নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি ও বলতে চাই !

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন

ব্লগিং হউক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন › বিস্তারিত পোস্টঃ

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও দিল্লির আইনি অজুহাত

০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বহুল আলোচিত বিষয় হলো চব্বিশের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও দেশ ছেড়ে পালানো সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া। সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত বে অফ বেঙ্গল কনভার্সেশনে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য ২০১৩ সালের দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের চলমান টানাপোড়েন কেন্দ্র করে পুরো বিষয়টি নতুন কূটনৈতিক রূপ নিয়েছে। শেখ হাসিনাকে স্থানান্তর এবং হস্তান্তরের আইনি দিক কেবল দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের গভীরতাই পরিমাপ করছে না বরং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ও সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলছে। ভারতীয় হাইকমিশনার সরাসরি ই বলেছেন যে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে একটি সুসংগঠিত আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। তবে কূটনীতির সূক্ষ্ম ভাষার আলোকে এই বক্তব্যকে কেবল আইনি ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন। নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা না জানানোর কৌশল ইঙ্গিত করে যে, দিল্লি বিচারিক বিশ্লেষণের দীর্ঘমেয়াদি পথ ধরে একটি ধীরগতির কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে চাইছে। ৫ আগস্টের চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় একজন সাবেক সরকার প্রধানকে আশ্রয় দেওয়া ভারতের একটি পররাষ্ট্রনীতির ই সিদ্ধান্ত ছিল। তবে আন্তর্জাতিক আইনের নীতি অনুযায়ী, রাজনৈতিক আশ্রয় এবং দণ্ডপ্রাপ্ত কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা আইনি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশের আদালত কর্তৃক শেখ হাসিনার বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য তাঁকে ফেরত আনার মূল ভিত্তি ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত এবং ২০১৬ সালে সংশোধিত বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি। এই চুক্তির বিধান গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে মূলত দুটি আইনি দিকের টানাপোড়েন রয়েছে। চুক্তির ৬(২) অনুচ্ছেদ স্পষ্ট বলা আছে যে গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ এবং চরম সহিংসতার মতো অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী প্রকাশিত
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের দপ্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ছাত্র- জনতার আন্দোলন দমাতে শেখ হাসিনার ও তার সরকারে সরাসরি নির্দেশে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে সন্ত্রাসীদের হাতে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। বিচারিক নথিপত্র ও চূড়ান্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এই রক্তপাতের অভিযোগ গুলো ইতোমধ্যে আদালতে প্রমাণিত হয়েছে এখন শুধু তা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে হস্তান্তর সময়ের ব্যাপার ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের জন্য ভারত সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছে। তবে ভারত সেদিকে তেমন নজর বা গুরুত্ব দিচ্ছে না। তবে আন্তর্জাতিক আইনি নীতিতে শেখ হাসিনাকে ভারতে আটক রাখার বা ফেরত না দেওয়ার ভারতকে সমালোচনার মুখোমুখি দাড় করাবে। যদিও বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির ৮ অনুচ্ছেদে প্রত্যর্পণ অনুরোধ নাকচ করার একটি সার্বভৌম ক্ষমতা ভারতকে দেওয়া হয়েছে। যদি দিল্লির দৃষ্টিতে প্রত্যর্পণের দাবিটি সৎ বিশ্বাসে না করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বা নিপীড়নমূলক বলে মনে হয়, তবে ভারত এই অনুচ্ছেদটি প্রয়োগ করতে পারে। ভারতের বর্তমান আইনি অবস্থান মূলত এই আইনি সুযোগ এবং বিচারিক যাচাই-বাছাইয়ের সময় ক্ষেপণকে ঢাল হিসেবে ই ব্যবহার করার আশংকা করছেন অনেক বিশ্লেষক। ফলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের মাধ্যমে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও সুদীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক সমীকরণের প্রয়োজন হবে।

শেখ হাসিনার অবস্থান এবং হস্তান্তরের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘমেয়াদি একটি রাজনৈতিক দোলাচল তৈরি করেছে। রাজনীতিতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিতিশীলতা সরাসরি প্রভাব ফেলে দেশের অর্থনৈতিক খাতের ওপর। যে কোনো দেশের অর্থব্যবস্থা ও টেকসই উন্নয়নের মূল শর্ত হলো একটি পূর্বাভাসযোগ্য এবং স্থিতিশীল আইনি ও রাজনৈতিক পরিবেশ। বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা এবং দেশীয় উদ্যোক্তারা চরম অনিশ্চয়তার মুখে নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকেন। ব্যবসার বিস্তার থমকে দাঁড়ায় এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। অর্থাৎ, শেখ হাসিনার আইনি নিষ্পত্তির বিষয়টির ওপর ভারত- বাংলাদেশের সু-সম্পর্ক বাংলাদেশের দ্রুত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক গতিপথ ও অনেকটাই নির্ভর করছে। ভারতের দিক থেকেও তাদের পররাষ্ট্রনীতি এক নজিরবিহীন পরীক্ষার মুখোমুখি। বিগত দের দশক ধরে বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাথে ঘনিষ্ঠ ও একমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করেছিল দিল্লি। তবে এই ধরনের ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক সম্পর্ক বাংলাদেশের সাধারণ জনমনে ব্যাপক অসন্তোষ ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের জনগন মনে করেন প্রতিবেশীর পররাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা ও সার্বিক রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো বিশেষ রাজনৈতিক শক্তিকে কেন্দ্র করে নয়। আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে অতীতের এই কৌশলগত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।

চলতি বছর ডিসেম্বর শেখ হাসিনা সহ তার দলের পালাতক শীর্ষ নেতারা দেশে ফেরার যে কাল্পনিক গল্প শুনিয়ে যাচ্ছেন তাতে বাংলাদেশে অবস্থানরত নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন সহ পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা ভোগীদের মধ্যে একটি উৎসাহের আমেজ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাদের ধারণা পালাতক শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন সেই আগের দাপুটে স্বৈরশাসকের ভুমিকায়। তারা বেমালুম ভুলেই গেছেন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আদালত কতৃক মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত একজন আসামি। তারা হয়তো ভুলেই গেছেন ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই অভিজ্ঞতা ও বিপুল জনজাগরণের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র ও সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব মৌলিক ভাবে বদলে যাওয়ার কথা । প্রশাসনিক আধিপত্য বা ক্ষমতার পুরনো কাঠামোতে ফিরে যাওয়ার কোনো সহজ পথ এখন আর শেখ হাসিনা ও তার নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের জন্য খোলা নেই। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বা না ফেরার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে আদালত, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, যথাযথ তথ্য-প্রমাণ ও আইনি নথিপত্রের ওপর। গুজবের ওপর ভিত্তি করে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা কেবল রাষ্ট্রের আইন ও জনসম্পৃক্ত জবাবদিহিতার মুখে পড়বে। আন্তর্জাতিক আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের ক্ষেত্রেও একটি মূলনীতি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বজায় রাখা আবশ্যক। একজন সাবেক শক্তিশালী শাসক ক্ষমতাশালী ছিলেন বলে যেমন আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না, তেমনই রাজনৈতিক ভাবে বিতর্কিত ব্যক্তি বলেই আইনগত ভাবে ন্যায়বিচারের অধিকার থেকেও তিনি বঞ্চিত হতে পারেন না। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক ভাবে গ্রহণযোগ্য, রাজনৈতিক প্রতিশোধ মুক্ত এবং স্বচ্ছ হতে হবে। জাতিসংঘের রিপোর্ট বা দেশীয় তদন্তের প্রতিটি তথ্যকে প্রমাণভিত্তিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করাই আইনের শাসনের আসল পরীক্ষা। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোনো একপক্ষের আধিপত্যবাদী মনস্তত্ত্ব বা 'বড় ভাই-ছোট ভাই' নীতির ওপর টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশ ভারতের শত্রুতা চায় না, তবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং সার্বভৌম অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়। গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে তোয়াক্কা না করে তৈরি হওয়া সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না এই ঐতিহাসিক শিক্ষা ভারতকে অনুধাবন করতে হবে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে কূটনৈতিক টেবিলে যা ই ঘটুক না কেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র এবং আইনের শাসন অনেক বেশি শক্তিশালী। সীমান্তে কোনো নেতা ফিরতে পারেন, কিন্তু একটি সচেতন জাতির অর্জন করা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও মুক্তির আকাক্সক্ষাকে পেছনে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত কোনো দেশের পছন্দ বা ব্যক্তিস্বার্থে নির্ধারিত হবে না; তা নির্ধারিত হবে এ দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনা, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:১৩

রাজীব নুর বলেছেন: দেশের মানুষ তো আওয়ামীলীগকে নিষিদ্ধ করে নাই।
দেশের মানুষ আওয়ামীলীগকে ভালোবাসে। মানুষ যা চাইবে তা-ই হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.