| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
একসময় এদেশে রেডিও ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় গণমাধ্যম। কিন্তু গত দেড় দশকে এ সমপ্রচার মাধ্যমটি অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে। জনপ্রিয়তা হারানোর অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হলো, গতানুগতিক ‘বস্তাপঁচা’ আধেয় এবং ৯০’র দশকের পর ঘরে ঘরে টেলিভিশন ও স্যাটেলাইট চ্যানেলের প্রবেশ। এর ফলে যেটা হলো, এদেশের বেশিরভাগ মানুষ রেডিও শোনা প্রায় ভুলেই গেল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, রেডিও বলে একসময়ের যুগান্তকারী এই যন্ত্রটি হারিয়ে যেতে বসল। দু’টি ইন্দ্রিয় একসঙ্গে সচল রাখার ক্ষমতা থাকায় টেলিভিশনের হাতে তখন ছিল পুরো রাজত্ব। কিন্তু কীভাবে যেন একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসে অনেকেই আবার রেডিও’র শ্রোতা হয়ে উঠলেন। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে রেডিও হয়ে উঠল নতুন এক সম্প্রচার মাধ্যম। তবে এই রেডিও আগেকার সেই এএম১ রেডিও নয়; নতুন প্রযুক্তি এফএম২ রেডিও আর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোবাইল ফোন। ২০০৬ সালে বেসরকারিভাবে রেডিও টুডে’র মাধ্যমে দেশে এফএম’র যাত্রা শুরু করে। জনপ্রিয়তার কারণে দিন দিন তার দল ভারি হয়েছে। রেডিও ফুর্তি, রেডিও আমার, এবিসি রেডিও, পিপলস্ রেডিও তো আছেই, আরও নতুন করে যুক্ত হচ্ছে সাতটি রেডিও।৩
এখন প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক, একের পর এক এফএম রেডিও আসছে, ঘটনা কী? কেউ ইচ্ছে করলে রেডিও টুডে’র কর্ণধার রফিকুল হকের মন্তব্যের মধ্যে উত্তর খুঁজতে পারেন। তার ভাষায়, ‘আমরা যখন রেডিও নিয়ে এ ধরনের চিন্তা করি তখন রেডিওর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। আমি যখন রেডিও নিয়ে কথা বলতাম, মানুষ আমাকে পাগল বলত।…আমি মনে করি কনটেন্ট যদি ভাল করা যায়, রেডিওটা আবার ফিরে আসবে।…প্রথমে যেটা করার চেষ্টা করেছি যে, কনটেন্টটা ভাল করার চেষ্টা করেছি।’৪ রফিকুল হকের কথা একাংশ সত্যি হয়েছে এই অর্থে যে, রেডিও আবার ফিরে এসেছে। আর এটি করতে তিনি চেষ্টা করেছেন কনটেন্ট বা আধেয় ভাল করতে। তিনি বা তারা (এফএম রেডিও কর্তৃপক্ষ) আধেয় কতটুকু ভাল করতে পেরেছেন তা বলা মুশকিল। তবে আধেয়গুলোকে বিশ্লেষণ করা আমার মতো নবীণ লেখকের জন্য অপেক্ষাকৃত সহজ। তাই, এই লেখায় সেটিই করার চেষ্টা করব। আর এক্ষেত্রে আমি বেছে নিয়েছি এই রেডিওগুলোর সেই সব অনুষ্ঠান, যেসব অনুষ্ঠানের উপর ভিত্তি করেই তারা জনপ্রিয়।
কে ওখানে? ভূত এফএম
‘কলেজের হোস্টেলের এক কক্ষে দু’টি মেয়ে থাকত। এক রাতে তাদের একজনের ওয়াশ-রুমে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। ওয়াশ-রুম ঘরের কাছে হওয়ায় মেয়েটি একাই সেখানে যায়। রাতও তখন খুব বেশি ছিল না। ওয়াশ-রুম থেকে বের হয়ে সে একটি শব্দ শুনতে পেয়ে ভালোভাবে লক্ষ্য করে বুঝতে পারে শব্দটি জানালার দিক থেকে আসছে। শব্দটি কিসের জানার জন্য মেয়েটি জানালার একদম কাছে গিয়ে দেখতে পায় উপর থেকে জানালায় কিছু একটা ঝুলছে। সে আরও কাছে গিয়ে ঝুলন্ত দু’টি রক্তমাখা পা দেখতে পায়। পা দুটো ঠিক উল্টোভাবে ঝুলানো। হাঁটুর নীচ থেকে ছিন্ন করা পা দুটোর কাটা অংশ নিচে আর পায়ের পাতা উপরে। মেয়েটি ভয়ংকর এ দৃশ্য দেখে দৌড়ে কোনমতে তার কক্ষে পৌঁছায়। কক্ষে গিয়ে দেখে তার রুমমেট বিছানায় শুয়ে বই পড়ছে। মেয়েটি রুমমেটের কাছে সব ঘটনা খুলে বললে তা শোনার পর রুমমেট অদ্ভুত হাসি দিয়ে তার পায়ের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে বলে দেখত এই দু’টি পা নাকি?
মেয়েটি তখন দেখে জানালায় সে যে দু’টি পা দেখেছিল তার রুমমেটের পা দু’টি ঠিক সেই রকম। এটা দেখে মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে পড়ে। জ্ঞান ফিরলে মেয়েটি দেখে চারপাশে তার সেই রুমমেটসহ অনেকে বসে আছে। তারপর মেয়েটি সবাইকে এই সব ঘটনা খুলে বলে। তখন রুমমেটটি বিস্ময়ের সাথে বলে, তার রুমমেট যখন ওয়াশ-রুমে যায় সঙ্গে সঙ্গে সেও বই আনার জন্য কক্ষের বাইরে যায়। পরে বই নিয়ে এসে দেখে তার রুমমেট অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। তারপর সে সবাইকে ডেকে আনে।’
এই ছিল রেডিও ফুর্তিতে ১৫ অক্টোবর ২০১১ এ প্রচারিত ভূত এফএম অনুষ্ঠানে ই-মেইলে পাঠানো তাজ নামের একজন শ্রোতার বর্ণিত একটি ঘটনা। শুধু ই-মেইলেই নয়, অনেকেই অতিথি হয়ে এসে এ ধরনের নানা ঘটনা সরাসরি ভূত এফএম এ অন্য শ্রোতাদের কাছে বর্ণনা করেন। ভূত এফএমের আয়োজন এখানেই শেষ নয়। তাদের ভূত-বিষয়ক স্পেশাল টিমও রয়েছে। যারা ভূত-বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করে তা প্রচার করে। আর অনুষ্ঠান চলাকালীন ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ভৌতিক ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার করে থাকেন। খুব আত্নবিশ্বাসী হয়ে ও গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। এ ছাড়া উপস্থাপক মাঝে মাঝে ভৌতিক ঘটনাটিকে শ্রোতাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করার জন্য অতিথিকে নানাভাবে প্রশ্ন করে থাকেন। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অতিথিরা অনেক সময় বিব্রতবোধ করেন। ফাঁকে ফাঁকে চলে পাঠকের খুদে-বার্তা (এসএমএস) পড়া। এই হলো ভূত এফএমের আধেয় ও মূল উপজীব্য।
এখন এই উপজীব্য নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। এই উপজীব্য’র প্রধান দাবি হলো- ভূত-পেতী্ন আছে। দাবি বলছি এ কারণে যে, অন্য একদিনের অনুষ্ঠানে এক শ্রোতা যখন ভূত বিশ্বাস করেন না, বলে একটি খুদে-বার্তা পাঠান; তখন সেই শ্রোতার উদ্দেশে উপস্থাপক বলেন, ‘তো আপনি শুনছেন কেন? গো টু স্লিপ।’ অর্থাৎ অনুষ্ঠান শুনবেন কি না তা আপনার ব্যাপার; কিন্তু ভূত বলে একটা বিষয় আছে তা আপনাকে মানতে হবে। আর শ্রোতাকে যদি ভূতে বিশ্বাস করানো যায় তাহলে যা যা ঘটছে-
প্রথমত, ঝাড়ফুঁক, তাবিজসহ এই ধরনের চিকিৎসাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এসব বিষয় সাধারণত চিকিৎসাবিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় তাদের অব্যর্থ শক্তি দিয়ে। অথচ একবিংশ শতাব্দিতে এসে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও যুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রেডিও’র এই স্বীকিৃতি বা বৈধতা দেওয়ার অর্থ কী তা আমাদের জানা নেই।
দ্বিতীয়ত, তরুণ প্রজন্মকে কুসংস্কারে বিশ্বাসী করানো হচ্ছে। পাঠক খেয়াল করলে দেখবেন, এই অনুষ্ঠানের অধিকাংশ শ্রোতাই তরুণ। এদের অনেকেই হয়ত এই অনুষ্ঠান শুরুর আগে এ ধরনের কুসংস্কারে বিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু প্রতিনিয়ত এই অনুষ্ঠান শোনার ফলে তার মধ্যে একধরনের বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে।
তৃতীয়ত, এ ধরনের অনুষ্ঠান তরুণ প্রজন্মের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। কারণ এই অনুষ্ঠানে অনেক শ্রোতা খুদে-বার্তার মাধ্যমে জানিয়েছেন, অনুষ্ঠান শুনে ঘুমাতে যাওয়ার সময় তাদের গা ছমছম করে। এছাড়াও অনেকে বলেছেন যে, তারা অনুষ্ঠান শোনার পর একা একা বাইরে যেতে ভয় পায়। বাকীটুকু পড়তে ক্লীক করুন এফএম রেডিও : ‘ভূত’ আর ‘লাভ’ এর সমান্তরাল চলা
©somewhere in net ltd.