নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

বাংলা আমার জীবনানন্দ

সাহিত্য পাঠক

তেলীভীষণ

সাহিত্য পাঠক

তেলীভীষণ › বিস্তারিত পোস্টঃ

চৌর্যবৃত্তি ও প্রভাবিত কবিতা ।। সবুজ তাপস

০১ লা জুন, ২০১৪ রাত ১০:২৮

প্রথম কিস্তি

কবি ও প্রাবন্ধিক আবু হাসান শাহরিয়ারের ‘কবিতা অকবিতা অল্পকবিতা’ গদ্যটির যৎসামান্য মূল্যায়ন করেই অগ্রসর হতে হচ্ছে। শাহরিয়ার তার এ-গদ্যে রণজিৎ দাশের ‘শ্মশানছবি’র সাথে ফরিদ কবিরের ‘দেয়ালবন্ধুরা’ তুলে ধরেছেন এবং বলেছেন, ‘দশক-বিচারী প্রাবন্ধিকদের কেউ কেউ বলেন, গত শতকের আশির দশকের কবিরা (বাংলাদেশে) কবিতায় নতুন বাঁকের সন্ধান করেছিলেন। যত না বাঁক, তার চেয়ে বেশি অনুসরণের ঘটনাই ঘটেছে ঐ কালখণ্ডে। … ফরিদ কবির ঐ কালখণ্ডেরই জাতক’। অনুসরণ বলতে তিনি কবিতা অনুকরণ বা কবিতাকে সামনে রেখে কারোর বানানো কবিতা নির্দেশ করেছেন। এ-যে বক্তব্য, তার যাথার্থ্য এজাজ ইউসুফীর একটা নোটেও পাই। নোটটা, দৈনিক পূর্বকোণ-এর ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতি’ পাতায় ৬ জুলাই ২০০৭-এ প্রকাশিত আমার ‘কথাটা প্যারাডক্স হলো’ শিরোনামের একটি পাঠ-প্রতিক্রিয়ামূলক গদ্যের নিচে ছিল : ‘কবিতার অধরসুধপান করতে সম্প্রতি এক অদ্ভুত কুম্ভিলকবৃত্তির প্রতিযোগিতা দেখা দিয়েছে। অনেকেই আশির দশকে এই কাজটি অহরহ করতো। কিন্তু কখনও তা ঘাঁটার চেষ্টা করিনি …’। আবু হাসান শাহরিয়ারের মতের সাথে এজাজ ইউসুফীর এ-মত যোগ করে, শুধুু আমি নই, যে-কোনো কাব্যপাঠকই বলতে পারেন : উল্লেখিত দশকে বাংলা সাহিত্য কোনো স্বতন্ত্রকাব্যভাষী-শক্তিমান কবি পেল না!



আবু হাসান শাহরিয়ার এ-গদ্যে শুধু আশির দশক নয়, অন্যান্য কালখণ্ডেও-যে এ-অনুসরণের ঘটনা ঘটেছে, তার সপ্রমাণ ব্যাখ্যা দিতেও নিরত হয়েছেন। প্রমাণস্বরূপ তুলে ধরেছেন শঙ্খ ঘোষের ‘প্রতিহিংসা’ ও পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘যে টেলিফোন আসার কথা’র অংশবিশেষের সাথে যথাক্রমে সিকদার আমিনুল হকের ‘স্মৃতি’ ও ওমর কায়সারের ‘চন্দ্র এখন পর্দানশীল’র অংশবিশেষের সাযুজ্য। এবং এর দ্বারা তিনি শেষোক্ত দুজনকে ‘নবিশ কবি’ বলার (…)সাহস দেখিয়েছেন। এ-ক্ষেত্রে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, অংশবিশেষের সাযুজ্য ও কিছু শব্দচিত্রের অভিন্নতা দেখিয়ে কি কাউকে ‘নবিশ কবি’ বলা যায়? এ-জাতীয় প্রশ্নের জবাব দুটো- ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’। পাঠক ‘না’ বলার পক্ষে কিনা- জানি না। যদি এর জবাব ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আমি আবু হাসান শাহরিয়ারকেও একই অভিধা দিতে পারি। তার মধ্যেও এমন কিছু লক্ষ করি, যেগুলোর অংশবিশেষ অন্যের কাছ থেকে নেয়া, অনুসরণজাত। উদাহরণস্বরূপ তার একলব্যের পুনরুত্থান-এর ‘অকুলচারীর পাঠ্যসূচি’ তুলে ধরতে পারি। একে শঙ্খ ঘোষের ‘তুমি’র পরে পড়লে যেকোনো কাব্যপাঠক তার গায়েও তার আবিষ্কৃত ‘নবিশ কবি’ সিলটির ছাপ রাখতে প্রণোদিত হবেন।

আমি উড়ে বেড়াই আমি ঘুরে বেড়াই

আমি সমস্ত দিনমান পথে পথে পুড়ে বেড়াই

কিন্তু আমার ভালো লাগে না যদি ঘরে ফিরে না দেখতে পাই

তুমি আছো তুমি।

(তুমি/ শঙ্খ ঘোষ)



এবং

আমি উড়ে বেড়াই

উড়ে উড়েই ঘুরে বেড়াই

… … …

তাই আগুনে হাত রাখলে আগুন নিজেই পোড়ে।

আর রক্তগোলাপ ফোটে জমাট শ্বেতপাথরে।



আমি উড়ে বেড়াই

উড়ে উড়েই ঘুরে বেড়াই

কালে-কালান্তরে

ধর্মে আমার কুলায় না তাই থাকি বৃহত্তরে।

(অকুলচারীর পাঠ্যসূচি/আবু হাসান শাহরিয়ার)



এই-যে ব্যাপার, এ-ক্ষেত্রে আমি এখানে-ওখানে আত্মশ্লাঘাকারী আবু হাসান শাহরিয়ারের মতোই বলতে পারি: ‘চেতনেই হোক আর অবচেতনেই হোক, এ জাতীয় অনুসরণের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত রাখাও কবির কর্তব্যের অংশ…’। উপরে শঙ্খ ঘোষের ‘তুমি’তে লক্ষ করি তার তুমিতে সীমাবদ্ধ থাকার ইচ্ছাবোধ আর আবু হাসান শাহরিয়ারের ‘অকুলচারীর পাঠ্যসূচি’তে তার বৃহত্তর পরিসরে অবস্থান নেয়ার স্বীকৃতিজ্ঞাপন। লক্ষ্যণীয় পার্থক্য কেবল বিশেষ (Special) এবং সামান্যের (Universal)



আবু হাসান শাহরিয়ার এলিয়টের বরাত দিয়ে বলেছেন, ‘নবিশ কবিরা নকল করে, আর পাকা হাতের কবিরা করে চুরি’। তার এ-উদ্ধার থেকে বোঝা যায়, কাঁচা হাতের কবিরাই নবিশ কবি। কিন্তু এ-গদ্যে তিনি কারোর একটি কবিতার পূর্ণাঙ্গ নকলরূপ তুলে ধরতে সক্ষম হননি। পূর্ণাঙ্গ নকল হিসেবে আমি উত্তরআধুনিক আশীষ সেনের ‘এক ক্লান্ত পদাতিক’ (২০০৭, আদিত্য প্রকাশন, চট্টগ্রাম) কাব্যের ‘মশালের আলোয় দেখা’, ‘আমার স্বপ্ন ও আমার পৃথিবী’ এবং ‘ভালোবাসার মতন’ নির্দেশ করতে পারি। এখানে কেবল প্রয়াত খান শফিকুল মান্নানের ‘কখনো কোথাও’ (পদাতিক, একুশে সংখ্যা, ১৯৭৮, সম্পাদক- মাহাবুব-উল-আজাদ চৌধুরী)-এর সাথে আশীষ সেনের ‘মশালের আলোয় দেখা’ পড়া যাক-



কখনো কোথাও মাহুত মাতাল হয়

ম্যাপের কোনায় রক্ত ফিনকি দিয়ে

কখনো কোথাও লালের আভাস রাখে

কখনো কোথাও হরিণ পালায় বনে

খাতার পাতায় ঝড়েরা বন্দী থাকে

মোমের বাতিটি নীরবে জ্বলিয়া যায়

প্রাচীন প্রাণীর লেজের মহিমা আজো

বঙ্গসাগর উথাল পাতাল করে

ছুটেছে মহিষ লবণ মাঠের বুকে

বেপথু ঝড়ের ছোবল বারংবার

বিপুল নখরে ছিঁড়েছে সাইকলপ্স

ইথাকা এখনো বিরান পাহাড়ভূমি

বেদিয়া পাখীরা অনেক গাঙের চিল

হাতিরা কখনো মাঝারি শূকর হয়

কখনো ইঁদুর বিলাসী হোটেল ঘরে

অশোক কাননে সোনার লঙ্কা জ্বলে।

(কখনো কোথাও/খান শফিকুল মান্নান)



এবং

কখনো কোথাও মাহুত মাতাল হয়

ম্যাপের হৃদয়ে রক্ত ফিনকি দিয়ে

কখনো সে লাল ভোরের আভাস রাখে

জাগে লোকালয় হরিণ পালায় বনে।



খাতার পাতায় ঝড়েরা বন্দী থাকে।

মোমের বাতিটি নীরবে জ্বলে ফুরায়

প্রাচীন প্রাণীর লেজের তাড়ন আজো

বঙ্গসাগর উথাল-পাতাল করে।



ছুটছে মহিষ লবণ মাঠের বুকে

ঝড়ো খুরে হানে ছোবল বারংবার,

সুবিধাবাদীরা ছিঁড়ছে পুঁথির পাতা

শয্যাসঙ্গী পানাহার হলাহল।



ইথাকা এখনো বিরান পাহাড়ভূমি

বেদে-পাখিরাও খোঁজে নিজ বাসাবাড়ি

হস্তী কি কভু শুকরের পাল হয়

রাজা হতে কভু ইঁদুর নাহি তো পারে।



অশোক কানন নিরাপদ যতো হোক,

তবুও সেখানে সোনার লঙ্কা জ্বলে।

(মশালের আলোয় দেখা/আশীষ সেন)



শাহরিয়ার পাকা হাতের কবির চুরিকর্ম হিসেবে জয় গোস্বামীর ‘দাগী’ এবং ময়ুখ চৌধুরীর ‘চন্দ্রমল্লিকার বাড়ি’ নির্দেশ করেছেন। এগুলো যে তাদের চৌর্যবৃত্তিক ফসল, প্রমাণের স্বার্থে তুলে ধরেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘উত্তরাধিকার’ ও আবিদ আজাদের ‘কবিতার দিকে’। সত্যিই কাব্যপাঠকের কাছে মনে হবে, ‘উত্তরাধিকার’ থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘দাগী’। ময়ুখ চৌধুরীর ‘চন্দ্রমল্লিকার বাড়ি’ নিয়ে তিনি যা বলেছেন, তাও বক্তব্য। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে, তিনি (ময়ুখ চৌধুরী) আবিদ আজাদের ‘কবিতার দিকে’ ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘কোনদিনই পাবে না আমাকেই-’কে সামনে রেখে ‘চন্দ্রমল্লিকার বাড়ি’ পৌঁছলেন।



চন্দ্রমল্লিকার মাংস ঝরে আছে ঘাসে

‘সে যেন এমনি চলে আসে’

হিমের নরম মোম হাঁটু ভেঙে কাৎ

পেট্টলের গন্ধ পাই এদিকে দৈবাৎ



কাছাকাছি

নিজের মনের কাছে নিত্য বসে আছি

দেয়ালে দেয়ালে

হাটের কাচকড় কুপি অনেকেই জ্বালে



নিভন্ত লন্ঠন

অস্তিত্ব সজাগ করে বারান্দার কোণ

বসে থাকে

কোনদিন পাবে না আমাকে-

‘কোনদিনই পাবে না আমাকে!’

(কোনদিনই পাবে না আমাকে-/শক্তি চট্টোপাধ্যায়)



– কোনদিকে যাবে, বাঁয়ে?

– না।

– কোনদিকে যাবে, ডানে?

– না।

– কোনদিকে যাবে, উত্তরে দক্ষিণে পুবে পশ্চিমে?

– আমি কবিতার দিকে যাবো।

– কোন পথে যাবে?

– সবপথে যাবো, সবপথই গেছে কবিতার দিকে।

(কবিতার দিকে/আবিদ আজাদ)



শক্তির কবিতার ‘চন্দ্রমল্লিকা’, ‘কোনদিন পাবে না আমাকে’ এবং আবিদ আজাদের কবিতার স্ট্রাকচার, ‘সবপথে যাবো, সবপথই গেছে কবিতার দিকে’ মাথায় রেখে ময়ুখ চৌধুরীর ‘চন্দ্রমল্লিকার বাড়ি’ পড়া যাক-



- এই রিক্সা যাবে নাকি?

- যাবো স্যার; কোথায় যাবেন?

- যাবো চন্দ্রমল্লিকার বাড়ি।



এই বলে খুব তাড়াতাড়ি

রিক্সায় বসেছি ছেপে; দেখেছি ঘড়িটা বারবার।

যদিও এখান থেকে কোলকাতার ডায়মন্ড হার্বার

বহুদূর, তবু আমি আরেক কাউকে

খুঁজে ফিরি এ শহরে এখানে ওখানে-

চিত্রপ্রদর্শনী, মিনি সুপার মার্কেট কিংবা বইয়ের দোকান;

ততক্ষণে চন্দ্রকলা মেঘের আড়ালে।



- এবার কোন্ দিকে স্যার?

- সবদিকে যাও। চন্দ্রমল্লিকা যেহেতু নেই কোনোখানে,

তার মানে সবদিকে আছে।

তুমি আরও যেতে থাকো,-

আকাশে আরেক চন্দ্রমল্লিকার ইশারা তো পাবে!



চন্দ্রমলি¬কার বাড়ি বুকের ভেতর নিয়ে

পাল্টে দিই সড়কের নাম;

এইভাবে পথে-পথে প্রতিটি গলির মোড়ে

অন্যনামে খোঁজ করি ক্রিসেনথিমাম।

রেখে যাই প্রণয়প্রণাম।



(দ্বিতীয় কিস্তি )

মন্তব্য ৭ টি রেটিং +৩/-০

মন্তব্য (৭) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা জুন, ২০১৪ রাত ১২:০৯

কান্ডারি অথর্ব বলেছেন:


+++

২| ০২ রা জুন, ২০১৪ রাত ১২:৪০

ওয়্যারউলফ বলেছেন: ভাই তেলীভীষন,আপনার লিখাটা নিয়ে আমার মত অল্পবিদ্যায় মন্তব্য করা ভয়ংকর। তবে হুমায়ুন আহামেদ স্যারের একটি লিখায় পড়েছিলাম ( কোথায় পড়েছিলাম এখন আর মনে নাই সম্ভবত কোন পত্রিকায় ) কবি জীবনান্দ দাসের বনলতা সেন কবিতাটি নাকি টু-হেলেন নামক একটি কবিতার সাথে হুবহু মিল এবং কবিগুরুর একটি কবিতার বেলায়ও একই কথা লিখেছিলেন।

০২ রা জুন, ২০১৪ বিকাল ৫:৩৮

তেলীভীষণ বলেছেন: পরবর্তী পর্বে দেখুন

৩| ০২ রা জুন, ২০১৪ রাত ২:১২

নাহিদ শামস্‌ ইমু বলেছেন: খুব বিশ্লেষনধর্মী একটি লেখা।
সাহিত্য নিয়ে আপনার মত এভাবে খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করা সত্যিই খুব কঠিন কাজ।
শুভকামনা রেখে গেলাম...

০২ রা জুন, ২০১৪ বিকাল ৫:৩৯

তেলীভীষণ বলেছেন: ধন্যবাদ

৪| ০৩ রা জুন, ২০১৪ রাত ১২:৩৩

আসোয়াদ লোদি বলেছেন: সত্যিকার অর্থে অনেক খ্যাতিমানরা ছিলেন 'শব্দচোর ভাবের তস্কর' । এগিয়ে যান । অনেক কিছু জানবার আছে এখান থেকে । পোষ্টটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ।

০৪ ঠা জুন, ২০১৪ রাত ৯:১৩

তেলীভীষণ বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.