নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

গাজী তরিকুল ইসলাম

গাজী তরিকুল ইসলাম › বিস্তারিত পোস্টঃ

ভালোবাসা ও বাস্তবতা

০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৪ সকাল ৭:৫৯

সকাল হয়েছে । পূর্বাকাশ ধীরে ধীরে পরিস্কার হচ্ছে । কুয়াশাঘেরা এই পথ অস্পস্ট এখোনও । উত্তরের বাতাস কাপড় চামরা ভেদ করে মজ্জায় গিয়ে শীতের উপস্থিতির জানান দিচ্ছে বেশ ভালো ভাবেই ।

ঢাকা শহরে শীতের সকালটা বেশ নির্জন । শীতকাল ছাড়া অন্য সময়ে চব্বিশ ঘন্টার কখোনই রাস্তা এতটা ফাকা থাকে না । ডায়বেটিক রুগীরা ইতোমধ্যে রাস্তায় নেমে পড়েছে । এটা ঢাকার একটা সংস্কৃতি । প্রতিটা পার্ক বা যেকোনো দর্শনীয় স্থানে সকালে প্রাতভ্রমন কারিদের ভীর থাকে । এদের বেশিরভাগই বহুমুত্রের রোগী । এদের রোগমাপার জন্য ভ্রাম্যমান ল্যাবও বসে ওইসব যায়গায় । যতক্ষন রোগীরা পার্কে থাকে এদের ব্যাবসা জমজমাট চলে ।

সূর্য উঠতে চললো । গায়ের পাতলা খাতাটা শীত মানতে চাচ্ছে না । নিচে একটা নোংড়া পাতলা চাদর । নড়াচড়া করলেই প্রতিটি লোমকুপ শিরশির করে উঠে । ফুটপাতের যেদিকটাতে রাস্তা , তার বিপরীদ দিক থেকে ঠান্ডাটা একটু কম আসে । বাকি তিন দিক থেকেই সমানে ঠান্ডা আসে । এর মধ্যে নিচের চাদর ভেদকরেও ঠান্ডা আসে ।

বাবলুর দৈনিক রুটিন শুরু হবে আরো কিছুক্ষন পরে । ইচ্ছে করলেই বিলাসিতা করে ঘুমিয়ে থাকার সূযোগ নেই । ফুটপাত ছারতে হবে । সূর্য ওঠার এখোনো অনেক দেরি । বাবলুর কাছে ঘরি না থাকলেও সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না । তবে এই হাড় কাপানো শীতে পাতলা কাঁথার নিচে বসে কাপার কোনো মানে হয় না । এখান থেকে একটু দুরেই লোকজন আগুন জ্বালিয়ে গা গড়ম করে । সেখানে যাওয়া যায় । চাদর আর কাঁথা দলামুচি করে নিজের গোপন স্থানে রেখে দেয় বাবলু । গরম কাপড় বলতে একটা গেঞ্জি আছে বাবলুর । বেশ ঢোলা । ঘুমানোর সময়ও ওটা গায়েই ছিলো ।

বেশিক্ষন উম পোয়ানো যাবে না । পেটের ভিতর আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে । পকেটের অবস্থা বাড়াবাড়ি রকমের খারাপ । দেশের মধ্যে হরতাল না অবোরোধ কি যেনো দিয়া রাখছে হালারা , রাস্তায় নোকজনই রের হয় কম । ভাবে বাবলু । তার ইনকাম রাস্তায় লোকজন উপস্থিতির সমানুপাতিক ।

এক সময় ফুল বিক্রি করতো বাবলু । কিন্তু সেটায় পরিশ্রম বেশি । ফুল সংগ্রহের জন্য ত মাঝে মাঝে কমান্ডো অভিযান চালাতে হতো ! ধরা পড়লে দুচারটা চটকানা যা দিতো , সেটা সমস্যা না । সমস্যা হলো ফুলগুলো রেখে দিতো । তার উপরে বিক্রির সময় নানান অনুনয় বিনয় সত্বেও একটা ফুল কেউকে গছাতে রীতিমতো রক্ত পানি হয়ে যেতো ।

এরচেয়ে সদরঘাটে পানি বিক্রির ব্যাবসাটা বেশ ভালো । সকাল বেলা লঞ্চ থেকে বোতল কুড়িয়ে আনা । দুপুরের পর বোতলগুলো পানিভর্তি করে কয়েক দফায় বিক্রি করা । হরতালের কারনে ব্যাবসায় মন্দা পরেছে । লঞ্চ আসেও কম , যায়ও কম । তার উপরে আগে লঞ্চে তিল ধারনের যায়গা থাকতো না । এখন ত অনেক যায়গা খালি থাকে ।

কিন্তু মুল সমস্যা যেটা , ও ওখানকার অন্যান্যদের সাথে প্রতিযোগীতা করে টিকতে পারে না । পানিই বিক্রি হয় অল্প কিছু , তার উপরে ওদের অগ্রাধিকার । আগে ওদেরটা বিক্রি হবে , পরে ওরটা ।

বাধ্য হয়েই এই তিন নম্বর পথে নেমেছে ও । ভিক্ষা করতে ওর বেশ খারাপ লাগে । মানুষের কাছে ছোটো হতে হয় । অনেকের খারাপ ব্যাবহার , গালাগালিও সহ্য করতে হয় ।

ইদানিং ভিক্ষায়ও পয়সা নেই । আসবে কিভাবে ? রাস্তায় লোকজনই ত আসে না । তার উপর প্রফেশনালদের আনাগোনা ।

এই বিচিত্র জীবন , বিচিত্র সংগ্রাম , প্রতি মুহুর্তে ক্ষুধার সাথে আন্দোলোন , প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ ! জীবনটা চ্যালেঞ্জিং । বাবলুর ক্লান্তি নেই । বিলাসিতা কাকে বলে সেটা হয়তো ও জানে না , কিন্তু যুদ্ধ জয়ের আনন্দ আর হারের বেদনা তার প্রতি মুহুর্তের সঙ্গী ।

তার জীবনে কি কি অপূর্ণতা আছে , সেটা ভেবে নষ্ট করার মত সামান্য সময়ও তার নেই । তাই সে কখোনো হতাশায় ভোগেনা ।

হতাশা , নিরাশা , বিরহ , বেদনা এগুলো উচু দরের অনুভূতি । বাবলু এদের নাগাল পায় না , এরাও বাবলুকে ঘাটাতে যায় না । ভালোবাসা একটি দাপ্তরিক পরিভাষা । কর্পোরেট পর্যায়ে এর স্বীকৃতি থাকলেও বাস্তবে বাবলুদের জন্য ঘৃণা আর অবহেলা ছাড়া কিছুই বরাদ্ধ নেই ।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.