| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রিয়াদ( শেষ রাতের আঁধার )
কিছু মানুষ অন্য মানুষকে মুগ্ধ করার অসীম ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। আর কিছু মানুষের ভিতর এই ক্ষমতা কখনই আসে না। আমি দ্বিতীয় দলের মানুষ। কাউকে মুগ্ধ করার মত কিছু কখনই করতে পারি না। কেউ অনেক সুন্দর গান গায়, আমি শুধু শুনে যাই। কেউ অনেক সুন্দর নাচে, আমি শুধু হাত তালি দিয়ে যাই। কেউ অনেক সুন্দর লেখে, আমি শুধু ভেবে যাই, কী করে এত ভালো লেখে কেউ? আমিও লিখি। তবে তা কাউকে মুগ্ধ করার মত কিছু না। আমার লেখায় আমার ভালোবাসা ছাড়া কিছুই নেই। পড়াশুনা শেষ, বুটেক্স থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হয়ে চাকরি, বিয়ে, পেশা পরিবর্তন সব হয়েছে। লেখালেখির ধারাবাহিকতায় চারখানা উপন্যাস অমর একুশে বইমেলায় বেরিয়েছে। টুকরো ছায়া টুকরো মায়া (২০১৫) – সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার । একা আলো বাঁকা বিষাদ (২০১৬) – সামাজিক উপন্যাস । মধ্য বৃত্ত (২০১৮) – ডিটেকটিভ সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার । অভিসন্ধি (২০২০) – ক্রাইম থ্রিলার । দেশটাকে ভালোবাসি অনেক। অনেক মায়া কাজ করে। মাঝে মাঝে ভাবি, সব বদলে দিতে পারতাম। স্বপ্নের মত না, বাস্তবের মত একটা দেশ গড়তে পারতাম …………………………
বাবা মা নাম রেখেছে জান্নাত। তাদের মনে হয়ত ছিল, এ-জনম আর ওই-জনম দুই জনমেই মেয়ে জান্নাতের দেখা পাবে। ওই জনমের খবর এখনও জানা না গেলেও, এ জনমের জন্য যে তা অধরা রয়ে গেছে, সে ব্যাপারে জান্নাত নিশ্চিত।
গলির মুখে এসে, কাঁধের ব্যাগের ফিতেটা শক্ত করে টেনে ধরল ও। মনে মনে ভাবল, এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভয় পায় কীসে জান্নাত? বা সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে?
দুটোর উত্তরই বোধহয় সামনের গলিতে অপেক্ষা করছে।
কুকুর! এক, দুই, তিন, চার। একদম রাস্তা জুড়ে শুয়ে আছে। জান্নাত জানে, ঠিক যখনই ও কাছাকাছি যাবে, কুকুরগুলো এক পলক ওকে দেখবে। তারপর ঘাড়টা উঁচু করবে। একটা অস্পষ্ট গোঙানি দেবে। তারপর - ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ……ক্রমাগত। থামবে না, আবার জান্নাতের পিছুও নেবে না। একই জায়গায় একই স্বরে ডেকে যাবে কুকুরগুলো।
বাবা আগে বলত। আগে মানে যখন ওকে ভালোবাসত, তখন বলত, "মা কুকুর দেখে দৌড়াবা না, কুকুর মানুষরে দৌড়াতে দেখলে, পাগলা ভাব নেয়। তোমার পিছনে দৌড়াবে, ভয় দেখাবে, মাস বিশেষে কামড়ও দিয়ে দিতে পারে।"
জান্নাত তাই দৌড়ায় না। ভয়ে ভয়ে, কাঁধটাকে উঁচু করে কানের কাছাকাছি নিয়ে যায়। হাত দুটো পেটের কাছে একসাথে জড়ো করে নেয়। দাদীর শেখানো, “সুম্মুম বুকমুন উমইয়ুন, ফাহুম লা-ইয়ারজিঊন” দোয়া পড়তে শুরু করে। দাদী বলেছে, এই দোয়া কুকুরকে দূরে রাখে। কামড়ায় না। এই দোয়ার অর্থ জান্নাত জানে না। জানে না আদৌ কুকুর এই দোয়ায় দূরে যায় কিনা, ভয় পায় কিনা। মা বলেছিল, "কুকুর চেনা মানুষ দেখলে, চিল্লায় না", জান্নাত কি এতদিনেও কুকুরগুলোর চেনা মানুষ হয়নি?
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কুকুরের গলিটা পার হয় জান্নাত। হাঁফ ছেড়ে যেন বাঁচে। আসলেই কি বেঁচে যায়? আবার আগামীকাল একই ঘটনা, একই পরিস্থিতি, একই ভয় তাড়া করবে।
জান্নাতের প্রতিদিন ভয় পেতে ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে মনে হয়, বাবাকে বলে, "বাবা আমার কলেজ যেতে সমস্যা হয়। কুকুর দেখে ভয় লাগে।"
বাবা হয়তো আগের মতন, মেয়ের ভয়ে নিজেও ভয় পাবে না। সে বয়স জান্নাত পার করে এসেছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আহ্লাদগুলো ন্যাকামি হয়েছে, আবদারগুলো হয়েছে খামখেয়ালি। সারাদিন কাজ করা শেষে বাড়ি ফিরে, বাবার মেজাজ ভীষণ তিরিক্ষি হয়ে থাকে। সে সময় কুকুর নিয়ে আলাপ শুনতে তার ভালো লাগবে না। তার চেয়ে বাবাকে শান্ত করার জন্য, শীতল জলে লেবুর সরবত এগিয়ে দিয়ে, “বাবা খেয়ে নাও, ভালো লাগবে,” বলাতেই প্রশান্তি পাওয়া যাবে। মেয়ের এই সচরাচর, অথচ মায়াময় কাজে বাবা হয়তো কোনো মায়া খুঁজে পাবে না। বড় হওয়ার সাথে সাথে হয়তো সন্তানের অনেক মনমুগ্ধকর বিষয়ই আর বাবা-মায়ের কাছে অনবদ্য ঠেকে না। জান্নাত বড় হতে চায় না।
কানে এখনও কুকুরগুলোর ঘেউ ঘেউ শব্দ ভেসে আসছে। এখনও থামেনি। এর মাঝেই এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট। কুকুরের দ্বিগুণ- চায়ের দোকানের সামনে রাখা, রাস্তা আটকানো বেঞ্চিতে বসা। জান্নাত পেটের কাছে জড়ো করা হাত দুটো, একটু উপরে বুকের কাছে জড়ো করল। আটজনই ওর দিকে এক পলক দেখল, ঘাড় উঁচু করলো, এরপর চায়ের কাপ ফেলে উঠে দাঁড়ালো। একজন এসে বলল, “আহহা। কী দরকার এসবের? আমরা না দেখলে কাকে দেখাবা?”
জান্নাতের পুরো শরীরে কাঁপুনি দিলো। জ্বর আসার মতন কাঁপুনি। তবে জ্বরে শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়, এই কাঁপুনি শরীর শীতল করে দেয়। হাত-পা সব অসাড় করে দেয়। দৌড়ে পালাতে চায় জান্নাত, শরীরে সে শক্তি পায় না।
ছেলেটা বলে যায়, “কী যেন নাম তোমার?”
জান্নাত চুপ করে থাকে। গলা দিয়ে কথা বের হয় না। জড়ো করা হাতের নিচে হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি বাড়ে। রাগ হয়, প্রকাশ হয় না।
“নাম বলো। বলো নাম,” দ্বিতীয়বার জানতে চাওয়ায় ধমকের সুর।
জান্নাত ধরে আসা গলায় বলে, "জান্নাত।"
ছেলেটা আশেপাশের বাকিদের দিকে তাকায়। বাকিদের চোখে মুখে আনন্দের ছায়া খেলা করে যায়, সে আনন্দ জান্নাতের মনে বিষাদের ছায়া হয়ে বিঁধে যায়।
"কী মিল রে বাবা! যেমন নাম, তেমন দেখতে, তেমন মালপত্র। ইশ।"
বাকিদের দিকে তাকিয়ে ছেলেটা বলে, "দেখ না, ওর নাম জান্নাত, সংক্ষেপে জান। আমার নাম মিজান, সংক্ষেপে জান।"
মিজান জান্নাতের দিকে তাকায়, মুখটা জান্নাতের কাছাকাছি এনে বলে, "এখন থেকে তুমি আমার জান, আমি তোমার জান।"
হাসির রোল ওঠে চারপাশে।
মিজান আরও কাছে ঘেঁষে দাঁড়ায় জান্নাতের, "জানের সামনে লজ্জা করতে নেই। হাতটা সরাও, ওড়নাটাও মানাইতেছে না। দেখি তো।"
জান্নাত দূরে যায় এক ঝটকায়।
আস্তে করে, “আমার কলেজে দেরি হচ্ছে,” বলে সমস্ত শক্তি এক করে দৌড় লাগায়। হাঁপাতে হাঁপাতে গলিটা পার হয়ে, কিছুক্ষণ দাঁড়ায়। কানে কি তখনও, ঘেউ ঘেউ শব্দ ভেসে আসছিল, নাকি ওদের হাসির শব্দ?
কলেজ শেষে প্রাইভেট টিউশন থাকে জান্নাতের। শেষ হতে সন্ধে। সন্ধেবেলাও ছেলেগুলো ওই জায়গা ছাড়ে না। এরা কি বাসায় যায় না? পড়াশোনা, কাজ কিংবা অন্য কোনো ব্যস্ততা নেই? কেউ কি ওদের ডেকে বলে না, "চল আজকে কোথাও ঘুরতে যাই।"
ছেলেগুলোর একই রকম আচরণে গা গুলিয়ে আসে জান্নাতের। মনে হয় গায়ে মেখে নিয়ে যাচ্ছে এক দলা বিচ্ছিরিরকম নোংরা, স্যাঁতসেঁতে শ্যাওলা জমা কথার স্তর। সে কথার সবটা জান্নাতের কানে আসে না। কানে নিতে চায় না। কিছু মাংসপিণ্ডের প্রতি এদের এত আগ্রহ, তা নিয়ে এত আলাপ। মাঝে মাঝে করুণা হয় জান্নাতের। তবে করুণা ভয় হয়ে তলিয়ে যায়, দৌড়ে পালাবার সময় পায়ের নিচের ধুলোবালির সাথে লুটোপুটি খেয়ে মিলিয়ে যায়। বাড়ি ফেরার পথে চায়ের দোকানের পরের কুকুরগুলোকে পাওয়া যায় না। ওরা অন্য কোথাও পাড়ি জমায় সে সময়টায়। এটাই স্বস্তি।
বাড়ি ফিরেই শাওয়ারের নিচে বসে যায় জান্নাত। নিঃশব্দে কাঁদে। কখনও অল্প বিস্তর যে শব্দ হয়, তা জল পড়ার শব্দে মিলিয়ে যায়। ছোটো গোসলখানার গণ্ডির বাইরে পৌঁছায় না। গায়ে পড়তে থাকা জলের সাথে জান্নাত ভাবে, ধুয়ে মুছে যাচ্ছে - গায়ে লাগা শ্যাওলা জমা কথাগুলো। কথাগুলো ধুয়ে যায় না। আরও স্যাঁতসেঁতে হয়, বুকের ভিতর বিঁধে যায়। একটা মেয়ে, কিছু বেড়ে ওঠা মাংসপিণ্ডের জন্যই নিজেকে বড় অবাঞ্ছিত মনে হয়। জান্নাত আর বেড়ে উঠতে চায় না।
গোসল শেষে বেরিয়ে আসে জান্নাত। মা বিছানায় শুয়ে। শরীরে শত শত রোগের কারখানা। ঠিকভাবে হাঁটতে পারে না, দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয়। তবু সংসারের রান্না বান্না করার কেউ নেই, মাকেই সেসব সামলে নিতে হয়। সন্ধ্যার পর, মায়ের মেজাজও খুব একটা সুবিধার থাকে না। মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে জান্নাত সাহস জমায়, কথাটা বলা দরকার। কীভাবে বলবে, বুঝতে পারে না। এর আগে মাকে কুকুরের ভয় নিয়ে বলেছিল। মা দুই তিনটা অশ্রাব্য গালি দিয়ে বলেছিল, কলেজ যাওয়ার দরকার নেই। বাসায় বসে তাকে রান্না বান্নায় সাহায্য করতে। কিছুই পারে না জান্নাত। বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি দিয়ে কী করবে? স্বামী ওকে তাড়িয়ে দিবে। আরো কত কথা!
এমন একটা অবস্থা যেন, একজন মেয়ের জন্মই শুধু শ্বশুর বাড়ি গিয়ে রান্না বান্না করার জন্য।
জান্নাত সাহস সঞ্চয় করে বলল, "আম্মা, একটা কথা বলব?"
মা চোখ তুলে তাকায়, কিছু বলে না।
জান্নাত অনুমতির অপেক্ষা উপেক্ষা করে বলে, "তোমার বোরকা আছে না? আমাকে দিও তো।"
মা সরু চোখে জান্নাতকে দেখে। বুঝতে চায় মেয়ের মনের অবস্থা। কাতরাতে কাতরাতে বিছানায় বসে বলে, “আবার কী রঙ শুরু করছস। তোর মতি গতি তো ভালো ঠ্যাকে না। বোরকা পরার শখ জাগছে ক্যান? কার লগে দেখা করতে যাবি।”
জান্নাত লজ্জা পায়। লজ্জা আর চুপসে আসা গলায় বলে, "কারো সাথে দেখা করতে যাব না। কলেজে যাব বোরকা পরে।"
"এহ ঢং দেখলে মেয়ের বাঁচি না। দুইদিন পর পর খালি রঙ তামাশা। পড়ালেখার খবর নাই। বোরকা পরব, লিপিস্টিক দিব, কিরিম মাখব। যা, উপরের তাকে আছে, বাইর কইরা নে।"
জান্নাত পরের দিন বোরকা পরে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে আসলো বাসা থেকে। অন্য দিনের চেয়ে নিজেকে কেনো যেন নিরাপদ মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, রাস্তা দিয়ে হাঁটবার সময় বুভুক্ষু চোখে দেখতে থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক কম। যারা চোখ দিয়ে পুরো শরীরের জরিপ করত, চোখাচোখি হলে, চোখ ফিরিয়ে নিত, সেসব মানুষের সংখ্যাও কমে গিয়েছে এইটুকু এক কাপড়ের আড়ালে।
বুক ভরে গভীর একটা শ্বাস নিল জান্নাত। হাতটা আজ পেটের কাছে জড়ো হলো না। কুকুর বসে থাকা গলিটায় ঢুকতেও কেনো যেন আজ তেমন একটা ভয় করল না। জান্নাত এগিয়ে গেল, মনে মনে আজ আর দোয়াটাও পড়ল না। গলিতে পৌঁছে চমকে উঠল জান্নাত। অবাক বিষয়, কুকুরের সংখ্যা চার থেকে একে নেমে এসেছে। একটা মাত্র কুকুর অলস ভঙ্গিতে রাস্তা দখল করে শুয়ে আছে। আশেপাশে তাকাল জান্নাত। নাকে হঠাৎ একটা বিশ্রী, নোংরা রকম গন্ধ পেল। বাকি কুকুর তিনটেরও হদিস মিলেছে। পাশেই এক ম্যানহোল উপচে ময়লা পানি, আবর্জনা, মল রাস্তা ধরে ছড়িয়ে পড়ছে। আর কুকুর তিনটে সানন্দে সে ময়লা থেকে মল খাচ্ছে। রাস্তায় শুয়ে থাকা কুকুরটার বোধহয় ওসবে পোষায় না, তাই একাই রাস্তা দখল করে আরাম করছে।
পিঠের কাছের কুঁজো ভাবটা সরিয়ে, জান্নাত সটাং সোজা হয়ে দাঁড়াল, হাঁটতে শুরু করল কুকুরটার দিকে। এগিয়ে গেলো অনেকটা কাছে। কুকুরটা তাকাল জান্নাতের দিকে, ঘাড় উঁচু করতে গিয়েও করল না। এক পলক জান্নাতকে দেখে, আবার নেতিয়ে পড়ল ধুলো বালি মাখা রাস্তায়। একটা ঘেউ শব্দও আসলো না কানে। নির্বিঘ্নে পার হয়ে আসলো, প্রতিদিনের ভয়ের কুকুর ভরা গলি। জান্নাত কি তবে কুকুরগুলোর চেনা মানুষে পরিণত হয়েছে? না-কি কুকুরগুলোর মনে সৎ ইচ্ছার সঞ্চয় হয়েছে। জান্নাত জানে না।
এবার দ্বিতীয় যুদ্ধের প্রস্তুতি। জান্নাত আজ বোরকা পরেছে। বেঞ্চে আসন নেয়া ছেলেগুলোর আজ এগিয়ে আসার কথা না। যদি আসে, আজ কোনো ছাড় নয়। প্রথম যুদ্ধ জয়ে, জান্নাতের মনে যে শক্তির বীজ বোনা হয়েছে, সে বীজ অঙ্কুরিত হতে চায়, ডাল পালা মেলে সাহসের গাছ হতে চায়। জান্নাত জানে, এরা এলাকার বাড়িওয়ালার ছেলেপেলে। তার ভাড়াটিয়া বাবা এদের কিছুই করতে পারবে না। যা করার জান্নাতকে করতে হবে। কিন্তু জান্নাত করবে কী?
এগিয়ে গেলো জান্নাত, বুকের কাছটা আজ হাত দিয়ে আড়াল করল না। জান্নাত গলির মধ্যে ঢুকতেই, জান্নাতের ভাবনা ভুল প্রমাণ করে, ছেলেগুলো উঠে দাঁড়াল। আজ গতকালের চেয়েও বেশি, কুকুরের দ্বিগুণ আটের চেয়েও বেশি। আস্তে আস্তে যেন, খেলা জমছে, দর্শক বাড়ছে। সে খেলার বস্তু জান্নাত। জান্নাত দমে গেল না, থমকে দাঁড়াল না। এগিয়ে চলল সামনের দিকে। লাভ হলো না। মিজান দৌড়ে এসে পথ আগলে দাঁড়াল। না চাইতেও থেমে গেল জান্নাত।
জান্নাতকে আপাদমস্তক দেখে, ঘাড়টা সরিয়ে জান্নাতের পিছনে ঝুলানো ব্যাগটা দেখল। আলতো হাসি ফুটল, মিজানের মুখে। ব্যাগ দেখে হয়তো, চিনতে পেরেছে মিজান। অথচ না চেনার মতন ভান করে বলল, “কে গো তুমি?” আবার পুরো শরীরের দিকে তাকিয়ে বলল, "ইশশ, বোরকার উপর দিয়েই এই অবস্থা ভিতরে না জানি কী আছে।"
মিজান হাক ছাড়ে, "ঐ বুলু, মালটা আন না, গিফটা কিনলাম না কালকে।"
বুলু নামে একজন, মিজানের হাতে একটা প্যাকেট এনে দিলো। মিজান প্যাকেট থেকে একটা অন্তর্বাস বের করে জান্নাতের সামনে মেলে ধরল।
"তোমার জন্য। দেখে অনুমান করে আনছি, সাইজ হবে কিনা জানি না।"
জান্নাত রাগে, অপমানে লাল হয়ে গেল। পুরো শরীরে যেন কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। থরথর করে কাঁপছে জান্নাত। কাঁপতে কাঁপতেই জান্নাত প্রথম যুদ্ধে জয় করা সাহসকে, শক্তি করে বলল, “একদম আজেবাজে কথা বলবি না। বেয়াদব যেন কোথাকার। থাপ্পড় দিয়ে গাল ফাটিয়ে দিব। তোর বাসায় মা বোন নাই?”
মিজান সহ বাকিরা হেসে উঠল। মিজান অন্তর্বাসটা হাতে নিয়েই বলল, “লেইম। এই তোমরা মেয়েরা এই এক ডায়ালগ ছাড়া আর কিছু পারো না। দিতে চাইলাম উপহার, মারতে চাইলা থাপ্পড়। তাইলে পরাইয়া দেই আসো। তাইলে কী করবা?” বলেই মিজান অন্তর্বাসটা চেপে ধরল জান্নাতের বুকের কাছে।
জান্নাতের হঠাৎ করেই মনে হলো, চারপাশটা খুব চুপচাপ হয়ে গেছে। কোনো কোলাহল নেই, আশেপাশে কিছুই ঘটছে না। পাশ দিয়ে দু একজন লোক হেঁটে যাচ্ছে, এদের মধ্যেও কোনো ভাবান্তর নেই। আশেপাশে যেন সত্যিই কিছু ঘটছে না।
ধীরে ধীরে অনেক দূর থেকে জান্নাতের মনে হলো, তীক্ষ্ণ অথচ অস্পষ্ট একটা শব্দ ভেসে আসছে। সে শব্দ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে, একই শব্দের পুনরাবৃত্তিতে কোলাহল হচ্ছে। জান্নাত সামনের দিকে তাকাল। সব গুলো মানুষ মুখ নাড়ছে, কিছু বলছে, কারও মুখে ভঙ্গিমায় হাসির ছাপ, কারও কৌতুক, কারও কৌতূহল। কিন্তু সবগুলো শব্দ মিলিয়ে জান্নাতের কানে শুধু বাজছে- ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ।
জান্নাত কাঁপতে কাঁপতে, দৌড়ে পালাবার আগ মুহূর্তে উচ্চারণ করল, "সুম্মুম বুকমুন উমইয়ুন, ফাহুম লা-ইয়ারজিঊন।"
রাত দশটা। এত আগে মিজান সচরাচর বাসায় ফেরে না। আজ পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। বেশ গরম। বাইরে বাতাসেরও নাম গন্ধ নেই। গোসল করা দরকার। ও বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলো। দরজা ভিতর থেকে লাগানো। ছোটো বোনটা সুযোগ পেলেই মিজানের বাথরুমে গোসল করতে চলে যায়, বহুবার বারণ করেছে মিজান। কাজ হয়নি। বিছানার উপর গা এলিয়ে শুয়ে পড়ল মিজান। ছোটো বোনটা গোসল করে বেরিয়েছে। মিজান উঠে বসল। তাকাল বোনের দিকে। মাথা ঝাঁকি দিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল মিজান। মিজান এভাবে বোনের দিকে তাকাতে চায় না, তাকায় না কখনও। অথচ আজকে কী হলো?
ছোটো বোন অল্প হেসে জিজ্ঞেস করল, “কিছু বলবি, ভাইয়া?”
মিজান কিছু একটা বলতে চাইলো। কিন্তু মুখ থেকে বের হলো, "ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ।"
ছোটো বোন অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভাইয়ের দিকে, “ছিঃ, ভাইয়া”, বলে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
মা খাবার সাজাচ্ছেন টেবিলে। বোন ব্যাপারটা মাকে জানাবার আগে, মিজানের বুঝিয়ে বলা উচিত। মিজান মায়ের দিকেও একইভাবে তাকাচ্ছে। মায়ের কাছে গিয়েও মিজান বলল, "ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ।"
মা-ও বিস্ময়ভরা চোখে ছেলের দিকে তাকাল। মিজান অন্য কিছু বলতে চায়। অথচ মুখ দিয়ে বের হচ্ছে, "ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ।" আর কানের কাছে বাজছে, "সুম্মুম বুকমুন উমইয়ুন, ফাহুম লা-ইয়ারজিঊন- (তারা বধির- বোবা- অন্ধ, সুতরাং তারা আর ফিরে আসবে না)।"
রিয়াদুল রিয়াদ
২|
২৪ শে মে, ২০২৬ রাত ১২:৩৩
আহমেদ জী এস বলেছেন: রিয়াদ( শেষ রাতের আঁধার ),
ভালো লিখেছেন। একটা সাহসের কথা আছে গল্পে।
©somewhere in net ltd.
১|
২৩ শে মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০০
রাজীব নুর বলেছেন: ঘেঊ ঘেঊ ঘেঊ।