নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি ও বলতে চাই !

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন

ব্লগিং হউক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন › বিস্তারিত পোস্টঃ

ব্যাংক রেজল্যুশন আইন আমানতকারীদের সুরক্ষা নাকি লুটেরাদের পুনর্বাসন?

১৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:৫৯

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় হলো ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন লুটপাট। আওয়ামী লীগের শাসনামলের দেড় দশকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দেশের সাধারণ মানুষের আমানত রক্ষার নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহৃত না হয়ে কিছু বিশেষ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অর্থ লোপাটের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর তথ্যমতে, শেখ হাসিনার শাসনামলেের পনের বছরে মাত্র ২৪টি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির মাধ্যমে প্রায় ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের হালনাগাদ গবেষণা বলছে, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপ এককভাবেই কয়েকটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে। ২০০৯ সালে যেখানে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, আজ তা অফিশিয়াল হিসাবে সাড়ে ৩ লক্ষ কোটি আর প্রকৃত হিসাবে ৭ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের দাবি ছিল এই লুণ্ঠিত অর্থের পুনরুদ্ধার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। কিন্তু বর্তমান সরকারের " ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬ " সেই গণদাবিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে লুটেরাদের পুনর্বাসনের এক নির্লজ্জ নীল নকশা হাজির করেছে।

গত ​১০ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে যে " ব্যাংক রেজল্যুশন বিল " পাস করালেন তা মূলত সংস্কারের নামে এক বিশাল শুভঙ্করের ফাঁকর ই বহিঃপ্রকাশ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে " ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫ " জারি করেছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল যেসব ব্যাংক লুটপাটের কারণে দেউলিয়া হয়েছে, সেগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং অপরাধী মালিকদের চিরতরে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই সেই অধ্যাদেশকে বিলে রূপান্তরের সময় এমন এক ধারা যুক্ত করেছে, যা পুরো সংস্কার প্রক্রিয়াকে তামাশায় পরিণত করেছে। আলোচিত এই ১৮(ক) ধারাটি মূলত ব্যাংক লুটেরাদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি বিশেষ সুবিধার ই অংশ বিশেষ মাত্র। এই ধারার মাধ্যমে একীভূত হওয়া বা " রেজল্যুশন " প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলোর পুরোনো মালিকদের পুনরায় ফিরে আসার আইনি পথ তৈরি করা হয়েছে। ​নতুন এই আইনের শর্তাবলি বিশ্লেষণ করলে যেকোনো বিবেকবান মানুষ আঁতকে উঠবেন। যে মালিকরা হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছেন, তারা এখন সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিয়োগ করা অর্থের মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করেই মালিকানা ফিরে পাওয়ার আবেদন করতে পারবেন। বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধের জন্য তারা পাবেন দুই বছরের দীর্ঘ সময় এবং তাও মাত্র ১০ শতাংশ সরল সুদে। এটি কি কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া, নাকি অপরাধীদের জন্য কিস্তিতে মালিকানা কেনার এক আকর্ষণীয় বিলাসিতা? যে সাধারণ গ্রাহক আজ ব্যাংকে নিজের গচ্ছিত আমানত ফেরত পাচ্ছেন না, তাদের প্রতি সরকারের এই চরম অবজ্ঞা ও দায়িত্বহীনতা অবশ্যই কোন ভাবে গ্রহনযোগ্য হতে পারে না।

​অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এই বিলটিকে " বিচারহীনতার সংস্কৃতির নতুন সংস্করণ " হিসেবে দেখছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ( টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তিনি একে ‘আত্মঘাতী’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর মাধ্যমে চোরতন্ত্রের সাময়িক বিরতির পর পুনরায় তাদের পুনর্বাসনের পথ সুগম করা হয়েছে। যে এস আলম গ্রুপ বা নাসা গ্রুপ ব্যাংক খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের হাতেই আবার দায়িত্ব তুলে দেওয়া মানে হলো সুশাসনকে এক নিষ্ঠুর পরিহাসে পরিণত করা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিলটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গঠিত কমিটি এবং খোদ বাংলাদেশ ব্যাংক এই ১৮(ক) ধারা যুক্ত করার বিপক্ষে ছিল। কিন্তু কোন অদৃশ্য জাদুর ছোঁয়ায় বা কার স্বার্থে শেষ মুহূর্তে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তা আজ দেশবাসীর কাছে এক বিশাল প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ​সরকারের এই দ্বিমুখী নীতি আমানতকারীদের মনে আস্থার সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। একদিকে সরকার বলছে তারা আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চায়, অন্যদিকে লুটেরাদের জন্য ফেরার পথ উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। এটি কি সেই সংস্কার যা নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল? বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, কোন মানদণ্ডে এই পুনর্দখলের বিনিময় মূল্য নির্ধারিত হবে? আর যারা অতীতে আমানত লুণ্ঠনের পাইওনিয়ার ছিলেন, তারা যে পুনরায় দায়িত্ব পাওয়ার পর স্বচ্ছতার সাথে ব্যাংক পরিচালনা করবেন তার গ্যারান্টি কে দেবে? সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে এমন নিশ্চয়তা দেওয়া কীভাবে সম্ভব? বাস্তবে এটি তথাকথিত শর্ত পূরণের নামে নতুন করে ঋণ আদায়ের সুযোগ তৈরি করে দেবে এবং ব্যাংক খাতে গভীরতর দেউলিয়া পনার দ্বার উন্মোচন করবে, যার চূড়ান্ত বোঝা বইতে হবে দেশের সাধারণ জনগণকে।

ইতোমধ্যে ​ইসলামী ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আমানতকারীদের মধ্যে যে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যা আগামীর এক ভয়াবহ সংকটের ইঙ্গিত। আমানতকারীরা যখন কিছুটা আশ্বস্ত হতে শুরু করেছিলেন, ঠিক তখনই বিতর্কিত মালিকদের ফেরার খবর সেই আস্থায় বড় ফাটল ধরিয়েছে। গ্রাহকরা যদি আতঙ্কিত হয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার হিড়িক শুরু করেন, তবে পুরো আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়া কেবল সময়ের ব্যাপার। বর্তমান সরকারের এই অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত কেবল অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বরং এটি রাজনৈতিকভাবেও সরকারের নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ​একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেখানে আইনের শাসন থাকার কথা, সেখানে অপরাধীদের পুরস্কৃত করার এমন উদাহরণ নজিরবিহীন। ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, সাবেক মালিকরা অঙ্গীকারনামা দিয়ে আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু এই অঙ্গীকারনামার বাস্তবায়ন হবে কীভাবে? যারা অতীতে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন, তারা পাচার করা সেই অর্থের সামান্য অংশ দিয়েই পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেবেন এটি কি রাষ্ট্রীয়ভাবে মানি লন্ডারিংয়ের বৈধতা দেওয়া নয়? এই আইন আর্থিক খাতে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করবে। সংস্কারের যে স্বপ্ন অন্তর্বর্তী সরকার দেখিয়েছিল, বর্তমান সরকারের এই পদক্ষেপ তার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। ​বর্তমান সরকারের এই দায়িত্বহীনতা কেবল ব্যাংক খাতের সুশাসনকেই ধ্বংস করবে না, বরং তা বিনিয়োগ পরিবেশকেও বিপন্ন করবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন দেখবেন যে লুণ্ঠনকারীরাই পুনরায় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বসছে, তখন তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আস্থা হারিয়ে ফেলবেন। এই দ্বিমুখী নীতি মূলত সুবিধাবাদী গোষ্ঠীতন্ত্রের স্বার্থরক্ষার এক হীন প্রচেষ্টা। একটি গণতান্ত্রিক সংসদ থেকে এমন গণবিরোধী আইন পাস হওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে যদি সত্যিই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হয়, তবে এই বিতর্কিত ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’ এর ১৮(ক) ধারা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। অপরাধীদের পুনর্বাসন নয়, বরং তাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার করাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সরকার যদি এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে, তবে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় এবং দেশের অর্থনীতি এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। জনআকাঙ্ক্ষাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে লুটেরাদের স্বার্থরক্ষা করার এই পরিণতি কখনো শুভ হতে পারে না। ইতিহাসের পাতায় এই দায়িত্বহীনতা এক কালো অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.