নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি ও বলতে চাই !

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন

ব্লগিং হউক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন › বিস্তারিত পোস্টঃ

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও রাষ্ট্রপতির নৈতিক অবস্থান

০১ লা মার্চ, ২০২৬ রাত ১:২২

​২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি অবিনাশী চেতনার নাম। ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন আত্মত্যাগের বিনিময়ে দীর্ঘ দেড় দশকের একটি পাথরচাপা কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটেছিল। এই অভ্যুত্থান ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি রন্ধ্রে চেপে বসা অবিচার, সীমাহীন দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ফ্যাসিবাদ বিলোপের এক চূড়ান্ত গণবিস্ফোরণ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য জনমনে নতুন করে গভীর ক্ষোভ ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। ​রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি হলেন 'ঐক্যের প্রতীক' এবং 'সংবিধানের অভিভাবক'। ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মঁতেস্কু তাঁর 'ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতিতে' নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে যে ভারসাম্যের কথা বলেছিলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি সেই ভারসাম্যের এক আনুষ্ঠানিক কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের নিয়োগ প্রক্রিয়া ও তাঁর রাজনৈতিক অতীত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি শুরু থেকেই একটি নির্দিষ্ট দলীয় বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন। আওয়ামী লীগ মনোনীত এবং একটি বিতর্কিত ও ভোটারবিহীন সংসদের মাধ্যমে নির্বাচিত এই ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক পরিচয় অত্যন্ত স্পষ্ট। পাবনা জেলা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের শীর্ষপদে থাকা এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হওয়া সাহাবুদ্দিন সাহেব কখনোই দলনিরপেক্ষতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এমনকি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তিনি যখন একটি বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদে আসীন ছিলেন, সেই সময়কালটি আর্থিক খাতের জন্য ছিল এক অন্ধকার অধ্যায়। এস আলম গ্রুপের আজ্ঞাবহ হিসেবে ব্যাংকটিকে আর্থিক অন্তঃসারশূন্য করার যে অভিযোগ রয়েছে, তাতে তাঁর নাম জড়িয়ে থাকা রাষ্ট্রপতির মতো মর্যাদাপূর্ণ পদের জন্য এক নৈতিক স্খলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
​সবচেয়ে বড় বিতর্কটি তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রপতির সত্যনিষ্ঠা নিয়ে। ৫ই আগস্ট রাতে তিন বাহিনীর প্রধানকে পাশে নিয়ে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে তিনি স্বয়ং বলেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। অথচ এর দীর্ঘ আড়াই মাস পর সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীর সাথে আলাপকালে তিনি দাবি করলেন, পদত্যাগপত্রের কোনো "দালিলিক প্রমাণ" তাঁর কাছে নেই। এই দ্বিমুখী অবস্থান কেবল রাজনৈতিক অসততা নয়, বরং এটি তাঁর শপথের স্পষ্ট লঙ্ঘন।রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্য তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতার ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দেওয়ার একটি সূক্ষ্ম অপকৌশল ছিল। কারণ, ৫ই আগস্টের ভাষণের ওপর ভিত্তি করেই সেই সরকার সুপ্রিম কোর্টের মতামত সাপেক্ষে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে শপথ নিয়েছিল। রাষ্ট্রপতির এমন বিতর্কিত মন্তব্য ছিল এক ধরনের 'কনস্টিটিউশনাল সাবোতাজ' বা সাংবিধানিক নাশকতা।

​সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো তুলেছেন, তা কেবল ভিত্তিহীনই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচারের পরিপন্থী। তিনি অভিযোগ করেছেন যে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে দেওয়া হয়নি এবং বিশেষ দিবসের ক্রোড়পত্রে তাঁর বাণী প্রচার করা হয়নি। অথচ দেশের সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন যে, প্রতিটি বিশেষ দিবসে সংবাদপত্রের ক্রোড়পত্রে রাষ্ট্রপতি এবং তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বাণী সমানভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত থেকে এমন অসত্য বক্তব্য দেওয়া কেবল মানহানিকর নয়, বরং তাঁর শপথের সরাসরি বরখেলাপ। সাধারন ​জনগণের মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, একজন ব্যক্তি যার আনুগত্য একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি এবং যিনি দীর্ঘকাল স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে কাজ করেছেন, তিনি কীভাবে নতুন বাংলাদেশের অভিভাবক হতে পারেন? ফরাসি দার্শনিক, লেখক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ জঁ-জাক রুশোর 'সামাজিক চুক্তি' মতবাদ অনুযায়ী, শাসকের ক্ষমতার উৎস হলো জনগণের সম্মতি। যখন কোনো শাসক বা রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী কাজ করেন এবং জনগণের বিশ্বাস হারান, তখন তিনি তাঁর পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারান। ৫ই আগস্টের সেই উত্তাল দিনে যখন স্বৈরাচারের পতন হলো, তখন সেই মুহূর্তটি ছিল একটি 'বিপ্লবী মুহূর্ত', যা প্রচলিত যেকোনো কাগজের সংবিধানের চেয়ে ঊর্ধ্বে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন তৈরি হয়েছে, সেখানে এমন একজনকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মেনে নেওয়া কঠিন, যিনি জুলাই বিপ্লবের রক্তের দাগের ওপর দাঁড়িয়ে আগের স্বৈরশাসকের প্রতি ব্যক্তিগত অনুকম্পা বা দুর্বলতা প্রকাশ করেন। ​গুরুতর আরেকটি দিক হলো রাষ্ট্রপতির দ্বৈত নাগরিকত্ব বা বিদেশে বিনিয়োগকারী হিসেবে স্থায়ী বসবাসের অভিযোগ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ ও ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক বা বিদেশের প্রতি আনুগত্য পোষণকারী ব্যক্তি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার অযোগ্য। এই অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তবে এটি কেবল একটি আইনি ত্রুটি নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি এক ধরনের হুমকি। একজন ব্যক্তি যার আনুগত্য অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রতি থাকতে পারে, তিনি কীভাবে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে বহাল থাকেন, তা এক বিরাট জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি।

​বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও এখানে পর্যালোচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলের অবস্থান শুরু থেকেই কিছুটা দোদুল্যমান ছিল। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তাঁর ' পলিটিকাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং সোসাইটি ' গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, উত্তরণকালীন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দোদুল্যমানতা প্রায়শই পুরনো ব্যবস্থাকে ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়। ৫ই আগস্টের বিপ্লব কোনো সংবিধানের ধারা মেনে হয়নি, বরং তা ছিল সংবিধানের ওপর জনগণের চূড়ান্ত কর্তৃত্বের বহিঃপ্রকাশ। সুতরাং, রাষ্ট্রপতিকে সরানোর ক্ষেত্রে সেই সময় কেন বারবার সেই বিতর্কিত সংবিধানের দোহাই দেওয়া হয়েছিল, যা নিজেই স্বৈরাচারী সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষতবিক্ষত?
​আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সেখানে ভাষণ দেবেন। সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে, তাঁর ভাষণে বিগত সাড়ে ১৫ বছরের অপশাসনের চিত্র উঠে আসবে। এটি অত্যন্ত বিদ্রূপাত্মক যে, যে ব্যক্তি নিজে সেই শাসনের অংশ ছিলেন এবং যাঁকে সেই ফ্যাসিবাদই ক্ষমতায় বসিয়েছিল, আজ তাঁর মুখ থেকেই সেই শাসনের সমালোচনা শুনতে হবে। দেশের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল নতুন বাংলাদেশের নতুন সংসদ শুরু হবে একজন নির্ভেজাল, নিরপেক্ষে এবং জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণকারী ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে।

​২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ৫৭টি মেধাবী সেনা কর্মকর্তার জীবনহানি থেকে শুরু করে জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে হাজারো ছাত্র-জনতার রক্ত রাষ্ট্রপতির স্মৃতিতে কোন শোক ই দাগ কাটে নাই বরং তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকতে জুলাই বিপ্লবীদের সাথে এক ধরনের প্রতারণা করে জাতির অভিভাবক হওয়ার যোগ্যতা অনেক আগেই হারিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি পদটি স্রেফ ক্ষমতার অলঙ্কার নয়, এটি সুমহান চারিত্রিক গুণাবলী ও নৈতিকতার প্রতীক। যখন দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী তাঁর ওপর আস্থা হারিয়েছে এবং তাঁর বক্তব্য বারবার জাতীয় সংহতিকে বিব্রত করছে, তখন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করাই ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে সম্মানজনক পথ। ​পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশ এখন এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আমরা একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র এবং স্বচ্ছ বিচারিক ব্যবস্থা চাই। সেই লক্ষ্য অর্জনে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের চেতনার ভিত্তিতে যে যাত্রা শুরু হয়েছে, তাকে কোনোভাবেই কলুষিত করা যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যেক জাতীয় সংকটে একমত হওয়া। একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে সরিয়ে একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয়, নিরপেক্ষ এবং জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণকারী ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়াই হবে এই মুহূর্তের শ্রেষ্ঠ সমাধান। জনগণের সম্মিলিত শক্তিই শেষ কথা, আর সেই শক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করাই হবে আমাদের মাতৃভূমির জন্য চূড়ান্ত মঙ্গল।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.