নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

যুক্তিই হোক মুক্তির হাতিয়ার।

সুরথ সরকার

সমস্ত অবিশ্বাসকে পিছনে ফেলে এমন একটি সমাজ গড়বো,যে সমাজ সমস্ত অবিশ্বাসকে দূর করবে যুক্তি দিয়ে।

সুরথ সরকার › বিস্তারিত পোস্টঃ

আমার সাধের বাংলা ভাষা

০৫ ই মার্চ, ২০১৩ রাত ৯:১১

প্রত্যেক জাতির এমন একটি মাধ্যমের প্রয়োজন যার দ্বারা দেশটি তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সমৃদ্ধি নতুন প্রজন্ম তথাপি পুরো বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারে। ভাষা সর্বৎকৃষ্ট মাধ্যম যা একটি দেশের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, পারে সংরক্ষণ করতে। একটি দেশের নিজস্ব ভাষার মাধ্যমেই তার ঐতিহ্যগত ও সংস্কৃতিগত সমৃদ্ধি সম্ভব। মাতৃভাষায় কথা বলতে পারার অধিকার একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু আমরা, বাঙ্গালীরা অনেকদিন এই অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলাম। ১৯৫২ সালে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ছিল একটি নজিরবিহীন ঘটনা। পৃথিবীর আর কোন দেশে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে কখনও আন্দোলন হয়নি। বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলার ঐতিহ্য,সাহিত্য, সংস্কৃতি আজ হুমকির সম্মুখীন। নতুন প্রজন্মকে এই বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করার জন্য তাদেরকে বাংলা ভাষা সম্পর্কে, বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে হবে। জানতে হবে কত শহীদের রক্তের বিনিময়ে, কত ত্যাগের বিনিময়ে, কত আন্দোলনের মাধ্যমে আজ আমরা বাংলাকে আমাদের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে, মায়ের ভাষা হিসেবে পেয়েছি। নতুন প্রজন্ম যাতে পৃথিবীর সামনে মর্যাদার সাথে তাদের নিজেদের পরিচয় স্পষ্টরূপে তুলে ধরতে পারে এবং মাতৃভাষাকে যথার্থ মর্যাদায় উপস্থাপন করতে পারে সেই লক্ষ্যে আমাদের পরিচয় এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ সংরক্ষণ করার সময় এখনই।

বাংলা ভাষার উৎপত্তিঃ

ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা সবচেয়ে পূর্বপ্রান্তীয় ভাষা। হারানো আর্য ভাষা মূলত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশেরই সদস্য। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশ বলতে মূল ভাষাগোষ্ঠীকে বোঝায়। যেসব ভাষা ইউরোপের অনেকটা অংশ জুড়ে এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমে বিস্তৃতি লাভ করে, তাদের সম্মিলিতভাবে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবার বলে। এসব ভাষাভাষীগোষ্ঠী বর্তমানে সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষ এ পরিবারভুক্ত ভাষায় কথা বলে থাকে। বাংলা সহ আইরিশ, ইংরেজি, ফরাসি, গ্রিক, রাশিয়ান, ফার্সি ভাষাগুলো ইন্দো-আর্য ভাষার অন্তর্ভূক্ত, প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে যার অস্তিত্ব ছিল। এই ভাষা পরিবারের ভাষা শাখাগুলোর মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রায় তিন থেকে চার হাজার বছর আগে। মূলত ওই সময়ের মধ্যেই গ্রিক, অ্যান্টোলিন এবং ইন্দো ইরানীও প্রভৃতি ভাষা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, এসব ভাষা এসেছে পূর্ব ইউরোপ এবং পশ্চিম এশীয় অঞ্চলের ঘুরে বেড়ানো যাযাবর উপজাতির কাছ থেকে। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সাল থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের ভাষাভাষী লোকেরা ইউরোপ ছাড়িয়ে আটলান্টিকের উপকূল এবং ভূমধ্যসাগরের উত্তরকূলের দিকে আসতে শুরু করে। পারস্য ও ভারত জয়ের মাধ্যমে তারা ছড়িয়ে যায় এশিয়ার দূর এলাকাসমূহে। এই সময়ে সিন্ধুর অধিবাসীগণও পূর্বে ও পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দের মধ্যে দুইটি ভাষা শাখা ভারতীয় আর্য এবং ইন্দো-ইরানীয়, আলাদা হয়ে যায়। বাংলা পশ্চিমে ওড়িয়া, মাগাধি এবং মৈথিলি দ্বারা এবং পূর্বে অসমিয়া থেকে এসেছে। ৯০০-১০০০ খ্রিষ্টাব্দে মাগধির অপভ্রংশ এবং অবহট্ট থেকে একটি নতুন ইন্দো-আর্য ভাষা হিসেবে বাংলার উৎপত্তি হয়। বাংলার ওপর অন্যতম প্রধান প্রভাব ছিল সংস্কৃতের। কারণ খ্রিস্টাব্দের শুরু থেকে প্রায় সমগ্র উপমহাদেশের জন্য সাহিত্য এবং সংস্কৃতির বাহন ছিল এই সংস্কৃত ভাষা। বাংলা দুটি অনার্য ভাষার দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল, দ্রাবিড় এবং কোল। শুধু মাত্র শব্দের গঠনই নয়, বাক্যের গঠনেও এই ভাষাগুলোর অবদান সুস্পষ্ট। বাংলা ভাষার মধ্যকার অসংখ্য ধ্বন্যাত্মক শব্দ, সংযুক্ত শব্দ অনার্য ভাষার দ্বারা প্রভাবিত। চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলা এবং অসমিয়ার মধ্যে কিছু ভাষাগত পার্থক্য ছিল। বাংলা ভাষার বিবর্তনকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়।

প্রাচীন বাংলা(৯০০ : ১০০০-১৩৫০)-

প্রাচীন বাংলার উদাহরণ পাওয়া যায় চর্যাপদ এর মাধ্যমে। চর্যাগীতিকোষ বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন। এছাড়াও নাথগীতিকার উদ্ভব ঐ সময়েই হয়েছিল। কিন্তু নাথগীতিকা নামক কোনো পুস্তক পাওয়া যায় নি। চর্যাগীতিকোষ নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি আদিযুগের বাঙলা ভাষায় লেখা কয়েকজন কবির গীতবিতান। চর্যাপদের ভাষা মূলত বাংলা। খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দীর দিকে বা তার সামান্য পূর্বে, যখন মাগধী অপভ্রংশ সামান্য বিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষায় রূপলাভ করে, সেই অপরিণত ভাষায় সিদ্ধাচার্যগণ চর্যাপদগুলি রচনা করেন। এ ভাষার মূল বুনিয়াদ মাগধী অপভ্রংশ থেকে জাত প্রাচীনতম বাংলা ভাষার উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই এর বেশিরভাগ শব্দই মাগধী অপভ্রংশজাত। এবং একে সাধারণভাবে বাংলা ভাষা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু হিন্দি, ওড়িয়া, মৈথিল, অসমীয়া ভাষাও এর দাবীদার। ডক্টর সুকুমার সেন, অধ্যাপক প্রিয়রঞ্জন সেন, বিজয়চন্দ্র মজুমদার প্রমুখ বাঙালি বিদ্বানেরাও এ মত সত্য বলে অস্বীকার করেন নি। তবে চর্যাপদের ভাষাটি ছিল জটিল রহস্যময়। কিছুটা বোঝা গেলেও বাকিটুকু থেকে যেত অসচ্ছ। চর্যাপদের আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এজন্য চর্যাপদের ভাষাকে ‘সান্ধ্যভাষা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। চর্যাগীতিকোষের ভাষার সাথে পূর্ব মাগধী ভাষার যথেষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাচীন বাংলার সময়কালে অনেক বাঙালি সংস্কৃত ভাষার মাধ্যমে কাব্য রচনা করতো। বাংলার বিবর্তনের পরেও জয়দেব, উমপতিধারা, গোবর্ধন আচার্য এর মত বিখ্যাত কবিগণ সংস্কৃতের মাধ্যমে তাঁদের সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন। এর ফলে অনেক বিশুদ্ধ সংস্কৃত শব্দ বাংলা ভাষায় স্থান করে নেয়।

মধ্যযুগীয় বাংলা(১৩৫০-১৮০০)ঃ

চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন মধ্যযুগীয় বাংলার উদাহরণ। এই সময়ের অন্যান্য সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে রামায়ন-মহাভারতের অনুবাদ, বৈষ্ণবপদাবলী, শ্রীচৈতন্যের কাব্যিক জীবনগাথা, মঙ্গলকাব্য, আরাকান-রোসাঙ্গের দরবারে রচিত বর্ণনামূলক কবিতা ও পূর্ববঙ্গগীতিকা।

আধুনিক বাংলা(১৮০০-বর্তমানকাল পর্যন্ত)ঃ

ফারসি আরবি শব্দের একটি অন্তঃপ্রবাহএই সময়ের বাংলা ভাষার বিবর্তনে লক্ষ্য করা যায়। সংস্কৃত থেকে যেসকল শব্দ বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে সেসব শব্দকে তৎসম এবং তদ্ভবে ভাগ করা যায়। ইংরেজি এবং আরও অনেক ভাষার বিভিন্ন শব্দ এই সময়ের বিবর্তনে বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে। পৃথিবীর ২৩০ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা সর্বাধিক কথ্য ভাষাসমূহের মাঝে অন্যতম। চীনা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, স্প্যানিশ, আরবি এবং পর্তুগিজের পর বাংলা ভাষা পৃথিবীর সপ্তম ভাষা হিসেবে স্থান লাভ করেছে। বাংলা ভাষা বাংলাদেশের সরকারি এবং রাষ্ট্র ভাষা। ভারতের ২৩ টি সরকারি ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম। বাংলাদেশী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীর সম্মানে বর্তমানে সিয়েরা লিওনের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা। আসামের সহ-সরকারি ভাষা বাংলাকে করা হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত এবং শ্রীলঙ্কা এই তিনটিদেশের জাতীয় সঙ্গীত লিখেছেন বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এটি সম্ভবত একমাত্র ভাষা যাকে ভিত্তি করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে।

ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক পটভূমিঃ

বাংলাদেশ ভারতীয় উপমহাদেশের একটি অংশ ছিল। বিশ এবং ত্রিশের দশকে ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রিটিশদের কাছ থেকে অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করতে চেয়েছিল। অবশেষে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট এই উপমহাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করার আগেই এই সমগ্র উপমহাদেশ দুটি পৃথক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। পাকিস্তান অঙ্গরাজ্য এবং ভারতীও অঙ্গরাজ্য। ভারতের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী হয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং পাকিস্তানের ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তবে পাকিস্তানের সীমারেখার মধ্যে একটি বড় ধরনের ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। পাকিস্তানের পূর্ব এবং পশ্চিম দুটি অংশের মধ্যকার ব্যাবধান রয়ে যায় হাজার হাজার মাইল। এই দুই অংশের মধ্যে অবস্থান করতে থাকে ভারত। যদিও পশ্চিম এবং পূর্ব পাকিস্তানের উভয় অংশের মানুষ একই ধর্মাবলম্বীর ছিল, তবুও তাদের মধ্যে ছিল বিস্তর ফারাক। ধর্ম বাদে ভাষা, শিল্প,সাহিত্য, সংস্কৃতি, পোশাক, আচার সার্বিক ক্ষেত্রেই তাদের মধ্যে অমিল ছিল উল্লেখযোগ্য। দেশের শাসনব্যবস্থায় পশ্চিম পাকিস্তানিদের আধিপত্য ছিল লক্ষণীয়। তারা পূর্ব পাকিস্তানিদের মতামতকে অগ্রাহ্য করতো। পূর্ব পাকিস্তানিদের ভাষা ছিল বাংলা। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা ছিল উর্দু ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠী। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলাকে যোগাযোগের কোন মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে বা সুযোগ দিতে রাজি ছিল না। সকল স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত, সরকারি যাবতীয় কাজে বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে স্থান দেওয়া হল। এমনকি স্কুল, কলেজের শিক্ষাদানের ভাষা হিসেবেও বাংলাকে বিরত করা হল। আইন করা হল উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা, জনগনের ভাষা। পাকিস্তানের গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দিল, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষণার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগন উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার আবেদন করলে তা প্রত্যাখ্যান করে দেওয়া হয়। পূর্ববাংলার মানুষ তখন ক্ষোভে ফেটে পড়ে। শুরু হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রাম।

ভাষা আন্দোলনঃ

ভাষা আন্দোলন সংঘটনের মূল চালিকাশক্তি ছিল বাঙ্গালির দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ, যা বায়ান্নতে এসে বিস্ফোরিত হয়েছিল এবং ভাষা আন্দোলনকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে গিয়েছিল।

সেপ্টেম্বর ১৫, ১৯৪৭-

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডক্টর আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে তমুদ্দুন মজলিশ গঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে এর সভাসমূহ অনুষ্ঠিত হত। পরবর্তীতে এ সমার্থকেরা ডঃ আবুল কাশেমকে আবুল হাসিমের সঙ্গে নির্বাচিত সভাপতি করে খিলাফাহ রাব্বানী নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে।

নভেম্বর, ১৯৪৭-

পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রীর আহ্বানে করাচীতে আয়োজিত এক শিক্ষা সম্মেলনে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি হিসেবে ফজলুর রহমান যোগদান করেন এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর প্রস্তাবনার বিরোধিতা করেন।

জানুয়ারি ৪, ১৯৪৮-

মুসলিমলীগের ভিন্নমতাবলম্বী তরুনের উদ্যোগে এদিন পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগ গঠিত হয়। বাঙ্গালির প্রতি পীড়নমূলক কেন্দ্রীয় নীতিসমূহকে প্রতিরোধ করার জন্য দলটির জন্ম অবধারিত ছিল। পরবর্তীতে এই দলটি ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ফেব্রুয়ারি ২৬, ১৯৪৮-

প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও খাজা নাজিমুদ্দীন পার্লামেন্টে বাঙ্গালির ন্যায়সঙ্গত দাবি উপেক্ষা করে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে গ্রহণের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষণ প্রদান করে। এর মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠীর বাঙালি দমনপীড়নমূলক মনভাব নগ্নভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ে। পূর্ববাংলা এ ভাষণের বিপরীতে তীব্রক্ষোভ প্রকাশ করে।

মার্চ ২, ১৯৪৮-

ভীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব পার্লামেন্ট ও অপর পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবর্গের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। দুঃখজনকভাবে পূর্বপাকিস্তানের প্রতিনিধিত্বকারী খাজা নাজিমুদ্দিনও পশ্চিমাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সংশোধিত প্রস্তাব পেশ করেন এবং তা পুনরায় পশ্চিমাদের দ্বারা বর্জিত হয়।

মার্চ ১১, ১০৪৮-

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকশন কমিটি, বামপন্থী, ডানপন্থী এবং মধ্যমপন্থী দলসমূহ বাঙ্গালিদের মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন গড়ে তুলবার লক্ষ্যে একাত্ম হয়। আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ করে এবং বিপুল সংখ্যক ছাত্রকে গ্রেফতার করে।

মার্চ ১৯, ১৯৪৮-

কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা পরিদর্শনে আসেন। প্রাদেশিক শাসনকর্তা নাজিমুদ্দিন সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া বিক্ষুব্ধ আন্দোলন, গভর্নর জেনারেলের আগমন এই দুই নিয়ে বিচলিত হন। এদিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভীষণ প্রতিকূল হয়ে ওঠে। কায়েদে আজম জিন্নাহ ১৯ মার্চ ঢাকা সফর করলেন। খাজা নাজিমুদ্দিন গভর্নর জেনারেলের আগমনের ক্ষণে এমন গণআন্দোলনে বিব্রত হন এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নাজিমুদ্দিন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

মার্চ ২১, ১৯৪৮-

কায়েদে আজম এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রভাষা শুধুমাত্র উর্দু রাখার স্বপক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন। তরুন ছাত্ররা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করে এর বিপক্ষে। তারা একে জাতীয় অপমান হিসেবে ব্যাক্ত করে। পাকিস্তানে মোট জনগোষ্ঠীর ৫৪ শতাংশ ছিল বাংলাভাষী। শেখ মুজিবুর রহমান তখন তরুন ছাত্র। তিনি সমবেত ছাত্রদের সঙ্গে প্রতিবাদে সোচ্চার হন এবং অন্য আরও অনেক আন্দোলনকারীর সাথে গ্রেফতার হন। ক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলন কর্মীদের কার্য পরিচালনার অপরিহার্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে। জিন্নাহ আন্দোলনের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং একটি মাত্র রাষ্ট্রভাষা থাকার সুবিধা ব্যাক্ত করেন। কিন্তু ছাত্ররা তার ভাষ্যে সন্তুষ্ট হতে পারে না। জিন্নাহর সাথে আলোচনা কোন ফলাফল বয়ে আনতে না পারলেও শেখ মুজিবুর রহমান ও শাহ আজিজুর রহমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত পৃথক ছাত্র রাজনৈতিক দলের মতবিভেদ ম্লান হয়ে পড়ে। অপরদিকে জাতীয় নেতৃবৃন্দ বাঙ্গালির প্রাণের দাবিকে নাকচ করে দিতে অধিক তৎপর হয় এবং আন্দোলনকারীদের কারাগারে প্রেরণ করে।

সেপ্টেম্বর ১১, ১৯৪৮-

জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করে এবং ফলে উর্দুর রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্রোতে খানিক ভাটা পড়ে।

জানুয়ারি ২৬, ১৯৫২-

এদিন পাকিস্তান কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান সভায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার নীতি চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। পল্টন ময়দানে জনসমাবেশে নাজিমুদ্দিন একই ঘোষণা প্রদান করেন। এটি ছিল আন্দোলনের দ্বিতীয় দফার প্রথম অগ্নিস্ফুলিঙ্গ যা দিয়ে পরবর্তীতে আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে।

জানুয়ারি ২৮, ১৯৫২-

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবৃন্দ এক প্রতিবাদ সভায় প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী ও পশ্চিমপাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানায়।

জানুয়ারি ৩০, ১৯৫২-

আওয়ামীলীগের এক গোপন বৈঠকে, যাতে বাম মোর্চাভুক্ত কিছু দল উপস্থিত ছিল। ছাত্ররা এই বিষয়ে একমত হয় যে এত বড় আন্দোলন শুধুমাত্র ছাত্রদের একার পক্ষে চালিয়ে নিয়ে সফল হওয়া সম্ভব হবেনা। সিদ্ধান্ত হয়, পুরো জোট আওয়ামীলীগের ছত্রছায়ায় থাকবে এবং আন্দোলন পরিচালিত হবে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মাধ্যমে।

জানুয়ারি ৩১, ১৯৫২-

মওলানা ভাসানী সর্বদলীয় জোটের এক সম্মেলন আহ্বান করেন। সেখানে কাজী গোলাম মাহবুবকে মূল আহ্বায়ক এবং মওলানাকে সভাপতি ঘোষণা করে আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, খিলাফাতে রাব্বানী, ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা কমিটি প্রত্যেক দল হতে দুজন প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়।

ফেব্রুয়ারি ৪, ১৯৫২-

সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ভাষা দিবস ঘোষণাপূর্বক দিনটিকে বিক্ষোভদিবস হিসেবে নির্ধারিত করা হয়।

ফেব্রুয়ারি ১৯, ১৯৫২-

জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলা প্রাঙ্গণে ছাত্ররা সমবেত হতে থাকে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানায়।

ফেব্রুয়ারি ২০, ১৯৫২-

ঢাকা জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ২০শে ফেব্রুয়ারি থেকে পরবর্তী ত্রিশ দিনের জন্য ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে এবং সকল প্রকার মিটিং মিছিল নিষিদ্ধ করে।

ফেব্রুয়ারি ২১, ১৯৫২-

সকাল ১০টা নাগাদ ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জড় হতে থাকে। বেশিরভাগ ছাত্র ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে অবস্থান করে এবং সবাই সরোষে-রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, ১৪৪ ধারা মানি না, মানব না স্লোগান দিতে থাকে। ছাত্র নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ সিদ্ধান্ত নেন, বিপুল সংখ্যক ছাত্র একসাথে রাস্তায় না নেমে দশ জনের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে নামতে হবে। এতে করে বড় ধরনের সহিংসতার শিকার না হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা যাবে। কলা অনুষদের গেট খুলে দিয়ে দশজনের প্রথম দলটি রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে এবং হাবিবুর রহমান শেলির নেতৃত্বে স্বেচ্ছায় গেফতার হয়। একে একে আব্দুস সামাদ আজাদের নেতৃত্বে দ্বিতীয় দল, আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে তৃতীয় দল এবং জাফর কাদিরুল্লাহ খানের নেতৃত্বে চতুর্থ দলটি রাস্তায় নামে এবং গ্রেফতার হয়। এরপর ছাত্রীদের সংগঠিত দলটি নেমে আসে। তাদেরও গ্রেফতার করা হয়। ছাত্ররা বানের জলের মত রাজপথে থই থই করতে থাকে। অধিকার আদায়ের স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চারিদিক। এমন সময় উত্তেজিত ছাত্রদল ও পুলিশের মাঝে ইটপাটকেল বিনিময় শুরু হয়ে যায়। পুলিশ ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে মুহুর্মুহু টিয়ারশেল ছুড়তে থাকে। বিকেল ৩টায় পূর্ববঙ্গের বাজেট অধিবেশন সঙ্ঘটিত হবার কথা থাকে। ছাত্ররা মন্ত্রীর পথ রোধ করবার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা কলা অনুষদ এবং ঢাকা মেডিকেলের মধ্যবর্তী দেয়ালটি ভেঙ্গে ফেলে যাতে যথাসম্ভব বৃহৎ জায়গা জুড়ে পুলিশী আক্রমণ রুখে দেওয়া যায়। মন্ত্রীর গমনপথ প্রতিরোধশুন্য রাখার জন্য আরও স্বতন্ত্র পুলিশ আরোপ করা হয়। কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ দিকে মোড় নেয়। একদল পুলিশ রাস্তার প্রান্তে আত্মগোপন করে থাকে এবং ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোরেশীর পূর্বনির্দেশ অনুসারে ধাবমান মিছিলের একাংশ আওতার মাঝে আসা মাত্রই এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে। টিয়ারশেল, বেধড়ক লাঠিচার্জ এবং লাগাতার গোলাগুলি চালাতে থাকে। পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক জব্বার, সফিউর সহ আরও অনেকে শহীদ হন এবং বহু আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রী জখম হয়। রাষ্ট্রপক্ষ এভাবে ত্রাশের রাজত্ব কায়েম করে কিন্তু ভাষা আন্দোলনকে রোধ করতে ব্যর্থ হয়। গ্রেফতারকৃতদের সংখ্যা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সংকুলানকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। গ্রেফতারকৃত অবশিষ্ট ছাত্রদের ভাওয়াল জঙ্গলে অন্তরীন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের প্রেস ব্রিফিং এ তিনজন নিহত ও দুজন আহত হবার সংবাদ প্রকাশিত হয়। পুলিশ ওপরের নির্দেশে প্রচুর লাশ লুকিয়ে ফেলে। তাই শুধু মাত্র আবুল বরকত ছাড়া শহীদদের আর কাউকে সমাহিত করা যায়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন আইন পরিষদে কোন প্রকার গুলিবর্ষণ বা হত্যার কথা অস্বীকার করে। কিন্তু এই গণহত্যার সংবাদ বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। বিকাল ৩টায় ধর্মঘট পূর্ণমাত্রায় আরম্ভ হয়। সমস্ত দপ্তর, কোর্ট, কারখানা, দোকান, এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত রেডিও ও রেলস্টেশন পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তায় জনসমুদ্র নেমে আসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরে কারফিউ জারি করা হয় এবং সেনাবাহিনী চারপাশ ছেয়ে ফেলে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২২শে ফেব্রুয়ারি পূর্ণদিবস ধর্মঘট ঘোষণা করে এবং শহীদদের জন্য গায়েবানা জানাজা আদায় করে।

ফেব্রুয়ারি ২২, ১৯৫২-

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজারো শিক্ষার্থী গুলিবর্ষণে নিহতদের জন্য প্রার্থনায় অংশ নেয়। প্রার্থনার পর মিছিলে নামলে পুনরায় পুলিশের গুলি বর্ষিত হয়। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের একাংশ একটি আধাসরকারি সংবাদপত্রের দপ্তরে আগুন জ্বেলে দেয়। পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। চারজন সাথে সাথে একই স্থানে শহীদ হন। রাষ্ট্রপক্ষ রাজপথে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে। অবশেষে ছাত্র আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে নেয় রাষ্ট্র। প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্তটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

ফেব্রুয়ারি ২৩, ১৯৫২-

সরকারের দমননীতির আশ্রয়ের ফলে দাবি মেনে নেওয়ার পরও স্বতঃস্ফূর্ত সাধারন ধর্মঘট পালিত হয়। ফেব্রুয়ারির ২৫ তারিখ পুনরায় ধর্মঘট ঘোষণা করে। বরকত যেখানে শহীদ হন সেই স্থানে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার স্বরূপ সেখানে একরাতের মাঝে শহীদ মিনার গড়ে তোলে। আজও যা আমাদের জাতীয় চেতনা ও প্রেরণার প্রতীক হয়ে আছে।

ফেব্রুয়ারি ২৪, ১৯৫২-

রাষ্ট্র পুলিশ এবং সেনাবাহিনীকে শহরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবার জন্যে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়। এ সময়ের মধ্যে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত প্রায় প্রত্যেক ছাত্র এবং রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।

ভাষা আন্দোলনের ফলাফলঃ

১৯৫৪ সালের ৭ই মে, পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান করে এবং ১৯৫৬ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি, গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানকারী প্রথম সংশোধনীটি অনুমোদিত হয়। ২৩শে মার্চ সংশোধনীটি কার্যকর হয়। ১৯৪৮ হতে ৫২ সাল অবধি প্রবাহিত প্রতিটি ঘটনাস্রোত পর্য়বেক্ষণে দেখা যায় কিভাবে পূর্বেকার প্রতিটি আন্দোলন একটু একটু করে একটি চূড়ান্ত আন্দালনের রূপরেখা প্রণয়ন করেছে। মূলতঃ ৪৮-এ রাষ্ট্রভাষার উর্দুকরণের বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্র এবং প্রগতিশীল সংগঠনসমূহের সুসংগঠিত প্রতিরোধ, ৫২-র ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের ভিত্তিভূমি গড়ে দেয়। নির্ভীক ভাষাসৈনিকগণ যে ইতিহাস তৈরি করে গেছেন তা বাঙালির মাথা নত না করার দৃষ্টান্ত হয়ে আজীবন স্মরিত হবে, প্রেরণা যোগাবে। আন্দোলনে যাঁরা স্বীয় জীবন উৎসর্গ গেছেন অমর শহীদ হিসেবে তাঁরা চিরবরেণ্য হয়ে রবেন।

ভাষা সৈনিকঃ

পৃথিবীতে বাংলাই একমাত্র ভাষা যাকে সমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে সে ভাষাভাষী মানুষ ভালবেসে রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল। এখানে আমরা এমন কিছু মানুষের কথা বলব যারা জীবন বাজি রেখে ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, প্রাণ দিয়েছিলেন।

রফিক উদ্দিন আহমেদঃ

রফিক ছিলেন আবদুল লতিফ মিঞা এবং রাফিযা খাতুনের জ্যেষ্ঠ সন্তান, জন্মেছিলেন মানিকগঞ্জ জেলার পারিল গ্রামে। ১৯৫২ সালে তাঁর পরিবার মুদ্রণ ব্যবসায় জড়িত ছিল এবং তিনি ছিলেন পারিবারিক ব্যবসাটির অন্যতম কর্ণধার। চার ভাই- রশীদ, খালেক, যিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সালাম এবং খোরশেদ আলমের চেয়ে তিনি ছিলেন ভিন্নতর। ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনচেতা, পরোপকারী ব্যক্তিত্ব এবং সঙ্গীত ও থিয়েটারের জন্যে গভীর অনুরাগী। কিছু গ্রামীন মঞ্চ নাটকে তিনি অভিনয়ও করেছিলেন। ১৯৫২ মালে পারিবারিক সিদ্ধান্তে সায় জানিয়ে বিয়ের পিড়িতে বসতে সম্মত হন এবং তারই ধারাবাহিকতায় বিয়ের বাজার করার জন্যে ভাতিজাকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। ২১শে ফেব্রুয়ারি কেনাকাটা শেষে তাঁদের বাড়ির গাড়ি ধরবার কথা। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রদের উত্তাল আন্দোলন দেখে তিনি ভাতিজার হাতে বিয়ের সদাই তুলে দিয়ে মিছিলের ভিড়ে মিশে যান। পাকিস্তানি পুলিশ মেডিকেলের মর্গ থেকে যে সকল শহীদের লাশ সরিয়ে ফেলেছিল তাঁদের মাঝে তিনিও ছিলেন। পরদিন সকালে আজিমপুর গোরস্থানে সহস্র মানুষ তাঁর স্মৃতির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে।

আবুল বরকতঃ

আবুল বরকত ১৯২৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বাবলা গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম শামসুদ্দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্স বিভাগের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। থাকতেন ঢাকার পুরানা পল্টনের বিষ্ণু প্রিয়া ভবনে। ২১শে ফেব্রুয়ারি মিছিলে পুলিশের গুলিতে অকুস্থলে শহীদ হন।

আবদুস সালামঃ

আবদুস সালাম ১৯৫২ সালে শিল্প অধিদপ্তরের কর্মচারি ছিলেন। গুলিবিদ্ধ সালামকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। প্রায় দুমাস পর, ১৭ই এপ্রিল, তিনি মৃত্যবরণ করেন।

আবদুল জব্বারঃ

৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রথম যে সূর্যসন্তানের রক্তে রাজপথ লাল হয়ে ওঠে তিনি আবদুল জব্বার। হাসান আলি এবং সাফাতুন নেসার জ্যেষ্ঠ পুত্র জব্বার ১৯২৭ সালের ২৬শে ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানার পিচুয়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। ধোপাঘাট কৃষিবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেনীতে পড়াকালীন বাবার সাথে রাগ করে বাড়ি ছাড়েন। এক মাস পর ফিরে আসেন। তারুণ্যে রেঙ্গুন যাত্রা করেন। যে জাহাজে চড়ে তিনি রেঙ্গুনের পথ পাড়ি দিয়েছিলেন সে জাহাজের ক্যাপ্টেন তাঁকে জাহাজে কাজ জুটিয়ে দেন। ভগ্নস্বাস্থের কারণে নাবিকের চাকরি বেশিদিন করতে পারেন নি। দেশে ফিরে আসেন। প্রতিবেশী ছেলেদের নিয়ে গ্রাম প্রতিরক্ষাদল গঠন করেন। ১৯৪৯ সালে বিয়ে করে স্ত্রী আমিনা খাতুনকে নিয়ে থিতু হন। ১৯৫২ সালে অসুস্থ শাশুড়ি মা-কে সুচিকিৎসার জন্যে ঢাকা নিয়ে আসেন। একই গাঁয়ের ছেলে ডা. সিরাজুল ইসলামের সহায়তায় তাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করান। ঢাকা তখন ফুটন্ত আগ্নেয়গিরি। সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, ধর্মঘট নিত্যদিনের ঘটনা। মেডিকেলের পাশেই ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক কার্যালয়। ২১শে ফেব্রুয়ারি, মিছিলের সময় জব্বার রাস্তায় নেমেছিলেন শাশুড়ির জন্যে কিছু ফলমূল কিনবেন বলে। হঠাৎ দেখতে পান ফেনিয়ে ওঠা জনতার সাগর, শুনতে পান আকাশচেরা শ্লোগান- রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। সব কিছু ভুলে মুহূর্তে মিছিলের ভিড়ে যোগ দেন তিনি। প্ল্যাকার্ড হাতে সামনের কাতারে চলে আসেন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে নেবার পথে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ভাষাসৈনিক আবদুল জব্বার।

শফিউর রহমানঃ

শফিউর রহমানের জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কোননগর গ্রাম। বাবা মৌলভী মাহবুবুর রহমান। ভাষা আন্দোলন চলাকালীন তিনি ছিলেন আইনের ছাত্র এবং একইসাথে হাইকোর্টের কর্মচারি। এক কন্যাসন্তান ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীসহ মুখ চেয়ে থাকা বিশাল পরিবারটির মায়া ভুলে ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার নবাবপুর রোডের রথখোলায় খোশমহল রেস্তোরাঁর কাছে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তরুণ এ ভাষাসৈনিক ।

অহি উল্লাহঃ

ভাষাশহীদ অহি উল্লাহর পিতার নাম হাবিবুর রহমান। মেডিকেলের মর্গ থেকে লুকিয়ে ফেলা লাশগুলোর একজন অহি উল্লাহ।

আবদুল আউয়ালঃ

আবদুল আউয়াল ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপক অন্তেষ্টিক্রিয়ার মিছিলে লেলিয়ে দেয়া পুলিশের ট্রাকের নিচে পিষ্ট হন আবদুল আউয়াল।

গাজিউল হকঃ

গাজিউল হক ভাষাসৈনিক এবং সুপরিচিত ছাত্রনেতা গাজিউল হক ১৯২৯ সালে তৎকালীন নোয়াখালী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। আমতলায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী সমাবশেটির অন্যতম নেতা ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯৫১ সালে ইতিহাসে স্নাতক এবং ১৯৫২ সালে স্নাতকোত্তর সনদ লাভ করেন। ছাত্র-রাজনীতির সুত্র ধরে ১৯৫৩ সালের ১৪ই এপ্রিল তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং স্নাতকোত্তর সনদ কেড়ে নেয়া হয়। পরে সনদ ফিরিযে দেয়া হয়। ১৯৫৬ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এল.এল.বি. সনদ লাভ করেন। দীর্ঘদিন রোগ ভোগের পর ২০০৯ সালে স্কয়ার হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন এ সংগ্রামী নেতা।

মাওলানা আমেদুর রহমান আজমীঃ

মাওলানা আমেদুর রহমান আজমী বায়ান্নর অন্যতম ভাষাসৈনিক এবং পরবর্তিকালে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা আজমীর জন্মস্থান চট্টগ্রামের মিরসরাই থানার ইছাখালি গ্রাম। ১৯৫২ সালে হাটহাজারি আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াকালীন সময়ে ঢাকা আসেন এবং ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ২১শে ফেব্রুয়ারি মিছিলে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে সমাবেশ আহ্বান করেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, পরে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের দাপ্তরিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ব্যবস্থাপনা পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন। ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল চলাকালীন পলাতক হন। আইউব খান তাঁকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করার কিছুকাল পরই তিনি গ্রেপ্তার হন। পরবর্তিকালে এগার দফা আন্দোলন চলাকালীন মুক্তি পান। ২০১১ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি এ মহান বিপ্লবী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন

মোহাম্মদ সালাউদ্দিনঃ

ব্যাংক কর্মচারি মোহাম্মদ সালাউদ্দিন মিছিলে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন। কিছুকাল পর মৃত্যু বরণ করেন।

এক পরিচয়হীন শিশুঃ

এক পরিচয়হীন শিশু ভাষাশহীদদের আন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মিছিলে লেলিয়ে দেয়া ট্রাকের চাকায় আবদুল আউয়ালের মতই পিষ্ট হন এক পরিচয়হীন শিশু। মিছিলের পুরোভাগে দেশমায়ের এ পথশিশুর হাস্যোজ্জ্বল উদ্যত-উদ্ধত ফটোগ্রাফটি ভাষা আন্দোলনের অমর মৃহূর্তগুলোর একটি হয়ে আছে।

শহীদ মিনারঃ

শহীদ মিনার বাংলাদেশের একটি জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ। বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন একটি মর্যাদাপূর্ণ অধ্যায়। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি আবেগ এবং সম্মানের প্রতীক হিসেবে শহীদ মিনার দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি অগণিত রাজনৈতিক নেতা,ছাত্র এবং সাধারণ জনগণ উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন পাকিস্তানি মিলিটারী বাহিনী প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে, ককটেল নিক্ষেপ করে এবং গণহত্যা সঙ্ঘটিত হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারির পরপরই যেখানে প্রথম ভাষা সৈনিক বরকত নিহত হন সেই স্থানে তাৎক্ষণিকভাবে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগতা এবং ডিজাইনার ডক্টর সৈয়দ হায়দারের ভাষ্যমতে, প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রদের ছিল। ২১শে ফেব্রুয়ারির প্রথম আক্রমণ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অভ্যন্তরে ঘটেছিল। সুতরাং সিদ্ধান্ত নেওয়া হল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিকট এটি নির্মাণ করা হবে। ২২শে ফেব্রুয়ারির মধ্যরাতে পরিকল্পনা করা হয় এবং পর দিন নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। এই মিনারটি নির্মাণে সার্বিক সহযোগিতা করেন পিয়ারু সরদার, তিনি ছিলেন পুরান ঢাকার পাঁচ সরদারের অন্যতম। যখন কিছু ছাত্র ২২শে ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে পিয়ারু সরদারের কাছে মিনার তৈরির কিছু কাঁচামালের প্রয়োজনে সাহায্য চায়, তখন তিনি তাদেরকে সাহায্য করেন। যদিও সেসময় কারফিউ ছিল, ২৩শে ফেব্রুয়ারি বিকেলে ছাত্ররা শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু করে। তারা সারারাত অবধি কাজ করে ভোর হওয়ার আগেই নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে। মিনারের সাথে একটি কাগজ লাগিয়ে দেওয়া হয় এবং তাতে হাতে লেখা থাকে, শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। শহীদ মিনারটি ভাষা সৈনিক শফিউর রহমানের বাবা উদ্বোধন করেন। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এটি পাকিস্তানি মিলিটারিরা ধ্বংস করে ফেলে। দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদ মিনারের ছোট সংস্করন নির্মাণ করা হয়। প্রথম শহীদ মিনার ধ্বংসের দুই বছর পর অর্থাৎ ১৯৫৪ সালে আবারও ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে পুনরায় একটি শহীদ মিনার নির্মিত হয়। এটি নাট্যগুরু নুরুল মমেন উদ্বোধন করেন। শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ পাকিস্তান শাসনামলে কখনই সমাপ্ত হয়নি। বাংলাদেশের জন্মের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানি মিলিটারিদের দ্বারা এটি বেশ কয়েকবার ধ্বংস হয়। সর্বপ্রথম ১৯৫৬ সালে সরকারিভাবে একটি শহীদ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিল্পী হামিদুর রহমান এবং ভাস্কর নভেরা আহমেদ একটি মডেল দাড় করান। ১৯৫৭ সালের নভেম্বর মাসে এই মডেল অনুযায়ী নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল, কিন্তু মার্শাল আইন জারি হওয়ার কারণে মিনারের নির্মাণ কাজ থামিয়ে দিতে বাধ্য হয়। জনগণের দাবীতে সরকার ১৯৬৩ সালে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে, কিন্তু আসল মডেলের সাথে এই শহীদ মিনারের তেমন কোন মিল থাকলো না। ভাষা শহীদ আবুল বরকতের মা ১৯৬৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি এই মিনারটির উদ্বোধন করেন। কিন্তু আবারও ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ অপারেশন সার্চলাইটে পাকিস্তানিদের প্রথম লক্ষ্য থাকে এই শহীদ মিনার। তারা এটি ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয় এবং সেখানে মসজিদ লিখে একটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয়, যদিও মসজিদটির নির্মাণ কাজ কখনও হাতে নেওয়া হয়নি। অবশেষে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে শহীদ মিনার নির্মাণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু এই সময় মূল নকশার সংক্ষেপিত একটি মডেল অনুযায়ী খুব দ্রুত এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে ফেলা হয়। ১৯৭৬ সালে আবারও একটি নতুন নকশা অনুমদিত হয়, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। পরবর্তীকালে ১৯৮৩ সালে শহীদ মিনারের জন্য নির্ধারিত স্থান প্রশস্ত করা হয় এবং বর্তমানের এই স্থানটির অংশটুকুই বরাদ্দ করা হয় শহীদ মিনারের জন্য। নতুন নকশাটিতে শহীদ মিনারের জন্য একটি ভিত্তি সংযোজন করা হয় যার আয়তন ১৫০০ বর্গফুট যা ভাষা আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে। ৪টি ছোট এবং একটি বড় স্তম্ভ প্রতীকায়িত করে একজন মা তাঁর ৪ জন যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সন্তানকে নিয়ে মিনারের বেদির ওপর দাঁড়িয়ে আছেন এবং পেছনে লাল সূর্য জ্বলজ্বল করছে। স্তম্ভগুলো মার্বেল পাথরের তৈরি। মিনারের সিঁড়ি এবং চারিদিকের বেড়াকে আলাদা সৌন্দর্য দেওয়ার জন্য উজ্জ্বল সাদা রঙ দেওয়া হয়েছে। উভয় দিকের লোহার বেড়া কাল্পনিক কবির কবিতা দ্বারা লোহার অক্ষর দিয়ে অঙ্কন করা। এখন পর্যন্ত শহীদ মিনার তাঁর স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের অসমতা নিয়ে বাংলাদেশের ভাষাগত এবং স্বাদেশিক সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রভাত ফেরিঃ

একুশে ফেব্রুয়ারি একই সাথে শোকের এবং গৌরবের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমাদের হারাবার বেদনা এবঙ অর্জনের গৌরব একুশের এক সুতোয় গাঁথা। সালাম বরকত রফিক জব্বার আর নাম না জানা কত বীরসন্তানকে হারিয়েছি। বিনিময়ে পেয়েছি তেজস্বিতার দীক্ষা, মাথা না নোয়াবার চিরায়ত শিক্ষা। রাত বারোটা এক মিনিটে রাষ্ট্রপতি শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পন করেন। এরপর একে একে আসেন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী পরিষদের অপরাপর সদস্যবৃন্দ, বিদেশী কূটনীতিকবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিনিধিগণ প্রমুখ। রাত বারোটার মাঝে পুরো শহীদ মিনার প্রাঙ্গন ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়। প্রতিবেশ ব্যানার ফেস্টুনে পূর্ণ হয়ে ওঠে, প্রাঙ্গন-মেঝেতে কি রাস্তায় শোভা পেতে থাকে দারুণ আল্পনা। তাতে ফুল পাখির নকশা ছাড়াও থাকে সুদৃশ্য বাঙলা বর্ণমালা। দিনভর সর্বস্তরের মানুষ শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে যান। শাদা কালো পরিধেয় গায়ে জড়িয়ে খালি পায়ে ফুল হাতে প্রভাতফেরীতে যোগ দেন সবাই। মুখে উচ্চারিত হতে থাকে সে শোকাবহ সঙ্গীত, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি। আজিমপুর গোরস্থানে ভাষাশহীদদের কবর জিয়ারত করতে যান অনেকে। বাঙলাদেশের মাটির সবটা জুড়ে কোথাও না কোথাও শহীদ মিনার গড়া হয়েছে। সারা দেশের মানুষ, যে যেখানে থাকুক তার কাছের মিনারটিতে এসে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি ভালবাসা জানিয়ে যায়। বাঙলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিসহ আদিবাসী পরিচালিত সাঙস্কৃতিক সঙগঠনগুলোতে কবিতা, গান কিঙবা ছোটদের রচনা বা চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বাঙলা একাডেমি প্রাঙ্গনস্থ অমর একুশে গ্রন্থমেলা লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠানসমূহ পরিচালিত হয়, পত্রিকাসমূহ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। একুশে ফেব্রুয়ারি স্বকীয় সাঙস্কৃতিক উৎকর্ষের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরায় যা একাত্তরের স্বাধীন রাষ্ট্র গড়বার পেছনে একটি বড় প্রেরণা হয়ে ছিল। বাঙলাদেশের বাহিরে কলকাতা, আসাম প্রভৃতি অঞ্চল যেখানে বাঙলা প্রধান ভাষা, দিনটি তাদের জন্যেও বিশেষ বার্তাবহ, গর্ব এবঙ উদযাপনের বিষয়বস্তু। ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার পর সারা বিশ্বে দিনটি দারুণ উৎসাহে উদযাপিত হয়।

ভাষা আন্দোলনের গানঃ

ভাষা আন্দোলনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে বিশিষ্ট কলামিস্ট, লেখক জনাব আব্দুল গাফফার চৌধুরী আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি গানটি রচনা করেন। সারা ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে গানটির মায়াবী করুণ সুর দেশের প্রতিটি কোণ হতে ভেসে আসে, হৃদয়ের তন্ত্রীতে আলোড়ন তোলে। এতে প্রথম সুর বসিয়েছিলেন আব্দুল লতিফ। পরবর্তীতে আলতাফ মাহমুদ এতে দ্বিতীয়বারের মত সুর বসান। বিবিসি বাংলার শ্রোতামণ্ডলীর নির্বাচনে এটি শ্রেষ্ঠ বাংলা গানসমূহের মাঝে তৃতীয়। গানটি নিম্নরূপ-আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি,আমি কি ভুলিতে পারি।ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায় ফেব্রুয়ারি,আমি কি ভুলিতে পারি।আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি,আমি কি ভুলিতে পারি।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসঃ

ইউনেস্কো দ্বিভাষিক এবং বহুভাষিক শিক্ষামাধ্যমে মাতৃভাষার প্রচলন ঘটিয়েছে যা শিক্ষার মান বাড়াতে জরুরী ভূমিকা রাখছে। কর্মপন্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রতিষ্ঠানটি ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছে। ঘোষণাটি ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে প্যারিসের ইউনেস্কো সদরদপ্তরে প্রস্তাবাকারে উত্থাপিত হয় এবং সর্বসম্মতিক্রমে গৃহিত হয়। প্রস্তাবে ইউনেস্কোর ভাষ্যটি ছিল, ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের নিদর্শনস্বরূপ ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হবে।

ভাষা আন্দোলন যাদুঘরঃ

১৯৮৯ সালের ২রা জুন ভাষা আন্দোলনের একজন গবেষক, এম এ বর্ণিক ভাষা আন্দোলন যাদুঘরের প্রবর্তন করেন। ঢাকার ধানমণ্ডির ১০নং এ ভাষা সৈনিক কাজী মাহবুব আলম সড়কে এটি অবস্থিত। এটি ভাষা সৈনিক কাজী মাহবুব আলম মেমোরিয়াল ট্রাস্ট নামক একটি ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি এবং একটি কার্যনির্বাহী কমিটি দ্বারা পরিচালিত। যাদুঘরটি মোট ৬টি বিভাগে সুসজ্জিত- প্রদর্শনী, গবেষণাকেন্দ্র, সহায়িকা, কম্পিউটার এবং চলচ্চিত্র, প্রকাশনা ও লাইব্রেরি এবং প্রশাসনিক। এই পর্যন্ত যাদুঘরটি ৪টি প্রকাশনী থেকে মোট ১০টি বই বের করেছে। যাদুঘরের ২টি প্রদর্শনী কক্ষে ২৮টি ফটোগ্রাফ, ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত সকল তথ্য, আন্দোলনের সময়ের সকল বই, জার্নাল এবং সংবাদপত্রের কাটিং সহ সকল তথ্য প্রদর্শিত করা রয়েছে। যাদুঘরে শুধু যে ফটোগ্রাফই প্রদর্শিত রয়েছে তাই নয়, এর সাথে কাপড় ও কাগজ দিয়ে রফিক, জব্বার, শফিউর, বরকত, সালাম এবং ওহিউল্লাহর প্রতিকৃতিও রাখা আছে। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র নেতা এবং বুদ্ধিজীবীদের জীবনী এবং প্রতিকৃতি রয়েছে এই যাদুঘরে। প্রফেসর আবুল কাশেম তমুদ্দুন মজলিশের একটি কপিও এখানে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। বইটি কিছু বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা লিখিত যারা আন্দোলনটিকে সংহত করেছিলেন। গবেষকদলটি যাদুঘরের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সকল ইতিহাস এবং তথ্য এঁদের দ্বারা সংরক্ষন করা আছে এখানে যার মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন নিয়ে যেকোনো গবেষককে দেশ এবং দেশের বাইরেও তাঁরা সাহায্য করতে পারেন। যাদুঘরের সদস্য সচিব মাহবুব আলম বলেন, তাঁদের লক্ষ্য শুধুমাত্র ভাষা আন্দোলনের সময়ের আর্কাইভ সংরক্ষণই না, এর সাথে মহান ভাষা আন্দোলনের ওপর গবেষণা এবং বই প্রকাশ করাও তাঁদের অন্যতম উদ্দেশ্য। গবেষণা কেন্দ্র ইতিমধ্যে একটি বিশাল গ্রন্থাগার, আর্কাইভ, প্রামান্যচিত্র, ডায়েরি এবং ভাষা আন্দোলনের লিখিত ঘটনা দ্বারা সমৃদ্ধ। তারা ইতিমধ্যে গবেষণাকেন্দ্রের জন্য অসংখ্য তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং কিছুদিনের মধ্যেই তা প্রকাশিত হবে। এইসকল তথ্যের বেশিরভাগ অংশই এখন বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে। তাই ভাষা আন্দোলন যাদুঘর এইসকল তথ্যের দ্বারা ভাষা আন্দোলনের ওপর ২৫০০ পাতার এনসাইক্লোপিডিয়া প্রকাশ করবে বলে জানিয়েছে।

বাংলা একাডেমীঃ

আজকের বাঙলা একাডেমি ভাষা আন্দোলনের ফলশ্রুতি হিসেবে ১৯৫৫ সালের ৩রা ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবংবাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নের লক্ষে নিরন্তর গবেষণারত একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্রমেই বিকশিত হয়েছে। বিখ্যাতভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সর্বপ্রথম এমন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। বাংলা ভাষা এবং বর্ণমালার উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে একাডেমিটিতে উন্মুক্ত আলোচনা কক্ষ, দুর্লভ গবেষণামূলক গ্রন্থ ও নথিপত্রের বিপুল সঙগ্রহ, লোকজ ভাষা ও সঙ্গীতের সমৃদ্ধ সঙগ্রহশালাসহ একটি আধুনিক ছাপাখানা রয়েছে। বাঙলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং বাঙলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা ছিল বাঙালি জাতির অগ্রসরমানতাকে গতিশীল করার জন্যে একটি জনগুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কেননা এ জাতির চিরায়ত ধর্মনিরপেক্ষতা, উন্মুক্ত মনোভাব ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেঅক্ষুণ্ণ রেখে সার্বিক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক তথা অর্থনৈতিক সাম্য ও উৎকর্ষ প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে এর কোন বিকল্প ছিল না। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯৫৩ সালের জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোর্ট-বর্তমানে সিনেট নামে পরিচিত, বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্যে একটি একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকে যুক্তিগ্রাহ্যরূপে সুপারিশ করেছিল। বাংলা একাডেমি নিয়মিত ভাষিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলেখ্যানুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। মূলধারার সৃজনশীল সাহিত্য ওবিজ্ঞানের ওপর গ্রন্থ-সাময়িকী ও লোকসাহিত্যের ওপর ত্রৈমাসিক প্রকাশনা প্রকাশ করে এবং একটি ইংরেজি ষাণ্মাসিক মুখপত্রও এ তালিকায় রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী বাংলা দিনপঞ্জির বহু বছরের পুরোন জটিলতার নিরসনোত্তর পুনর্গঠনেবাংলা একাডেমি অনন্য ভূমিকা রেখেছে।দিনপঞ্জিটিকে সর্বজনগ্রাহ্য করে গড়ে তুলবার পেছনে নিরলস শ্রম দিয়ে গেছেনড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ ও অপরাপর গবেষকবৃন্দ। ১৯৮৮ সালের পহেলা জুলাই থেকে রাষ্ট্রে এর দাপ্তরিক ব্যবহার শুরু হয়।জন্মলগ্ন থেকে বাংলা একাডেমি আমাদের সাংস্কৃতিক ভিতকে আরও সুগঠিত ও মজবুত করার লক্ষ্যে সফলভাবে কাজ করে আসছে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে একাত্তর অবধি এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গণ্য হয়ে এসেছে। বর্তমানে বাংলা একাডেমি সহস্র কৃতিত্ব সহকারে দেশের সবচেয়ে বড় প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে স্বীকৃত। এটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানসম্মত বাংলা বই প্রকাশ করে থাকে এবং চিরায়ত বিশ্বসাহিত্যকে স্বদেশী পাঠকের হাতে তুলে দিতে সচেষ্ট থাকে। ভাষার সেবায় এ্রর উল্লেখযোগ্য অবদানসমূহের মাঝে রয়েছে আঞ্চলিক ভাষার অভিধান রচনা যা দেশে প্রচলিত আঞ্চলিক শব্দনিচয়ের এক বিপুলা ভাণ্ডার, যারসম্পাদনায় ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। একাডেমি অতি প্রয়োজনীয় অপরাপর অভিধানের চাহিদাও মিটিয়ে চলেছে। এর অন্যতম বৃহৎ উদ্যোগটি হচ্ছে একটি বাৎসরিক গ্রন্থমেলার আয়োজন করা।সারা ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে চলমান বইমেলাটি আমাদের আত্মিক মিলনমেলা হয়ে ওঠে। মেলার দৃশ্য থেকে দেশের মননের বর্তমান অবস্থান ও গতিপথ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। ফি বৎসর বিপুল জনসমাগম ধারণ করে এ গ্রন্থমেলা এবং আপামর জনতার আত্মার ঋদ্ধতার দলিল স্বরূপ বইয়ের বিপনন বেড়ে চলে। এখানে আমাদের মহান মুক্তি সংগ্রামসংক্রান্ত দলিলপত্র, রচনাবলী, তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিজ্ঞানের নানা অনুষঙ্গ, গদ্য, পদ্য, সমালোচনা গ্রন্থের এক ধরণের গঠনমূলক বাজার গড়ে ওঠে। বাংলা নববর্ষকে ঘিরেও বাংলা একাডেমি সপ্তাহব্যাপিমেলা আয়োজন করে। এ মেলায় বইয়ের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোকশিল্প প্রদর্শিত হয়। এতকিছুর পরও একাডেমি খুব সহজে শ্লাঘা অনুভব করতে পারে না। বাঙলা একাডেমির বর্তমান কার্যক্রম গতিশীল হলেও গণমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ছুঁয়ে দিতে এবং প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিপূর্ণভাবে সফল করতে আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। বাংলা একাডেমি এ দেশের মানুষের ভাষার প্রতি আবেগের প্রতীক হয়ে আছে। এ আবেগতাবৎ বৃহৎ কর্মযজ্ঞে দারুণ প্রেরণা যুগিয়ে চলেছে এবং চলবে।একুশ আমার চেতনা শ্লোগানটি তাই বাঙালির কাছে শ্লোগান থেকেও বেশি কিছু- যেন সকল সংগ্রামে পিছু না হটার রসদ। একুশ অতীত ঐতিহ্যের আলোকে, অতীত সংগ্রাম এবং বিজয়ের গল্প শুনিয়ে আমাদের অগ্রসরমান শক্তিমত্ত্ব মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

একুশে বই মেলাঃ

ফেব্রুয়ারি মাস ভাষা, ভাষা আন্দোলন এবং অনুপ্রেরণার মাস। দেশের স্বাধীনতার প্রথম পদক্ষেপ গৃহীত হয় এই মাসে। একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের মানুষ ভাষা শহীদদের প্রতি তাদের সম্মান প্রদর্শন করে। শুধুমাত্র এই বই মেলার মাধ্যমেই সমস্ত ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান এবং আবেগ প্রদর্শন করা হয়। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমী বই মেলার আয়োজন করে থাকে। মাসটির প্রথম দিন থেকে শুরু হয়ে শেষ দিন পর্যন্ত এই মেলা চলে। ১৯৭২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি মুক্তধারা প্রকাশনী সর্বপ্রথম বাংলা একাডেমীর সামনে কিছু বই নিয়ে তা বিক্রি করা শুরু করে। মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা ছিলেন এর প্রবর্তক। পরবর্তীতে আর কিছু প্রকাশনী মুক্তধারার সাথে যুক্ত হয়। পরবর্তীতে ক্রেতা, দর্শক ও বিক্রেতাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকারিভাবে বইমেলার আয়োজন করা হয় এবং এটি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধিক জনপ্রিয় বইমেলায় রূপান্তরিত হয়। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমী বই মেলার দায়িত্ব নেয়। ১৯৮৪ সালে একুশে বই মেলার নামকরণ করা হয় অমর একুশে বই মেলা। মেলার পরিধি ক্রমশ বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় মেলা পরিচালনার যাবতীয় দায়িত্ব গ্রহণ করে। বর্তমানে ৪০০ এর ও অধিক স্টলের দ্বারা বই মেলা সজ্জিত হয়। প্রকাশনীসমূহের স্টলগুলো প্রকাশক এলাকা, প্রকাশক বিক্রেতা এলাকা, শিশু কর্ণার, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং লিটল ম্যাগাজিন ইত্যাদি এলাকায় বিভাজন করে স্থান দেয়া হয়। এছাড়া মেলা চত্বরকে ভাষা শহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউর এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ প্রমুখ ব্যক্তিত্বের নামে ভাগ করা হয়। এই মেলায় দেশের খ্যাতনামা সব প্রকাশনী, বই বিক্রেতা ছাড়াও দেশের বাইরে, যেমন ভারত, রাশিয়া, জাপান প্রভৃতি দেশ থেকেও নানা প্রকাশনা সংস্থা তাঁদের বই ও প্রকাশনা নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। এই মেলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারেরও বহু রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান, যেমন বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন, বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ইত্যাদি তাদের স্টল নিয়ে মেলায় অংশগ্রহণ করে। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানও অংশ নেয়। মেলাতে ইদানিং বিভিন্ন ডিজিটাল প্রকাশনা যেমন সিডি, ডিভিডি ইত্যাদিও স্থান করে নিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মোবাইল ফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও তাদের সেবার বিবরণসহ উপস্থিত হয়। মেলাতে বেশ জনপ্রিয়তার সাথে স্থান করে নিয়েছে লিটল ম্যাগাজিনও। মেলার মিডিয়া সেন্টারে থাকে ইন্টারনেট ও ফ্যাক্স ব্যবহারের সুবিধা। এছাড়া থাকে লেখক কর্ণার এবং তথ্যকেন্দ্র। মেলা প্রাঙ্গন পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত। মেলায় বইয়ের বিক্রয়ে ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় থাকে। এছাড়া মেলায় শিক্ষাসহায়ক পরিবেশ ও তথ্যের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স রাখা হয়, যারা বইয়েরকপিরাইট বা মেধাসত্ত্ব আইন লঙ্ঘন করেছে কি-না সনাক্ত করেন ও যথাযোগ্য ব্যবস্থা নেন। বই মেলা এমন একটি জায়গা যেখানে পাঠক এবং লেখকদের মধ্যে মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়। এটি সকল প্রকাশকদের জন্যও একটি মিলনস্থল। মেলাতে লেখককুঞ্জ রয়েছে, যেখানে লেখকেরা উপস্থিত থাকেন এবং তাঁদের বইয়ের ব্যাপারে নিজেদের, পাঠক ও দর্শকদের সাথে মতবিনিময় করেন। এই মতামত গ্রহণের মাধ্যমে লেখকদের লেখার মান আরও সমৃদ্ধ হয়। মেলা চলাকালীন প্রতিদিনই মেলাতে বিভিন্ন আলোচনা সভা, কবিতা পাঠের আসর বসে। প্রতি সন্ধ্যায় থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়া মেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রতিনিয়ত নতুন মোড়ক উন্মোচিত বইগুলোর নাম, তদীয় লেখক ও প্রকাশকের নাম ঘোষণা করা হয় ও দৈনিক প্রকাশিত বইয়ের সামগ্রিক তালিকা লিপিবদ্ধ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন রেডিও ও টেলিভিশনচ্যানেল মেলার মিডিয়া স্পন্সর হয়ে মেলার তাৎক্ষণিক খবরাখবর দর্শক-শ্রোতাদেরকে অবহিত করে। এছাড়াও মেলার প্রবেশদ্বারের পাশেই স্টল স্থাপন করে বিভিন্ন রক্ত সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে রক্ত সংগ্রহ করে থাকে। ২০১০ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই মেলার প্রবর্তক জনাব চিত্তরঞ্জন সাহার নামে একটি পদক প্রবর্তন করা হয়। পূর্ববর্তী বছরে প্রকাশিত বইয়ের গুণমান বিচারে সেরা বইয়ের জন্য প্রকাশককে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।পুরষ্কারটির আনুষ্ঠানিক নাম চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার। এছাড়া স্টল ও অঙ্গসজ্জার জন্য দেয়া হয় সরদার জয়েনউদদীন স্মৃতি পুরস্কার। সর্বাধিক গ্রন্থ ক্রয়ের জন্য সেরা ক্রেতাকে দেয়া হয় পলান সরকার পুরস্কার।

আপনার যদি একটি অ্যান্ড্রয়েড সেট থাকে তাহলে পুরো লেখাটা ভাষা আন্দোলনের সময়ের ছবি, ভিডিও, শহীদ দিবসের গানসহ আপনি পেতে পারেন Click This Link নামিয়ে নিতে পারেন যদি ইচ্ছে হয়



বিশেষ কৃতজ্ঞতায়ঃ > পার্লিয়া

মন্তব্য ৩ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (৩) মন্তব্য লিখুন

১| ০৫ ই মার্চ, ২০১৩ রাত ৯:২০

অবিশ্বাসকে বিশ্বাস করো না বলেছেন: স্যালুট বস অসাধারণ লেখা।
অনেক ভালো লেগেছে।

২| ০৫ ই মার্চ, ২০১৩ রাত ৯:২৯

অবিশ্বাসের দর্শন বলেছেন: লেখাটি নিয়ে কোন মন্তব্য করে চাই না ।
সত্যি অসাধারণ।

৩| ০৫ ই মার্চ, ২০১৩ রাত ৯:৪৭

সুরথ সরকার বলেছেন: লেখাটি পড়ে আমার এতটাই ভালো লেগেছে সেটা শেয়ার করেছি বন্ধুদের জন্য।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.