| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
দানবিক রাক্ষস
অন্ধদের রাজ্যতে এক চোখা মানুষটি রাজা এবং আমি সেই রাজা। না ঈশ্বর, না পিশাচ—আমি তৃতীয় বিশ্বাস।
ঢাকার আকাশে সেদিন হালকা বৃষ্টি ছিল।
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো গেটের সামনে এক কফির দোকানে একা, হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি সাথে একটা সিগারেট , চোখে ক্লান্তি আর বুকভরা বহু বছরের নীরবতা।
চারপাশে ভেজা বাতাস, কৃষ্ণচূড়ার লাল পাপড়ি আর স্মৃতির ভার।
জীবনে অনেক কিছু বদলে গেছে।
বন্ধুরা হারিয়ে গেছে সময়ের ভিড়ে।
স্বপ্নগুলো কর্পোরেট অফিসের ফাইলে বন্দী।
কিন্তু একটা নাম আজও বদলায়নি— কেয়া।
কেয়াকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম, সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে বিকেলের আলো পড়েছিল।
সাদা সালোয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে দেখে মনে হয়েছিল, কেউ যেন শান্ত বিকেলকে মানুষের রূপ দিয়েছে।
তার চোখদুটো ছিল গভীর নদীর মতো শান্ত।
চোখে কোনো অহংকার ছিল না, ছিল অদ্ভুত এক কোমলতা।
তার হাসি এত নরম ছিল যে, মনে হতো পৃথিবীর সব রাগ গলে যেতে পারে।
কেয়া কথা বলত খুব আস্তে, যেন শব্দ দিয়েও কাউকে আঘাত করতে চায় না।
তার কণ্ঠে ছিল মায়া, ঠিক রবীন্দ্রসঙ্গীতের নরম সুরের মতো।
চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো হলে মনে হতো বৃষ্টির ভেতর কালো মেঘ ভেসে যাচ্ছে।
তার মুখে খুব সাধারণ এক সৌন্দর্য ছিল, কিন্তু সেই সাধারণত্বই তাকে অসাধারণ করে তুলেছিল।
সে কখনো জোরে হাসত না, শুধু ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটত।
আর সেই হাসি দেখলে আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত ঝড় উঠত।
কেয়া রাগ করলেও চোখে মায়া লেগে থাকত।
সে ক্যাম্পাসের কুকুরদের খাবার দিত, পথের ছোট বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিত।
কেউ মন খারাপ করে থাকলে সে চুপচাপ পাশে বসে থাকত।
তার ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি, যেন পৃথিবীর সব যুদ্ধের মাঝেও সে শান্তির ভাষা জানে।
আমি বহু সুন্দর মানুষ দেখেছি, কিন্তু কেয়ার মতো সুন্দর আত্মা কখনো দেখিনি।
তার সৌন্দর্য শুধু মুখে ছিল না, ছিল আচরণে, দৃষ্টিতে, শব্দে, নীরবতায়।
মাঝে মাঝে মনে হতো, মানুষ নয়—সে যেন প্রার্থনা।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দিনগুলো ছিল আমাদের ছোট্ট এক পৃথিবী।
প্রতিদিন সকালে আমি শুধু তাকে একবার দেখার জন্য ক্লাসে যেতাম।
ক্যান্টিনের শেষ বেঞ্চটা ছিল আমাদের প্রিয় জায়গা।
দুজন মিলে এক কাপ চা ভাগাভাগি করে খেতাম।
বৃষ্টির দিনে কেয়া জানালার পাশে বসে থাকত আর আমি চুপচাপ তাকে দেখতাম।
সে খাতার কোণায় ছোট ছোট ফুল আঁকত।
আমি মজা করে বলতাম, “তুমি পড়াশোনার চেয়ে শিল্পী বেশি।”
সে হেসে বলত, “তোমাকে দেখলেই আমাকে আঁকতে ইচ্ছা করে।”
আমরা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে লাইব্রেরির পেছনের করিডোরে হাঁটতাম।
কখনো বিকেলে রিকশায় পুরো ঢাকা শহর ঘুরতাম।
কেয়া খুব পছন্দ করত বৃষ্টিভেজা রাস্তা আর ফুচকা।
আমি ইচ্ছে করেই ধীরে হাঁটতাম, যেন তার সাথে সময়টা দীর্ঘ হয়।
শীতের সকালে সে আমার জন্য গরম কফি এনে দিত, ছোট্ট ফ্লাক্সে করে।
পরীক্ষার আগে রাতে ফোনে পড়তে পড়তে কখন যে গল্প শুরু হয়ে যেত বুঝতেই পারতাম না।
আমি বলতাম, “তুমি না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়টা এত সুন্দর লাগত না।”
কেয়া হেসে বলত, “বিশ্ববিদ্যালয় সুন্দর না, তুমি আছো বলে সব সুন্দর লাগে।”
একদিন বৃষ্টির মধ্যে আমরা পুরো ক্যাম্পাস হেঁটেছিলাম।
কেয়ার চুল ভিজে মুখের ওপর পড়ে ছিল। আহ কি অপূর্বই না লাগছিল তাকে।
আমি সে দিন বলেছিল, “জানো, আমি চাই এই সময়টা কখনো শেষ না হোক।”
কেয়া কিছু বলিনি তখন।
কারণ হয়েত সে জানত, সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোই সবচেয়ে দ্রুত শেষ হয়ে যায়।
আমরা একসাথে বইমেলায় গিয়েছিলাম।
কেয়া কবিতার বই খুব পছন্দ করত।
সে প্রতিটা বইয়ের পাতার গন্ধ নিত।
আমি তাকে দেখতাম আর মনে হতো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হলো—একটা শান্ত মেয়ের বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাওয়া।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদে বসে আমরা সূর্যাস্ত দেখেছি।
কেয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে বলত, “মানুষ কি সত্যিই সারাজীবন এক মানুষকে ভালোবাসতে পারে?”
আমি তখনও উত্তর দিইনি।
কারণ আমি ভয় পেতাম, সত্যি বললে হয়তো সে বুঝে যাবে আমি তাকে কতটা ভালোবাসি।
একদিন সে আমার হাতে একটা নীল কলম দিয়েছিল।
বলেছিল, “যখন আমাকে মনে পড়বে, এটা দিয়ে লিখবে।”
আজও সেই কলমটা আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি।
আমাদের ভালোবাসা খুব চিৎকার করে জন্ম নেয়নি।
ধীরে ধীরে, নীরবে, একে অপরের অভ্যাস হয়ে উঠেছিলাম আমরা।
তার পাশে বসলে মনে হতো পৃথিবীতে আর কিছু প্রয়োজন নেই।
কেয়া আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ অনুভূতি ছিল।
আমি তার চোখে নিজের ভবিষ্যৎ দেখতাম।
আর সে হয়েত আমার নীরবতাও বুঝে ফেলত।
কিন্তু সময় সব গল্প পূর্ণ হতে দেয় না।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হওয়ার কিছুদিন পর কেয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়।
তার ফ্যামেলি ছিল খুবই রক্ষনশীল আর আমি তখন বেকার, চাকরি খুজছি,
আমি কেয়াকে বলছিলাম, চল আমরা পালিয়ে দূর বহু দূরে চলে যাই, কিন্তু সে নিশ্চুপ ছিল।
এক সন্ধ্যায় কেয়া খুব শান্ত গলায় আমাকে বলেছিল,
“সব ভালোবাসা একসাথে থাকার জন্য জন্মায় না।”
আমি সেদিন হাসার চেষ্টা করেছিলাম।
কিন্তু ভেতরে পুরো পৃথিবী ভেঙে পড়ছিল।
অনেক বছর পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রিইউনিয়ন,
আমি বুকের এক কোণে একটু আশা ছিল, কেয়া আসবে , তাকে দুচোখ ভরে দূর থেকে দেখব মন ভোরে।
কেয়া ঠিকিই আসল, আবার কেয়ার সাথে দেখা হল।
নীল শাড়িতে তাকে দেখে মনে হয়েছিল, সময় শুধু বয়স বাড়িয়েছে, সৌন্দর্য কমায় না।
তার চোখে এখনো সেই নরম মায়া ছিল।
শুধু কিছু ক্লান্তি জমে ছিল গভীরে।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
কারণ কিছু মানুষকে দেখলে ভাষা হারিয়ে যায়।
“কেমন আছো?”
কেয়া ধীরে জিজ্ঞেস করল।
আমি মৃদু হাসলাম।
“ভালো থাকার মুখোশ পড়ে বেচে আছি।”
কেয়া তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“তুমি এখনো আগের মতোই কথা বলো।”
নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে আমি কেয়াকে বললাম চল আমরা আবার পুরোনো ক্যাম্পাসে হাঁটি।
তারপর পুরোনো ক্যান্টিনে বসে চা খেলাম।
কেউই অতীত নিয়ে কথা বলিনি।
কারণ কিছু স্মৃতি স্পর্শ করলে মানুষ ভেঙে যায়।
রাত বাড়ছিল।
ঢাকার আকাশে বৃষ্টি নামছিল ধীরে ধীরে।
গাড়ির জানালার পাশে বসে কেয়া হঠাৎ বলল,
“জানো … জীবনে সবাই সংসার পায়, কিন্তু সবাই ভালোবাসা পায় না।”
আমি চুপ করে রইলাম।
কারণ, এই একটা কথার ভেতরে বহু বছরের কান্না লুকিয়ে আছে।
বিদায়ের আগে শেষে কেয়া ধীরে বলেছিল,
“যদি আবার কোনো জন্ম হয়… তখন আমাকে আর হারিয়ে ফেলো না।”
আমি কিছু বলতে পারিনি।
কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টের অনুভূতি হলো—
যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো, তাকে ঠিক সময়টাতে না পাওয়া।
________________________________________
কেয়া চলে যায়।
রাস্তার আলো ভেজা বৃষ্টির ওপর পড়ে ঝাপসা হয়ে যায়।
আমি দাঁড়িয়ে থাকি একলা দীর্ঘক্ষণ।
তারপর , একটি সিগারেট টান দিয়ে , খুব ধীরে চোখ বন্ধ করি, কারণ কিছু ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না—
শুধু মানুষগুলো একসাথে থাকতে পারে না।
আজও বৃষ্টি নামলে আমি কেয়াকে মনে করি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর, কফির কাপ, ভেজা চুল, নরম হাসি—সব মনে পড়ে।
আর বুঝতে পারি—
কিছু মানুষ জীবনে আসে না থাকার জন্য।
তারা আসে মানুষকে ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ শেখানোর জন্য।
আর আমার জীবনের সেই অর্থের নাম— কেয়া।
২৯ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১৬
দানবিক রাক্ষস বলেছেন:
খুলে দে বাধন, দেখব তখন , কে শিকার আর কে শিকারি ।
কিন্তু কেয়াতো সেই বাঁধন খুলে দেয়নি ![]()
২|
২৯ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০
অপ্সরা বলেছেন: দিয়েছে বটে তবে তুমি বাঁধন ধরে রেখেছো!
হাজার হোক ভুল করে দানবিক আসলে মানবিক! ![]()
২৯ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৩
দানবিক রাক্ষস বলেছেন: কেয়াও ঠিক , আমিও ঠিক, ভূল নিতান্তই প্রাকৃতিক।
এটা শিক্ষার প্রতিশোধ , দুটি ভিন্ন মূল্যবোধ। ![]()
যাক সে সব কথা, গত সপ্তাহে একটা লেখা পোস্ট করেছিলাম, পড়ার অনুরোধ রইল।
https://www.somewhereinblog.net/blog/DanobikRakhos/30392937
৩|
২৯ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৪
অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য বলেছেন: এটা গল্প না কি কবিতা?
২৯ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬
দানবিক রাক্ষস বলেছেন: জীবনের ছোট্ট গল্প ![]()
©somewhere in net ltd.
১|
২৯ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৫৪
অপ্সরা বলেছেন: রাক্ষস ভাইয়া দানবিক হলে কেনো?

তুমি তো আসলে মানবিক রাক্ষস তাই তো কেয়া অন্যকে বিয়ে করতে পারলো।
মনে মনে দানবিক হলে কি চলবে?