নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

অদ্ভুত ছেলেটি

মেহেদী আনোয়ার

জানিনা

মেহেদী আনোয়ার › বিস্তারিত পোস্টঃ

কর্পোরেট জালের ইতিকথা

২৩ শে মে, ২০২৬ রাত ১:০২


গরুর গল্প ও কর্পোরেট রূপকথা
ধরুন, আপনার গোয়ালে একটি নাদুসনুদুস গরু আছে। সেই গরুর দুধে আপনার নিজের মেটে, পরিবারের পুষ্টি হয়, আর বাড়তিটুকু বেচে বেশ হেসেখেলেই সংসার চলে যায়। আপনি স্বাধীন, আপনিই মালিক।

একদিন আমি—মানে এক চকচকে 'মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি'—স্যুট-টাই পরে হাজির হলাম। অনেকগুলো টাকার লোভ দেখিয়ে আপনার গরুটা কিনে নিলাম। আপনি ভাবলেন, "যাক, এবার বড়লোক হয়ে গেলাম!" কিন্তু মজাটা শুরু হলো এরপর। আপনার নিজের কোনো গরু নেই, তাই বাধ্য হয়ে আমার প্যাকেটজাত দুধই আপনাকে কিনতে হচ্ছে।

টাকা তো আর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়! কিছুদিনের মাঝেই বুঝলেন, জমানো টাকা ফুরিয়ে আসছে। নিরুপায় হয়ে শেষমেশ আমার কাছেই হাত পাতলেন চাকরির জন্য। আমি অত্যন্ত 'দয়ালু' হয়ে আপনার সেই পুরোনো গরুটা দেখাশোনার দায়িত্বই আপনাকে দিলাম। কিন্তু বেতন দিলাম এমন, যা দিয়ে বাচ্চার দুধ তো দূরের কথা, আপনার নিজের এক কাপ রঙ চাও জুটবে না!

২. ঋণের রোলারকোস্টার ও 'মহান' মালিক
এরপর শুরু হলো আমার কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (CSR)-এর খেলা। বাচ্চার দুধ কেনার জন্য আমিই আপনাকে ঋণ দিলাম। সাথে দিলাম বিক্রির কমিশনের লোভ। বাঁচার তাগিদে আপনি আশেপাশের প্রতিবেশীদেরও মগজধোলাই শুরু করলেন তাদের গরুগুলো আমার কাছে বেচে দেওয়ার জন্য।

ইতিমধ্যে আমার লাভের টাকা পাহাড় ছুঁয়েছে। আমি একটা স্কুল খুললাম। আমার কাছ থেকে নেওয়া স্বল্পসুদের ঋণে আপনি সেখানে আপনার বাচ্চাকে পড়াতে পাঠালেন। সেখানে আমি তাদের শেখালাম আমার সুবিধামতো 'ভ্যালু' আর 'নীতিবিদ্যা'।
আপনার খরচ বাড়ছে, আর ধীরে ধীরে আপনার ভিটেমাটি আমার কাছেই বন্ধক পড়ছে। স্বভাবতই, আমি মহান! তাই আপনার বউকে ট্রেনিং দিয়ে আমার মিষ্টির কারখানায় কাজে লাগালাম (যাকে বলে ওমেন এমপাওয়ারমেন্ট!)। আগে ২২ টাকা লিটারের দুধ নিতাম ২০ টাকায়, আর এখন মিষ্টির কারখানায় দুধ বেচে পান ৪ টাকা। ১৪০ টাকা কেজির মিষ্টিতে আমার পকেটে ঢোকে ১৩৬ টাকা!

৩. পুরো পরিবার যখন 'গর্বিত কর্মী'
আপনার ৬ টাকা আয় থেকে কিন্তু আমাকে কিস্তি দিতে হয়! সেই কিস্তির টাকা তোলার জন্য আমার নতুন ব্যাংকে চাকরি দিলাম আপনার ছেলেকে। মেয়ে স্কুল পাশ করলে তাকেও ট্রেনিং দিয়ে পোল্ট্রির কাজে লাগালাম—সেই আপনারই পুরোনো ভিটেতে।
সকাল থেকে সন্ধ্যা—সেই আট-নয় ঘণ্টার রুটিন বাঁধা ঘানি টেনে, হাড়ভাঙা খাটুনিতে আপনাদের তো অসুখ হতেই পারে! তাই আমি একটি হাসপাতালও বানিয়েছি, যেখানে আমার 'সংস্থার কর্মী' হিসেবে আপনি ৩০% ডিসকাউন্ট পান। আমার গার্মেন্টস, আমার বিড়ি-সিগারেট, আমার হাসপাতাল—সবকিছুর ক্রেতা এখন আপনি ও আপনার সেই প্রতিবেশীরা, যাদের গরু আপনিই আমার কাছে বেচিয়েছিলেন।



কর্পোরেট বাণিজ্যের ৩টি অমোঘ সত্য
এই পুরো নাটক থেকে তিনটি রূঢ় বাস্তবতা পরিষ্কার:

শুভংকরের ফাঁকি: আপনার বেতন যতই বাড়ুক, আপনি ১৪ জেনারেশন ধরে চেষ্টা করেও পুরোপুরি ঋণমুক্ত হতে পারবেন না, আর আমার মতো বড়লোক তো নয়ই।

বেতন বাড়ার পেছনের রহস্য: আমি আপনার বেতন ঠিক তখনই বাড়াব, যখন আমার উৎপাদিত নতুন পণ্যের জন্য বাজারে ক্রয়ক্ষমতা সম্পন্ন 'ভোক্তা' বা কনজিউমার দরকার পড়বে।

স্বাধীন উৎপাদক থেকে কর্পোরেট চাকর: গতকাল যে মানুষটি একটি উৎপাদক যন্ত্রের (গরু) স্বাধীন মালিক ছিল, আজ সে আমার ইচ্ছার অধীনস্থ, উচ্চ বেতনধারী এক মাল্টিন্যাশনালের 'গর্বিত কর্মী'। সোজা বাংলায়—আপনি উপরে যতই ওঠেন না কেন, আমি মালিক, আর আপনি আমার চাকর।

ইঁদুর দৌড় বা 'দ্য ম্যাট্রিক্স'
Job ➔ Income ➔ Spend ➔ Tax...
এই অন্তহীন চক্রের মাঝেই আমাদের জীবন শেষ। সারাদিন গাধার খাটুনি খেটে ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, ভবিষ্যৎ, সন্তানের মানুষ হওয়া—সবকিছু নিয়ে আমরা এতই ব্যস্ত যে, নিজের আত্মার জন্য বা পরকালের জন্য একটু ভাবার সময়, শক্তি বা ইচ্ছা কোনোটাই আর অবশিষ্ট থাকে না।

The more you will be busy, the more you are involved in the system, the less effort is needed to control your life and mind.

এটাই সেই গেমপ্ল্যান। সমাজ, দেশ এবং পরিশেষে পুরো পৃথিবীকে একটি অদৃশ্য সুতোর টানে নিয়ন্ত্রণ করার এই তত্ত্বকেই অনেকে বলেন 'Conspiracy Theory', যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো "New World Order"।

অথচ, এই ভয়ংকর ফাঁদ সম্পর্কে আজ থেকে ১৪০০ বছর আগেই সতর্ক করা হয়েছিল:

"প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে পৌঁছাচ্ছ। কখনোই নয়! শিগগিরই তোমরা জানতে পারবে... তোমরা জাহান্নাম দেখবেই।"
— [সুরা আত-তাকাসুর: ১-৬]

সবকিছু চোখের সামনে ঘটছে। আমরা দেখেও দেখছি না, শুনেও শুনছি না। কারণ, "Knowing is not believing." আমরা জেনেও মানতে নারাজ!

মন্তব্য ২ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ২৩ শে মে, ২০২৬ রাত ১:২৪

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: একেই বলে মেটিকুলাস ডিজাইন,
আমরা ভেঁতো বাঙালী চোর চলে যাবার পর
বুদ্ধি সচল হয় !!!

২| ২৩ শে মে, ২০২৬ রাত ১:৩৫

ঢাকার লোক বলেছেন: وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ দুনিয়ার জীবন শুধু মাত্র একটা ধোঁকা ! ( আল ইমরান , আয়াত ১৮৫)
এর পিছনে দৌড়ায়ে একদিন সব ফেলে রেখে সম্পূর্ণ খালি হাতে চলে যেতে হবে!

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.