| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আট মহাকাব্যের ভিড়ে যে মহাকবি আড়ালে
মাইকেল - হেমচন্দ্র - নবীনচন্দ্রদের পাশে কায়কোবাদকে আমরা কতটা পড়েছি?
- এস এম আজাদ রহমান
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘মহাকবি’ শব্দটি উচ্চারিত হলে মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম প্রায় অবধারিতভাবে সামনে আসে। সঙ্গে উচ্চারিত হয় হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, কায়কোবাদ- আরও কয়েকজন মহাকাব্যচর্চাকারী কবির নাম।
কিন্তু একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না-
একই মহাকাব্যিক ঐতিহ্যের অংশ হয়েও কেন কায়কোবাদ আজ এতটাই বিস্মৃতপ্রায়?
যে কবি মহাশ্মশান- এর মতো বৃহৎ ঐতিহাসিক কাব্য রচনা করেছেন, যাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয়েছে, যাঁর রচনাবলি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে, যাঁকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মহাকবি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে- তাঁর নাম আজকের সাধারণ পাঠকের কাছে কেন অনেক সময় শুধু একটি পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর?
“মহাশ্মশান-এর রচয়িতা- কায়কোবাদ।”
একজন মহাকবির পরিচয় কি এতটুকুতেই শেষ হয়ে যেতে পারে?
এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য মাইকেলকে ছোট করা নয়, নবীনচন্দ্রকে অস্বীকার করা নয়, কিংবা কায়কোবাদকে জোর করে অন্য সবার ওপরে বসিয়ে দেওয়া নয়। বরং প্রশ্নটি আরও মৌলিক-
বাংলা সাহিত্যের মহাকাব্যিক ইতিহাসে কায়কোবাদের প্রকৃত অবস্থান কোথায়, এবং কেন তাঁর মূল্যায়ন এত অসম্পূর্ণ?
মহাকাব্যের মানচিত্রে আটটি নাম
বাংলা মহাকাব্যের আলোচনা মূলত উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে নতুন মাত্রা পায়। পাশ্চাত্য মহাকাব্যের রীতির সঙ্গে ভারতীয় পুরাণ, ইতিহাস, জাতিসত্তা ও সমকালীন সমাজচেতনার মিশ্রণে তৈরি হয় নতুন এক কাব্যধারা।
এই ধারার আলোচনায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৃত্রসংহার, নবীনচন্দ্র সেনের রৈবতক- কুরুক্ষেত্র–প্রভাস এবং কায়কোবাদের মহাশ্মশান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুসলিম সাহিত্যধারায় ইসমাইল হোসেন সিরাজীর স্পেন বিজয় কাব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লিখিত তালিকার আনন্দচন্দ্র মিত্র, হামিদ আলী ও যোগীন্দ্রনাথ বসুর মতো কবিদেরও এই আলোচনার বিস্তৃত পরিসরে বিবেচনা করা যায়; তবে তাঁদের সবাইকে একই মাত্রায় “প্রধান মহাকবি” হিসেবে চিহ্নিত করা বাংলা সাহিত্য-ইতিহাসে সর্বসম্মত নয়। ফলে তুলনাটি এখানে মূলত মহাকাব্য রচনার ঐতিহ্য ও সাহিত্যিক গুরুত্বের তুলনা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
আর এই তুলনাতেই কায়কোবাদের অবস্থানটি নতুনভাবে চোখে পড়ে।
মাইকেল: যিনি দরজা খুলে দিলেন- বাংলা মহাকাব্যের আধুনিক ইতিহাস বলতে গেলে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নেই।
১৮৬১ সালে প্রকাশিত মেঘনাদবধ কাব্য বাংলা কাব্যের ভাষা ও ছন্দে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটায়। অমিত্রাক্ষর ছন্দের শক্তিশালী প্রয়োগ, পাশ্চাত্য মহাকাব্যিক রীতির প্রভাব এবং রামায়ণের প্রচলিত নায়ক-খলনায়কের ধারণাকে উল্টে দিয়ে মেঘনাদ ও রাবণের প্রতি সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি- সব মিলিয়ে এটি বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
মাইকেলের গুরুত্ব এখানেই।
তিনি শুধু একটি মহাকাব্য লেখেননি;
তিনি বাংলা মহাকাব্য লেখার ভাষাটাই বদলে দিয়েছিলেন।
তাঁর এই বিপ্লবী ভূমিকার কারণে বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবস্থান অনন্য। তাই কায়কোবাদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে মাইকেলকে অস্বীকার করা নয়; বরং দেখতে হবে- মাইকেলের নির্মিত নতুন মহাকাব্যিক পরিসরে কায়কোবাদ কী নতুন সংযোজন করেছিলেন।
হেমচন্দ্র: পুরাণ থেকে জাতিসত্তার দিকে
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৃত্রসংহার বাংলা মহাকাব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পুরাণ ও মহাভারতীয় উপাদান ব্যবহার করে তিনি বীরত্ব, ন্যায়-অন্যায় এবং স্বাজাত্যচেতনার বিষয়কে মহাকাব্যের পরিসরে নিয়ে আসেন।
তাঁর কবিতায় দেশ ও জাতির প্রতি আবেগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ মাইকেলের কাব্যে যেখানে শিল্পরূপের বিপ্লব প্রবল, হেমচন্দ্রের কাব্যে সেখানে জাতিসত্তা ও দেশচেতনার প্রবাহ আরও স্পষ্ট।
নবীনচন্দ্র সেন।-
নবীনচন্দ্র: মহাকাব্যকে করলেন বৃহৎ আখ্যান
নবীনচন্দ্র সেনের রৈবতক, কুরুক্ষেত্র ও প্রভাস বাংলা মহাকাব্যিক আখ্যানের বিস্তৃতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে তিনটি কাব্যে তিনি একটি বৃহৎ পৌরাণিক আখ্যান নির্মাণ করেন। তাঁর কাব্যিক প্রকল্পের ব্যাপ্তি বাংলা মহাকাব্যের ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আর এখানেই একটি ঐতিহাসিক সূত্র পাওয়া যায়।
কায়কোবাদের ওপর নবীনচন্দ্রের প্রভাব ছিল।
কিন্তু প্রভাব থাকা আর অনুকরণ করা এক বিষয় নয়।
কায়কোবাদ পূর্বসূরিদের কাছ থেকে মহাকাব্যের কাঠামো ও কাব্যভাষার শিক্ষা নিয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু তাঁর বিষয়, ইতিহাসবোধ এবং সামাজিক অবস্থান তাঁকে একটি স্বতন্ত্র জায়গায় নিয়ে যায়।
কায়কোবাদ: মহাকাব্যের কেন্দ্রে একটি “মহাশ্মশান”
১৯০৪ সালে প্রকাশিত মহাশ্মশান কায়কোবাদের সবচেয়ে আলোচিত রচনা।
বিষয়- তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ।
কিন্তু নামটি লক্ষ্য করার মতো।
মহাশ্মশান।
কেন “বিজয়” নয়?
কেন “পানিপথ” নয়?
কেন কোনো বিজয়ী বীরের নাম নয়?
কারণ কায়কোবাদ যুদ্ধকে শুধু বিজয়-পরাজয়ের হিসাব হিসেবে দেখেননি। তিনি দেখেছেন তার পরিণতি- মৃত্যু, ধ্বংস, রক্তপাত ও বিপর্যয়।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের কারণেই কাব্যটির নাম মহাশ্মশান। কাব্যটি ইতিহাসের একটি ভয়াবহ যুদ্ধকে মহাকাব্যিক পরিসরে রূপ দিয়েছে।
এখানে কায়কোবাদের দৃষ্টিভঙ্গির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে।
তিনি যুদ্ধের বিজয়ীর গৌরবের চেয়ে যুদ্ধের পরিণতির দিকে তাকিয়েছেন।
এটি শুধু ইতিহাসের পুনর্কথন নয়।
এটি ইতিহাসকে মানবিক চোখে দেখার চেষ্টা।
এখানেই কায়কোবাদের সবচেয়ে বড় স্বাতন্ত্র্য
মাইকেল পুরাণের প্রচলিত নৈতিক বিন্যাসকে প্রশ্ন করেছিলেন।
কায়কোবাদ ইতিহাসের প্রচলিত বিজয়-পরাজয়ের বিন্যাসকে প্রশ্ন করেছেন।
মাইকেলের মেঘনাদ পরাজিত হয়েও মহত্তর মানবিক চরিত্রে উজ্জ্বল।
কায়কোবাদের পানিপথও বিজয়ী-পরাজিতের বাইরে গিয়ে একটি বিশাল মানবিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়।
এই জায়গায় দুজনের মধ্যে একটি গভীর আত্মীয়তা খুঁজে পাওয়া যায়-
দুজনই প্রচলিত দৃষ্টিকে সরিয়ে অন্য দিকটি দেখতে চেয়েছেন।
তবে তাঁদের পদ্ধতি আলাদা।
একজন পুরাণকে পুনর্নির্মাণ করেছেন।
অন্যজন ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায়কে পুনরায় পাঠ করেছেন।
কায়কোবাদকে বুঝতে হলে তাঁর সময়কে বুঝতে হবে
এখানেই কায়কোবাদের মূল্যায়নে সবচেয়ে বড় ভুলটি হয়ে থাকে।
আমরা প্রায়ই শুধু কবিতাটি পড়ি; কবির সময়টি পড়ি না।
কায়কোবাদ এমন সময়ে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হন, যখন বাঙালি মুসলমানের আধুনিক বাংলা সাহিত্যচর্চা এখনও শক্ত ভিত তৈরি করতে পারেনি। বাংলা ভাষায় মুসলিম সমাজের সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ ছিল একটি চলমান রূপান্তরের মধ্য দিয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় কায়কোবাদের আবির্ভাবকে এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় তাঁর অশ্রুমালা ও মহাশ্মশান-এর মতো রচনার পাশাপাশি তাঁকে গীতিকবি হিসেবেও মূল্যায়ন করা হয়েছে।
অর্থাৎ কায়কোবাদের অবদান শুধু একটি মহাকাব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি একটি সাহিত্যিক সেতু।
একদিকে পুঁথি ও মধ্যযুগীয় মুসলিম সাহিত্যিক ঐতিহ্য;
অন্যদিকে আধুনিক বাংলা কাব্যের মূলধারা।
এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কায়কোবাদ আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজের জায়গা তৈরি করেন।
কায়কোবাদ কি শুধু মুসলমানের কবি?
এই প্রশ্নের উত্তর- না।
তাঁর মুসলিম পরিচয় তাঁর সাহিত্যিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু তাঁকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখলে তাঁর সাহিত্যিক ব্যাপ্তি ছোট হয়ে যায়।
মহাশ্মশান- এর বিষয়ই এর প্রমাণ।
তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ কোনো একক সম্প্রদায়ের ইতিহাস নয়। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
কায়কোবাদ সেই ইতিহাসকে মহাকাব্যের বিষয় করেছেন।
তাঁর কাব্যে মুসলিম ঐতিহাসিক চরিত্র যেমন আছে, তেমনি বৃহত্তর ভারতীয় ইতিহাসের বহুস্বরও রয়েছে।
তাই কায়কোবাদকে শুধু “মুসলিম মহাকবি” হিসেবে দেখলে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় অসম্পূর্ণ থাকে।
তিনি একই সঙ্গে-
বাংলা ভাষার কবি, ইতিহাসের কবি এবং মানবিক ট্র্যাজেডির কবি।
ইসমাইল হোসেন সিরাজী: একই জাগরণের আরেক কণ্ঠ
ইসমাইল হোসেন সিরাজীর স্পেন বিজয় কাব্য বাংলা মুসলিম সাহিত্যধারায় মুসলিম ইতিহাস ও গৌরবচেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
কিন্তু কায়কোবাদ ও সিরাজীর মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য আছে।
সিরাজীর কাব্যে অতীতের গৌরব ও জাগরণের আহ্বান প্রবল।
কায়কোবাদের মহাশ্মশান-এ অতীত এসেছে আরও বেশি ট্র্যাজিক স্মৃতি হিসেবে।
একজন অতীত থেকে শক্তি খুঁজেছেন।
অন্যজন অতীতের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়েছেন।
দুই দৃষ্টিই মূল্যবান।
কিন্তু কায়কোবাদের দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে একটি বৃহত্তর মানবিক পাঠের সুযোগ দেয়।
তাহলে কায়কোবাদ কোথায় দাঁড়ান?
এখানেই মূল বিতর্ক।
সাহিত্যিক শিল্পমানের বিচারে মাইকেল মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্য- এটি প্রতিষ্ঠিত সত্যের কাছাকাছি।
কায়কোবাদের মহাশ্মশান সেই অর্থে মাইকেলের কাব্যের সমান শিল্পসিদ্ধি অর্জন করেছে কি না, তা নিয়ে সাহিত্য-সমালোচনায় বিতর্ক থাকতেই পারে।
বাংলাপিডিয়াও মহাশ্মশান-এর কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছে এবং মাইকেল ও নবীনচন্দ্রের প্রভাবের বিষয়টি স্বীকার করেছে।
কিন্তু এখানেই একটি ভুল করা হয়।
শুধু শিল্পরীতির একটি নির্দিষ্ট মাপকাঠি দিয়ে কায়কোবাদের সমগ্র ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিচার করা হয়।
সাহিত্যিক মূল্যায়নের মাপকাঠি কি শুধু-
ছন্দ?
ভাষা?
অলংকার?
নাকি এর সঙ্গে যুক্ত হবে-
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট?
সামাজিক প্রতিনিধিত্ব?
সাহিত্যিক ধারার বিকাশে ভূমিকা?
একটি জনগোষ্ঠীর আধুনিক সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ?
মানবিক ইতিহাসের নতুন পাঠ?
যদি এই প্রশ্নগুলোও মূল্যায়নের অংশ হয়, তাহলে কায়কোবাদের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।
বাংলা মহাকাব্যচর্চার আলোচ্য আট কবি / একটি তুলনামূলক চিত্র
ক্রম কবি প্রধান মহাকাব্য/কাব্য মূল বিষয়/উপাদান
১ মাইকেল মধুসূদন দত্ত মেঘনাদবধ কাব্য রামায়ণ, বীরত্ব, ট্র্যাজেডি, আধুনিকতা
২ হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বৃত্রসংহার পৌরাণিক আখ্যান, বীরত্ব, স্বাজাত্যচেতনা
৩ নবীনচন্দ্র সেন রৈবতক, কুরুক্ষেত্র, প্রভাস কৃষ্ণ, মহাভারত, ইতিহাস ও জাতিচেতনা
৪ কায়কোবাদ মহাশ্মশান তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ, ইতিহাস, ধ্বংস ও মানবিক ট্র্যাজেডি
৫ ইসমাইল হোসেন সিরাজী স্পেন বিজয় কাব্য মুসলিম ইতিহাস, বিজয় ও জাগরণ
৬ আনন্দচন্দ্র মিত্র হেলেনা পৌরাণিক/ঐতিহাসিক আখ্যান
৭ হামিদ আলী সোহ্রাববধ কাব্য বীরত্ব, করুণরস ও ঐতিহাসিক-পৌরাণিক আখ্যান
৮ যোগীন্দ্রনাথ বসু পৃথ্বীরাজ পৃথ্বীরাজ চৌহান, ইতিহাস ও বীরত্ব
এই টেবিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- প্রত্যেক কবির অবদান আলাদা।
তাই এক লাইনের “কে বড়?” প্রশ্নের চেয়ে “কে কী দিয়েছেন?” প্রশ্নটি বেশি কার্যকর।
আর সেই প্রশ্নের উত্তরেই কায়কোবাদের শক্তি প্রকাশ পায়।
অবহেলার আসল জায়গা কোথায়?
কায়কোবাদকে কেউ একদিন বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে “অবহেলা” করেছেন- এমন সরল অভিযোগ ইতিহাসসম্মত নয়।
অবহেলা বরং তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক স্মৃতি, পাঠ্যক্রম, গবেষণা, প্রকাশনা এবং জনপরিসরে উপস্থিতির অসমতার মধ্য দিয়ে।
একজন পাঠক মাইকেলকে তাঁর কাব্যের জন্য চেনেন।
নবীনচন্দ্রকে অন্তত মহাকাব্যিক ত্রয়ীর মাধ্যমে চেনেন।
কিন্তু কায়কোবাদকে কতজন মহাশ্মশান পড়ে চেনেন?
কতজন অশ্রুমালা পড়েছেন?
কতজন তাঁর অন্যান্য কাব্য সম্পর্কে জানেন?
কতজন জানেন, তিনি শুধু মহাকবি নন- গীতিকবিও?
এখানেই “অবহেলা” শব্দটির যথার্থতা।
কায়কোবাদ ইতিহাস থেকে মুছে যাননি; কিন্তু পাঠকের স্মৃতি থেকে অনেকটাই সরে গেছেন।
এ দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে।
আরও বড় একটি প্রশ্ন: আমরা কি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে অসমভাবে পড়েছি?
এই প্রশ্নটি এড়িয়ে গেলে কায়কোবাদ-আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার ইতিহাস দীর্ঘদিন প্রধানত কিছু নির্দিষ্ট ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকে ঘিরে লেখা হয়েছে।
ফলে বাংলা মুসলিম সাহিত্যিক আধুনিকতার ইতিহাস অনেক সময় আলাদা অধ্যায় হিসেবে পড়ানো হয়েছে- মূলধারার সাহিত্য-ইতিহাসের সঙ্গে সমানভাবে সংযুক্ত করে নয়।
কায়কোবাদ এই বিভাজনকে প্রশ্ন করার একটি সুযোগ।
তাঁকে মাইকেলের বিপরীতে দাঁড় করানোর দরকার নেই।
বরং মাইকেল, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, কায়কোবাদ, সিরাজী- সবাইকে একই ধারার বিভিন্ন বাঁক হিসেবে পড়া দরকার।
তখন দেখা যাবে-
বাংলা মহাকাব্যের ইতিহাস একক কোনো কবির ইতিহাস নয়।
এটি বহু কণ্ঠের ইতিহাস।
আর সেই বহু কণ্ঠের মধ্যে কায়কোবাদের কণ্ঠটি দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে নিচু করে রাখা হয়েছে।
“মহাকবি কায়কোবাদ”- শুধু একটি উপাধি নয়
কায়কোবাদের ক্ষেত্রে “মহাকবি” শব্দটি শুধু প্রশংসাসূচক বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করলে তাঁর সাহিত্যিক গুরুত্ব বোঝা যাবে না।
এটি একটি ঐতিহাসিক পরিচয়।
মহাশ্মশান তাঁর সেই পরিচয়ের কেন্দ্রীয় ভিত্তি।
কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক ব্যাপ্তি তার চেয়েও বড়।
তিনি বাংলা মুসলিম কাব্যের আধুনিকতার অন্যতম প্রাথমিক মুখ।
তিনি ইতিহাসকে মহাকাব্যের বিষয় করেছেন।
তিনি যুদ্ধকে কেবল বীরত্বের গল্প না বানিয়ে ধ্বংসের মানবিক পরিণতি দেখেছেন।
তিনি গীতিকবিতাতেও নিজের স্বাতন্ত্র্য দেখিয়েছেন।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-
তিনি বাংলা ভাষাকে নিজের সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন এমন এক সময়ে, যখন এই পথটি তাঁর পূর্বসূরিদের জন্য সহজ ছিল না।
কায়কোবাদকে “সবার ওপরে” রাখার নতুন অর্থ
তাহলে কি বলা যায়- কায়কোবাদই বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকবি?
এটি একটি মতামত হতে পারে।
কিন্তু গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনের জন্য আরও শক্তিশালী বক্তব্য হলো অন্যটি।
কায়কোবাদকে সবার ওপরে বসানোর চেয়ে তাঁকে তাঁর প্রাপ্য উচ্চতায় ফিরিয়ে আনা জরুরি।
কারণ “শ্রেষ্ঠ” একটি বিতর্কিত সৌন্দর্যবোধের প্রশ্ন।
কিন্তু “যথাযথ মূল্যায়ন”- এটি অনেক বেশি নির্ণেয় প্রশ্ন।
আর সেই প্রশ্নে কায়কোবাদের অবস্থান নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা: মহাশ্মশানের কবি, নাকি আমাদের বিস্মৃত মহাকবি?
একটি সাহিত্যসমাজ তার কবিদের শুধু বইয়ের পাতায় বাঁচিয়ে রাখে না।
তাদের পাঠে রাখে।
গবেষণায় রাখে।
পাঠ্যক্রমে রাখে।
আলোচনায় রাখে।
নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়।
কায়কোবাদের ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়তো এখানেই।
তিনি হারিয়ে যাননি।
তাঁর বই হারিয়ে যায়নি।
তাঁর মহাশ্মশান হারিয়ে যায়নি।
বাংলা একাডেমি তাঁর রচনাবলি প্রকাশ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সাহিত্য নিয়ে গবেষণা হয়েছে। সাহিত্য-ইতিহাসে তাঁর নাম আছে।
কিন্তু নাম থাকা আর জীবন্ত সাংস্কৃতিক উপস্থিতি থাকা এক জিনিস নয়।
মাইকেলকে আমরা শুধু মেঘনাদবধ কাব্য, এর কবি হিসেবে মনে রাখিনি- তাঁকে বাংলা আধুনিকতার এক প্রতীক বানিয়েছি।
নবীনচন্দ্রকে শুধু কুরুক্ষেত্র-এর রচয়িতা হিসেবে রাখিনি—তাঁর বৃহৎ সাহিত্যিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা করেছি।
কায়কোবাদের ক্ষেত্রেও কি আমরা তা করতে পেরেছি?
সম্ভবত না।
আর তাই আজ কায়কোবাদকে সামনে আনার অর্থ কোনো কবির বিরুদ্ধে আরেক কবিকে দাঁড় করানো নয়।
এটি বাংলা সাহিত্যের স্মৃতিতে একটি অসমতা সংশোধনের চেষ্টা।
মাইকেল বাংলা মহাকাব্যের আধুনিক দরজা খুলেছিলেন।
হেমচন্দ্র তাকে দেশচেতনার ভাষা দিয়েছিলেন।
নবীনচন্দ্র তার আখ্যানকে বিস্তৃত করেছিলেন।
সিরাজী মুসলিম ইতিহাস ও জাগরণের কণ্ঠকে শক্তিশালী করেছিলেন।
আর কায়কোবাদ- ইতিহাসের এক রক্তাক্ত ধ্বংসস্তূপকে দাঁড় করিয়ে মহাকাব্যের সামনে প্রশ্ন রেখেছিলেন: বিজয়ের গল্পের বাইরে পরাজিত মানুষের কান্নাও কি ইতিহাস নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর আজও প্রাসঙ্গিক।
তাই কায়কোবাদকে “মাইকেলের চেয়ে বড়” প্রমাণ করার চেষ্টার চেয়ে বড় কাজ হলো-
মাইকেলের পাশে কায়কোবাদের প্রাপ্য জায়গাটি তৈরি করা।
কারণ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কায়কোবাদের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি তাঁর মহাশ্মশান নয়।
ট্র্যাজেডি হলো- একজন মহাকবির জন্য যে পরিমাণ পাঠ, গবেষণা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি প্রাপ্য, আমরা আজও তাঁকে তার সবটুকু দিতে পারিনি।
আর সেই কারণেই কায়কোবাদকে নিয়ে নতুন করে কথা বলা শুধু একজন কবিকে স্মরণ করা নয়-
এটি বাংলা সাহিত্যকে আরও পূর্ণ করে পড়ার দাবি।
©somewhere in net ltd.