| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সুম১৪৩২
আমি লিখি আমার দেখা, শোনা আর অনুভবের গল্প। কল্পনা আর বাস্তবের মিলনে গড়ে তুলি নতুন এক জগত। কলমে আমি হলো আমার একান্ত লেখা, শুধু আমার নিজের শব্দের ভুবন।
আমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি।
সিদ্ধান্তটা গতকাল নিইনি। অনেক দিন ধরে একটু একটু করে নিয়েছি।
আজ শুধু বাস্তবায়ন করতে বের হয়েছি।
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বিদ্যুৎ ছিল না।
আমি এমন এক জায়গায় থাকি, যেখানে দিনের বেলাতেও বাতি জ্বালিয়ে রাখতে হয়। চারপাশের বিল্ডিংগুলো গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই শহরে এক সুতা জায়গা ছেড়ে বাড়ি বানানো মানে বোধহয় হীরার টুকরো ফেলে দেওয়া।
মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে জুতা খুঁজতে শুরু করলাম।
মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে একটু মায়া হলো। চার্জ মাত্র ১৭ শতাংশ। মনে হলো, বেচারা ভুল হাতে পড়েছে। কোনো নেতার হাতে থাকলে নিশ্চয়ই একশ শতাংশ চার্জ থাকত।
অন্ধকারে দরজায় তালা দিতে দিতে অবশ্য মনটা একটু ভালো হয়ে গেল। যে দেশে বিদ্যুৎ না থাকলেও বিদ্যুতের বাড়তি চার্জ দিতে হয়, সে দেশে মরার আগে অন্তত অন্ধকারটুকু বিনা পয়সায় উপভোগ করছি। যদিও এটাও কত দিন বিনা পয়সায় থাকবে, বলা কঠিন। কোনো একদিন হয়তো বিদ্যুতের বিলের নিচে নতুন একটা লাইন যোগ হবে—
“অন্ধকার উপভোগ চার্জ — ১৫০ টাকা।”
আমরা প্রতিবাদ করব।
প্রথম দিন খুব জোরে।
দ্বিতীয় দিন একটু কম।
তৃতীয় দিন বিলটা দিয়ে দেব।
আমরা প্রতিবাদী জাতি। তবে আমাদের প্রতিবাদের মেয়াদ সাধারণত বাহাত্তর ঘণ্টা। আমাদের অভিভাবকেরাও বিষয়টা ভালো করেই জানেন। তারা জানেন—কয়েক দিন প্যানপ্যান করবে, তারপর এমনিতেই চুপ হয়ে যাবে। কারণ আমাদের চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁদের হাতে বিশাল এক হাতিয়ার আছে।
আমাদের পেট।
এই জাতির পেটে ক্ষুধা আছে। সংসার আছে। মাসের শেষে বিল আছে। আর ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে প্রতিবাদের চেয়ে রাতের খাবারটা সাধারণত বেশি জরুরি। আমাদের অভিভাবকেরা এই সহজ হিসাবটা খুব ভালো করেই জানেন।
সিঁড়ি দিয়ে নামতেই নিচতলার রহিম সাহেবের সঙ্গে দেখা। লুঙ্গি পরে দরজার সামনে বসে পুরোনো খবরের কাগজ ভাঁজ করে বাতাস করছেন।
কাগজটার এক পাশে বড় বড় অক্ষরে শুধু একটা শব্দ দেখা যাচ্ছে—
“...প্ল্যান”
প্ল্যানটা কী, সেটা অবশ্য বোঝার উপায় নেই। বাকি লেখাটা কাগজের উল্টো পাশে, আমার দিক থেকে দেখা যাচ্ছে না। আমাদের দেশে প্ল্যানের ব্যাপারটা সম্ভবত এমনই। প্ল্যান আছে—বড় বড় অক্ষরে দেখাও যায়। শুধু প্ল্যানের ভেতরে কী আছে, সেটা সাধারণ মানুষের দিক থেকে দেখা যায় না।
অবশ্য মাঝে মাঝে আমাদের অভিভাবকেরা নিজেদের সুবিধামতো কিছু শব্দ ছুড়ে দেন। শব্দগুলোর মানে ঠিকমতো বুঝি কি না, সেটা জরুরি নয়। আমরা সেই শব্দগুলো নিয়ে বানরের মতো লাফাতে থাকি। তর্ক করি, দল ভাগ করি, একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি।
আর আমাদের অভিভাবকেরা দূরে বসে সম্ভবত নির্মল আনন্দে দৃশ্যটা উপভোগ করেন। শুধু প্ল্যানের ভেতরে কী আছে, সেটা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না।
রহিম সাহেব আমাকে দেখে বললেন,
—কই যান?
বললাম,
—মরতে।
রহিম সাহেব একটু চিন্তিত হয়ে বললেন,
—আজকে যাইয়েন না ভাই। রাস্তায় অনেক জ্যাম।
আমি থেমে গেলাম। মানুষটা আমার মৃত্যু নিয়ে চিন্তিত না। আমার যাতায়াত নিয়ে চিন্তিত।
বললাম,
—মরতে যাচ্ছি। জ্যাম দিয়ে কী করব?
রহিম সাহেব ভাঁজ করা পুরোনো খবরের কাগজ নাড়তে নাড়তে বললেন,
—আরে ভাই, মরতে গেলেও তো সময়মতো পৌঁছানো লাগে। ধরেন, ট্রেনের নিচে পড়ে মরবেন। জ্যামে আটকা পড়ে রেলের লাইনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দেখবেন ট্রেন চলে গেছে। আর গাড়ির নিচে পড়ে মরতে চাইলে আরও বিপদ—সব গাড়ি তো জ্যামে দাঁড়ানো। চাপা দেবে কীভাবে?
আমি কিছুক্ষণ রহিম সাহেবের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
যুক্তি আছে।
আমাদের দেশে যুক্তির অভাব নেই। শুধু যুক্তি অনুযায়ী কাজের একটু অভাব আছে।
নিচে নামতেই বাড়িওয়ালা আমাকে আটকালেন।
—ভাই, গ্যাসের বিলটা দিয়েন।
বললাম,
—গ্যাস তো থাকে না।
তিনি এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন, যেন আমি দেশের অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোটাই বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি।
—গ্যাস না থাকলে বিল দিবেন না কেন?
আমি চুপ করে গেলাম। সত্যিই তো। এই দেশে সেবা পাওয়া আর সেবার বিল দেওয়ার মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে—
এমন কথা আমাকে কে বলেছে?
গ্যাস থাকবে কি না, সেটা গ্যাসের ব্যাপার। কিন্তু বিল আমাকে দিতেই হবে।
আমি বললাম,
—আমি আসলে মরতে যাচ্ছি।
বাড়িওয়ালা কিছুক্ষণ চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
—ও আচ্ছা। তাহলে যাওয়ার আগে বিকাশ করে দিয়েন। পরে তো আর পাওয়া যাবে না।
আমি মাথা নাড়লাম।
মানুষটা বাস্তববাদী। আমার জীবন নিয়ে তার কোনো দাবি নেই। বকেয়া বিলটা পেলেই হলো।
আমি রাস্তায় বেরিয়ে এলাম।
মোড়ের চায়ের দোকানে প্রচণ্ড ভিড়। আমাদের দেশে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সাধারণত দুই জায়গায় নেওয়া হয়—একটা সংসদে, আরেকটা চায়ের দোকানে।
পার্থক্য হলো, সংসদের সিদ্ধান্তে দেশ চলে। আর চায়ের দোকানের সিদ্ধান্তে জানা যায়—
দেশটা আসলে কীভাবে চালানো উচিত।
একজন খুব উত্তেজিত হয়ে বলছেন,
—এই দেশ শেষ! সব চোর! দুর্নীতি কইরা দেশ খাইয়া ফেলছে।
পাশের লোক মাথা নেড়ে বললেন,
—একদম ঠিক বলেছেন।
প্রথম লোকটা চায়ে চুমুক দিলেন। তারপর একটু গলা নামিয়ে বললেন,
—আপনার ওই ভূমি অফিসের লোকটার নম্বরটা দিয়েন তো। পাঁচ-দশ হাজার লাগলেও সমস্যা নাই। আমার কাজটা একটু আগে করানো দরকার।
আমি লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
এক কাপ চা শেষ হওয়ার আগেই একটা বিপ্লবের মৃত্যু দেখলাম।
চায়ের দোকানদার আমাকে বলল,
—ভাই, চা দিব?
বললাম,
—দেন। জীবনের শেষ চা।
—ক্যান ভাই?
—মরতে যাচ্ছি।
সে একটুও বিচলিত হলো না। বলল,
—তাহলে আগের বাকিটাও দিয়ে যাইয়েন।
আমি পকেট থেকে টাকা বের করলাম। মৃত্যুর আগেও ঋণ পরিশোধ করা ভালো। বিশেষ করে চায়ের দোকানের ঋণ। ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা নিয়ে উধাও হলে কী হয় জানি না, কিন্তু চায়ের দোকানের তিনশ টাকা বাকি রেখে উধাও হলে এলাকায় সম্মান থাকবে না।
চায়ে চুমুক দিলাম। চিনি বেশি।
বললাম,
—চিনি এত বেশি কেন?
দোকানদার বলল,
—চিনির দাম বাড়ছে তো ভাই।
আমি কাপটা নামিয়ে কিছুক্ষণ লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
—দাম বাড়ছে বলে বেশি দিচ্ছেন?
—জি ভাই।
আর কিছু বললাম না।
অর্থনীতির এত দিন যা শিখেছি, সব ভুল। দাম বাড়লে জিনিসের পরিমাণও বাড়ে—এই যুগান্তকারী অর্থনৈতিক তত্ত্ব আবিষ্কার করে লোকটা চায়ের দোকান চালাচ্ছে!
তাকে অর্থমন্ত্রী বানানো দরকার।
জিনিসপত্রের দাম যত বাড়বে, মানুষ তত বেশি পাবে।
চা শেষ করে হাঁটা শুরু করলাম।
ফুটপাত দিয়ে হাঁটব ভেবেছিলাম।
কিন্তু ফুটপাতে মোটরসাইকেল আছে, দোকান আছে, ফলের ঝুড়ি আছে, চেয়ার আছে, চায়ের টেবিল আছে। ইদানীং আবার শুনেছি, বাংলার খেতো টেসলাও ফুটপাত দিয়ে চলাচল করে। প্রতিবাদ করলে নাকি চালকেরা এমন কিছু বিশুদ্ধ বাংলা শব্দ শোনান, যেগুলো বাংলা একাডেমির অভিধানে এখনো জায়গা পায়নি।
ভাগ্য ভালো, আজ কোনো টেসলা চোখে পড়ল না। এক জায়গায় দেখি দোকানদার ফুটপাতেই বিছানা পেতে ঘুমাচ্ছেন। সবই আছে।
শুধু পথচারী হাঁটার জায়গাটা নেই।
অগত্যা রাস্তায় নেমে হাঁটতে শুরু করলাম।
হঠাৎ বিশাল আকৃতির একটা যন্ত্র আমাকে চাপা দিতে দিতে ঠিক পাশে এসে থামল। যন্ত্রটার ভেতর থেকে একজন মাথা বের করে চিৎকার করল,
—মরতে চান নাকি?
আমি আনন্দিত হয়ে বললাম,
—জি ভাই!
লোকটা কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইল। সম্ভবত জীবনে প্রথমবার প্রশ্নটার সঠিক উত্তর পেয়েছে। তারপর কিছু না বলে আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। যন্ত্রটা চলে যাওয়ার পর বুঝলাম, ওটা আসলে একটা বাস। প্রথম দেখায় চিনতে পারিনি। অবশ্য আমাকে দোষ দেওয়া যায় না। বাসের চেহারা বলতে যা বোঝায়, তার খুব বেশি কিছু ওটার শরীরে অবশিষ্ট ছিল না। তবে ফিটনেস ঠিকই আছে।
বিষয়টা ভেবে স্বস্তি পেলাম। আমাদের দেশে গাড়ির ফিটনেসের সঙ্গে গাড়ির ফিট থাকার সম্পর্ক থাকাটা সম্ভবত বাধ্যতামূলক নয়।বাসটার শরীরের ফিটনেস নেই, কাগজের ফিটনেস আছে। আর এই দেশে কাগজ সুস্থ থাকলেই হলো—গাড়ি অসুস্থ হলেও দিব্যি রাস্তায় চলতে পারে।
আমি হতাশ হলাম।
মানুষ যখন বাঁচতে চায়, তখন বাস তাকে মারতে আসে। আর আমি যখন মরতে চাইছি, বাসও সহযোগিতা করছে না। এই দেশে প্রয়োজনের সময় কোনো সেবাই পাওয়া যায় না।
রাস্তার পাশে বিশাল একটা বিলবোর্ড।
বড় বড় অক্ষরে লেখা—
“দুর্নীতিকে না বলুন।”
বিলবোর্ডের ঠিক নিচে দুইজন লোক দাঁড়িয়ে। একজনের পরনে বিশেষ ধরনের সরকারি পোশাক। পোশাকটা দেখলেই সাধারণ মানুষ এমনিতেই একটু ভদ্র হয়ে যায়। অবশ্য এই ভদ্রতার পেছনে সম্মানের পাশাপাশি ভয় কাজ করে। কারণ মাঝে মাঝে সাধারণ মানুষের একেবারে খালি পকেটেও জাদুর মতো এমন কিছু চালান ঢুকে যায়, যেটা বের করতে গিয়ে পকেট খালি থাকলেও সঞ্চয়টা আর খালি থাকে না। যাইহোক
অন্য লোকটা চারপাশে তাকিয়ে তার হাতে ভাঁজ করা কয়েকটা নোট ধরিয়ে দিল। নোট নেওয়া লোকটাও চারপাশে তাকালেন। তারপর খুব যত্ন করে সেগুলো পকেটে রেখে দিলেন।
আমি মুগ্ধ হয়ে দৃশ্যটা দেখলাম।
লোকটা সম্ভবত বিলবোর্ডের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনেছেন।
দুর্নীতিকে মুখে “হ্যাঁ” বলেননি।
চুপচাপ পকেটে রেখেছেন।
আমাদের দেশে সাইনবোর্ডের একটা আলাদা জীবন আছে।
হাসপাতালের সামনে লেখা থাকে—
“দালাল থেকে সাবধান।”
সাইনবোর্ডের নিচেই দালাল দাঁড়িয়ে থাকে।
সরকারি অফিসে লেখা থাকে—
“ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।”
লেখাটা থাকে টেবিলের ওপরে। লেনদেনটা হয় টেবিলের নিচে।
রাস্তার পাশে লেখা থাকে—
“এখানে ময়লা ফেলবেন না।”
সাইনবোর্ডটা খুঁজে বের করতে হয় ময়লার স্তূপের ভেতর থেকে।
আমরা নির্দেশনা খুব পছন্দ করি। তাই বড় বড় করে লিখে রাখি। শুধু মানার সময় কেন জানি লেখাগুলো আর চোখে পড়ে না।
কিছুদূর গিয়ে একটা সরকারি অফিসের সামনে বিশাল লাইন দেখলাম।
মরতে বের হলেও আমার কৌতূহল এখনো মরেনি।
এক বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলাম,
—চাচা, কিসের লাইন?
—একটা কাগজ তুলব বাবা।
—কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন?
—সকাল আটটা থেকে।
ঘড়িতে প্রায় বারোটা ।
—আজকে পাবেন?
বৃদ্ধ হাসলেন।
—না।
আমি অবাক হলাম।
—তাহলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
—আজকে দাঁড়ালে জানতে পারব, কালকে কোন রুমে যেতে হবে।
আমি আর কিছু বললাম না।
এই দেশে সরকারি অফিসে গেলে শুধু কাগজ পাওয়া যায় না। আরও অনেক কিছু পাওয়া যায়।
অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।
ধৈর্য বাড়ে।
মানুষ চিনতে শেখা যায়।
বিশেষ করে এমন কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, যাঁরা আপনাকে এমন সব দর্শনের তত্ত্ব শোনাবেন—শুনে মুগ্ধ হওয়া ছাড়া আপনার সামনে খুব বেশি পথ খোলা থাকবে না।
মুখে মুগ্ধতার ভাবটা ঠিকমতো ফুটিয়ে তুলতে না পারলে আপনার জীবন নরকের কাছাকাছি চলে যেতে পারে। ভাগ্য খারাপ হলে ছোটখাটো নরক দেখেও ফেলতে পারেন।
তাই তাঁদের কথা শোনার সময় এমনভাবে মাথা নাড়তে হবে, যেন মনে মনে ভাবছেন—
দর্শনে যাঁরা এত দিন নোবেল পেয়েছেন, তাঁদের সম্ভবত ভুল করেই দেওয়া হয়েছে। আসল নোবেলটা এই ভদ্রলোকেরই প্রাপ্য ছিল।
তারপর অবশ্য মনে পড়বে—দর্শনে নোবেল বলে কোনো পুরস্কারই নেই।
সেটাও সম্ভবত এই ভদ্রলোকের প্রতি পৃথিবীর আরেকটা অবিচার।
একটা ভবনে আসলে কতগুলো রুম থাকতে পারে, সে সম্পর্কেও বিস্তর জ্ঞান অর্জন হয়।
ঠিক তখন এক যুবক বৃদ্ধের কাছে এসে বলল,
—চাচা, কাজটা আজকেই করে দিতে পারি।
বৃদ্ধের চোখ চকচক করে উঠল।
—কীভাবে?
—একটু খরচ আছে।
—সরকারি ফি কত?
—একশ টাকা।
—আপনাকে কত দিতে হবে?
—দুই হাজার।
বৃদ্ধ অবাক হয়ে বললেন,
—এত টাকা কেন?
যুবক একটু বিরক্ত হলো।
—চাচা, তাড়াতাড়ি চান না?
আমি আবার নতুন কিছু শিখলাম।
মরতে বের হয়ে এত কিছু শেখার ইচ্ছা আমার ছিল না। অথচ সকাল থেকে একটার পর একটা অভিজ্ঞতা জমছে। এত অভিজ্ঞতা নিয়ে মরে যেতে হবে—ভাবতেই একটু খারাপ লাগল। অভিজ্ঞতাগুলো পুরোপুরি অপচয়। যাই হোক, এবার যা শিখলাম তা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে ঘুষকে সরাসরি “ঘুষ” বলা সম্ভবত অসভ্যতা। এর অনেক ভদ্র নাম আছে—
চা-পানি।
মিষ্টির খরচ।
ফাইল নড়ানোর খরচ।
দেখার খরচ।
স্যারকে খুশি করার খরচ।
তাড়াতাড়ির খরচ।
নাম আলাদা। কাজ এক।
শুধু একটা জিনিসই নেই—
রসিদ।
অবশ্য রসিদ চাওয়াটাও ঠিক হবে না। কারণ রসিদ চাওয়া সম্ভবত দুর্নীতির চেয়েও বড় অপরাধ।
আমি বৃদ্ধকে রেখে চলে এলাম।
সামনে কয়েকজন যুবক ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত চাকরির পরীক্ষা দিয়ে বের হয়েছে।
একজন বলল,
—লিখিত ভালো হইছে। ভাইভাও ভালো দিছি।
অন্যজন জিজ্ঞেস করল,
—লোক আছে?
—নাই।
—তাহলে দোয়া কর।
আমি মনে মনে ভাবলাম, আমাদের চাকরির বাজারে তিনটা জিনিস খুব গুরুত্বপূর্ণ—
যোগ্যতা।
অভিজ্ঞতা।
এবং একজন মামা।
আপনার নিজের মামা হতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। ক্ষমতাধর এমন একজন হলেই চলবে, যার ফোনটা মানুষ রিসিভ করে।
প্রথম দুটো আপনার থাকলে ভালো। তৃতীয়টা থাকলে প্রথম দুটো মাঝে মাঝে ঐচ্ছিক হয়ে যায়।
অবশ্য মামা জোগাড় করতে না পারলেও ক্যারিয়ারের আরও কিছু রাস্তা খোলা আছে।
সরকারি দলের নাম নিয়ে নিয়মিত একটু বেশি চাটাচাটি করতে পারলে ক্যারিয়ার নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তা করতে হয় না। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা কিংবা রাজনৈতিক জ্ঞান—এসব থাকলে ভালো। না থাকলেও জীবন একেবারে থেমে যায় না। নিয়মিত প্রশংসা করতে করতে একসময় দেখবেন, মানুষ আপনাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভাবতে শুরু করেছে। ভাগ্য আরেকটু ভালো হলে রাজনৈতিক উপদেষ্টাও হয়ে যেতে পারেন। তখন অবশ্য রাজনীতি শেখার আর প্রয়োজন নেই। আপনি যা বলবেন, সেটাই রাজনৈতিক জ্ঞান।
আমি ছেলেটার পাশে দাঁড়িয়ে বললাম,
—হতাশ হবেন না। চাকরি হবে।
সে আমার দিকে তাকাল।
—আপনি কী করেন ভাই?
বললাম,
—আপাতত মরতে যাচ্ছি।
ছেলেটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—কোনো চাকরির খবর জানলে যাওয়ার আগে একটা ফোন দিয়েন ভাই।
আমি তার নম্বর নিয়ে নিলাম। নম্বরটা কেন নিলাম, জানি না। সম্ভবত আমাদের দেশে আশাবাদও একধরনের রোগ। চাকরি না পাওয়া ছেলেটা আশা করছে চাকরি পাবে। আর মরতে যাওয়া মানুষটা ভাবছে, পরে তাকে ফোন দেবে। দুজনের মধ্যে কে বেশি আশাবাদী, ঠিক বুঝতে পারলাম না।
হাঁটতে হাঁটতে একটা হাসপাতালের সামনে চলে এলাম।
গেটের কাছে যেতেই এক লোক দ্রুত এগিয়ে এল।
—রোগী আছে?
বললাম,
—না।
—টেস্ট করাবেন?
—না।
—ডাক্তার দেখাবেন?
—না।
লোকটা এবার বেশ হতাশ হয়ে বলল,
—তাহলে হাসপাতালে আসছেন কেন?
বললাম,
—হেঁটে যাচ্ছি।
সে বিরক্ত হয়ে আমার দিকে তাকাল।
মনে হলো, হাসপাতালের সামনে দিয়ে সুস্থ শরীরে হেঁটে গিয়ে আমি লোকটার মূল্যবান সময় নষ্ট করে ফেলেছি। দালালের সময় নষ্ট করাও সম্ভবত একধরনের অপরাধ।
হাসপাতালের গেটে বড় করে লেখা—
“রোগীর সেবাই আমাদের অঙ্গীকার।”
ঠিক তখন ভেতর থেকে একজন রোগীর স্বজনের চিৎকার শুনলাম—
—ভাই, একটা হুইলচেয়ার দেন! কেউ আছেন?
কেউ উত্তর দিল না।
আমি আবার সাইনবোর্ডটার দিকে তাকালাম।
বুঝলাম, অঙ্গীকার ঠিকই আছে। অঙ্গীকারটা দেয়ালে ঝুলছে। হুইলচেয়ারটা কোথায় আছে, সেটা জানা গেল না।
আমি দ্রুত সেখান থেকে সরে এলাম।
আজ এমনিতেই মরতে বের হয়েছি।
ভুল করে হাসপাতালে ঢুকে পড়লে মরার আগেই বেঁচে থাকার খরচ জোগাড় করতে হতে পারে।
একটু সামনে যেতেই বাজার।
এক লোক দোকানদারের সঙ্গে তর্ক করছেন।
—ভাই, গত সপ্তাহেও তেলের দাম এত ছিল, আজ এত বেশি কেন?
দোকানদার খুব শান্তভাবে বলল,
—আন্তর্জাতিক বাজার, ভাই।
লোকটা বললেন,
—আন্তর্জাতিক বাজারে তো দাম কমেছে।
দোকানদার এবার আরও শান্ত গলায় বলল,
—এইগুলা আগের বেশি দামে কেনা মাল।
আমি দাঁড়িয়ে গেলাম।
“আগের বেশি দামে কেনা মাল”—আমাদের দেশের এক বিস্ময়কর সম্পদ।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আজকের মাল আজই দামি হয়ে যায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে আজকের মাল হঠাৎ পুরোনো হয়ে যায়।
কখনো এক মাসের।
কখনো ছয় মাসের।
প্রয়োজন হলে সম্ভবত এক বছরেরও হতে পারে।
আমি মুগ্ধ হলাম।
আমাদের দোকানের পণ্য টাইম ট্রাভেল করতে পারে।
দাম বাড়ার খবর পেলে ভবিষ্যতে চলে যায়।
দাম কমার খবর পেলে অতীতে ফিরে আসে।
আইনস্টাইন বেঁচে থাকলে আপেক্ষিকতা বাদ দিয়ে বাংলাদেশের মুদি দোকানের পণ্য নিয়ে গবেষণা করতেন। টাইম ট্রাভেল প্রমাণ হাতের কাছেই পাওয়া যেত।
আরেকটু এগিয়ে একটা স্কুলের সামনে এলাম।
স্কুল ছুটি হয়েছে।
এক বাবা ছেলের হাত ধরে রাস্তা পার হচ্ছেন। সিগন্যাল তখন লাল। বাবা চারপাশে একবার তাকালেন। তারপর ছেলের হাত ধরে দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে গেলেন।
ছেলেটা অবাক হয়ে বলল,
—বাবা, লাল বাতিতে তো রাস্তা পার হওয়া নিষেধ।
বাবা হাঁটতে হাঁটতে বললেন,
—সব সময় বইয়ের নিয়ম মানলে বাংলাদেশে চলতে পারবি না, বাবা।
আমি দাঁড়িয়ে গেলাম।
লোকটা তার ছেলেকে জীবনের প্রথম ব্যবহারিক শিক্ষা দিয়ে দিলেন।
সকালে স্কুলে শিশুটি শিখেছে—
“আইন মেনে চলব।”
বিকেলে বাবার কাছে শিখল—
“সুযোগ বুঝে চলবি।”
দুটো শিক্ষাই গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু কোনটা পরীক্ষার খাতায় লিখতে হবে আর কোনটা বাস্তব জীবনে ব্যবহার করতে হবে—সেটা ধীরে ধীরে শিখে যাবে।তারপর একদিন ছেলেটা বড় হবে। নিজের সুবিধামতো নিয়ম ভাঙবে। সুযোগ পেলে অন্যায়ও করবে।
তখন আমরাই চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আফসোস করব—
“আজকালকার ছেলেপেলেদের কোনো নৈতিকতা নেই!”
অথচ নৈতিকতাটা তার কাছ থেকে ঠিক কবে কেড়ে নিয়েছিলাম, সেটা আর আমাদের মনে থাকবে না। সম্ভবত সেদিনই—যেদিন তার ছোট্ট হাতটা ধরে লাল বাতির মধ্যে রাস্তা পার হয়েছিলাম।
আমি আবার হাঁটতে শুরু করলাম।
রাস্তার পাশে একজন তরুণ দাঁড়িয়ে মোবাইলে ভিডিও করছে। একজন ক্যামেরার সামনে বেশ আবেগ নিয়ে বলছে—
—দেশের মানুষকে সচেতন হতে হবে। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধ করতে হবে। দেশটা আমাদের, পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও আমাদের।
ভিডিও শেষ হলো।
ছেলেটা মোবাইলটা নামাল। পানির বোতলে শেষ চুমুক দিয়ে খালি বোতলটা পাশের ড্রেনে ছুড়ে দিল।
আমি দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাম।
ছেলেটা আমাকে দেখে বলল,
—কী দেখেন ভাই?
বললাম,
—সচেতনতা।
সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। সম্ভবত বুঝতে পারল না।
ভালোই হয়েছে।
আমাদের দেশে সচেতনতা মূলত অন্যকে সচেতন করার কাজে ব্যবহৃত হয়। নিজের ওপর প্রয়োগ করার নিয়ম সম্ভবত এখনো চালু হয়নি।
আমি আর কিছু বললাম না।
সব কথা সবাই বুঝে ফেললে সমাজে শান্তি থাকে না।
হাঁটতে হাঁটতে বিকেল হয়ে গেল।
মরার জন্য একটা নিরিবিলি জায়গা দরকার ছিল। কিন্তু এই শহরে নিরিবিলি জায়গা পাওয়া কঠিন। জীবিত মানুষের থাকার জায়গাই যেখানে কম, সেখানে মৃত হওয়ার জায়গা পাওয়া আরও কঠিন।
শেষ পর্যন্ত একটা পার্কে ঢুকে পড়লাম। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা ফাঁকা বেঞ্চও পেলাম। ঢাকায় ফাঁকা বেঞ্চ পাওয়া আর নিরিবিলি জায়গা পাওয়া—দুটোই মোটামুটি ভাগ্যের ব্যাপার।
সূর্য ডুবছে।
পকেট থেকে মোবাইল বের করলাম। চার্জ ৩ শতাংশ।
ভাবলাম, মরার আগে ফেসবুকে কিছু লিখে যাই।
ফেসবুক খুলতেই প্রথম পোস্ট—
“আসুন, আমরা সবাই মিলে সোনার বাংলা গড়ে তুলি।”
পোস্টদাতাকে আমি চিনি।
কয়েক মাস আগে একটা কাজের জন্য তার কাছে গিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন,
—কাজ হয়ে যাবে। তবে বুঝেনই তো, একটু চা-পানির খরচ আছে।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,
—আপনি কত টাকার চা খান ?
তিনি আমার রসিকতা পছন্দ করেননি।
আজ তিনি সোনার বাংলা গড়ছেন।
আমি স্ক্রল করলাম।
পরের পোস্ট—
“যোগ্যরাই এগিয়ে যাক।”
এই ভদ্রলোক গত সপ্তাহেই নিজের ভাগনেকে চাকরি দেওয়ার জন্য তিনজনকে ফোন করেছিলেন। ভাগনে আবার অটোপাস। মজার ব্যাপার হলো, ঠিক পরের বছর অটোপাসের বিরুদ্ধে তিনিই রাজপথে সোচ্চার ছিলেন। স্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ফেলেছিলেন। সম্ভবত অটোপাসও আপেক্ষিক বিষয়। নিজের ভাগনে পেল সুযোগ, অন্যের ভাগনে পেলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
আমি আবার স্ক্রল করলাম।
পরের পোস্ট—
“ট্রাফিক আইন মেনে চলুন।”
পোস্টদাতার প্রোফাইল ছবিতে তিনি মোটরসাইকেলে বসে আছেন।
লোকটাকেও চিনি। মাস দুয়েক আগে উল্টো পথে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে তার তুমুল বাকবিতণ্ডার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ ঘুরেছিল।
আজ তিনি ট্রাফিক আইন শেখাচ্ছেন।
আমি আর স্ক্রল করলাম না।
ফেসবুক বন্ধ করে দিলাম। মনে হলো, আমরা সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে নীতিবান জাতিগুলোর একটি। বিশেষ করে ফেসবুকে।
সেখানে আমরা দুর্নীতিবিরোধী।
যোগ্যতার পক্ষে।
আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
দেশপ্রেমিক।
সমস্যা হয় শুধু ফেসবুক থেকে বের হওয়ার পর। বাস্তব জীবনে ঢোকার সময় কেন জানি নীতিগুলো লগআউট করে আসি।
আমি আকাশের দিকে তাকালাম। ছোটবেলায় কতবার গেয়েছি—
“আমার সোনার বাংলা...”
তখন সত্যিই ভাবতাম, দেশটা সোনার। বড় হয়ে বুঝলাম, ধারণাটা পুরোপুরি ভুল ছিল না। দেশ আসলেই সোনার। সোনা সত্যিই আছে।
শুধু সোনাটা কোথায় আছে, সাধারণ মানুষ জানে না।
কেউ ব্যাংকের টাকা নিয়ে উধাও হয়।
কেউ প্রকল্পের টাকা খায়।
কেউ রাস্তা বানায়—বৃষ্টি আসার আগেই রাস্তা চলে যায়।
কেউ একই কাজের বাজেট তিনবার বাড়ায়।
কেউ ঘুষ নেয়।
কেউ কমিশন নেয়।
কেউ সুযোগ নেয়।
আর যে কিছুই নিতে পারে না—
সে দেশ নিয়ে স্ট্যাটাস দেয়।
আমি হঠাৎ হেসে ফেললাম। মরতে এসেছি কেন আমি?
বিদ্যুৎ নেই বলে?
গ্যাস নেই বলে?
চাকরি নেই বলে?
ঘুষ আছে বলে?
ফুটপাত নেই বলে?
হাসপাতালে সেবা নেই বলে?
নাকি চারপাশের এসব অসংগতি দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেছি বলে? কিন্তু এগুলো তো আমি তৈরি করিনি। তাহলে শাস্তিটা আমি নিজেকে দেব কেন? পকেট থেকে চিরকুটটা বের করলাম। মাত্র এক লাইন—
“এই সমাজে আর বাঁচতে ইচ্ছা করছে না।”
কিছুক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে থেকে ছিঁড়ে ফেললাম।
মোবাইলে চার্জ ১ শতাংশ। নোটপ্যাড খুলে লিখলাম—
“আমি আজ আত্মহত্যা করতে বের হয়েছিলাম। পথে এসে দেখি, আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার আগেই বিবেক আত্মহত্যা করেছে।
লজ্জা আত্মহত্যা করেছে। নীতি আত্মহত্যা করেছে। দায়িত্ববোধও বহুদিন ধরে নিখোঁজ।
শুধু দুর্নীতি বেশ সুস্থ আছে।
নিয়মিত খাচ্ছে।
দিন দিন মোটা হচ্ছে।”
একটু থেমে শেষ লাইনটা লিখলাম—
“এতগুলো মৃত্যুর মধ্যে আমি মরে ভিড় বাড়ানোর কোনো মানে হয় না।”
ঠিক তখনই মোবাইলটা বন্ধ হয়ে গেল।
বেচারার জন্য একটু খারাপ লাগল।
ভাবলাম, কোনো নেতার সঙ্গে দেখা হলে মোবাইলটা তাকে দিয়ে দেব। শুধু অনুরোধ করব—বেচারাকে ঠিকমতো চার্জ দিয়েন। শুনেছি নেতাদের মোবাইলে নাকি সব সময় ১০০ শতাংশ চার্জ থাকে।
কী ভাগ্যবান মানুষ!
অবশ্য এই দেশে অনেক কিছুই সম্ভব।
মিথ্যা বলে দিব্যি ভালো থাকা যায়।
আবার সাধারণ মানুষ সেই মিথ্যাটাকে একটু খারাপ ভাষায় মিথ্যা বললে—তার জন্য আইন আছে।
মৃত মানুষকেও প্রয়োজনে জীবিত করা যায়। কেউ ট্রল করলে একদল প্রমাণ নিয়ে হাজির হবে—
“না না, ওই সময় উনি জীবিতই ছিলেন!”
আর কিছু জায়গায় কথা শেষ হওয়ারও দরকার নেই। কথার আগেই হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই দেশে বেঁচে থাকলে প্রতিদিনই নতুন কিছু শেখা যায়। এত শিক্ষার সুযোগ রেখে মরে যাওয়াটা ঠিক হবে না।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলাম।
মনে পড়ল, বাড়িওয়ালা গ্যাসের বিল চেয়েছেন। বিলটা দিতে হবে। গ্যাস থাকুক আর না থাকুক।
বিদ্যুতের বিলও দিতে হবে।
বিদ্যুৎ থাকুক আর না থাকুক।
ট্যাক্স দিতে হবে।
সেবা পাই আর না পাই।
কারণ আমি সাধারণ মানুষ। এই দেশে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সম্ভবত—
সবকিছু সহ্য করেও স্বাভাবিক থাকা।
হাঁটতে হাঁটতে আবার সেই চায়ের দোকানের সামনে এলাম। রহিম সাহেব বসে চা খাচ্ছেন। আমাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন,
—কী ভাই! মরলেন না?
—না।
—কেন?
একটু ভেবে বললাম,
—প্রতিযোগিতা বেশি। আমার আগেই বিবেক গেছে, লজ্জা গেছে, নীতি গেছে। লাইনে দাঁড়াতে ইচ্ছা করল না।
রহিম সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,
—ভালো করছেন। চা খাবেন?
—দেন।
দোকানদার জিজ্ঞেস করল,
—চিনি কম দিমু?
—না, একটু বেশি দেন।
—ক্যান?
আমি হাসলাম।
—সোনার বাংলা খুঁজতে বের হয়েছিলাম। সোনা পাইনি। অন্তত চা-টা মিষ্টি হোক।
রহিম সাহেব হাসলেন।
আমিও হাসলাম।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবলাম—
আমি মরব না।
আমি লিখব।
এই শহরের কথা।
এই দেশের কথা।
আমাদের কথা।
কারণ দেশটা শুধু চোর, ঘুষখোর কিংবা ক্ষমতাবানদের নয়।
দেশটা আমারও।
ছোটবেলায় যে সোনার বাংলার কথা শুনেছিলাম, সেই বাংলা এখনো আছে। মাটি আছে। মানুষ আছে। স্বপ্নও আছে। শুধু সোনাটা কোথায় গেল, সেটাই বুঝতে পারছি না। হয়তো কেউ চুরি করেছে।
হয়তো আমরা সবাই একটু একটু করে সরিয়েছি।
আর সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটা হলো—
চোরটা সব সময় অন্য কেউ নয়। মাঝে মাঝে আয়নার সামনেও তাকে দেখা যায়।
আমি চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলাম।
আজ আর মরতে যাব না।
কালও না।
তার বদলে একটা কাজ করব।
প্রতিদিন আয়নায় দাঁড়িয়ে অন্তত একজন চোরকে সৎ রাখার চেষ্টা করব।
নিজেকে।
তারপরও একটা প্রশ্ন থেকে যায়—
আমরা কি সত্যিই সবাই চোর?
যদি উত্তরটা ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে হয়তো একদিন বলতে হবে—
সোনার বাংলা হারায়নি।
আমরাই তাকে একটু একটু করে চোরের বাংলা বানিয়েছি।
পুনশ্চ: এটি সামাজিক অসংগতি নিয়ে লেখা একটি গল্প, রাজনৈতিক কোনো বিবৃতি নয়। এর মধ্যেও যাঁরা রাজনীতি আবিষ্কার করবেন, তাঁদের অসাধারণ আবিষ্কারক্ষমতার প্রতি সমবেদনা রইল। রাষ্ট্র সবার, তাই রাষ্ট্রের অসংগতিগুলো নিয়েও কথা বলার অধিকার সবার।
আর যাঁরা সব বিষয়ে আমার চেয়ে একটু বেশি জানেন, তাঁদের প্রতি বিনীত অনুরোধ—আজকের জ্ঞানটুকু অন্তত কমেন্টবক্সে জমা না দিলেও চলবে।
বিশেষ করে গল্পে বলা অসংগতিগুলোর পক্ষে সাফাই গাইতে আসবেন না। কারণ যুক্তিতে না পারলে আমার মুখ কিন্তু, মাশাআল্লাহ, খুব একটা খারাপ না। হাঃ হাঃ!
তাই গালি নয়, গল্প হিসেবেই পড়ুন। মিল পেলে হাসুন, আর নিজের সঙ্গে মিলে গেলে—একটু ভাবুন।
©somewhere in net ltd.