নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি ও বলতে চাই !

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন

ব্লগিং হউক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন › বিস্তারিত পোস্টঃ

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ গণতন্ত্র বাঁচাতে কঠিন সিদ্ধান্ত

১৩ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৭

পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এটি কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার একটি আইনী ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়ায়। বিশ শতকের ইউরোপ থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকা বা এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যখনই কোনো রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনগণের ওপর স্টিম রোলার চালিয়েছে, তখনই সেই শক্তিকে রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার যে প্রক্রিয়স সম্পন্ন হয়েছে, তাকেও এই বিশ্বজনীন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মানদণ্ডেই বিচার করতে হবে।

​আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি কেবল একটি তাৎক্ষণিক আবেগীয় বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক সিদ্ধান্ত ই নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে আওয়ামী লীগের সুদীর্ঘ দেড় দশকের সুসংগঠিত ফ্যাসিবাদী শাসন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংসসাধন এবং সর্বোপরি পরিকল্পিত গণহত্যা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ডট তাঁর " দ্য অরিজিনস অব টোটালিটারিয়ানিজম " গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ফ্যাসিবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি সত্য ও মিথ্যার ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দেয় এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে " আইনসম্মত " রূপ দান করে। শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশ ঠিক এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই অতিবাহিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার পনের বছরের শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছিল উন্নয়ন এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে যা প্রকৃতপক্ষে ছিল একটি সর্বগ্রাসী একনায়কতন্ত্র। এখানে সংবিধানকে সংশোধনীর নামে কাটছাঁট করে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরকে দলীয় ক্যাডার বাহিনীতে রূপান্তর করা হয়েছিল। ​একটি রাজনৈতিক দল যখন তার আদর্শিক চরিত্র হারিয়ে একটি " ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’" বা অপরাধী চক্রে পরিণত হয় তখন তাকে আর সাধারণ রাজনৈতিক দলের সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির নাৎসি পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল কারণ তাদের অস্তিত্ব ছিল মানবসভ্যতার জন্য হুমকিস্বরূপ। একইভাবে ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। জার্মানির বর্তমান সংবিধানে " মিলিট্যান্ট ডেমোক্রেসি " বা প্রতিরক্ষামূলক গণতন্ত্রের যে ধারণাটি রয়েছে, তার মূল কথা হলো গণতন্ত্রকে সেই সব শক্তি থেকে রক্ষা করতে হবে যারা গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে গণতন্ত্রকেই ধ্বংস করতে চায়। আওয়ামী লীগ গত তিনটি নির্বাচনে (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে এবং রাষ্ট্রের সকল গণতান্ত্রিক স্তম্ভ ভেঙে দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, তারা এই " প্রতিরক্ষামূলক গণতন্ত্রের " ধারণায় নিষিদ্ধ হওয়ার যোগ্য। ​আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত অপরাধগুলো কেবল দুর্নীতি বা অপশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ। পিলখানা হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে শাপলা চত্বরের বিভীষিকা, এবং সর্বশেষ ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ওপর হেলিকপ্টার থেকে স্নাইপার দিয়ে গুলি চালিয়ে শিশুদের বুক ঝাঁঝরা করে দেওয়া সেই সাথে হাজার দুয়েক আন্দোলনরত সাধারণ মানুষকে হত্যা এসবই একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় গণহত্যার অংশ। যখন কোনো দল নিজের দেশের সাধারণ নাগরিক, ছাত্র এবং শিশুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন সেই দলের রাজনৈতিক বৈধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। আয়নাঘরের মতো গোপন টর্চার সেল তৈরি করে ভিন্নমতাবলম্বীদের গুম করা এবং বছরের পর বছর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা, ক্রসফায়ারে নামে বিনাবিচারে দেশের সাধারণ নাগরিক হত্যা কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি হতে পারে না এটি কেবল একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের পক্ষেই সম্ভব।

​দার্শনিক ফ্রাঁৎস ফ্যানন তাঁর " দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ " গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, দীর্ঘদিনের শোষিত জনগোষ্ঠী যখন মুক্তি পায়, তখন শোষকের প্রতিটি প্রতীক এবং চিহ্নের সমূলে বিনাশ ছাড়া প্রকৃত মুক্তি আসে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ কেবল একটি দল নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত ফ্যাসিবাদের নাম। এই দলের অঙ্গসংগঠনগুলো, বিশেষ করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনপদে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। আবরার ফাহাদের মতো মেধাবী ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা ছিল এই প্রাতিষ্ঠানিক ফ্যাসিবাদের একটি ক্ষুদ্র উদাহরণ মাত্র। তাই এই ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধ করতে হলে এর মূল শিকড় উপড়ে ফেলা অপরিহার্য।

২০২৫ সালের ১১ই মে তারিখে " সন্ত্রাসবিরোধী আইন- ২০০৯ " সংশোধন করে ওই অধ্যাদেশ জারি করে পরদিনই এর ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। গত ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার অধ্যাদেশটি বিল আকারে সংসদে পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার যে চুড়ান্ত আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে , তা মূলত এই ঐতিহাসিক শুদ্ধি অভিযানেরই অংশ। ​অনেকে ই প্রশ্ন করেন আওয়ামী লীগের মত একটি প্রাচীন দলকে নিষিদ্ধ করা কি আদৌ কোন গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ? উত্তর হলো গণতন্ত্র কোনো আত্মঘাতী চুক্তি নয়। যদি কোনো দল গণতন্ত্রের সিঁড়ি বেয়ে ক্ষমতায় এসে সেই সিঁড়িটিই ভেঙে দেয় এবং পুনরায় ক্ষমতায় থাকার জন্য রাষ্ট্রকে বধ্যভূমিতে পরিণত করে, তবে সেই দলকে নিষিদ্ধ করাই গণতন্ত্রকে রক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায়। নিকোলো মেকিয়াভেলি বলেছিলেন, ভয় দেখিয়ে শাসন করা যায়, কিন্তু যখন সেই ভয় ঘৃণায় রূপ নেয়, তখন শাসনের পতন অনিবার্য। আওয়ামী লীগ কেবল ঘৃণা নয়, জনগণের মধ্যে এক গভীর ট্রমা বা মানসিক ক্ষত তৈরি করেছে। এই ক্ষত নিরাময়ের প্রথম ধাপ হলো আওয়ামী লীগের মত অপরাধী সংগঠনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বর্জন করা। ​তবে কেবল একটি দলকে কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ করাই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তাঁর " দ্য থার্ড ওয়েভ " গ্রন্থে আমাদের সতর্ক করেছেন যে, স্বৈরশাসনের পতনের পর যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার না হয়, তবে পুনরায় একনায়কতন্ত্র ফিরে আসতে পারে। তাই বর্তমানে জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো পুলিশ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ সহ সকল রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয়করণ মুক্ত করা। পুলিশকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন তারা কোনো ব্যক্তির বা দলের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ না করে। ইতালির " শেলবা আইন " যেমন ফ্যাসিস্ট আদর্শ প্রচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে, বাংলাদেশেও তেমনি ফ্যাসিবাদের কোনো রূপ যেন ভবিষ্যতে মাথাচারা দিয়ে না উঠতে পারে, সেজন্য আইনি ও সাংস্কৃতিক মহাপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে ​আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার এই ঘটনাটি বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও একটি বড় বার্তা হয়ে দাঁড়াবে । এটি প্রমাণ করে যে, জনগণের ওপর স্টিম রোলার চালিয়ে এবং বন্দুকের নলে ক্ষমতা দখল করে চিরকাল টিকে থাকা যায় না। প্রতিটি গুলির হিসাব এবং প্রতিটি গুম-খুনের বিচার প্রকৃতির নিয়মেই সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশের মানুষ আজ এক নতুন ভোরে আলোয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই নতুন বাংলাদেশে রাজনীতির সংজ্ঞায় পরিবর্তন আসতে হবে। রাজনীতি হবে সেবা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার নাম, দমন-পীড়নের নয়।

​আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধকরণ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের নাগরিক অধিকার রক্ষার একটি চূড়ান্ত ফয়সালা। জুলাইয়ের শহীদদের রক্তস্নাত এই বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের কোনো ঠাঁই হতে পারে না। একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ে তোলার পথে এই সিদ্ধান্তটি ছিল সবচেয়ে বড় বাধা অপসারণ। এখন সময় হলো জাতীয় ঐক্য গড়ার এবং এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করার যেখানে ক্ষমতা থাকবে প্রকৃতপক্ষেই জনগণের হাতে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দান থেকে আওয়ামী লীগের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের যে অন্ধকার অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে তার ছাই থেকেই জন্ম নিক এক নতুন, ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ। এই নিষিদ্ধকরণ হোক সেই দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ যাত্রার প্রথম এবং অনিবার্য পদক্ষেপ।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.