নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি ও বলতে চাই !

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন

ব্লগিং হউক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন › বিস্তারিত পোস্টঃ

সড়ক খাতের চাঁদাবাজি বনাম কল্যাণ তহবিল বিতর্ক

২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৫১

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে চাঁদাবাজি শব্দটি কোনো নতুন অভিধা নয়। এটি আমাদের জাতীয় জীবনের এক গভীর ক্ষত, যা দশকের পর দশক ধরে সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিকড় গেড়েছে। ফুটপাত থেকে শুরু করে বাসস্ট্যান্ড, কাঁচাবাজার থেকে শিল্পকারখানা, এমনকি নৌপথের লঞ্চঘাট কিংবা নিভৃত পল্লীর জলমহাল কোথাও এই অদৃশ্য হাতের নাগাল থেকে মুক্ত নয়। সাম্প্রতিক সময়ে নবনিযুক্ত সড়ক পরিবহন মন্ত্রী যখন সড়কে সংগৃহীত অর্থকে চাঁদা হিসেবে মানতে নারাজ হয়ে একে " সমঝোতার ভিত্তিতে সংগৃহীত কল্যাণ তহবিল " হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, তখন তা কেবল একটি প্রশাসনিক শব্দচয়ন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের চরিত্র ও আইনের শাসনের ভিত্তি নিয়ে একটি গভীর রাজনৈতিক ও দার্শনিক সংকটের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এই তথাকথিত সমঝোতার আড়ালে যে কী পরিমাণ রক্তপাত, মারামারি আর খুনাখুনি লুকিয়ে আছে, তা টার্মিনালগুলোর পিচঢালা কালো রাস্তার দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
​মাক্স ভেবার রাষ্ট্রের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন যে, রাষ্ট্র হলো সেই প্রতিষ্ঠান, যা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে " বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার " ধারণ করে। এর অর্থ হলো, রাষ্ট্রের বাইরে অন্য কোনো গোষ্ঠী বা সংগঠন বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অর্থ আদায় করতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশের সায়েদাবাদ বা গাবতলী বাস টার্মিনালের চিত্রটি পর্যবেক্ষণ করলে মাক্স ভেবারের এই তত্ত্বের এক শোচনীয় পরাজয় চোখে পড়ে। এখানে বলপ্রয়োগ কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং আক্ষরিক অর্থেই প্রাণঘাতী। রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন বাস টার্মিনালে আধিপত্য বিস্তার আর চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে গত কয়েক দশকে বহুবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশের নথি বলছে, কেবল চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে রাজধানীর সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় গত এক দশকে অন্তত ডজনখানেক খুন হয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়া, প্রতিপক্ষ গ্রুপের ওপর হাতবোমা নিক্ষেপ কিংবা কুপিয়ে জখম করার ঘটনা এখানে নৈমিত্তিক। যখন রাষ্ট্র এই অনানুষ্ঠানিক অর্থ সংগ্রহকে অলিখিত বিধি হিসেবে মেনে নেয়, তখন কার্যত রাষ্ট্র তার একচেটিয়া কর্তৃত্ব ওইসব সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর কাছে ইজারা দেয়। রাজধানীর গাবতলী টার্মিনালে উত্তরবঙ্গগামী বাসগুলোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। সেখানে মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নামে যে অর্থ আদায় হয়, তার নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক নেতাদের মধ্যে যে সংঘাত হয়, তাতে সাধারণ শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র তার সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগে ব্যর্থ হয়ে এক ধরনের ছায়া প্রশাসন বা সমান্তরাল রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে আপস করেছে, যেখানে আইনের চেয়ে অস্ত্রের জোর বেশি।

​দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্ক্স তার " উদ্বৃত্ত মূল্য " তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন যে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতাধর গোষ্ঠীগুলো শ্রমিকের শ্রম থেকে সৃষ্ট অতিরিক্ত মূল্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। বাংলাদেশের পরিবহন খাতের শ্রমিক চালক, হেলপার ও কন্ডাক্টররা সবচেয়ে বেশি শোষিত। সায়েদাবাদ থেকে চট্টগ্রামগামী একজন চালক সারাদিন অতিপরিশ্রম করে যে আয় করেন, তার একটি বড় অংশ তাকে বিভিন্ন স্হানে চাঁদা হিসেবে দিয়ে দিতে হয়। এই চাঁদা দিতে সামান্য দেরি হলে বা অস্বীকার করলে চালক ও হেলপারদের ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। অনেক সময় টার্মিনালের ভেতরেই শ্রমিকদের পিটিয়ে হাত পা ভেঙে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন সড়ক পরিবহন খাত থেকে গড়ে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা চাঁদা হিসেবে আদায় হয়। বছরে এই অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অর্থের সিংহভাগই যায় সেইসব শক্তির কাছে, যারা পেশিশক্তি দিয়ে টার্মিনাল দখল করে রাখে। এই অর্থের সংস্থান হয় সাধারণ মানুষের পকেট থেকে, যা পণ্যের দাম বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতিকে উস্কে দেয়। মার্ক্সের ভাষায়, এটি হলো শোষণের এমন এক কাঠামো যেখানে শ্রমিকের ঘাম আর সাধারণ মানুষের রক্ত জল করা পয়সা একটি ক্ষুদ্র সুবিধাবাদী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর পকেটে স্থিতি পায়।ম​ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো তার " গভর্নমেন্টালিটি " ধারণায় ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, আধুনিক রাষ্ট্র কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং নির্দিষ্ট বয়ান বা ডিসকোর্স তৈরির মাধ্যমে শাসন করে। যখন নবনিযুক্ত মন্ত্রী চাঁদাবাজিকে " কল্যাণ তহবিল " হিসেবে আখ্যা দেন, তখন তিনি ফুকো বর্ণিত সেই " পাওয়ার/নলেজ " কাঠামোকেই ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ, সত্যকে আড়াল করে একটি নতুন " মিথ্যা সত্য " প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, দেশের বিভিন্ন বাস টার্মিনালে যে " কল্যাণ তহবিল " বা " জিপি " আদায় করা হয় তার কত শতাংশ প্রকৃত অর্থে শ্রমিকের কল্যানে ব্যয় করা হয়? বরং এই অর্থ নিয়ে কোন্দলে বাসস্ট্যান্ডে বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ফুকোর তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্র যখন এই অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে একটি " বৈধ ভাষা " দিয়ে ব্যাখ্যা করে, তখন সে আসলে একটি নৈতিক সংকেত দেয় যে, এই সশস্ত্র সংঘাত ও অবৈধ কর্মকাণ্ডই এখন থেকে সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম। এটি ধীরে ধীরে এমন একটি সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করে, যা রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়। ​গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তার " রিপাবলিক " গ্রন্থে সতর্ক করেছিলেন যে, যখন শাসকরা ন্যায়বিচারের পরিবর্তে নিজেদের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন, তখন রাষ্ট্র একটি অন্যায্য ব্যবস্থায় পরিণত হয়। বাংলাদেশের পরিবহন সেক্টরে দীর্ঘদিনের এই চাঁদাবাজি কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি একটি বিশাল ন্যায়বিচারের সংকট। যখন একজন পরিবহন মালিক চাঁদা দিতে না পারায় তার বাসটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, কিংবা কোনো শ্রমিক নেতাকে প্রকাশ্য রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হয়, এবং রাষ্ট্র তাকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন প্লেটোর সেই " অন্যায্য রাষ্ট্র " মূর্ত হয়ে ওঠে। সম্প্রতি কিছু পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭টি ভিন্ন ভিন্ন নামে চাঁদা তোলা হয়। এই চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত অর্ধশত রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত খুনের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আইনের শাসন যেখানে থাকার কথা, সেখানে এই অস্ত্রের শাসন বা জঙ্গলরাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্লেটোর মতে, একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, যেখানে আইন সবার জন্য সমান। কিন্তু এখানে আইন কেবল সাধারণ মানুষের জন্য, আর ‘সমঝোতা’ হলো শক্তিশালী ও সশস্ত্র সিন্ডিকেটের জন্য।

​সমাজবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, কোনো অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তবে তা একটি অলিখিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাতে চাঁদা এখন এমন এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে যে, নতুন কোনো চালক এলে তাকে প্রথমেই শিখিয়ে দেওয়া হয় কোথায়, কাকে, কত দিতে হবে এবং প্রতিবাদ করলে প্রাণহানির ঝুঁকি কতটা। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এটি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে। যখন একজন নাগরিক দেখেন যে পুলিশকে ফোন দেওয়ার চেয়ে স্থানীয় ক্যাডারকে টাকা দিলে তার প্রাণ রক্ষা পায়, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তার আনুগত্য বিলীন হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল শব্দচয়ন পরিবর্তন করলে চলবে না, প্রয়োজন আমূল সংস্কার। সায়েদাবাদ, গাবতলী বা মহাখালীর মতো টার্মিনালগুলোতে নগদ অর্থে চাঁদা তোলা সম্পূর্ণ বন্ধ করে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করতে হবে এবং প্রতিটি খুনের ও মারামারির ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ​পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের এই পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দেবে, নাকি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে সমঝোতার আড়ালে খুনাখুনিকে বৈধতা দেবে? রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার পুলিশ বা সেনাবাহিনীতে নয়, বরং তার নৈতিক বৈধতায়। সেই বৈধতা অর্জিত হয় যখন একজন সাধারণ নাগরিক অনুভব করেন যে, রাষ্ট্র তাকে কোনো গোষ্ঠী বা মাস্তানের কাছে জিম্মি হতে দিচ্ছে না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাষা যখন সাধারণ মানুষের তিক্ত অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যাবে, তখনই শুরু হবে প্রকৃত সংস্কার। এই বিতর্কটিকে একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে সরকারকে উচিত পরিবহন সেক্টরে দীর্ঘদিনের এই রক্তক্ষয়ী চাঁদাবাজি প্রথা চিরতরে বিলুপ্ত করা। নতুবা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও রাজপথের রক্তপাত রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.