| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শ্রাবণধারা
" আমাদের মতো প্রতিভাহীন লোক ঘরে বসিয়া নানারূপ কল্পনা করে, অবশেষে কার্যক্ষেত্রে নামিয়া ঘাড়ে লাঙল বহিয়া পশ্চাৎ হইতে ল্যাজমলা খাইয়া নতশিরে সহিষ্ণুভাবে প্রাত্যহিক মাটি-ভাঙার কাজ করিয়া সন্ধ্যাবেলায় এক-পেট জাবনা খাইতে পাইলেই সন্তুষ্ট থাকে......."
"হীরক রাজার দেশে" সিনেমায় অত্যাচারী রাজা প্রজাদের ওপর অনেক অত্যাচারের পরেও যখন দেখেন যে প্রজারা পুরোপুরি বশ মানছে না, তখন সভা-বিজ্ঞানীকে দিয়ে একটা "যন্তর-মন্তর" ঘর তৈরি করেন। সেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রজাদের এমন মগজ ধোলাই দেওয়া হয় যে অত্যাচারিত প্রজারা পর্যন্ত অতীতের সব কিছু ভুলে রাজার গুণগান করতে থাকে। হীরক রাজা বুঝেছিলেন, মানুষ যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।
হীরক রাজার "যন্তর-মন্তর" ছিল রাজ্যশাসন টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা - বিদ্রোহ দমন ও আনুগত্য নিশ্চিত করার উপায়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গভীর। এখানে মগজ ধোলাই বিদ্যমান শাসন রক্ষার জন্য নয়; মানুষকে চিন্তাহীন করে, অন্ধ ও প্রশ্নহীন আনুগত্য তৈরি করে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে - একটি মোল্লাতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই এই মগজ ধোলাই প্রকল্পের লক্ষ্য। এমন এক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে যেখানে প্রশ্নহীন এই আনুগত্যকে মানুষ ধর্মীয় কর্তব্য মনে করে।
বিভিন্ন সময়ে শাসকগোষ্ঠী আমাদের চিন্তার স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের মতো একসাথে এতগুলো সমন্বিত মগজ ধোলাইয়ের মেশিন আগে দেখা যায়নি। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অনেকগুলো মগজ ধোলাইয়ের যন্ত্র এখন একসাথে কাজ করছে। এর মধ্যে শক্তিশালী একটি মাধ্যম হলো ধর্মের নামে পরিচালিত ওয়াজ-মাহফিল বা ওয়াজী মোল্লাদের বক্তৃতা।
এই ধরনের বক্তৃতাগুলো কখনো সমালোচনা বা বিশ্লেষণ করা হয় না। মানুষ সেখানে বক্তার বক্তব্য, যুক্তি বা তার বাস্তব প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। বক্তৃতাদানকারীর কথার অর্থ, সময়োপযোগিতা বা বাস্তবতা নিয়ে জবাবদিহিতা থাকে না। পুরো বিষয়টিই এমন যে এসব বক্তব্য যুক্তি-তর্ক বা বিশ্লেষণের বিষয় নয়। এগুলো কেবল বিশ্বাস বা মান্য করার বিষয়। বক্তব্যগুলো পবিত্র ও প্রশ্নাতীত। ফলে সমালোচনার জায়গা নেই।
এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে ধর্মের সাথে সম্পর্কিত সবকিছুই ভালো ও শ্রেষ্ঠ। ধর্মের সাথে যুক্ত ধর্মজীবী মোল্লারা জ্ঞানী। যে বিষয় নিয়ে কোনো প্রশ্নই করা যায় না, সেটি কীভাবে জ্ঞানের বিষয় হয়, সেটিও একটা প্রশ্ন বটে। এভাবে ধর্মীয় পরিচয় ও ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রশ্নাতীত একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
প্রশ্নহীন ধর্মীয় কর্তৃত্ব যখন সমালোচনা, যুক্তি বা জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়, তখন এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হল, লন্ডনের একজন ইমামকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনাটি। এই ইমামের নাম আব্দুল হালিম খান। তার বিরুদ্ধে ২১টি ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। যাদের তিনি ধর্ষণ করেছেন, সেই সাতজন ভুক্তভোগীর মধ্যে তিনজন নারীশিশু আছে, যাদের বয়স ১৩ বা তার কম।
আদালত ইমামের অপরাধ সম্পর্কে বলেন, "অপরাধী ভুক্তভোগীদের এই বলে প্রতারিত করত যে তার সাথে জিন আছে, যেটা তাদের ও তাদের পরিবারকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। এরপর অপরাধী জিনের ছদ্মবেশে নারী এবং নারীশিশুদের ধর্ষণ করতেন। ভুক্তভোগীরা যাতে ঘটনাগুলো গোপন রাখে, সেজন্য আবার ধর্ষক এই বলে তাদের ভয় দেখাতেন যে কাউকে বলে দিলে জিন তাদের অনেক বড় ক্ষতি করবে।"
ইংল্যান্ডের আদালত তাদের রায়ে এই মর্মান্তিক অপরাধের অভিযোগ জানানোর জন্য ভুক্তভোগীদের ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন। তারা যৌন নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার সকল ভুক্তভোগীকে তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিষয়ে পুলিশকে জানানোর জন্য উৎসাহিত করেছেন। তারা বলেছেন, "এই দণ্ডাদেশ এই বার্তা দেবে যে শিশু সুরক্ষা পরিষেবা অবিচলভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে এবং নারী ও শিশুদের যৌন অপরাধীদের বিচার করবে। আপনারা একা নন, এবং সবসময় সাহায্য পাওয়ার অধিকার আপনাদের আছে।"
ঘটনাটি ইংল্যান্ডে ঘটেছে বলেই হয়তো সাতজন ভুক্তভোগী নারী ও শিশু ইমামের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে সাহস করেছেন। তাদের বিশ্বাস ছিল যে তাদের অভিযোগগুলো আমলে নেওয়া হবে এবং খুব সম্ভব তারা ন্যায়বিচার পাবে।
ঘটনাটি যদি বাংলাদেশে ঘটত, তাহলে সম্ভাবনা ছিল যে ভুক্তভোগীরা পুলিশের কাছেই যেত না। অপরাধী ক্ষমতাশালী, আবার পুলিশও ক্ষমতাশালী। ভুক্তভোগীই কেবল ক্ষমতাহীন। তাই তাদের অভিযোগ করার জায়গা নেই। প্রায় ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযোগ করলে বিপদ আরও বাড়ে। পুলিশ টাকা চায়, অপরাধী হুমকি দেয়, আবার পাড়া-প্রতিবেশী সুযোগ পেয়ে কুৎসা রটায় - "ইমামের দোষ নয়, ওই মেয়ের দোষ, মেয়েটা খারাপ" - এমন উদাহরণ আমাদের সমাজে অসংখ্য আছে।
কোনোভাবে গণমাধ্যমে খবরটি প্রকাশিত হলে বা বিষয়টি নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলে যদি সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশ পেয়ে পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারও করে, তবে দেখা যেত তথাকথিত "তৌহিদি জনতা" মব তৈরি করে থানা ঘেরাও করত - ইমাম সাহেব বলে কথা।
যখন মোল্লাতন্ত্র রাষ্ট্রের অংশ না হয়েও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মানুষের অনুভূতির অংশ হয়ে ওঠে, তখন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে কোনো কাজ করতে পারে না। এমন পরিস্থিতি আমরা ড. ইউনূসের সময়ে দেখেছি, যখন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা, এমনকি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও, মবের পক্ষ নিয়ে বক্তব্য দিতেন।
সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত মোল্লাতন্ত্রের প্রভাব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যক্রমেও প্রতিফলিত হয়। পুলিশ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ - সবাই একটি নির্দিষ্ট সামাজিক পরিবেশের ভেতর কাজ করে, যেখানে জনমতের চাপ ও প্রত্যাশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন জনগণের প্রত্যাশা প্রবল হয়, তখন প্রতিষ্ঠানগুলোও সেই চাপের বাইরে থাকতে পারে না। ফলে অনেক সময় নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ ন্যায়বিচারের চেয়ে জনমতের প্রতিক্রিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
উদাহরণ হিসেবে কুষ্টিয়ায় পীরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি উল্লেখ করা যায়। সেখানে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও মব দমনকে তারা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিল। যদিও আইনগতভাবে এটি একটি গুরুতর অপরাধ এবং তা প্রতিরোধ করা তাদের দায়িত্ব ছিল, তবুও জনচাপ ও পরিস্থিতিগত ঝুঁকির কারণে তারা দায়িত্ব পালন করেনি।
ইংল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশীয় মুসলিম অভিবাসীদের একটি অংশের মধ্যে পাকিস্তানি-ধাঁচের একটি রক্ষণশীল ও উগ্রবাদী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। পশ্চিমা বিশ্বের উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক নীতি ও মূল্যবোধ - যেমন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা- এসবের অপব্যবহার করে একটি উগ্রবাদী সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে। এই পরিবেশই আব্দুল হালিম খানের মতো ব্যক্তিদের জন্য কর্তৃত্ব ও প্রভাব অর্জনের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
এই ধরনের ঘটনা পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক পরিসরেও প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। উগ্র ডানপন্থী শক্তি (যেমন ইংল্যান্ডের টমি রবিনসনের মতো ব্যক্তিত্বরা) এসব ঘটনাকে ব্যবহার করে মুসলিম-বিদ্বেষী বা ইসলাম-বিদ্বেষী প্রচারণা জোরদার করে। একদিকে মুসলিম অভিবাসীদের উগ্রবাদী সংস্কৃতি, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াশীলতা - উভয়েই একে অপরকে শক্তিশালী করে।
২|
১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৫২
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: পতিতালয় থাকতে এরা মানুষের ক্ষতি করে কেন কে জানে ? যারা উনার লালসার শিকার এদের অনেকের লাইফটাইম ট্রমায় কাটবে । ![]()
৩|
১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০১
নতুন বলেছেন: আমাদের দেশে এমন অনেক ধান্দাবাজ আছে যারা জীন, ভুত তাড়ানোর কথা বলে মানুষ কে প্রতারিত করে টাকা পয়সা আয় করে, নারীদের ধর্ষন করে।
অজ্ঞতা, ধর্মান্ধতা একটা বিরাট অভিষাপ। ![]()
৪|
১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৫
কলিমুদ্দি দফাদার বলেছেন:
মুনাফিক-কাফেরেরা যুগে যুগে আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ইসলামকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে আসছে। জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত সুপুরুষ আল্লাহমা মাহমুদুল হক (রিসোর্টি), দুই বিবাহ করা শিশু হুজুর বিরুদ্ধে প্রচারণা এই মিথ্যার একটি অংশ। বৃটেনে মুসলমানদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাকিংহাম প্যালেসে ইসলামী পতাকা উঠার ভয়ে ইষ্ট লন্ডনের এই ইমামের বিরুদ্ধে এই গভীর ষড়যন্ত্র!!!
আসছে শীতকালে ওয়াজে এগুলো শুনলে অবাক হবো না.......
©somewhere in net ltd.
১|
১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৬
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: মানুষ যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।
......................................................................................
অসভ্য সমাজের জন্য তা প্রযোজ্য ,
আমাদের অর্জিত জ্ঞান যদি সঠিক না থাকে
এবং তা রাজনীতির প্রভাবে থাকে, অথবা ধর্মীয় অন্ধত্বর কবলে থাকে,
তাহলে তো সেই শিক্ষার বেহাল অবস্হা হবে ।