নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি মেহেদি হাসান, মি. বিকেল নামে পরিচিত। আমি একজন লেখক, অভিনেতা, সমাজকর্মী, রেডিও জকি, ওয়েব ও অ্যাপ ডেভেলপার, সম্পাদক, উপস্থাপক, রক্তদাতা, এবং নাট্য পরিচালক। মাইক্রোসফটে ডেভেলপার হিসেবে কর্মরত এবং গল্প বলা আমার প্রধান পরিচয়।

মি. বিকেল

আমি মোঃ মেহেদি হাসান, কলম নাম মি. বিকেল।

মি. বিকেল › বিস্তারিত পোস্টঃ

প্রেডিক্টেবল স্ক্রিপ্ট ভাঙার কৌশল এবং আত্মরক্ষার উপায়

০৩ রা এপ্রিল, ২০২৫ রাত ১:৪১



আমাদের মস্তিষ্কে কিছু পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিপ্ট বা চিত্রনাট্য যুক্ত থাকে। একই মানুষ গ্রামের পরিবেশে এবং শহুরে পরিবেশে একইরকম আচরণ প্রদর্শন করেন না। বরং তিনি অবস্থাভেদে তার প্রতিক্রিয়া দ্রুত নির্ধারণ করতে পারেন। গ্রামের নিঃশব্দ এবং শহরের কোলাহল আমাদের স্মৃতিতে রেকর্ড করা আছে। গ্রাম বললে যেমন একটি চিত্র আমাদের সামনে এসে থাকে ঠিক তেমনি শহর বললেও আমাদের সামনে একটি নির্দিষ্ট চিত্র এসে থাকে।

অনেকক্ষেত্রে বিষয়টি একটি অটোমেটিক প্রক্রিয়ার মত মনে হতে পারে। জনাব রহিম কে দেখে আমরা তাৎক্ষণিক সালাম দিতে পারি অন্যদিকে জনাব করিম কে দেখে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে এড়িয়েও যেতে পারি। মানে হলো জনাব রহিম ও করিম আমাদের অতি চেনা ব্যক্তিত্ব। আর তাদের ঐ ব্যক্তিত্ত্বের উপর ভিত্তি করে আমাদের মাথায় নির্ধারিত একটি চিত্রনাট্য তৈরি হয়ে আছে। আর ঐ চিত্রনাট্য থেকে আমরা অটোমেটিক নির্ধারণ করতে পারি যে, কাকে সম্মান করতে হবে এবং কাকে এড়িয়ে যেতে হবে (ঘৃণাভরে)।

আমাদের সামজিক এই অটোমেটিক আচরণের একটি অনুমানযোগ্য প্রোফাইলিং করা সম্ভব। এবং তার উপর ভিত্তি করে কোন বিশেষ ব্যক্তি কে প্রভাবিত করাও সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ: মি. রিফাত, নিয়মিত কিছু মানুষদের সাথে ‘রাজনীতি’ বিষয়ক আলাপ জমান। তারপর এক ডজন চা পান শেষে আলোচনা শেষ করেন। প্রায় প্রতিদিনই মি. রিফাত সন্ধ্যা ৬টায় এই আড্ডায় যোগ দেন। আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, তিনি একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে বিশেষ বিশেষ অভিযোগ করে থাকেন।

ধরে নিচ্ছি, মি. রিফাতের এই আচরণ অতি সূক্ষ্মভাবে প্রোফাইলিং করেছেন মি. অমিত। এখন মি. অমিত জানেন মি. রিফাত আসলে ঐ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল সম্পর্কে কি ধরণের পারসেপশন (অনুধাবন/উপলব্ধি) রাখেন। মি. অমিত আরো জানেন যে, মি. রিফাত বাকি রাজনৈতিক দল বা প্রতিপক্ষ দলকে কী কী অভিযোগ বারবার করে থাকেন। এর উপর ভিত্তি করে মি. অমিত চাইলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব খাটাতে পারেন।

বিশেষ করে ঐ আলোচনায় মি. অমিত সরাসরি যুক্ত হয়ে মি. রিফাতের পক্ষে অবস্থান করে তার সমর্থিত রাজনৈতিক দল অনেক ভালো বিবেচনায় উস্কে দিতে পারেন। এবং এই উস্কে দেবার ফলে মি. রিফাত মনে করতে পারেন যে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক আলাপ-ই যথেষ্ট নয় বরং ঐ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য ক্যাম্পেইন করাও জরুরী। এতে করে মি. রিফাতের যে পকেটের টাকা কাটা পড়বে সেটা তার ইচ্ছার পুরোপুরি বহিঃপ্রকাশ নাও হতে পারে।

আরো ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে যে, মি. রিফাতের যে দলের প্রতি সমর্থন আছে এবং যে দলের প্রতি আক্ষেপ বা অভিযোগ বা ঘৃণার উপলব্ধি রয়েছে তা সত্য হওয়া এখানে জরুরী নয়। বরং মি. রিফাত যা ভাবছেন, যা করছেন তার উপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা প্রোফাইলিং তার বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবহার করা বা ‘Weaponize’ করা সম্ভব।

অনুমানযোগ্য ব্যক্তিত্বের কিছু সমস্যা হচ্ছে, তারা সাধারণত একই দোকান থেকে প্রত্যহ দিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করে থাকেন, একই ডাক্তারের থেকে সেবা নিয়ে থাকেন, একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থন করেন (এখানে ঐ দল সঠিক দল হওয়া জরুরী নয়), নির্বাচিত বা একই সাংবাদিকদের থেকে তথ্য গ্রহণ করে থাকেন, নির্বাচিত বই পড়েন, নির্বাচিত ইতিহাস পড়েন, নির্বাচিত সিনেমা/সিরিজ/নাটক দেখে থাকেন, টাকার লেনদেনে নির্দিষ্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপর আস্থা রাখেন ইত্যাদি। আর এই অনুমানযোগ্য ব্যক্তিত্বের মানুষরা নিজেদের আবার ‘প্রেডিক্টেবল (Predictable)’ বলে একধরনের গর্ববোধ করেন।

কিন্তু একজন মানুষ যত বেশি অনুমানযোগ্য হয়ে পড়বেন তাকে পাঠ করে তার সম্পর্কে একটি প্রোফাইল তৈরি করা করা তত সহজ হয়ে যায়। এই মানুষগুলোর ভাষা তাদের সামাজিক শিক্ষা ও সংস্কৃতি অনুযায়ী হয়ে থাকে এবং এদের অঙ্গভঙ্গি পূর্ব অনুমানযোগ্য হয়ে থাকে। রাজনৈতিক দলের সমর্থন থেকে শুরু করে নির্ধারিত ও নির্দিষ্ট মানুষদের সাথে ওঠাবসা অত্যন্ত প্রেডিক্টেবল হয়ে যায়। এদের দিকে তাকিয়ে হাসলে এরাও আপনার দিকে তাকিয়ে হাসতে পারেন। কিন্তু কেন? কেউ হাসলে আমাকেও হাসতে হবে কেন? বিশেষ করে যদি সেখানে হাসাহাসি করার কারণ-ই না থাকে? মজার না!

‘দ্য আর্ট অব সেডাকশন’, ‘48 লস অব পাওয়ার’ -এই বইগুলোতে দেখানো হয়েছে, পূর্ব অনুমানযোগ্য ব্যক্তিত্বের আচরণের একটি প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এছাড়াও মাইকেল পেসের বই ‘Dark Psychology 101’ -তে এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও এ বিষয়ে আরো গভীর চিন্তার অবতারণা করেছেন ফিলিপ জিম্বার্ডো ‘দ্য লুসিফার ইফেক্ট’ -এ এবং ক্রিস্টোফার উইলির ‘মাইন্ডফাক’ -বইতে। আর এই ডার্ক সাইকোলজির নাম হলো, ‘অনুমানযোগ্য সামাজিক চিত্রনাট্য (Predictable Social Script)’। যেখানে একজন ব্যক্তির ভাষা ও অঙ্গভঙ্গির প্যাটার্ন বিবেচনায় তার সম্পর্কে একটি প্রোফাইল তৈরি করা হয় এবং ঐ প্রোফাইলের দূর্বল দিক কে ম্যানিপুলেট করা হয়।

বাস্তবতার নিরিখে একটি সোজাসাপ্টা উদাহরণ দেখা যাক:

দৃশ্য - ০১ (সাধারণ অবস্থা বিবেচনায়): রেস্টুরেন্টে খাবার চাইলেন → মেনু হাতে পাইলেন → অর্ডার করলেন → খাবার শেষে বিল পরিশোধ করলেন

দৃশ্য - ০২ (ডার্ক টেকনিক বিবেচনায়): রেস্টুরেন্টে খাবার চাইলেন → মেনু হাতে পাইলেন → মেনুতে নানান রকম ডিসকাউন্ট দেখতে পেলেন → টাকা বাঁচাতে ওয়েটার কে ডাকলেন → তিনি কিছু খাবার নেবার জন্য আপনাকে উৎসাহিত করলেন → অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করলেন

ডিজিটাল দুনিয়া বা অন্তর্জালের দুনিয়া নিয়ে একটি সাধারণ উদাহরণ দেখে নেওয়া যাক:

দৃশ্য - ০১ (স্বাভাবিক অবস্থা বিবেচনায়): আপনি গুগল/ফেসবুকে সার্চ করলেন বা লিখলেন → “আচ্ছা, গোলাপী রঙের শার্ট কি ছেলেরা পরে থাকেন? আমি নিতে ইচ্ছুক” → গুগল/ফেসবুক/আমাজন আপনাকে কিছু সাজেশন দেখালো → আপনি একটি বাছাই করে ক্রয় করলেন এবং টাকা পরিশোধ করলেন

দৃশ্য - ০২ (ডার্ক টেকনিক বিবেচনায়): আপনি গুগল/ফেসবুকে সার্চ করলেন বা লিখলেন → “আচ্ছা, গোলাপী রঙের শার্ট কি ছেলেরা পরে থাকেন? আমি নিতে ইচ্ছুক” → ফেসবুক/গুগল/আমাজন আপনাকে নানান রকমের শার্ট দেখাতে শুরু করলো → কিছু গোলাপী রঙের শার্ট সেলিব্রেটিরাও পরছেন সেটাও দেখানো হলো → কিছু শার্টে বিশেষ ডিসকাউন্ট, একটা ক্রয় করলে আরেকটা ফ্রি! → আপনি বেশি দামে একটি বা দুটি গোলাপী রঙের শার্ট ক্রয় করলেন এবং অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করলেন বা খরচ করলেন।

কারণ গুগল বা ফেসবুক বা আমাজন NLP এর সাহায্যে আপনার ভয়ংকর প্রোফাইলিং ইতোমধ্যেই তৈরি করে রেখেছে। ব্যস! আপনাকে ফাঁদে ফেলানোর জন্য। আর বর্তমানে এটাই বেশি হচ্ছে। এছাড়াও লাইক-কমেন্টের অধিক প্রতিক্রিয়া ‘গুজব’ কেও সাময়িক সত্যতে রুপান্তর করতে দেখা যায়। মানুষ মনে করেন, যেহেতু সবাই এই বিষয়ে একমত সেহেতু এটাই সত্য।

ঠিক একইভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে কেউ না কেউ আমাদের প্রোফাইলিং করছেন। এবং তাদের পণ্য বিক্রয়ের জন্য আমাদের সরাসরি টার্গেট করছেন। এরকম অভিযোগও আছে যে, যে দোকান থেকে আপনি বেশি কেনাকাটা করছেন সে দোকান আপনাকে বাকি দিয়ে খারাপ সময়ে সাহায্য করলেও আসলে তিনি বা তারা আপনার থেকে বেশি টাকা আদায় করছেন।

সামাজিক ক্ষেত্রে রুপক অর্থে আমরা অটোমেটিক আচরণ দেখাই, একই চরিত্র দেখাই কিন্তু ম্যানিপুলেটর এসে আমাদের আচরণ ও চরিত্র বদলাতে সক্ষম। আবার অনলাইনে কন্ট্রোভার্সিয়াল পোস্ট দেখে আমাদের নিজের মতামত রাখবার যে প্রবণতা সেটা আসলে একটি ফাঁদ।

তাই, অনুমানযোগ্য ব্যক্তিত্বের গর্ববোধ নয় বরং আমাদের মধ্যে এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত। ভোক্তা হিসেবে তথ্য বা পণ্যের সঠিকতা যাচাইয়ে ক্রসচেক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে ‘গুজব’ কীভাবে গুজবে রুপান্তরিত হচ্ছে তার কারণ হলো এই ডার্ক টেকনিক এবং আমাদের অসচেতনতা।

সুতরাং অন্তর্জালেও আমাদের সচেতন হওয়া বর্তমান সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হুট করেই কিছু ছড়িয়ে পড়লে তা যদি আমাদের পারসেপশন কেও সাবক্রাইব করে তবুও তার সত্যতা যাচাই করা উচিত।

ডার্ক সাইকোলজির এই পর্বে আমার পরামর্শ হলো, চেষ্টা করুন একটি আন-প্রেডিক্টেবল ব্যক্তিক্ত্ব হওয়ার জন্য। এতে করে খুব সহজেই কেউ আপনাকে ঘিরে একটি প্যাটার্ন ও প্রোফাইল তৈরি করতে পারবে না।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৫ সন্ধ্যা ৭:৩০

নকল কাক বলেছেন: গুরুত্বপূর্ন লেখা। ++++

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.