| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আমাদের ছোটবেলার ঈদ নিয়ে লিখতে বসলে থমকে যেতে হয়। এত এত স্মৃতি একসাথে মনের জানালায় এসে ভিড় করে যে কোথা থেকে শুরু করে কোথায় শেষ করবো এই ভেবে দিশেহারা হয়ে যেতে হয়। আমাদের ঈদ মূলত যারা নব্বইয়ের দশকের শেষে বা নতুন শতকের একদম শুরুর দিকের বছরগুলোতে শৈশব-কৈশোর পার করেছে তাদের ঈদ। কতশত পরিকল্পনায় ছেয়ে থাকা অদ্ভূত স্বপ্নময় একেকটা ঈদ।
আমাদের সে সময়ের জীবনে একটাই কষ্ট ছিল – পড়াশোনা। ঈদের কয়েকটা দিন সেই পড়াশোনা নামক দৈত্যের হাত থেকে মুক্তি মিলতো। এ আনন্দের কোন তুলনা হয় না। ঈদের ঠিক কয়দিন আগে থেকে আর পড়ার টেবিলে বসবো না এটা নিয়েও কত কাহিনী। কুরবানির ঈদের সময় সাধারণত আমাদের গরু আসার পর থেকে আর পড়ালেখা করতাম না। এটা ছিল অফিসিয়াল নিয়ম। কিন্ত যখন আব্বু গরু কিনার জন্যে বাসা থেকে বেরোতো তখনই আমরা পড়ালেখা ছেড়ে দিতাম। তারপর শুধু অপেক্ষা, বারান্দায় দাঁড়িয়ে গেটের দিকে চেয়ে থাকা, কখন গরু আসবে। সে তো মোবাইলের যুগ না যে চাইলেই ফোন দিয়ে খবর নেয়া যাবে গরু কিনা হলো নাকি বা হাটের কী অবস্থা। সে সবের সুযোগ তখন ছিল না, কিন্ত অপেক্ষার প্রহরগুলো অনেক বেশি মধুর ছিল। তবে পড়ালেখা থেকে মন উঠে যেতো কিন্ত আরও আগেই। যখন কোয়ার্টারে প্রথম কোন কুরবানির পশু আসতো তখন থেকেই – হোক সেটা গরু বা ছাগল। আমাদের শৈশব কেটেছে সরকারি কোয়ার্টারে, বাসার সামনেই মাঠ। কুরবানি ঈদের সময় সে মাঠ ভরে যেত গরু, ছাগলে। আমাদের গরু-ছাগল সবসময় কিনা হতো মাঝামাঝি সময়ে। তার আগেই হয়তো কোন আঙ্কেল দড়ি ঝুলিয়ে দুইটা ছাগল আর কাঁঠাল পাতার ডাল নিয়ে এসে গেছেন হাট থেকে। কোয়ার্টারের প্রথম কুরবানির পশু আসার সাথে সাথেই শুরু হয়ে যেত আমাদের ঈদ। যৌথ জীবনের এইসব আনন্দ তুলনাহীন।
আব্বুর গরুর হাটে যাওয়ার প্রস্ততিও ছিল দেখার মত। হাটে যাওয়ার জন্যে আলাদা একজোড়া শ্যু ছিল। প্রতিবছর ঠিক হাটে যাওয়ার সময়ই সেই জুতাজোড়া ব্যবহার করা হতো। আব্বু বের হওয়ার পর দরজার ছিটকিনি লাগিয়েই আমরা ঈদ শুরু করে দিতাম। কিন্ত এর মধ্যেও কত ধরনের বৈচিত্র্য। একবার এরকম হাটে যাওয়ার কয়েক ঘন্টা পর খবর ভেসে এলো কোন এক আঙ্কেলের গরু নাকি কিনার পর হাঁটিয়ে নিয়ে আসার সময় দড়ি ছুটে পালিয়ে গেছে। এই অবস্থায় রাস্তার মধ্যে দুই কিলোমিটার গরুর পিছনে দৌড়ানো হয়েছে। পথিমধ্যে গরুটা একটা মোটরসাইকেল উল্টিয়ে দিয়েছে এবং শেষপর্যন্ত কোন বাড়ির বারান্দার গ্রিলে গিয়ে শিং আটকে যাবার কারণে মহাশয় রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। কী রোমাঞ্চকর ব্যাপার। আমাদের ছেলেবেলার ঈদগুলো ছিল ঠিক এমনই রোমাঞ্চে ঠাসা।
ছাগল নিয়ে আলাদা করে কিছু না লিখলেই না। সে সময় কুরবানির ঈদ আসলে আমাদের এক দফা, এক দাবি – ছাগল চাইই চাই। কারণ মূল আনন্দটাই ছাগলকে ঘিরে। ছাগলকে যেভাবে নিজ হাতে খাওয়ানো, পরানো, নিজ হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায়, গরুকে নিয়ে তো তেমন সম্ভব না। একবারের কথা মনে পড়ে, আব্বু আমাদের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করার দরুণ আমরা কঠোর আন্দোলন গড়ে তুললাম। আমাদের ভাইবোনের সাথে আরও আছে আম্মু, বাসার কাজ করার মেয়েটা। আব্বু একা এক দল। সেইবার আমরা যুক্তি করে আব্বু হাটে যাওয়ার ঠিক আগে কাজের মেয়েকে দিয়ে বলিয়ে নিলাম যে, ছাগল না আনলে সে আর কোন কাজ করবে না। এই কথা শুনে আব্বু সবাইকে ইচ্ছামত ঝেড়ে হাটে চলে গেল। আমাদের তো মন খারাপ। এরপরের দৃশ্য আব্বু ছাগল এনে আমাদের বাসার সামনের গাছে বেঁধে, পাশে কয়েকটা কাঁঠাল গাছের পাতাওয়ালা ডাল রেখে দিয়ে উচ্চস্বরে আমাকে নিচে আসার জন্যে ডাকছে। আহ, কী আনন্দ!
সব গরু-ছাগল কিনা হয়ে যাওয়ার পর শুরু হতো আমাদের অস্থির, উত্তেজনাপূর্ণ সময়। কার গরু কত বড়, কত দাম এইসব নিয়ে হৈচৈ। আর সাথে সাথে গরুকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা, ভাতের মাড়, ভুসি, খড়, সবুজ ঘাস আরও কত কী। আর ছাগলের স্পেশাল খাবার কাঁঠাল পাতা। দিন নেই, রাত নেই আমাদের এইসব খাবার নিয়ে ছোটাছুটি আর খাওয়ানোর পালা। কিছু কুরবানি ঈদের সময় খুব শীত ছিল। তখন রাত হলে নতুন চিন্তা, গরুকে ঢাকা হবে কীভাবে? চট আনো, বস্তা আনো – কতরকম চিন্তা আমাদের। আর রাতে ছাগল রাখা হতো বাসায়। ছাগলের ম্যা ম্যার আওয়াজে আর রাতে ঘুমানোর উপায় নেই – এত ভালো লাগতো এভাবে জেগে থাকতে, মনে হতো ঈদ তাহলে এসেই গেল?
ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই পাড়ায় বসে যেত ঈদকার্ডের অস্থায়ী দোকান। আর শুরু হত ঈদকার্ড কিনার ধুম। আর সেইসব দোকানে চলতো বড় বড় সাউন্ডবক্সে উচ্চশব্দে গান। ঈদ যত ঘনিয়ে আসতো, গানের শব্দ যেন তত বাড়তে থাকতো, সাথে সাথে বাড়তো আমাদের আনন্দ। অবশ্য এটা কুরবানির ঈদের চেয়ে রোজার ঈদেই বেশি হতো। ঈদের আরেকটা অপরিহার্য কাজ ছিল বড় আপুদের মেহেদি দেয়া। আমাদের কোয়ার্টারেই মেহেদি গাছ ছিল, কাজেই মাঝেমধ্যে মেহেদি পাতা ছিঁড়ে আনার ভার আমাদের উপরও পড়তো। পুরো ব্যাপারটাতেই কেমন একটা অস্থির আনন্দ মিশে থাকতো, কেমন একটা ঈদ ঈদ গন্ধ যেন লেগে থাকতো বাতাসে।
আমাদের এমনিতে সকাল আর বিকাল ছাড়া বাইরে বেরোনোর অনুমতি ছিল না। কিন্ত ঈদের সময় এসব নিয়ম থাকতো না। সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা ইচ্ছামত ঘুরে বেড়াও, যা খুশি তাই করো, কী অবাধ স্বাধীনতা। সময় ঘুরতে ঘুরতে চলে আসতো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ – ঈদের আগের রাত। এই রাতে এত স্বাধীনতা নিয়ে আমরা কী করবো বুঝতে পারতাম না। আমাদের মাথায় দুষ্ট বুদ্ধির ভূত চাপতো। আমরা বিভিন্ন রকম উল্টাপাল্টা প্ল্যান করতাম বসে বসে। তার সবগুলো লেখা সম্ভব নয়। তবে একটা প্ল্যান ছিল এইরকম যে, কোয়ার্টরের কারেন্টের মেইন সুইচ অফ করে সব অন্ধকার করে দিবো। আফসোসের বিষয় এটা কখনও কার্যকর করা হয় নি। আরেকটু বড় হওয়ার পর এইসময় হয়তো বাহিরে চলে যেতাম, বিজয় স্মরণী ফ্ল্যাইওভারের উপরের ফুটপাথে বসে পড়তাম সব ছেলেপেলে একসাথে, দুনিয়ার সব আজগুবি বিষয় নিয়ে গুরুগম্ভীর আলাপ হতো আর ফাঁকে ফাঁকে সামনে দিয়ে গরু নিয়ে কেউ গেলেই, ভাই কত হলো? ঈদের আগের রাতে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আমাদের দেয়া হতো। সেটা হলো, দুই হাত ভরে কোক, সেভেন আপের দুই লিটারের বিশাল বিশাল বোতল দোকান থেকে নিয়ে আসা। কারণ আগেভাগেই এনে না রাখলে ঈদের দিন হয়তো সব শেষ হয়ে যাবে। কী উৎসাহে আমরা এসব সফট ড্রিংস কিনে আনতাম তখন!
কুরবানি ঈদের দিন একটু সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে। নিজের গোসল তো আছেই সাথে আবার গরু-ছাগলকেও তো গোসল করাতে হবে। গোসল করানোর লোক আলাদা আছেই, আমরা হয়তো শুধু দেখবো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কুরবানি ঈদের সকালে কুরবানির পরই নাকি খেতে হয়, তাও পায়েসের গন্ধে আমরা প্রায়ই নামাজে যাওয়ার আগেই মিষ্টিমুখ করে নিতাম। আর কে কখন নামাজে যাওয়ার জন্যে বের হবো সেটা তো আগের রাতেই প্ল্যান করা, সবাই একসাথে তাকবীর পড়তে পড়তে ঈদগাহ ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া। দ্রুত নামাজ পড়ে এসে গরু কুরবানি দেয়া দেখা, এরপর যখন গরু কাটাকাটির কাজ চলে সেই ফাঁকে আমাদের বাসায় বাসায় ঘুরে ঘুরে ইচ্ছামতন খেয়েদেয়ে বেড়ানো, ঈদের দিনের সময় যেন খুব দ্রুতই চলে যেতে থাকে। আর আমাদের মন খারাপ হতে থাকে, যাহ, এই ঈদটাও চলে গেল। ঈদ নিয়ে এতদিন ধরে এত বেশি উৎসাহ-উদ্দীপনা, এতরকম প্ল্যান থাকে যে ঈদ চলে গেলে আবার এমন মন খারাপ হয় তা আর বলার মতন না।
এইভাবেই আমাদের শৈশবের কুরবানি ঈদগুলো পার হতো। কৈশোরের ঈদ অভিজ্ঞতা আবার আরেকটু অন্যরকম। সেখানে ঈদের নতুন অনুষঙ্গ হিসেবে যুক্ত হয় গরুর হাটে নিজে যাওয়া, ঈদের আগের রাতে আর ঈদের দিন বাইরে বাইরে এলাকার সব ছেলেপেলে মিলে ঘোরাঘুরি। সে সব নিয়ে অন্য কোনদিন লেখবো। আজকের এই ফেসবুকীয় একঘেয়েমিতে ভরা ঈদের পূর্ব মুহূর্তে এসে সে সব ফেলে আসা সোনালী সময়ের ঈদগুলোর স্মৃতিচারণ করতে খুব বেশি ইচ্ছা হচ্ছিলো তাই এই লেখা।
সবার ঈদ প্রিয়জনদের সাথে নিয়ে অনেক অনেক সুন্দর এবং নিরাপদে কাটুক। সবাইকে পবিত্র ঈদুল-আজহার অনেক অনেক শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।
©somewhere in net ltd.