নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

কি হবে আমার ব্যাপারে জেনে? কোন লাভ নেই! তবে আমি এই চোখ দিয়ে যা দেখি, তা যদি আপনাদেরকে দেখাতে পারি, তাহলে হয়তো আপনাদের লাভ আছে। \n\n

ঈয়াশিফ তাশমীদ

ঈয়াশিফ তাশমীদ › বিস্তারিত পোস্টঃ

হঠাৎ একদিন

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১২:৪৫

সকালে আকস্মিক বৃষ্টির কারনে একটা বহুতল ভবনের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলাম। প্রথমে দারোয়ান দাঁড়াতে আপত্তি জানিয়ে চলে যেতে বলেন। আমি চলেই যাচ্ছিলাম! পরে উনার মনে কি বোধদয় হলো জানিনা। উনি আমাকে বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকতে না দিয়ে ভিতরে ঢোকালেন এবং নিচতলায় সিঁড়ির পাশে উনার ব্যক্তিগত রুমের বাহিরে বসতে দিলেন।
- অনেক ধন্যবাদ চাচা। আসলে হুট করে বৃষ্টি এলো তো! আর আশেপাশে কোন আশ্রয় নেওয়ার জায়গা পাইনি তাই বাধ্য হয়ে আপনাদের বিল্ডিং এর নিচে এখানেই দাঁড়ালাম।
- আসলে বাজান! আম্নে কিছু মনে কইরেন না। বাড়িওয়ালা বিল্ডিং এর সামনে কেউ দাঁড়াইয়া থাকলে খালি আমার লগে চিল্লায়। তাঁর ঘরে সেয়ানা দুইডা মাইয়া আছে। ভারছিতিতে পরে। তাই সব সময় ডরে থাকে! যদি মাইয়া কারো লগে প্রেম পিরিতি কইরালায়। তাই তোমারে দাঁড়াইয়া থাকতে দেইখা যাইতেগা কইছিলাম।
- ও আচ্ছা! তা চাচা। আপনার বয়সতো অনেক !আপনি আমার বাবার চেয়েও কম করে হলেও ২০ বছরের বড় হবেন। তা এই বয়সে এখনও কাজ করছেন? ছেলে মেয়ে নেই?
- হ বাজান! [একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে] যুদ্ধের সময় আমার বয়স আছিলো কুড়ি। তহনই বিয়া করছিলাম। বউডা ৩ টা পোলা বিয়াইয়া মইরা গেলো। মরছিলো কইলাম ৮০ সনে। এরপর পোলাগো দেখাশোনার লাইগা আমি আরেকটা বিয়া করি। আমি হারাদিন কাম কইরা আইয়া খালি শুনতাম সৎ মায় পোলাপাইনগোরে ধইরা মাইর ধইর করে। ওরা খালি আমার দারে বিচার দেয়। নতুন মায় পিডায়। ঠিক মতন খাওন দেয়না।
বাজান! বউ মইরা যাওনের পর আমি বিয়া করতে চাইনাই এই ভয়ে যে নতুন মায় আমার পোলাপাইন গুলারে কি নিজের মতন আদর করবতো? কিন্তু আত্মীয় স্বজনের চাপে পইড়া আমি নতুন বিয়াডা করছিলাম। তয় নতুন বিয়াডা করার পর নতুন বউয়ের সব অন্যায় আমি দেইখাও কিছু কইতে পারতাম না। কি জানি হেয় আমারে কি জাদুটোনা করছিলো। হের মুখের উপর দিয়া কিছু কইতে পারতাম না। কইতে গেলেই খালি আমারে চইলা যাওনের ডর দেহাইতো। আমার আগের বউডা কইলাম দেখতে কালা আছিলো। আর নতুন বউ আছিলো দুধের লাহান সাদা। তাই ওরে হারানোর ভয়ে আমি মুখ বুইজা থাকতাম আর পোলাপাইনগরে উলটা বকা দিতাম।
[ বলতে বলতে উনি থেমে গেলেন। আমি লক্ষ্য করছি উনার চোখ দিয়ে অঝরে পানি ঝরছে।]
- তারপর চাচা?
- তারপর বাজান! হগলদিনের লাহান সকালে আমি কামে গেছি। আমার ছোট পোলাটায় আবার ঘুঘু পক্ষী পালে। অয় দুয়ারে ঘুঘু পক্ষিরে ধান খাওয়াতাছিলো। হুট নতুন বউয়ের মুরগী আর বাচ্চাগুলান দৌড়াইয়া আইসা ঘুঘুর সব ধান খাইয়ালাইছিলো। এইডা দেইখা ছোট পোলায় ক্ষেইপা যাইয়া মুরগীরে সই কইরা অনেক বড় মাটির ঢিল মারছিলো। মুরগীরে লাগেনাই। তয় জাগাতেই ৩ টা মুরগীর বাচ্চা মইরা গেছে আর দুইডা আধমরা।
ঢিল মাইরা ছোড পোলায় হইয়া গেলো বেক্কল। অয় ভাবেও নাই মুরগীগুলান মইরা যাইবো। ভয়ে পোলাডায় অইহানেই দাঁড়াইয়া থরথর কইরা কাঁপতাছিলো। ছোট বউ মুরগীর চিল্লান হুইন্না দৌড়াইয়া আহে ! ওরে হাতে নাতে পাইয়া ধারেই আছিলো গজারীর চিরা কাঠ! হেইডা দিয়া আমার এতিম পোলাডারে ইচ্ছা মতন পিডাইছে। বাজান! এহনও মনে হয় হেই দাগ ওর শরীলে পাওয়া যাইব। ইচ্ছামতন পিডাইয়া অইহানেই ফালাইয়া রাখছে। আমার বড় পোলাডা মামা বাড়িত কইলাম আছিলো না। অয় থাকলে এত পিডাইতে পারতো না । মাইজাটা আছিলো কিন্তু অইডাই বলদ। নতুন বউরে জমের মত ডরাইতো।
সন্ধায় আমি কাম সাইরা আইয়া দেহি। পোলাডায় আমার দুয়ারে পইড়া তহনও ব্যাথায় কাতরাইতাছে। আমি দৌড়াইয়া গেলাম। ওর শরীরে মাইরের দাগ দেইখা আমার নিজের গায়ে কাঁটা দিয়া উঠছিলো। পুরা পিঠ আর বুক ছিল্লা গেছে। রক্ত শুকাইয়া পুরা শরীর কালা হইয়া গেছে। মোটা মোটা মাইরের দাগ। মাইজডা পাশে আছিলো। অয় আমারে পুরা কাহিনী কইলো। পোলার এই অবস্থা দেইখা বাজান আমি ঠিক থাকতে পারিনাই। নতুন বউরে যাইয়া জিগাইলাম
- "তুই মানুষ?" এমন কইরা কেউ কাউরে মারে? তুই সীমার ! তোর মনে কোন দয়ামায়া নাই। এই লাইগাই বিয়ার এতদিন হইলো তোর নিজের ঘরে পোলাপাইন হইলো না।"
- আমি যা করছি! ভালা করছি। আবারও করুম যদি এমন করে তোর পোলায়। আর তোর এমন জাওরা বীজের পোলাপাইন আমার লাগবো না। এমন পোলাপাইন আমার হইলে হেইডিরে মাইরালামু। "
যাইহোক, আমার উচিত আছিলো বাজান ওরে পিডানো কিন্তু আমি পিডাই নাই। ওর লগে বেশ তর্ক হইলো। এরপর আমি গামছা ভিজাইয়া আমার পোলাডার পুরা শরীর মুইছা দিছি। কাঁটা জায়গায় হলুদ বাটা লাগাইয়া দিছি। এরপর পোলাপাইনডিরে ভাত খাওয়াইয়া রাইতে ঘুমাইতে গেছি।
ঘুমানোর আগে অনেকক্ষন কানছি। কানতে কানতে কখন ঘুমাইয়া পড়ছি খেয়াল নাই। হঠাত ঘুমের ঘরেই আল্লাগো কইয়া চিল্লাইয়া উঠছি। চাইয়া দেহি! আমার বড় পোলায় একবার আমারে বড় হাসুয়া দিয়া কোপাইতাছে আরেকবার ওর নতুন মারে। আমারে দুইডা কোপ দিলেই আমি জান বাঁচাইতে লাফ দিয়া নাইমা বাইরে আইসা পড়ি। বাইরে থাইক্কা নতুন বউয়ের গোঙানির আওয়াজ পাইতাছিলাম। আর বড় পোলায় কইতাছিলো, -
" খাংকি! মাগী! তোর মায়রে *দি! তোর এত বড় সাহস আমার ছোট ভাইয়াডারে মারছস। এহন মারবি না? আয় মার ! আরে মার না মাগী!
মনের হাউস মিটাইয়া বউডারে কোপাইলো। পোলায় আমার রক্তমাহা শরীর লইয়া একহাতে হাসুয়া আরেক হাতে নতুন বউয়ের কল্লা লইয়া দরজার বাহিরে আইয়া বইলো। বড় বউয়ের রক্তমাখা কল্লা দেইখা আমি জাগাতেই জ্ঞান হারাইলাম।
পরে শুনছিলাম বড় পোলায় একদম পাথরের মত দুয়ারে বইয়া আছিলো। কোন নড়াচড়া নাই। মাইজ্জাটা আর ছোটটায় ভয়ে আমারে জড়াইয়া ধইরা পাশেই আছিলো।
চিল্লা চিল্লি শুইনা! আশেপাশের বাড়ির মানুষজন আইয়া হাজির হইছিলো। তয় কেউ ডরে ধারে আহে না। বিয়ান হইতে হইতে পুরা বাড়ি মানুষে গিজগিজ করতাছিলো। কেডা জানি, থানায় খবর দিয়া আইছিলো। ফর্সা হইলে থানা হইতে দারোগারা আইসা আমার পোলাডারে গ্রেপ্তার কইরা লইয়া যায় বাজান।
এতকিছু ঘইটা গেছে তয় আমি কিছুই টের পাইনাই। হুশ আইলে দেহি আমার আগের ঘরের শালা সমন্ধীরা আর নতুন বউয়ের আত্মীয়রা আইছে। ওরাই ডাক্তার আনছে। আমার শরীলে নাকি দুইজায়গায় ২০ কইরা সেলাই দিতে হইছিলো।
[ বলতে বলতে বয়স্ক চাচায় আমারে উনার জামা খুলে বুকের দাগগুলো দেখাচ্ছিলেন]
কি থাইক্কা কি হইলো। আমার তখনও মনে হইতাছিলো আমি স্বপন দেখতাছি।
- এরপর?
হেরপর বাজান! বড়পোলাডারে বাঁচাইতে জমিজামা বেইচা কেস লড়ি। তয় আমার পোলাডার ১০ বছরের জেল হইয়া যায়।অল্প বয়স দেইখা ফাঁসি যাবজ্জীবন হয়নাই।
৮৫ সনের কথা তহন বাজান। গ্রামে কাম কাজের বড়ই অভাব। না খাইয়া মরার মত অবস্থা। তহন এই বাড়ির মালিক আমাগো গ্রামে হেগো অনেক ভালা অবস্থা! হেয় গ্রামে বেড়াইতে যায়। হেয় তহন এই বাড়িডা নতুন বানাইবো। তাই এইডার ২৪ ঘন্টা দেহাশোনা করার লাইগা একটা মানুষ লাগতো। তহন আমারে পাইয়া ঢাহায় নিয়া আহে। আমিও পোলা দুইটারে এক বিধবা বইনের কাছে রাইখা ঢাহায় আহি। মাসে যা কামাই করতাম পোলাপাইনগুলারে পাডাইতাম। এরপর বাড়ি বানান শেষ হয়। আমি যাইতেগা চাইলেও আমারে অনেক ভালা জানে বইলা বাড়ির দারোয়ানের কামটাও আমারেই দিয়া দেয়।
আস্তে আস্তে পোলাপাইন বড় হয়। বিয়া শাদী করে। জমিজমা যতটুকুই আছেই ভাগ কইরা দেই। তয় আমার বড় পোলাটায় জেল থাইক্কা ছাড়া পাইলেও আর বাড়িত ফিরে নাই। অয় কই আছে কইতে পারুম না।
৫ বছর আগে দারোয়ানীর চাকরী ছাইড়া একবারে গ্রামে গেছিলাম। ভাবছিলাম শেষ বয়সটা পোলাপাইন নাতি পুতি ওগো লগে কাটামু। কিন্তু বাজান! অইহানে শান্তি পাইনাই। পোলা বউ নাতিপুতি কেউ দেখতে পারেনাই আমারে। তাই ২ মাস শেষে সইজ্য করতে না পাইরা আবার এখানেই ফেরত আইছি। বাড়িওয়ালা ফেরেশতার মত মানুষ নাইলে হেয় আমারে কামে আবার রাখত না। তাই মরার আগ পর্যন্ত এনার এখানেই কাম কইরা মরতে চাই। তয় মাঝে মাঝে নাতিপুতি, পোলা তিনডারে দেখতে মন চায় কিন্তু ওগোর তো আমারে দেখতে চায়না। আমি কি এতটাই খারাপ মানুষ বাজান।
[বৃদ্ধ লোকটি কাঁদছেন । এই বৃদ্ধলোকটিকে শান্তনা দেওয়ার ভাষা আমার নেই। জীবনে যা কিছুই করেছেন একটু শান্তিতে থাকার জন্য করেছেন। তবে ভাগ্য তাঁর জন্য সুপ্রসন্ন ছিল না। তাই তাঁর বাকি জীবনেও শান্তি আসবে বলে মনে হয়না। তবে উনার সন্তানদের ভবিষ্যতেও এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবেই ঘটবেই। যারা বাবা মাকে কষ্ট দেয় তাঁদের জন্যও এমন কষ্ট অপেক্ষমান]
- চাচা বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। আমি তবে আজ আসি।
- চইল্লা যাইবা বাজান?
- জী চাচা অনেক দেরী হয়ে গেলো। একটা বিশেষ কাজও আছে।
- তয় আচ্ছা যাও! তয় একটা কথা বাজান জীবনে দুইটা বিয়া জীবনেও কইরো না। একজনকে নিয়ে সুখে থাকার চেষ্টা করবা। আর বউ মইরা গেলেও যদি পোলাপাইন থাকে তয় আমার মত নতুন বিয়া কইরো না।
তাইলে জীবনটা ছারখার হইয়া যাইবো। আমি চাইনা আমার মতন ভুল আর কেউ করে।
আবার আইসো বাজান। মাঝে মাঝে আইসো এই বুড়া চাচার কাছে! এতক্ষন ছিলা কিছু খাওয়াতেই পারিনাই। রোজার দিন।
- জী চাচা আমি রোজা! তবে আমি আবার আসব। আপনার জীবনের কাছ হতে আমার অনেক অভিজ্ঞতা শিক্ষা নেওয়া বাকি আছে। সেটা নেওয়ার জন্য আসব। আর অবশ্যই সামনের বার না খেয়ে যাব না! আসি চাচা। ভালো থাকবেন! আসসালামু আলাইকুম!
আমি চলে আসার সময় লোকটি আমাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিলো। একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি উনি তখনও আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি দৃশ্যের বাহিরে না যাওয়া পর্যন্ত ছিলেন। এভাবেই কিছু মানুষ অল্প সময়ের জন্য পরিচিত হয়েও জীবনের একটা অংশ হয়ে যায়।
- ঈয়াশিফ তাশমীদ মাশতাদ।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.