| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
১.বিটিভিতে জীবনবীমা কোম্পানির একটি বিজ্ঞাপন; শোকে কাতর এক মহিলাকে দেখা যাচ্ছে তিনি সদ্য তার স্বা্মীকে হরিয়েছেন।একটু পর আবার তাকে দেখা যায় সেই জীবনবীমা কোম্পানির ম্যানেজার জাতীয় কারো অফিসে।
মহিলাঃ আমার স্বামী তো পাঁচশো টাকার এক কিস্তি দিয়াই মইরা গেছিল, আমি কি পুরা টাকা পামু।
ম্যানেজারঃঅবশ্যই আপনি পুরো টাকা পাবেন।এই নিন, পাঁচশো টাকার এক কিস্তি দিয়ে আপনি পুরো ষাটহাজার টাকাই পেলেন।
মহিলার মুখ উদ্ভাসিত হয় চকিত হাসিতে।মহিলার হাসি দেখে খুব মেজাজ খারাপ লাগে। মনে হয়, সেই হাসি যেন ঘোষণা করে বলছে, শোক কিংবা মৃত্যুরও আছে অর্থমূল্য।
২.শুক্রবারের পূর্ণ্যদৈর্ঘ্য সিনেমার শেষদৃশ্য চলছে, ভিলেনের গুদামজাতীয় আস্তানায় নায়ক হাজির। বন্দুকযুদ্ধ চলছে নায়ক আর ভিলেনের চ্যালা-চামুন্ডাদের মধ্যে। নায়ককে সহযোগিতা করছে পুলিশ বাহিনী। গুলিতে মারা গেল জনাকয়েক ভিলেনের সহযোগী আর জনাকয়েক পুলিশ।একদম শেষে গুলি লাগল নায়কের বুকে। নায়ক ঢলে পড়ে আছে ক্রন্দনরত নায়িকার কোলে।টেলিভিশনের সামনে আমাদেরও খানিক কান্না পায়, আমার দেখতে চাই কোন অলৌকিক উপায়ে বেঁচে উঠুক নায়ক। আমাদের চাওয়া বিবেচনা করেই হয়তোবা পরিচালক সাইরেন বাজিয়ে এম্বুলেন্স হাজির করেন ঘটনাস্থলে ।
কিন্তু ঐ মৃত পুলিশদের কি হল? তাদের পরিণতি আমরা জানতে চাই না,তাদের মৃত্যু আমাদের শোকাতুর করে না।কারণ, তাদের গল্পটা আমাদের কেউ বলে নি।হয়তোবা তাদের জন্যেও ছিল অপেক্ষমান প্রণয়িনী, বিধবা মা।সিনেমার শুরু থেকেই আমারা শুধু পরিচিত হয়েছি, একাত্ম বোধ করেছি নায়কের সাথে। পুলিশদের মৃত্যুতে আমাদের কিছু যায় আসে না।
কোন কোন মৃত্যু পাহাড়ের মত ভারী আর কিছু মৃত্যু পালকের চেয়েও হালকা।
৩.আমি তখন স্কুলে, ক্লাস টেনে পড়ি। আমাদের থানা শহরের ছোট কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা পিকিনিকে গেল রামসাগরে।ফিরে আসল একটা লাশ নিয়ে।দুই-পাতা সিডাকসিন পকেটে পুরে পিকনিকে গিয়েছিল তাদের একজন, কখন দলছুট হয়ে পরিকল্পিত সেই মৃত্যু আয়োজন সফল করেছিল সে যুবক, কেউ টের পায় নি।
সেই যুবকটি আমাকে ভাবায় এখনো।এভাবে আত্মহত্যা কেন, কি ভেবেছিল সে? আকাঙ্খিত কোন নারীর কাছ থেকে প্রত্যাখাত হয়েছিল? ভেবেছিল তার মৃতদেহের উপর আছড়ে পড়ে কাঁদবে সেই রমণী?
কোন সে অভিমান তার বুকে ভারী পাহাড় গড়েছিল ?ভেবেছিল কি মৃত্যু সেই পাহাড় চূর্ণ করে মিহি বালুতে পরিণত করবে?
বোকা যুবক কি জানত না জীবনের এই তুমুল আয়োজনে মৃত্যু অতি তুচ্ছ ব্যাপার?কয়েকদিন পর হয়ত তার বন্ধুরা পিকনিকে তোলা ছবি ওয়াশ করে এনে এলাবামে ভরেছে।যে দুই একটা ছবিতে সে যুবককে দেখা যায় সেখানে তারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে।ব্যাস, এই তো,এতটুকুই পাওনা, এর বেশি আর কি দিতে পারে তারা জীবনের মেলা থেকে হারিয়ে যাওয়া কাউকে।
যুবকের ছোটভাই আমার সহপাঠী ছিল।কয়েকটা দিন মাত্র, তারপর সেও আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে নিয়মিত হাসি-ঠাট্টায়।যুবকের পিতামাতার শোক ম্লান হতে সময় লেগেছে হয়ত আরো কয়েকমাস, আরো কয়েক বছর।
বোকা যুবক কি জানত না কোন শোকই চিরস্থায়ী নয়?যুবক কি পড়ে নি পাঠ্য বইয়ে শামসুর রহমানের ‘একটি ফটোগ্রাফ’ কবিতাটা? আগত অতিথিকে পিতা একটি ফটোগ্রাফ দেখিয়ে বলেন, সেটি তার মৃত কনিষ্ঠ সন্তানের, পুকুরে ডুবে মারা গেছে যে।পিতা নিজেই আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেন কি নির্লিপ্ত, শোকতাপহীন কন্ঠে তিনি বয়ান করলেন তার সন্তানের মৃত্যুর ইতিহাস, আবিষ্কার করলেন মাত্র তিন বছরেই শোকের নদীতে পড়েছে রুক্ষ চর।
৪.মাঘ মাস।রাতের বেলা রংপুর থেকে ফিরছি। কোন ধর্মঘটের কারণে বাস চলছে না।আমি আর স্বপন উঠে বসলাম একটা পিক-আপের পেছনে।আমাদের সাথে মজুর শ্রেণির কিছু লোক উঠেছে, তাদেরই একজন হটাৎ গান শুরু করল-
আমি তো মরেই যাব চলেই যাব রেখে যাব সবই
আছিস কি কেউ সঙ্গের সাথী সঙ্গে নি মোর যাবি…………………
পান-বিড়ি ,ভাঙাড়ির দোকানে কতবার শুনেছি এই গান। কিন্তু সেদিন গানটা শুনে অনুভব করলাম মৃত্যুর পথযাত্রায়ও মানুষ একজন সঙ্গীর জন্য কি ব্যাকুল!মৃত্যুর ওপারের জগতে একদম নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে হবে এই নির্মম সত্য আমরা কিভাবে বহন করে যাই পুরোটা জীবন?
তীব্র বাতাস আর মাঘ মাসের ভারি কুয়াশার ঝাপটায় চোখে পানি আসে, পোঁছে যায় কান পর্যন্ত।বলতে পারিনা অবশ্যাম্ভাবী সেই নিঃসঙ্গতার আতঙ্ক আর কষ্টও খানিকটা মেশানো ছিল কিনা সেই পানিতে।
৫.প্রিয়নাথ মৃত্যুশয্যায়।শ্বাস উঠে গেছে তার। বিছানার পাশে জড় হয়েছে সবাই।
প্রিয়নাথ বারবার বলছে-তোমরা সব চুপ করে আছ কেন? কিছু বল,আমাকে কিছু বল।আমি কেন এই বয়সে সবাইকে ছেড়ে যাচ্ছি ,আমার মেয়ে রইল, বৌ রইল!আমার এই কষ্টের সময় আমাকে কোন সুখের কথা বলে কেন আমার কষ্ট ভুলিয়ে দিচ্ছ না তোমরা?
একজন বলে –তুমি ভাল হয়ে যাবে প্রিয়নাথ।
প্রিয়নাথ ধমক দিয়ে বলে- যাও, যাও-
আরেকজন বলে-তোমার বৌ মেয়েকে আমরা দেখব , ভয় নেই।
প্রিয়নাথ রেগে বলে- আঃ সেতো আমি জানিই, অন্য কিছু বল।
কেউ কোন কথা খুঁজে পেল না। প্রিয়নাথের পিতা এসে দাঁড়ালেন বিছানার পাশে।
প্রিয়নাথ বলল-বাবা সারাজীবন আপনি কোন ভাল কথা বলেন নি কেবল শাসন করেছেন।এবার বলুন।
সবাই নিস্তব্ধ।সেই নিস্তব্ধতায় একটা পাহাড়প্রমান ঢেউ এগিয়ে আসছে, সে ঢেউ প্রিয়নাথকে জীবনের তীরভূমি থেকে অথৈ অন্ধকার সমুদ্রে টেনে নিয়ে যাবে।আর সময় নেই।
প্রিয়নাথের বাবা শান্ত স্ব্ররে বললেন-প্রিয়নাথ, আবার দেখা হবে।
সে কথা শুনে মৃত্যুপথযাত্রী প্রিয়নাথের মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে গেল।সে চোখ বুজল, ঘুমিয়ে পড়ল।
-শীর্ষেন্দু মুখোপধ্যায়ের ‘দেখা হবে’ গল্পের খানিকটা অংশ বললাম।
আমিও চাই আমাকেও মৃত্যুর আগ মূহুর্তে কেউ বলুক, দেখা হবে।
জীবনের সবকিছু অর্জন, সকল সম্পর্ক ফেলে রেখে যখন একলা পাড়ি দিতে চলেছি অজানা জগতে,জীবন মৃত্যুর সীমারেখায় দাঁড়িয়ে, তখন ঐ প্রতিশ্রুতিটুকু ছাড়া আর কিইবা সুখ দিতে পারে আমাকে? আর কেইবা বলতে পারে সেটা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি?
৬.মৃতের শোকাক্রান্ত স্বজন নয় আমার সহানুভূতি রইল নিষ্প্রাণ মৃত মানুষটির জন্য ।তার স্বজনরা তো সবাই মিলে শুধু একক মৃত লোকটিকেই হারাল, আরা মৃত লোকটি যে হারাল তাদের সবাইকে।
©somewhere in net ltd.
১|
১৭ ই আগস্ট, ২০১৬ রাত ৮:৩৫
আবুহেনা মোঃ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন: প্রিয়নাথকে কারো কিছু বলার ছিল না। যে যা বলেছে সবই ফর্মালিটি।
আসলেই মৃত্যুর চেয়ে কঠিন কিছু নেই। আজ মরলে কাল দুই দিন। কে আর মনে রাখে ভাই? ধন্যবাদ জীসান মাহমুদ।