| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এক দেশে ছিল এক জনদরদী রাজা, নাম
ছিল হায়দার আলী। শ্যামলীই ছিল তাঁর
এক মাত্র কণ্যা। সে অনেক দিন আগের
কথা। তখনকার মানুষ খুব ভাল ছিল। কিন্তু
রাজা-রাণীর মনে খুব আক্ষেপ ছিল
একটি পুত্র সন্তান না হওয়ার জন্য, তবে
সে কারণে আল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের
কোন অভিযোগ ছিল না। বরং তাঁরা
মনে প্রাণেই বিশ্বাস করতেন যে,
আল্লাহ যা করেন বান্দার ভালর জন্যেই
করেন।
রাজা হায়দার আলী দেশের মানুষের
কাছে প্রজা বান্ধব একজন প্রিয় মানুষ।
রাজ্যের সীমানার মাঝে কোন
অশান্তি নেই, নেই কোন অভাব
অভিযোগের বিন্দু মাত্র অজুহাত। সুখের
বন্যা খেলে যায় সারাটি দিনমান
উৎসবের আমেজে। রাখালী বাঁশির
সুরে গাছে গাছে পাখী ডাকে।
মাঠে মাঠে শষ্য কণা দোলে দখিনা
হাওয়ায়। মৌসুমী আনন্দের ঢেউ যেন
আছড়ে পড়ে মানুষের হৃদয় মনে সারাটি
বছরই বৈকালিক মিষ্টি রোদের
কাব্যিক মমতায়।
রাজা হায়দার আলীর প্রহর কাটে
প্রজাদের মঙ্গল চিন্তায়। ভাল সময় গুলো
নির্ভাবনায় কাটে বলে রাজার মনেও
অফুরন্ত প্রশান্তি। কিন্তু সময়ের সাথে
সাথে শ্যামলী মায়ের বয়স যে হাঁটি
হাঁটি পা পা করে ভরা মৌসুমে
পৌঁছে গেছে রাজার সে দিকে কোন
খেয়ালই নেই ! অথচ শ্যামলীর রূপ-গুনের
আকর্ষণে বিকশিত হতে থাকে দেশ-
বিদেশের ভ্রমর কূলের হৃদয় কানন!
অবশ্য শ্যামলীর মাঝে ভরা বর্ষার
জোয়ার থাকলেও, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ
থাকলেও তার ভয়ঙ্কর প্রকাশ নেই !
দীঘির জলের মতই শান্ত, আর এখানেই
তার আকর্ষনের রহস্য ! সে জন্যই সে
আলোচিত, আকর্ষিত এবং সর্বজন
স্নেহধন্য ! বাবার মতই প্রজাকূলের
আস্থাভাজন, নয়নের মনি। পূর্ণিমার
চাঁদের মতই আবেদন তার সকলের
আঙিনায় ! সুখের নহরে যেন দধির
প্লাবণ !
শ্যামলীর জননীও তো রাজমাতা, তাই
তাঁর বিবেচনাও যুক্তি গ্রাহ্য। তিনি
সবিনয়ে রাজাকে শ্যামলী মায়ের
জন্য সু-পাত্রের সন্ধ্যানে মনোনিবেশ
করার তাগিদ দেন। রাজা সানন্দে
সম্মতি জানান বটে, কিন্তু সাথে
সাথে প্রজাকূল ও দেশের ভবিষ্যৎ
চিন্তায় ভেতরে ভেতরে
মনোবেদনায় আহতও হন। যেহেতু তাঁর
কোন পুত্র সন্তান নেই তাই তাঁর আসন্ন
বার্ধক্য এবং জীবনাবসানের চিরন্তন
সত্যকে উপেক্ষা না করার মানসিকতাই
তাঁকে আরও সচেতন ও সতর্ক সিদ্ধান্তের
প্রতি মনোযোগী করে তোলে।
এতদিনে সম্মানিত সভাষদ ও
শুভাকাঙ্খী পারিষদবর্গ এই প্রথম লক্ষ্য
করলেন রাজাকে ক্ষণিক চিন্তার
রেখা যুক্ত কাতরতা নিয়ে দরবারে
আসতে ! সবার মাঝেই একটা অজানা
আশংকা দানা বাধায় শীতলতার
আস্তরনে পরিবেশ যেন আচমকাই
নিরবতার গভীরে নিমজ্জিত হ’লো।
রাজা লক্ষ্য করলেন, বুঝলেন এবং একটু
সময় নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে রাজদুহিতা
শ্যামলী মায়ের জন্য একজন সু-পাত্র
সন্ধ্যানের আহবান জানালেন। এতক্ষণে
সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন এবং
ঈষৎ আনন্দের ঘ্রাণ যেন তরঙ্গে ভেসে
ভেসে সবাইকে ছুঁয়ে দিয়ে পুলকিত
করে দিল। গভীর গুঞ্জরণে উজ্জীবিত
দরবার রাজাকে আশাবাদী করে
তোলে। ভাল লাগা প্রহর গুলো সব
সময়েই দ্রুত লয়ে গত হয়!
রাজদুহিতার পানি গ্রহণের বাসনা
জাগে অনেকেরই মনে । এমনকি
সীমানার ওপারেও জেগে ওঠে
প্রেমিক প্রবর ! রাজা হায়দার আলীর
কাছেও পৌঁছে যায় শ্যামলীকে
প্রতিবেশী দেশের মহারাজার পুত্রবধু
বানাবার সাধের আভাস ! হায়দার
আলীর চিন্তার রেখা গভীর থেকে
গভীরতর হতে থাকে। রাজমাতার
ব্যাকুলতার মাত্রাও বাড়তে থাকে
বিস্তৃত আকারে। অবশ্য নানান সুত্রে
রাজার কাছে আরও সু-পাত্রের
খবরাখবর আসতে থাকে, কিন্তু রাজার
মনে অশান্তির আগুন ধিক্ ধিক্ করে
জ্বলতে থাকে। কারণ অনুসন্ধ্যানে ব্যস্ত
পারিষদবর্গ। রাজা পরিস্থিতি
অনুধাবন করে সিদ্ধান্ত নিলেন
বিষয়টা খোলাসা করার। কিন্তু
দৈবাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত
সীমান্ত বাসীদের উপর দুরবর্তী
অঞ্চলের অরণ্যাশ্রিত দস্যুদের সশস্ত্র
আক্রমনে উদ্বিগ্ন রাজা হায়দার আলী
সৈন্যদের উপর দস্যু দমনের নির্দেশ
দানের সাথে সাথে প্রতিবেশী
রাজ্যের রাজপুত্র স্বপ্রণোদিত হয়ে
তার নেতৃত্বে অন্য একটা সেনা দল
নিয়ে দস্যুদের উপর আক্রমন করে তাদের
দমন করার জন্য সহযোগিতা করায় দস্যুরা
পরাজিত হওয়ায় দেশে পূণরায় শান্তির
সুবাতাস বইতে থাকে।
রাজা হায়দার আলী প্রতিবেশী
রাজ্যের মহারাজার প্রতি যথারীতি
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সত্য, কিন্তু তাঁর
সুদুর প্রসারী চিন্তার রেখাচিত্রে
ধরা পড়ে একটা নীল নক্সার আগ্রাসী
আয়োজনের পূর্বভাস ! তাই তো তিনি
প্রতিবেশী মহারাজার পক্ষ্ থেকে
কোন প্রকার প্রস্তাব আসার আগেই
শ্যামলীর জন্য পাত্র নির্বাচনের
সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করতে মনস্থির করলেন।
ইতোমধ্যে রাজার হাতে পাত্রদের যে
তালিকা পৌঁছে গেছে তার শীর্ষে
যে দুজন পাত্রের অবস্থান, তাদের
কেউই শৌর্যে-বীর্যে, জ্ঞান-গরিমায়,
বংশ লতিকায় কারো চেয়ে কম নয়।
রাজমাতা, পারিষদবর্গ এবং রাজা
নিজেও দু’জনেরই আচার-আচরণেও মুগ্ধ।
তাই রাজা চাইছিলেন শ্যামলী
মায়ের ইচ্ছাকেই চুড়ান্ত রূপ দিতে
কিন্তু শ্যামলীও চায় সবার পছন্দকেই
সম্মান জানাতে। ফলে বিষয়টা
একদিকে যেমন জানাজানি হয়ে গেল
তেমনি সৃষ্টি হলো দীর্ঘ সুত্রিতার।
প্রতিবেশী রাজ্যের মহারাজাও যেন
এমন একটা সুযোগের অপেক্ষায়ই
ছিলেন। তাই তি্নি এই মোক্ষম
সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে নিজের
খায়েশ পূরণের রাস্তা তৈরীতে
অগ্রসর হতে থাকেন। শান্তিপূর্ণ
রাজ্যের মধ্যে অনুচর ঢুকিয়ে, তাদের
দ্বারা এমন সব অপকর্ম করে করে দুই
পাত্রের বিরুদ্ধেই এমন ভাবে
অপবাদের বোঝা চাপিয়ে দিতে
থাকে যাতে করে দুই পাত্রের
বিরুদ্ধেই সবার মনে ঘৃণার সৃষ্টি হয়, সেই
সুযোগে মহারাজা স্বীয় পুত্রের পক্ষে
যেন রাজা হায়দার আলীর কাছে
প্রস্তাব পাঠাতে পারে।
ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস ! উদ্ভূত
পরিস্থিতিতে রাজা হায়দার আলীর
ধারণাকে পাশ কাটিয়ে রাজ্যের
সমগ্র প্রজাকে বিভাজিত করে ভাগ
করে দিল দুই শিবিরে ! শান্তির
রাজ্যে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল
অশান্তির আগুন। রাজা পরিস্থিতি
নিয়ন্ত্রনে যার পর নাই চাপ সৃষ্টি করতে
থাকেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর।
কিন্তু রাতের আঁধারে ঘটে যাওয়া
ঘটনার ক্রীড়নকরা অঘটন ঘটিয়েই
সীমান্তের ওপারে গা ঢাঁকা
দেওয়ার কারণে কিছুতেই সকল
বাহিনীর সদস্যগণ সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ও
তদন্তের কোন কূল কিনারা করতে না
পারায় চাকরী ও সম্মান রক্ষার্থে ভুল
মানুষকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়
করাতে থাকে। ফলে মানুষের মনে
আস্থাহীনতাও বাড়তে থাকে দুরন্ত
বেগে ! মুহুর্ত্তে ফুঁসে ওঠে শান্তির
সুশীতল ছায়া তলে বেড়ে ওঠা একটা
ভূ-স্বর্গ সম সুশৃঙ্খল জনপদ !
রাজদুহিতা শ্যামলীর বিয়ে তো দুরের
কথা, মানুষের নির্ঘুম রজনীই হয়ে গেল
রাজা হায়দার আলীর দুঃশ্চিন্তার মূখ্য
কারণ ! আর প্রতিবেশী রাজ্যের
মহারাজাও প্রহর গুনতে থাকে সেই
মাহেন্দ্রক্ষণের !
©somewhere in net ltd.