নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আবু সিদ

আবু সিদ › বিস্তারিত পোস্টঃ

কী জানি আর কী জানি না

১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:০১

এক

কী জানি আর কী জানি না তা আমরা অনেক সময় ভাবতে বা বুঝতে পারি না। অবশ্য বেশিরভাগ সময় আমরা আমাদের জানা/অজানাকে যাচাই করি না। আবার এমন সময় আসে যখন আমরা আমাদের জানাকে জাহির করতে চাই। কখনও কখনও বাক-বিতণ্ডা হয়। ক্ষেত্রবিশেষে কুৎসিত আক্রমণ বা মারামারি পর্যন্ত হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা যদি একটু নীরব হই, আর একটু চিন্তা করি তাহলে জ্ঞান আর অজ্ঞতা নিয়ে আমরা প্রত্যেকে অন্য কিন্তু অনন্য এক উত্তর পাব।

ধরা যাক, আমরা এরিস্টটলকে খুঁজে পেলাম। তিনি আমাদের সামনে সশরীরে হাজির। তার পাশে আমাদের এখানকার এক অনুসন্ধিৎসু মানুষ। তিনি মোটামুটি লেখাপড়া করেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের খোঁজ-খবর রাখেন। তাদের দু'জনের মাঝে ঘণ্টা দুয়েক জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে কথা-বার্তা হলে এরিস্টটল নিশ্চয় অবাক হবেন। যতটুকু জ্ঞান অর্জন করে তিনি পৃথিবী ছেড়েছিলেন তারপর মহাকাশ ও তার বিভিন্ন উপাদান নিয়ে যে হাজারো উদ্ঘাটন-উদ্ভাবন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হয়েছে তা দেখে তিনি বিস্মিত হবেন।

আমাদের একালের এই মোটামুটি জানা মানুষের বিজ্ঞতা দেখে অ্যারিস্টটল সম্ভবত অবাক হবেন এবং নিজেকে নিয়েও তাঁর সন্দেহ দেখা দিতে পারে। তিনি জানতেন যে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। যখন তিনি দেখবেন যে গ্যালিলিও শুধু বলেননি বরং দেখিয়েছেন যে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে না বরং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে । তিনি হয়ত ভাববেন, উঃ! আমি তো কিছুই জানি না। তাঁর মনে হতে পারে যে, এ-কালের এ-মানুষটি মনে হয় সর্বজ্ঞানী। যদি তাকে বলে দেওয়া হয় যে, না। একালের হিসেবে মানুষটি মোটামুটি জানেন। তাহলে অ্যারিস্টটল হয়ত আফসোস করবেন, ওঃ! যদি আমি এ-কালে জন্মাতাম। তাহলে তো আরও অনেক অনেক কিছু জানতে পারতাম। অ্যারিস্টটল ছিলেন তাঁর কালের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ কাতারের মানুষ; নিজের এই শোচনীয় অজ্ঞতা দেখে তিনি দৌড়ে পালিয়েও যেতে পারেন।

যাই হোক, এবার যদি একইভাবে নিউটনকে পেয়ে যাই তাহলেও দারুণ ব্যাপার হবে। নিউটন বুঝতে পারবেন যে তাঁর দুনিয়া ছাড়ার পর আরও নানান ধরণের জিনিস মানুষ উদ্ভাবন করেছে। তৈরি হয়েছে থিওরি অফ রিলেটিভিটি (Theory of Relativity), কোয়ান্টাম মেকানিক্স (Quantum Mechanics), বুলিয়ান অ্যালজেব্রা (Boolean Algebra, সত্য (True) আর অসত্য/মিথ্যা (False) দিয়ে গঠিত গাণিতিক যুক্তি যা কম্পিউটার সার্কিট আর প্রোগ্রামিংয়ের মূল ভিত্তি।), মানব মেধা সক্ষমতার সীমা বিষয়ক তত্ত্ব (The incompleteness theorem by Kurt Godel)... আরও অনেক কিছু।

মানব মেধার সীমা নিয়ে গ্যোডেলের অসম্পূর্ণতা তত্ত্ব এক গভীর সত্য তুলে ধরে। তিনি দেখিয়েছেন যে, কোনো গাণিতিক ব্যবস্থাই সব সত্যকে প্রমাণ করতে পারে না। অর্থাৎ যুক্তি ও গণিতের শক্তি যতই বড় হোক, কিছু সত্য সবসময় এর বাইরে থেকে যায়। এই তত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের জ্ঞানের সীমা আছে। যুক্তি আর বুদ্ধি দিয়ে মানুষ বিশ্ব চরাচরের সব কিছু জানতে বা বুঝতে পারবে না।

এসব জেনেশুনে নিউটন হয়ত দুয়ার বন্ধ করে আবার লেখাপড়ায় বসবেন। সব বুঝে হয়ত বলবেন, হুম! আমি এসব জানতাম না। কিন্তু তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং বিরোধীদের দমন করতে সিদ্ধহস্ত। তিনি হয়ত বলবেন, তা আমি না জানি, এসব তত্ত্ব আমি না জানলে অসুবিধা কী? আমি তো কখনও দাবী করিনি যে আমি সব জানি। বরং, আমি বলেছি যে, আমি জ্ঞানের সাগরে দাঁড়িয়ে কয়েকটি নুড়ি কুড়িয়েছি মাত্র। আমার সেসব নুড়ি যেমন, মাধ্যাকর্ষণ শক্তির তত্ত্ব (Theory of gravity) তোমরা এখনও ব্যবহার করছো। আর তাছাড়া আমার এসব উদ্ভাবন না হলে যেসব তত্ত্বের কথা তোমরা বলছো তা কী হতো? বুদ্ধিমত্তার সাথে নিউটন হয়ত আরও বলতেন যে, অবশ্য আমি কোন ক্রেডিট দাবী করি না। কারণ তোমরা জানো যে আমি বলেছিলাম, ‘If I have seen further, it is by standing on the shoulders of giants.'। মানে, ‘আমি যদি বেশি কিছু জেনে বা বুঝে থাকি তবে তা সম্ভব হয়েছে আমার মহৎ পূর্বসূরিদের প্রজ্ঞার আলোকে এগিয়ে যাওয়ার কারণে’।

নিউটন ভালোয় ভালোয় বিদায় নিয়ে আবার গিয়ে শুলেন কবরে। এবার একই ভাবে পাওয়া গেল সক্রেটিসকে। সব দেখে শুনে তিনি খালি মুচকি হাসছেন। তাঁর হাসি যেন থামছেই না। তিনি শুধু হাসিমুখে বলবেন; আমি এক কথার মানুষ। আমি হাজার বছর আগেও যা বলেছি এখনও তাই বলি: আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না (I know that I know nothing)। জ্ঞান-কে ব্যখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন যে, নিজের অজ্ঞতাকে জানাই হলো একমাত্র সত্যিকারের জ্ঞান (The only true wisdom is in knowing you know nothing)।

দুই
এবার বর্তমান কালের একটা উদাহরণ দেখা যাক। প্রায় বিশ বছর আগে ডিমের কুসুমকে ক্ষতিকর বলা হতো। তখন মনে করা হতো, কুসুমে থাকা কোলেস্টেরল সরাসরি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই সপ্তাহে মাত্র কয়েকটা ডিম খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হতো। কিন্তু পরে বড় আকারের গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেখা গেল, ডিমের কোলেস্টেরল রক্তের কোলেস্টেরল তেমনভাবে বাড়ায় না । বরং স্যাচুরেটেড ফ্যাটই আসল সমস্যা। নতুন গবেষণায় আরও বোঝা গেল, কুসুমে আছে দরকারি পুষ্টি (চোলিন, লুটেইন, ভিটামিন ডি, ওমেগা ৩ ইত্যাদি) (Djoussé & Gaziano, 2008; Rong et al., 2013)।

এখনকার বৈজ্ঞানিক মত হলো, ডিমের কুসুম আসলে উপকারী, যদি পরিমিত খাওয়া যায়। বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য দিনে এক দুইটা ডিম খাওয়া নিরাপদ। তা চোখ, মস্তিষ্ক আর বিপাকের জন্য ভালো। সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ‘ডিমের কুসুম আসলে কখনোই আসল সমস্যা ছিল না, আসল দোষী হলো অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট’ (National Geographic, 2026; Fuller et al., 2015)। এ থেকে বোঝা যায় যে, আমরা যা কিছু জানি বলে মনে করি তা সব সময় সঠিক জানা নাও হতে পারে। অর্থাৎ, আমাদের জ্ঞান নিশ্চিত নয়। একইভাবে আমরা যা কিছু আজ সঠিক বলে ভাবি তার কোনটা সঠিক আর কোনটা বা ভুল তাও আমাদের অজানা ।

আবার, ধরে নিই যে আমরা যা জানি তার সবকিছু সঠিক। এখন একটা জানা জিনিসের জন্য যদি এক (১) নম্বর করে দিই তাহলে সব মিলিয়ে ১০/২০/৫০/১০০, ১০০০ বা ১০,০০০ হতে পারে আমাদের জানার পরিমাণ। অন্যদিকে, অজানার পরিমাণ অপরিসীম। এখন এই জানার পরিমাণকে যদি অজানার পরিমাণ দিয়ে ভাগ করি তাহলে তা শূন্যের কাছাকাছি হবে — যদিও তা একেবারে শূন্য নয়।

অর্থাৎ, আমরা প্রত্যেকে কিছু না কিছু জানি। একজন এটা জানেন তো আরেকজন আরেকটা জানেন... এরকম। কিন্তু আমরা কেউই সব কিছু জানি না। এ থেকে বোঝা যায় যে আমাদের এই অতি সামান্য জ্ঞানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে অপরিসীম অজ্ঞতা। আমরা যদি এ কথা ভুলে না যাই তাহলে সবসময় নতুন কিছু শিখতে পারব। আর যখন নতুন কিছু আমরা জানি তখনই কেবল বুঝতে পারি যে, আরও কত কী জানি না !


মন্তব্য ২ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৫৬

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: আমাদের এত বুদ্ধির কি দরকার ছিল ?
এটম বোমা, গাইডেড মিসাইল, ড্রোন, ইত্যাদি
বিশ্বে সকল সাধারন মানুষের ঘুম হারাম করে নিয়েছে ।

১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:৫৩

আবু সিদ বলেছেন: স্বপ্নের শঙ্খচিল, দারুণ বলেছেন। আপনার মন্তব্য ইন্টারেস্টিং। এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর পদার্থবিদ হকিং দিয়েছেন এভাবে: জ্ঞান নিজে কোনো শত্রু নয়। আসল সমস্যা হলো আমাদের জৈবিক প্রবৃত্তি, বিশেষ করে আক্রমণাত্মক মনোভাব। যা এখনো এমনভাবে বিকশিত হয়নি যে আমরা নিজেরাই তৈরি করা পৃথিবী ধ্বংসকারী প্রযুক্তিগুলো সামলাতে পারি। তিনি মনে করতেন, পারমাণবিক শক্তি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর আমাদের দখল আমাদেরকে এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে প্রযুক্তিগত দক্ষতা আমাদের প্রজ্ঞার চেয়ে অনেক দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এই জ্ঞান যেন সর্বনাশ ডেকে না আনে, তার একমাত্র উপায় হলো পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ভালো বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.