নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সংক্রান্তির সলতে। লেখক সম্পাদক ওয়েব প্রকাশক

শ্রীশুভ্র

ফ্রীল্যান্স লেখক

শ্রীশুভ্র › বিস্তারিত পোস্টঃ

গণতন্ত্র ও গণভোট

২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ বিকাল ৫:৫৪





অবশেষে শেষ হলো পূর্ব ইউক্রেনের ডনবস অঞ্চলের আংশিক গণভোট। আংশিক কারণ। এখনো ডনবস অঞ্চলের রুশভাষী অনেক গ্রাম, শহর ও নগর পশ্চিম ইউক্রেনের শাসনাধীন। সেপটেম্বর ২৩ থেকে সেপটেম্বর ২৭শে যে চারটি অঞ্চলে সংঘটিত হলো এই গণভোট। সেগুলির ভিতর একমাত্র উত্তরপূর্ব প্রান্তের লুঘান্সক প্রদেশ ছাড়া বাকি অঞ্চলগুলি এখনো সম্পূর্ণ ভাবে ইউক্রেনের দখল থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ডনেৎস্ক প্রদেশের পশ্চিম প্রান্তের বেশ কিছুটা অঞ্চল এখনো ইউক্রেন বাহিনীর দখলেই রয়ে গিয়েছে। এবং যুদ্ধ চলছে। ঠিক তেমন ভাবেই জাপোরঝিয়া এবং খারসন অঞ্চলের অনেকটাই এখনো ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর দখলে রয়ে গিয়েছে। এই চারটি অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এই গণভোট। ওদিকে ওডেসা। যে ওডেসায় ২০১৪ সালের ২রা মে’তে নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালিয়ে জীবন্ত দগ্ধ করা হয় চল্লিশের বেশি ওডেসাবাসী নারী পুরুষদের। যাদের একমাত্র অপরাধ ছিল কিয়েভের নাৎসী প্রভাবিত অগণতান্ত্রিক সরকারকে অস্বীকার করা। এবং শহর বন্দরসহ ওডেসাকে রাশিয়ার সাথে সংযুক্ত করার দাবিতে সরব হওয়া। সেই ওডেসা এখনো সম্পূর্ণ ভাবেই নাৎসী প্রভাবিত কিয়েভের দখলেই রয়ে গিয়েছে। এই অপশক্তির দখলে রয়ে গিয়েছে উত্তর পূর্বের খারকভ শহর সহ আঞ্চলিক ছোট ছোট শহর ও গ্রামগুলি। প্রসঙ্গত খারকভ ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর। ফলে সম্প্রতি সংঘটিত গণভোট কিন্তু সম্পূর্ণ ডনবস অঞ্চলে সম্প্রসারিত করা সম্ভব হয়নি। না হলেও, ডনবসের রুশভাষী অঞ্চলের অনেকটা বড়ো অংশেই এই গণভোট সংঘটিত হয়ে গেল। প্রায় চল্লিশটির মতো দেশের শতাধিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতে সংঘঠিত এই গণভোট ছিল সম্পূর্ণ ভাবেই আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মকানুন অনুযায়ী বৈধ। ফলে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধানরা কে কি বলল। সেটা আর তত বড়ো কোন বিষয় না। বড়ো কথা নয় সিকিউরিটি কাউন্সিলে মার্কিন বাহিনীর সব শাকরেদরা একসুরে কি নামতা আউরিয়ে গেল। আসল কথা, ডনবস অঞ্চলের ইউক্রেনের দখলমুক্ত স্বাধীন নাগরিকরা এই গণভোটে কি রায় দিলেন। সেটাই।

এখন দেখা যাক। গণভোটের ফলাফলে কি তথ্য উঠে এলো। এই গণভোট নেওয়া হলো একটি মাত্র প্রশ্নকে সামনে রেখে। রাশিয়ার সাথে যোগ দেওয়ার পক্ষে ও বিপক্ষে মানুষের রায় কি। মনে রাখতে হবে গণভোট সংঘটিত হয়েছে মাত্র চারটি অঞ্চলে। উত্তরপূর্বের লুঘান্সক থেকে শুরু করে পূর্ব প্রান্তের ডনেৎস্ক। এবং দক্ষিণের জাপোরঝিয়া ও খারসেনের দখলমুক্ত এলাকায়। এর ভিতরে জাপোরঝিয়া ও খারসেনে মাঝে মধ্যেই আক্রমণ চালিয়ে গিয়েছে ন্যাটোর মদতপুষ্ট ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী। বাদ যায়নি ডনেৎস্কের অনেক জায়গাও। ফলে কত শতাংশ মানুষ শেষমেশ ভোট দিতে এগিয়ে আসতে পারবেন। সেই বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকসহ দখলমুক্ত অঞ্চলের প্রশাসনের ভিতরে বেশ কিছুটা সংশয় ও আশঙ্কা ছিল। আর এই কারণেই গণভোটকে সম্প্রসারিত করা হয়েছিল পাঁচদিনব্যাপী। নির্বাচন কমিশনের কর্মীরা বহু জায়গায় পাড়ায় পাড়ায় পোলিং বাস নিয়ে গিয়ে হাজির হয়ে ছিলেন। কোথাও কোথাও অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে গিয়েও ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য একটিই। যত বেশি মানুষ নির্বিঘ্নে নিরাপদে নিজেদের রায় নিজেরা দিতে পারেন। এবং তার ভিতরেও কোন কোন ভোটগ্রহণের স্থলে আক্রমণ শানিয়েছিল ইউক্রেনের দখলদার বাহিনী। যদিও রুশ সামরিক বাহিনী সেইসব আক্রমণ সামলিয়ে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ করতে সাহায্য করে। এইভাবে আধুনিক কালপর্বে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণভোট সংঘটিত হলো ডনবসের দখলমুক্ত অঞ্চলগুলিতে।

গণভোট প্রক্রিয়ার শেষে। প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে খারসন অঞ্চলে। সেখানে ৭৭% মানুষ ভোট দিতে পেরেছেন। কিন্তু রাশিয়ার সাথে ডনবসের সংযুক্তির প্রশ্নে সায় দিয়েছেন তার ভিতরে ৮৭.০৫% মানুষ। এরপরে জাপোরঝিয়া। সেখানে ভোট দিতে পেরেছেন ৮৫.৪% মানুষ। যাদের ভিতরে রাশিয়ার সাথে এক হওয়ার বিষয়ে তাদের সম্মতি জানিয়ে দিয়েছেন ৯৩.১১% অধিবাসী। এরপরে আসা যাক ডনেৎস্কে। সেখানে ভোট দিয়েছেন ৯৭.৫% ডেনেৎস্কবাসী। যাদের ভিতরে ৯৯.২৩% যোগ দিতে চান রাশিয়ায়। সবশেষে লুঘান্সক। লুঘান্সকের ৯৪.১% অধিবাসী এই গণভোটে অংশগ্রহণ করেছেন। রাশিয়ার সাথে ডনবস অঞ্চলের যোগ দেওয়ার প্রশ্নে ৯৮.৪২% অধিবাসী তাঁদের সম্মতি জানিয়ে দিয়েছেন। এই হলো গণভোটের সম্পূর্ণ ফলাফল। ফলে এটা এখন দিনের আলোর মতো পরিস্কার। পূর্ব ইুউক্রেনের রুশভাষী আধ্যুষিত অঞ্চলের মানুষ আর কোনভাবেই ইউক্রেনের সাথে থাকতে চান না। তাঁদের স্বাধীন ইচ্ছে রাশিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার। তাঁরা কোন ভাবেই চৌদ্দো পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে যেতেও রাজি নন। রাজি নন বলেই দীর্ঘ আট বছর ধরে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে চলেছেন। নিজের জন্মভুমিকে ইউক্রেনের দখলমুক্ত করার জন্য। প্রসঙ্গত স্মরণে রাখা দরকার। ২০১৪ সালে এই লুঘান্সক এবং ডনেৎস্কের অধিবাসীরা একটি গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। সেই গণভোটের রায় নিরঙ্কুশ ভাবেই এই এই অঞ্চলের স্বাধীনতার পক্ষে গিয়েছিল। এবং সেই কারণেই তাঁরা সেই গণভোটের পরেই ইউক্রেনের পতাকা নামিয়ে নিজেদের পতাকা তুলে দিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। ফলে আমাদের ভুললে চলবে না। লুঘান্সক ও ডনেৎস্ক প্রদেশের মানুষ দীর্ঘ আট বছর ব্যাপী এই স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধটা চালিয়ে আসছেন। আর ইউক্রেনের নাৎসী প্রভাবিত সামরিক শক্তি এতদিন তাদেরকে তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে পরাধীন করে রেখে দিয়েছিল। ফলে আজকের গণভোটে তারা যে রাশিয়ার সাথে পুনর্মিলনে রায় দেবেন। সেটা অবধারিত ছিল কারণ, বিগত আট বছরে তাঁরা বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন। একক ভাবে তাঁদের পক্ষে নিজেদের স্বাধীনতা ও অস্তিত্ব রক্ষা অসম্ভব। ফলে অত্যন্ত সাধারণ বুদ্ধিতেই যেটা মাথায় আসার কথা। রুশভাষী জনগণ রাশিয়ার সাথেই সংযুক্তির দাবি করবেন। তারা কেন ইউক্রেনভাষীদের ইউক্রেনের নাগরিক হয়ে থাকতে রাজি হবেন? আশ্চর্য্যের হলেও সত্যি। সেই সত্যটাকে বিশ্বজুড়ে ধামাচাপা দিয়ে চলেছে ওয়েস্টার্ন মিডিয়া। মনুষকে ঠিক উল্টোটাই বুঝিয়ে চলেছে। ফলে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলি যে এই গণভোটের বিরুদ্ধতা করবে। সে তো বলাই বাহুল্য। এই গণভোট মার্কিন অপশক্তির স্বার্থবিরোধী।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে। ইঙ্গমার্কিন অপশক্তি সহ যে কোন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই গণভোটের বিরোধী। এবং বিশেষ করে দেশে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঠিকাদারিত্বে বিভিন্ন রাষ্ট্রে যুদ্ধ এবং অস্থিরতা তৈরী করতে অক্লান্ত পেন্টাগণ এই বিষয়ে অদ্বিতীয়ম। এবার একটু ইতিহাসের দিকে পিছন ফেরা যাক। ১৯৪৭ সাল। বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ করার ঠিকাদার ব্রিটিশ এবং তাদের দালাল গোষ্ঠী কংগ্রেস হিন্দুমহাসভা আর এস এস এবং মুসলিম লীগ। সকলের স্বার্থ রক্ষায় ভাগ হয়ে গেল পাঞ্জাব ও বাংলা। দেখা হলো না বাঙালি ও পাঞ্জাবীদের জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলি। হিন্দু মুসলিম শিখদের সাম্প্রদায়িক স্বার্থরক্ষার অজুহাতে কোটি কোটি মানুষের ভাগ্যে নামিয়ে দেওয়া হলো রাষ্ট্রীয় সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়। অথচ একই সময়ে উত্তরপ্রদেশ বিহার হায়দ্রাবাদ এবং কাশ্মীর। মুসলিম অধ্যুষিত এই সকল অঞ্চল ভাগ করার কোন দাবি উঠলো না। একই ভারতবর্ষের ভিতরে এই অঞ্চলগুলিতে আজও হিন্দু মুসলিম পাশাপাশি বসবাস করে চলেছে। ভাগাভাগির কোন প্রশ্ন নাই। কিন্তু সেদিন, ১৯৪৭ সালে পাঞ্জাব আর বাংলাকে কেটে দুটুকরো করা হয়েছিল। কোন রকম গণভোট না নিয়েই। ক্ষমতার অক্ষে অবস্থান করা এলিট শ্রেণীর স্বার্থে। তাদের সিদ্ধান্তে। যে সিদ্ধান্তের মাশুল দিতে বাধ্য হয়েছিল কোটি কোটি সাধারণ মানুষ।

এরও আগে ১৯৪৫ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানি। কেটে দুটুকরো করা হয়েছিল কোন গণভোট ছাড়াই। জার্মান জনগণ কি চাইছে। সেটি গণ্য করার দরকার হয়নি। যেমন দরকার হয়নি ঠিক তার এক দশক বাদেই কোরিয়ায়। কোরিয়াকে দ্বিখণ্ডিত করার সময়ে। এবং আজকেও কোরিয়া থেকে কাশ্মীর। কোথাও গণভোটের প্রশ্নকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই দেওয়া হয় না। পাছে সংশ্লিষ্ট সুবিধেভোগী গোষ্ঠীগুলির স্বার্থহানি হয়। ইতিহাসের পাতাজুড়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিপুল আয়োজনের কোথাও কিন্তু গণভোটের বিশেষ ভুমিকা নেই। ভারতবর্ষে গণতন্ত্র চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। কিন্তু দেশ ভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেও গণভোটের আয়োজন করা হয়নি। কারণ একটাই। কোন জাতিই তার দেশকে ভাগ করতে চায় না। মাতৃভাষা ও মাতৃভুমিকে এক রাখার পক্ষেই থাকে অধিকাংশ সাধারণ মানুষ। শুধুমাত্র কিছু সংখ্যক দেশদ্রোহীরাই দেশপ্রেমের নামে সাম্প্রদায়িক এবং গোষ্ঠীস্বার্থের অজুহাতে দেশে দেশে গণভোটের আয়োজন না করেই দেশভাগ করতে থাকে। ইউক্রেনের এই ডনবস অঞ্চলই সম্ভবত প্রথম ব্যতিক্রম। যেখানে মানুষই গণভোটের আয়োজন করে রুশভাষী অঞ্চলগুলিকে রাশিয়ার সাথে সংযুক্তির দাবি তুলেছে। বিশ্বের ইতিহাসে হয়তো এক বিরলতম নজির। এখন ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গণভোটকে স্বীকার করে নিতে রাজি নয়। এই কারণেই ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন, ন্যাটো এবং বিশেষ করে পেন্টাগন ডনবস অঞ্চলের এই গণভোটকে স্বীকার করতে অস্বীকার করেছে ইতিমধ্যেই। মানুষের স্বার্থ এবং মানুষের রায় নিয়ে যাদের কোন মাথাব্যথা নেই। কোনদিনও থাকে না। ঠিক সেই কারণেই ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া যখন গণভোটের আয়োজন করে রাশিয়ায় সংযুক্তির ব্যবস্থা পাকা করে ইউক্রেন থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেছিল। সেই সময় থেকেই মার্কিন অপশক্তি রাশিয়ার উপরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। ফলে এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে। গণতন্ত্রের তথাকথিত স্বঘোষিত ঠিকাদাররাই সকলের আগে গণভোটের বিরোধীতায় সক্রিয় থাকে।

ইউক্রেনের পরিণতি কি হবে। ন্যাটো বনাম রাশিয়ার ছায়াযুদ্ধে কোন পক্ষ বিজয়ী হবে। ডনবস অঞ্চলের রুশভাষীদেরকে রাশিয়া নিজ দেশের নাগরিক বলে স্বীকার করে নিয়ে গোটা ডনবসকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে নিলে বিশ্ব রাজনীতি কোন নতুন দিশা পাবে কিনা। এই সকল প্রশ্নের মীমাংসা যাই হোক না কেন। গণতন্ত্রকে স্বীকার করে নিলে গণভোটের গুরুত্বকে যে প্রাধান্য দিতেই হবে। সেই বিষয়ে কিন্তু কোন সন্দেহ থাকার কথাই নেই। এই প্রসঙ্গেই ইউক্রেন সংকটকে সামনে রেখে সেই সংকটকে আরও তীব্র করে তোলার উদ্দেশে মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করা সুইডেন ও ফিনল্যাণ্ডের ন্যাটোভুক্তির আবেদনকেও বিচার করে দেখা দরকার। লক্ষ্য করে দেখুন। কোন দেশই তাদের ন্যাটোভুক্তির দাবি নিয়ে নিজেদের জনগণের মতামতের কোন তোয়াক্কাই করেনি। করলে অতি অবশ্যই সেই বিষয়ে গণভোটের আয়োজন করতো। জেনে নিত জনতার রায় কোন পক্ষে। এতদিনের নিরপেক্ষ অবস্থানেই থাকার পক্ষে। নাকি রুশবিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে রুশবিরোধী ন্যাটোগোষ্ঠীর সাথে সংযুক্তির পক্ষে। আসলে সুইডেন এবং ফিনল্যাণ্ডের শাসকগোষ্ঠীর কাছে এটা দিনের আলোর মতোই পরিস্কার। সাধারণ নাগরিকদের রায় কখনোই যুদ্ধবাজ ন্যাটোগোষ্ঠীর সাথে সংযুক্তির পক্ষে নেই। গণভোট হলে তাদের অধিকাংশই সুইডেন ও ফিনল্যাণ্ডের বহু পূর্ব থেকেই নেওয়া নিরপেক্ষতার অবস্থানের পক্ষেই রায়দান করতো। রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানের পক্ষে রায় দিতো না। সুইডেন ও ফিনল্যাণ্ডের শাসকশ্রেণী সেই বিষয়ে নিঃসন্দেহ বলেই গণভোট না নিয়েই একতরফা ন্যাটোভুক্তির আবেদন করে বসে রয়েছে। পেন্টাগন থেকে সেই রকম নির্দেশই তাদের কাছে এসে পৌঁছিয়েছে বলে অনুমান করা কঠিন নয়।

আরও একবার ইতিহাসের দুই একটি পাতা উল্টালে আমরা দেখতে পাবো। গত শতকের শেষ দশকে পূর্বতন যুগোস্লাভিয়াকে খণ্ড খণ্ড করার পর্বে। সার্বিয়া থেকে কসোভোকে পৃথক করার সময়েও। কোন গণভোট ছাড়াই কসোভোকে সার্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে সেই মার্কিন আপশক্তি। অর্থাৎ যখন যেখানে যেমন খুশি। নিজেদের স্বার্থে তখন সেখানে তেমন বন্দোবস্তকে কায়েম করাকেই মার্কিন অপশক্তি রুল বেস্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার নাম দিয়ে সারা বিশ্বে চালিয়ে দিয়েছে। যেখন যেখানে তাদের সেই রুল বেস্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডারের স্বার্থহানী ঘটবে। তৎক্ষণাৎ সেখানেই তারা সামরিক শক্তি নিয়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কসোভোর অধিকাংশ জনগণই যদি সার্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের স্বাধীনতা চাইত। সেক্ষেত্রে ন্যাটোগোষ্ঠীর গণভোট নিতে কোন বাধা থাকারই কথা ছিল না। কিন্তু তারা গণভোট নেওয়ার দিকে না গিয়েই। সামরিক শক্তির বলে কসোভোকে সার্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে রেখেছে। সেই একই ঘটনা স্পেনেও ঘটছে। সেখানে উত্তরপূর্ব স্পেনের ক্যাটালোনিয়ার জনগণ ২০১৭ সালের ১লা অক্টোবর গণভোটের আয়োজন করে। স্প্যানিশ সরকার যে গণভোটকে আজও স্বীকৃতি দেয়নি। সরকারের প্রবল বিরোধীতা সত্ত্বেও সেই দিনের গণভোটে ক্যাটালান জনগোষ্ঠী নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষে নিরঙ্কুশ সমর্থনের রায় দিয়েছিল। ফলে গণতন্ত্র থাকুক আর নাই থাকুক। সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠী গণভোটকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায়।

সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠীগুলি। নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থেই গণভোট এড়িয়ে চলে। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত রায়কে তারা ভয় পায়। উল্টে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্যে যখন যেমন খুশি নীতি নির্ধারণ করে সাধারণ জনগনকে সেই সব নীতিমালার জালে আটকিয়ে ফেলে। এবং শাসকশ্রেণী নিয়ন্ত্রীত মিডিয়ার প্রচারে সাধারণ জনগণকে নিরন্তর বিভ্রান্ত করে রাখে। এখন এই শাসকশ্রেণী আবার পরিচালিত হয় কর্পোরেট স্বার্থে। বর্তমান বিশ্বের তথাকথিত গণতন্ত্র সেই কর্পোরেট স্বার্থেই নিয়ন্ত্রীত হতে থাকে। রিপাব্লিকান হোক আর ডেমোক্রেট। দুই পক্ষই কর্পোরেট স্বার্থে পরিচালিত। কর্পোরেট স্বার্থরক্ষা করা ছাড়া তাদের আর করণীয় কিছু নেই। জনতার ভোট যে পক্ষেই পড়ুক না কেন। লাভের গুড় খেতে থাকবে কর্পোরেট গোষ্ঠীই। তাদের প্রতিনিধিরাই শাসকশ্রেণী রূপে রাজনীতিতে অবতীর্ণ। এটাই গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো। কর্পোরেট রাজত্বের পাতা ফাঁদেরই গালভরা নাম গণতন্ত্র। দেশে দেশে সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার তাই এতো কড়াকড়ি। ফলে সেখানে জনগণের স্বার্থরক্ষার কোন দায় নেই। জনতার রায়ের কোন গুরুত্ব নেই। ফলে যেখানেই গণতন্ত্র। সেখানেই গণভোট নৈব নৈব চ! পূর্ব ইউক্রেনের রুশভাষী জনগণ আজ যখন সেই গণভোটকেই আত্মরক্ষার হাতিয়ার করতে উদ্যোত। সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন ন্যাটো গোষ্ঠীর দেশগুলির শাসকশ্রেণী সেই গণভোটকে অস্বীকার করবে। এ আর বড়ো কথা কি।

অর্থাৎ একটি বিষয় কিন্তু দিনের আলোর মতো পরিস্কার। এই যে গণতন্ত্র। এটি জনগণের গণতন্ত্র নয়। সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলির পাতা একটি ফাঁদ মাত্র। যে ফাঁদে জনগণকে আটকিয়ে ফেলার জন্য কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলিই এক শ্রেণীর শাসকগোষ্টী তৈরী করে। যারা বিভিন্ন পোশাকে। নানান পতাকা ও প্রতীকে জনতার সামনে কয়েকটি বিকল্প রাজনৈতিক শিবির সাজিয়ে রাখে মাত্র। জনতার হাতে অন্য কোন বিকল্প থাকে না। হয় একে। নয় ওকে শাসন ক্ষমতায় বসাতে বুথে বুথে লাইনে দাঁড়াও শুধু। ভোট যাকেই দাও না কেন। দেশ ও দশের নিয়ন্ত্রণ রাজনীতি ও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ। শিল্প ও বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ সেই একই কর্পোরেট গোষ্ঠীরই হাতে থেকে যাবে। আর যখন যেখানে তাদের স্বার্থে আঘাত লাগার সম্ভাবনা দেখা দেবে। যখন যেখানে জনগণ কর্পোরেট গোষ্ঠীর পাতা ফাঁদ কেটে মুক্তির চেষ্টা শুরু করবে। প্রথমেই জনতাকে নানান ভাবে বিভ্রান্ত করে পরস্পরের থেকে পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করতে থাকো। যাতে তারা জমাট বাঁধতে না পারে। যাতে তারা একটা প্রবল শক্তি হয়ে উঠতে না পারে। ঠিক এই কারণেই মিডিয়াকে কাজে লাগানো থাকে অষ্টপ্রহর। জনতাকে চব্বিশ ঘন্টা বিভ্রান্ত করে রাখতে। জনতা যত বেশি বিভ্রান্তির শিকার হবে। তত বেশি করে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবে। জনতা জনশক্তিতে পরিণত হবে না। জনতার জনশক্তিতে পরিণত হওয়ার একটা বড়ো রাজপথ কিন্তু গণভোট। আর এই কারণেই কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলির নিয়ন্ত্রণাধীন শাসকশ্রেণী কখনোই গণভোটের পথে এগোতে চায় না। তারা বিলক্ষ্মণ জানে। গণভোটকে প্রশ্রয় দিলে। জনতাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে কলুর বলদের মতো শোষণ যন্ত্রে ঘোরানো সম্ভব হবে না দিনের পর দিন। ফলে একদিকে শিক্ষার প্রসারকে যতটা সম্ভব অবরুদ্ধ কিংবা ব্যায় সাপেক্ষ করে রাখো। যাতে অধিকাংশ জনতার ভিতরে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার শক্তি ঠিক মতো বিকশিত না হয়। আর অন্যদিকে পেইড মিডিয়া দিয়ে রাতদিন সাতদিন দশকের পর দশক সত্যকে ধামাচাপা দিতে নিরন্তর মিথ্যার প্রচার চালিয়ে যাও। লাগাতার ভাবে। আজকের ইউক্রেন সংকটকে বাস্তবতার এই ভিত্তিতে বুঝতে হবে। কেন রাশিয়ার সংবাদ মাধ্যমগুলি সহ বিশ্বের নিরপেক্ষ সংবাদ মাধ্যমগুলিকে ব্যান করে রাখা হয়েছে। কেন জনতার কানে অষ্টপ্রহর রুশ বিদ্বেষের বিষ ঢালার কাজ চলেছে। এবং কেন ডনবস অঞ্চলের রুশভাষী অধিবাসীদের আয়োজিত গণভোটকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। গণতন্ত্রের ফাঁদে জনতাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আটকিয়ে রাখতে গণভোটের মতো ঝুঁকি খুব কমই রয়েছে। তাই গণতন্ত্রের ঠিকাদাররা এই গণভোটকে এত ভয় পায়। গণভোটের শক্তির হদিশ জনতা যদি একবার পেয়ে যায়। তাহলে, সেই জনগণকে কর্পোরেট স্বার্থের ঘানিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কলুর বলদের মতো ঘোরানো অত সহজে আর সম্ভব হবে না। খুঁজতে হবে নতুন কোন পথ। গণভোটে আসল ভয় তাদের সেখানেই।

২৮শে সেপটেম্বর’ ২০২২
©শ্রীশুভ্র

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ ভোর ৬:২৯

কামাল৮০ বলেছেন: আমাদের দেশেও গনভোটের দরকার আছে।পাহাড়িরা আমাদের সাথে থাকতে চায় কিনা এই প্রশ্নে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.