মুখটা ভেসে উঠতে লাগলো মনের কোনে। এখনো ঐ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় সেই ক্ষণটার কথা, সেই স্থানে সেই মুখটার কথা মনে পড়ে। বিশ্বাস হচ্ছেনা সেদিন কালবৈশাখী রাতে আমি এই মহাসড়কে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে হেরেছিলাম, একটা জীবন কে বাঁচাব বলে। নিজেকে পরাজিত একজন সৈনিক মনে হয়। বিধাতাকে মনে মনে প্রশ্ন করি- জীবনই যখন দিলে, এতো কষ্টই কেন দিতে হয়, এভাবেই কেন নিবে!?
২|
০৫ ই মে, ২০১৪ রাত ২:৫৪
বাংলার নেতা বলেছেন:
৩|
০৫ ই মে, ২০১৪ সকাল ৮:৫৪
লাইলী আরজুমান খানম লায়লা বলেছেন: বিধাতাকে মনে মনে প্রশ্ন করি- জীবনই যখন দিলে, এতো কষ্টই কেন দিতে হয়, এভাবেই কেন নিবে!? ''--------------নিষ্ঠুর নিয়তি !!!
০৫ ই মে, ২০১৪ দুপুর ১:২০
শুভ্রনীল০০ বলেছেন: ধন্যবাদ.।। আপু.।.।.।.।
৪|
০৫ ই মে, ২০১৪ দুপুর ১২:২১
বিপ্লব৫৫ বলেছেন: সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা, এমন কোন পরীক্ষায় ফেল না যেখানে কৃতকার্য হতে পারবো না।
০৫ ই মে, ২০১৪ দুপুর ১:১৮
শুভ্রনীল০০ বলেছেন: মাঝে মাঝে অকৃতকার্য হতে হয়.।.। না হলে.. সফল হওয়ার তৃপ্তিটা সবসময় পাবেন না!!
৫|
০৫ ই মে, ২০১৪ দুপুর ১:০৪
শুভ্রনীল০০ বলেছেন: সবাইকে অনেক ধন্যবাদ!! সুন্দর কমেন্ট করার জন্য । @বিপ্লব৫৫ঃ মাঝে মাঝে অকৃতকার্য হতে হয়.।.। না হলে.. সফল হওয়ার তৃপ্তিটা সবসময় পাবেন না!!
৬|
০৫ ই মে, ২০১৪ দুপুর ২:২৩
সিফাত সারা বলেছেন: বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর । কে জানে ? হয়ত আমাকেও এভাবে প্রান দিতে হবে কোন এক অজানা জায়গায় ।
আল্লাহ যেন সবাইকে স্বাভাবিক মৃত্যু দান করে
০৬ ই মে, ২০১৪ রাত ৩:১৩
শুভ্রনীল০০ বলেছেন: হুম... ঠিক বলেছেন আপু! বিধাতার কাছে মৃত্যুর প্রারথনাই করি.।।
©somewhere in net ltd.
১|
০৫ ই মে, ২০১৪ রাত ২:৪০
নিয়ামুল ইসলাম বলেছেন: