| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
পৌষের মাঝামাঝি । অনিক গ্রামে এসেছে বেড়াতে ।প্রতি বছর এই সময়টাতে সে গ্রামকে খুব মিস করে । গ্রামের মাটির রাস্তা , রাস্তার দুপাসের ধানক্ষেত , বাড়ির ঊঠোন আর তার সামনের পুকুর , সব কিছুই যেনো শীতের সকালে স্বর্গের উপাদান মনে হয় ।
অনিক সর্বশেষ গ্রামে এসেছিলো বছর পাচেক আগে । গ্রামে আসতেই অনিক বড়সর একটা ধাক্কা খেলো । সুজন চাচার দোকান , যেটা কিনা বছর পাঁচেক আগে গ্রামের একমাত্র দোকান ছিলো , সেটা ঘীরে যে কান্ড হয়েছে তা রীতিমত একটা বাজার ! সামনের প্রাইমারি স্কুলের যে একটা বিশাল খেলার মাঠ ছিলো সেটির রাস্তা সংলগ্ন কোনো যায়গায়ই খালি নেই । স্কুলের পুকুরটার দুই পাসে শান বাধানো ঘাট হয়েছে ।
অবাক অবশ্য একটু আগেই হওয়া উচিত্ ছিলো অনিকের । আগে হাই-ওয়ে থেকে প্রায় চার মাইল হেটে গ্রামের বাড়ি আসতে হত । এখন টেম্পু সুজন চাচার দোকান পর্যন্ত আসে । রাস্তা পাকা । অনিকের অসস্থি লাগছিলো । গ্রামের ভিতর একপাসে ধানক্ষেত আর আরেকপাসে ছোট্ট খাল , এর মাঝে পিচ ঢালাই রাস্তা যেনো তরুণীর ঠোটে বেখাপ্পা অমানানসই রঙ্গের লিপিস্টিক ।
টেম্পু থেকে নামলো অনিক । এটা শুধু বাজার নয় , টেম্পু স্টেশনও বটে ! আরো দু চারটে টেম্পু দাড়িয়ে আছে । এর মধ্যে একটি শহরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে ।
অনিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে । গ্রামের মধ্যে তার পরিবার একটু বেশিই পরিচিত । তার বাবা মা থাকে পৌর এলাকায় । অনিকের অসস্তিটা বাড়ছে । শহরের কৃতিমতা মুক্ত হলেও গ্রামের মানুষের ভিতর এই গ্রাম্য ফরমালিটিটা রয়েই গেছে ।
অনেক অতি উত্সাহী মুরুব্বিরা তাকে দেখে রাজনৈতিক আলাপ জুরে দিলো । এসব পাবলিক হটাত্ই অনেক বেশি জ্ঞানি হয়ে উঠে । তাদের হাত থেকে নিজেকে ছারিয়ে কোনো রকমে বাড়ি পৌছল অনিক ।
গ্রামে অনিকের দুই চাচা থাকে । দু চাচার বাড়িতেই বেড়াবে অনিক । ইতোমধ্যে আরো একটা জিনিস আবিস্কার করলো অনিক , শহরের 'লোডশেডিং' গ্রামে এসে না পৌছলেও সৌরবিদ্যুত্ নেই এমন বাড়ি খুজে পাওয়া দুষ্কর ।
রাতে বাড়িতে কোনো কুপি বা হারিকেন জললো না । এনার্জি সেভিং লাইটের আলোতেই কাটলো ঘুমানোর আগ পর্যন্ত ।সকালে একটু আগেই ঘুম ভাঙ্গলো অনিকের । শহরে থাকলে ন'টার আগে কোনো ক্রমেই ঘুম ভাঙ্গে না । গ্রামের কথা আলাদা , এখানকার মানুষ সূর্যের সাথে পাল্লা দিয়ে কাজে যায় ।
সকালে ভয়ে ভয়ে বিছানা ছাড়লো অনিক । সবে আজান দিচ্ছে । বাইরে এখোনো অন্ধকার । অনিক বাইরে এসে দাড়ালো । ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে । অন্ধকারে চারদিক ঢাকা । অনিক দাড়িয়েই আছে । পূর্বাকাশ খুব দ্রুত পরিস্কার হচ্ছে । কিন্তু ঘন কুয়াশায় একহাত দূরের কিছুও দেখা যাচ্ছে না । গ্রামের লোকজন কাজে যেতে শুরু করেছে । উঠোনে বিশাল চুল্লিতে খেজুরের রস জ্বাল দেবার ব্যাবস্থা হচ্ছে ।
নাহ ! সবকিছু ঠিকই আছে । অনিক পুকুর পাড়ে গেলো । সেখানো ওর ছোট চাচাত ভাইটা গাছ থেকে রস নামাচ্ছে । একটি বোতল থেকে অনিক রস খেলো কয়েক ডোক ।
শীতের বাতাসটা বড় শক্ত ।সোয়েটার ভেদ করে একদম লোমকুপে হানা দিচ্ছে । অনিক রাস্তা পেড়িয়ে ধানক্ষেতের ভিতর গিয়ে বসলো ।
রোদ উঠতে শুরু করেছে আস্তে আস্তে । শিশির কনাগুলো ঘাশের ডগায় চিকচিক করছে । হাল্কা বাতাসে ধানেগাছগুলো যেনো মাথা দুলিয়ে হাসতেছে ।
এবার অনিক লক্ষ করলো ধানক্ষেতের পরিধিও ধীরে ধীরে ছোটো হয়ে আসছে । স্থানে স্থানে নতুন বাড়ি উঠতেছে । শুনেছে পাসের গ্রামে নাকি একটা বিশাল বিল উজার করে ইন্ডস্ট্রি করা হচ্ছে ।
জনসংখ্যা আর নগরায়ন যেভাবে লাগামহীনভাবে দৌরাচ্ছে , তাতে এরকম সকাল কদিন পরে জাদুঘরেও খুজে পাওয়া যাবে না ।
©somewhere in net ltd.