| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
অমিয়েন্দ্র
The Darkest Places in the Hell are Reserved for Those who Maintain Their Neutrality in Times of Moral Crisis. ꟷDante Alighieri
আজ থেকে প্রায় দু'বছর আগের কথা। আমার বাবা তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি, সন্ধ্যার দিকে তার একটি অপারেশন করার কথা। কিন্তু ডাক্তারদের অবহেলায় সেই অপারেশন আর সন্ধ্যায় করা গেল না, অপারেশন হতে হতে রাত ১২ টা বেজে গেল। অপারেশন সাকসেসফুল হয়নি, ফলস্বরুপ রাত ২টার দিকে আমাদেরকে চিরবিদায় জানিয়ে দূরদেশে পাড়ি জমালেন আমার আব্বা। :'(
ময়মনসিংহে যখন এতকিছু ঘটে গেল তখন আমি ঢাকায়, সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ভর্তি হয়ে সবে মাত্র গোছগাছ শুরু করেছি। আমাকে বাড়ি থেকে বলা হয়েছিল আব্বার পুরোনো সমস্যা (ফুসফুসে পানি) ফিরে এসেছে। গতবারের (৫ বছর আগে একটা অপারেশন করা হয়েছিল) মতো ছোট একটা অপারেশন করলেই বিষয়টা সেরে যাবে। আমি যেন ঠিক মতো পড়াশোনা করি, এসব বিষয় নিয়ে যেন চিন্তা না করি। আমিও জানি আগের বারের অপারেশনটা কোন ঝামেলা ছাড়াই শেষ হয়েছিল। কাজেই এবার যে এত বড় একটা দূর্ঘটনা ঘটবে সেটা আমাদের কারোর কল্পনাতেও ছিলনা।
৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৩ (মঙ্গলবার) ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আব্বাকে আমার দেখতে যাওয়ার কথা। আমার আব্বা মারা গেলেন সোমবার দিবাগত রাত দু'টায়। আব্বার সাথে শেষবারের মতো কথাটাও বলতে পারলাম না সামনাসামনি। পরে জানতে পারলাম আর দু' আড়াই ঘন্টা আগেও যদি অপারেশনটা করা হতো তাহলেও রিকভারি করার সম্ভাবনা ছিল প্রায় ৭০%!
যদিও আমার আব্বা চেয়েছিলেন আমি যেন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করি, কিন্তু সেদিন থেকেই আমি মনে মনে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম যে আমাকে ডাক্তার হতে হবে। কিছু সংখ্যক কসাইয়ের প্রতিবাদ করার জন্য, তাদের হাত থেকে মহান এই পেশাটাকে কিছুটা হলেও বাঁচানোর জন্যই আমাকে একজন ভাল ডাক্তার হতে হবে।
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া আমার পক্ষে সম্ভবও না। কারণ আব্বা মারা যাওয়ার পরই আমরা বিরাট অর্থকষ্টে পড়ে যাই। বিশাল পরিমান ঋণের বোঝা আমাদের ঘাড়ে এসে চাপে। ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই আমাকে গ্রামের কলেজে চলে আসতে হয়। দু' বছরে দু' দিনও প্রাইভেট পযতে পারিনি। ফলে ম্যাথে দূর্বলতা থেকে যায়। তাই সিদ্ধান্ত নেই যে মেডিকেলেই আমাকে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর গিয়েছিলাম মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দিতে। পরীক্ষা খুব ভালই হলো। কিন্তু বাইরে এসে শুনি প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। অমুকের ৯০ টা হবে, তমুকের ৯৫ টা হবে। একজন গার্জিয়ানকে দেখলাম তার ছেলেকে জিজ্ঞাসা করছেন, "ডেভিড বেকহামের প্রশ্নটা এসেছে?? সরল দোলকের প্রশ্নটা এসেছে??" আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। একরকম নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে আমার চান্স হচ্ছে না। কারণ আমি মাত্র ৭১টি প্রশ্নের সঠিক উত্তর ও ৬/৭ টি প্রশ্ন ধারণা থেকে উত্তর দিয়েছি যা অন্যান্য বার মেডিকেলে চান্স পাওয়ার জন্য যথেষ্ট হলেও এবার তা নিতান্তই অপ্রতুল কারণ এবার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী তা পেয়েছে। আওয়ামীলীগ সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো প্রশ্ন ফাঁস নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা।
আমার মতো হাজার হাজার ছেলেমেয়ের দু' বছর ধরে অতি যত্নে লালিত ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন, গায়ে সাদা অ্যাপ্রন জড়ানোর স্বপ্নের কবর রচিত করে দিলো আমাদের সরকার এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। এর থেকে আমরা পরিত্রাণ পাবো কবে??
প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ধামাচাপা দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রাতের আঁধারে তড়িঘড়ি করে ফলাফল প্রকাশ করলো। ভোরে যার স্কোর দেখা গেল ৯৮.৭৫, সার্ভার বন্ধ রেখে বিকেলে সেই রেজাল্টকে বানিয়ে দেয়া হলো ৯৪.৭৫! প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সহকারী পরিচালকসহ ৩ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করলো র্যাব। তারপর রংপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হলো কয়েকটা কোচিংয়ের পরিচালকসহ ৭ জনকে। এত কিছুর পরও আমাদের মূক ও বধির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে যে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় কোন প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। কী আজব দেশে বাস করি আমরা।
প্রশ্ন ফাঁসের এই পরীক্ষার বিরুদ্ধে সারা দেশ থেকে দাঁড়িয়ে গেছে কিছু সাহসী ছেলে মেয়ে। তারা আবার স্বচ্ছ পরীক্ষা চায়। তারা কিন্তু কারো ক্ষতি করেনি। অথচ তাদের এই ন্যায্য দাবী এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বারবার হামলা করছে পুলিশ?? কেন?? এই জবাব কে দিবে?? সরকার কি এই পুচকে ছেলে মেয়ে গুলোকে ভয় পাচ্ছে?? কেন ভয় পাচ্ছে??
এবার আসুন দেখে নিই মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার ঘটনাপঞ্জি::
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ২০১৫-১৬ সারমর্ম :
১. মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।
২. মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে।
৩. মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ১৮ সেপ্টেম্বরই অনুষ্ঠিত হবে।
১৬.০৯.১৫
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় একজন ডাক্তারসহ ৪ জনকে আটক করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB).
বুধবার মহাখালী ডিওএইচএস থেকে এই চক্রকে আটক করা হয়। এ সময় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, উত্তরপত্র এবং ১ কোটি ২১ লাখ টাকার চেক জব্দ করা হয়েছে।
১৮.০৯.১৫
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন হল ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই।
২০.০৯.১৫
ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ। রেকর্ড সর্বোচ্চ ১৯৮.৭৫ (সকালে)। ফল পরিবর্তিত, সর্বোচ্চ ১৯৪.৭৫ (বিকালে)!
পরীক্ষা বাতিল ও পুণরায় পরীক্ষা নেয়ার আবেদন করে হাইকোর্টে রিট আবেদন।
২১.০৯.১৫
হাইকোর্টে শুনানী শেষে ডিরেক্ট রিট আবেদন খারিজ।
পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে, কোনো প্রকার প্রশ্ন ফাঁস হয় নি : স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
২২.০৯.১৫
মেডিকেল প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে রংপুর থেকে ৩ ডাক্তারসহ ৭ জন আটক।
২৩.০৯.১৫
ফলাফল উধাও !!!
স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা যে কতটুকু তা এই আন্দোলনকারী ছেলে মেয়েদের মুখের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। এমনকি সমস্ত আনন্দ বিসর্জন দিয়ে এরা ঈদের দিনেও প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। (যারা খোঁজখবর রাখেন তারা জানেন)। চট্টগ্রামের ছেলেমেয়েরা কাফনের কাপড় পড়ে রাস্তায় শুয়েছে। কতটা কষ্ট পেলে কোমলমতি এই ছেলেময়েরা এটা করতে পারে?? ভাবুন, একবার ভাবুন। প্রশ্ন ফাঁসের এই পরীক্ষায় এতগুলো ছেলেমেয়ের স্বপ্নের অপমৃত্যুর দায় কে নেবে??
যে ছেলে মেয়েগুলো গতবার চান্স না পেয়ে টানা এক বছর পড়াশোনা করেছে তারা আজ হেরে গেল অসৎ লোকদের টাকার কাছে। তাদের স্বপ্নটাকে খুন করলো আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এই পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে লেখালেখি করছেন। টিআইবি ও এই পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের পক্ষে। তারপরও সরকার নিজেদের গুয়ার্তুমি বজায় রেখে ভর্তির তারিখ প্রকাশ করেছে। সরকারকে বুঝতে হবে গণমানুষের বিপক্ষে গিয়ে কোনদিন ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না।
সবশেষে বলবো প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং রি-এক্সাম বর্তমানে দেশে অন্যতম আলোচিত বিষয়। একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট পাশ করার পর বিসিএস দিয়ে দেশের ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার হয়। অনেক অসহায় মানুষের আশার প্রতীক হয়। রোগীদের কাছে সেকেন্ড গড বলে বিবেচিত হয়। আর সেই মানুষটির গোড়াতেই যদি থাকে গন্ডগোল, তাহলে জাতি তার কাছে কী আশা করতে পারে?? তার কাছ থেকে আমরা কিভাবে ভাল সেবার নিশ্চয়তা পেতে পারি..?? আমাদের মন্ত্রী আমলারা তো এটা নিয়ে চিন্তিত নন, কারণ তাদের শরীর একটু গরম হলেই তারা সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথের দিকে দৌড় লাগান। কিন্তু আমরা সাধারণ জনগণ তো তা করতে পারি না, আমাদেরকে নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা কে দেবে?? প্রশ্ন ফাঁস করে চান্স পেয়ে যারা ডাক্তার হবে তাদের কাছ থেকে কি আদৌ ভাল চিকিৎসা আশা করা যায়??
আজকে যারা প্রশ্ন ফাঁস করে, দুর্নীতি করে ডাক্তারি পড়ার চান্স পেল; ভবিষ্যতে ডাক্তার হওয়ার পর তাদের অবহেলায় যে আপনার কোন আত্মীয় মারা যাবে না, তার গ্যারান্টি আপনাকে কে দিবে?? ভাবুন, নিজের বিবেককে জাগ্রত করুন। প্রতিবাদ করুন আমাদের সাথে হওয়া এই অন্যায়ের।
৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:০২
অমিয়েন্দ্র বলেছেন: ধন্যবাদ, সম্পাদিত। বিসিএস দিয়েই ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার হতে হয়, এটা জানা ছিল। কিন্তু লিখতে ভুলে গেলাম কেন জানি না। ![]()
ধন্যবাদ সংশোধন করে দেওয়ার জন্য। ![]()
২|
৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ দুপুর ১২:২৩
আহসানের ব্লগ বলেছেন: ++++++
৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ দুপুর ২:১৫
অমিয়েন্দ্র বলেছেন: অসংখ্য ধন্যপাতা... জীবনের প্রথ পোস্টে + দেওয়ার জন্য... ![]()
৩|
৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৪:২৮
আহসানের ব্লগ বলেছেন: ভাল থাকবেন প্রিয় ব্লগার ।
০১ লা অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১২:১৩
অমিয়েন্দ্র বলেছেন: আপনিও ভাল থাকবেন... ![]()
©somewhere in net ltd.
১|
৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সকাল ৯:৫০
সাগরের হাসি বলেছেন: তথ্যে একটু ভুল আছে। পরিবর্তন আবশ্যক। মেডিকেল স্টুডেন্ট পাশ করার পরই ফার্স্টক্লাশ গেজেটেড অফিসার হয় না। এরপর আবার বিসিএস দিয়ে পাশ করলে তারপর পর ফার্স্টক্লাশ গেজেটেড অফিসার হতে পারে।