| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
পবিত্র কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ এবং সহিহ হাদিসের সুস্পষ্ট বক্তব্য হল- জামাতে নামাজের সময় ইমাম কুরআন পাঠকালীন সময় মুক্তাদির চুপ করে থাকতে হবে, সূরা ফাতিহা বা অন্য কোন সূরা পড়তে পারবে না। এর স্বপক্ষে কুরআন এবং সহিহ হাদিসের অজস্র বাণী রয়েছে, তন্মধ্যে কয়েকটি নিন্মে উল্লেখ করা হল-
১- “আর যখন কোরআন পাঠ করা হয়, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ কর এবং নিশ্চুপ থাক, যাতে তোমাদের উপর রহমত হয়। ” [সুরা আ’রাফ, আয়াত নং-২০৪]
হযরত আবু হুরাইরা [রাযি] ,হযরত ইবনে মাসঊদ[রাযি] ,হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস[রাযি],ইবনে জুবাইর[রাযি] প্রমখ সাহাবীগণ বলেছেন যে, এই আয়াতটি নাযিল হয়েছে নামায এবং জুম’আর খুতবা সম্পর্কে। [তাফসীর ইবনে কাসীরঃ১/২৮১]
ইমাম বুখারী [রহ] এর উস্তাদ ইমাম আহমদ [রহ] করেন, সবাই একমত যে এই আয়াতটি সালাতের ক্ষেত্রে নাযিল হয়েছে।” [আল মুগনী১/৪০৯]
এই আয়াত দ্বারা যে কেউ সহজে বুঝতে পারবেন যে, মুক্তাদীর ইমামের পিছনে কেরাত না পড়ার জন্য এটি একটি বড় ও পর্যাপ্ত দলিল এবং যখন ইমাম কেরাত পড়তে থাকেন তখন মুক্তাদীর চুপ থাকা ও মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা আবশ্যক।
“তানযীম উল আশতাত” গ্রন্থে উল্লেখ আছে, এই আয়াতটি মুক্তাদীকে ২টি আদেশ দেয়ঃ
১-নীরব থাকা- সিরী [যেসসব নামাযে কুরআন নিরবে পড়া হয়] এবং জেহরী যেসসব নামাযে কুরআন উচ্চস্বরে পড়া হয়] উভয় নামাযের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে চুপ থাকা।
২-মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা- জেহরী নামাযের ক্ষেত্রে।
এ থেকে বুঝা যায় যে,মুক্তাদী জেহরী নামাযের ক্ষেত্রে ইমামের কেরাত মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করার জন্য সম্পূর্ণরূপে চুপ থাকবে এবং সিরী নামাযের ক্ষেত্রেও সে চুপ থাকবে যদিও সে ইমামের কেরাত শুনতে পাই না(১ম আদেশ অনুযায়ী)।
তাছাড়া এই আয়াতটি তে বলা হয়েছে, “আর যখন কোরআন পাঠ করা হয়” (উচ্চস্বরে হোক বা চুপে চুপে হোক, কেউ শুনতে পাক বা না পাক), এই আয়াতটিতে “শুধুমাত্র যখন তুমি কোরআন শুনতে পাবে” বা “শুধুমাত্র যখন কোরআন উচ্চস্বরে পাঠ করা হয়” – “তখন নিশ্চুপ থাক,অন্যথায় নয়” – এ রকম কোন সীমাবদ্ধতা দেওয়া নেই।
সুতরাং এটি পরিষ্কার যে, এই আয়াতের মানে সিরী নামাযের ক্ষেত্রে অবশ্যই চুপ থাকতে হবে এবং যদি জেহরী নামায হয় তখন মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করাও জরুরী।
হাদিস শরীফেও রাসূলুল্লাহ [সা] জামাতে কিভাবে নামাজ পড়তে হবে অজস্র সহিহ হাদিসে তা বিস্তারিত বলে দিয়েছেন তন্মধ্যে দুইটি উল্লেখ করছি-
২-আবু সাঈদ আল খুদরী বর্ণনা করেন, “রসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন।তিনি আমাদেরকে নিয়মকানুন স্পষ্ট করে বলে দিলেন এবং আমাদেরকে নামায পড়া শিক্ষা দিলেন আর নির্দেশ দিলেন, তোমরা যখন নামায পড়বে, তোমাদের কাতারগুলো ঠিক করে নিবে।অতঃপর তোমাদের কেউ তোমাদের ইমামতি করবে।সে যখন তাকবীর বলবে, তোমরাও তাকবীর বলবে।সে যখন তিলাওয়াত করবে, চুপ করে থাকবে।সে যখন ‘গইরিল মাগদুবি আ’লাইহিম ওয়ালাদদল্লীন’ বলবে, তোমরা তখন ‘আমীন’ বলবে।আল্লাহ তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন। সে যখন তাকবীর দিয়ে রুকু করবে তখন তোমরাও তাকবীর দিয়ে রুকু করবে।......। [সহীহ মুসলিম শরীফ ১/১৭৪]
--- এই সহিহ হাদীস উপরে উল্লেখিত পবিত্র কোরআনের ১ম আয়াতটির ভাল ও উপযুক্ত ব্যাখ্যা দেয় এবং ইমাম ও মুক্তাদীর পালনীয় বিষয়গুলো চিহ্নিত করে [পার্থক্য করে।] উপরোক্ত সহিহ হাদীসে যেখানে মুক্তাদীকে ইমামের তাকবীর, রুকু ইত্যাদি অনুসরন করার আদেশ দেয়; সেখানে ইমামের সাথে সাথে সুরা ফাতিহা তিলাওয়াত করার কোন আদেশ দেয় না, বরং মুক্তাদীকে চুপ বা নীরব থাকার আদেশ দেয়।এটি প্রমাণ করে যে, যদি মুক্তাদীর জন্য তিলাওয়াত জরুরী হত, তাহলে রসূলুল্লাহ (সঃ) কখনো বিপরীত আদেশ (চুপ বা নীরব থাকার আদেশ) দিতেন না।সুতরাং কেরাত পড়া ইমামের জন্য ফরজ আর মুক্তাদীর জন্য ফরয চুপ বা নীরব থাকা এবং তিলাওয়াত শুনা।
হাদীস থেকে এটি বুঝা যায় যে, ইমাম যখন ‘ওয়ালাদদল্লীন’ বলবে, মুক্তাদী শুধুমাত্র তখনই কিছু বলবে (উচ্চারণ করবে), সে তখন ‘আমীন’ বলবে। আর তার ‘আমীন’ বলার কারণ হল আল্লাহর কাছে সুরা ফাতিহায় ইমামের করা প্রার্থনাকে আরও মজবুত ও শক্তিশালী করা।
৩-জাবীর [রাযি] বলেন রাসূলুল্লাহ [সা] বলেছেন, “যেই ব্যাক্তির ইমাম আছে, তার ইমামের কেরাতই তার কেরাত বলে গন্য হবে।” [মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং-৩৮২৩]
এই হাদিসটি সহিহ এই হাদিসটি ভিন্ন সনদে মুসনাদে আবদ ইবনে হুমায়দ এবং মুসনাদে আহমদ ইবনে মানীতে রয়েছে। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম বুসিরি [রহ] এটি ইমাম বুখারী [রহ] এবং ইমাম মুসলিম [রহ] উভয়ের শর্তমোতাবেক সহিহ।
এই সহিহ হাদিসে স্পষ্ট করে মূলনীতি বলে দেয়াই হয়েছে যে, মুক্তাদির জন্য সুরা ফাতিহা বা অন্য কোন সূরা পড়ার প্রয়োজন নেই, বরং ইমামের পড়াটাই তার জন্য যথেষ্ট হবে। কারণ সূরা ফাতিহা হল আল্লাহ দরবারে হেদায়াতের জন্য আবেদন আর দরবারে সকলের পক্ষ থেকে আবেদন একজনই পেশ করে থাকেন, ইমামকে সেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আর রুকু, সিজদা, তাকবীর, তাসবীহ হল উক্ত দরবারে আদব তাই তা সকলকে পালম করতে হয়।
আল্লাহর রাসূল [সা] হাতে গড়া সাহাবায়ে কিরামও মুক্তাদির জন্য সূরা না পড়ে চুপ করে থাকা ফতোয়া দিয়ে গিয়েছেন।
৪-আতা ইবনে ইয়াসার [রহ] থেকে বর্ণিত, তিনি একবার সাহাবী যায়েদ ইবনে সাবিত [রাযি] কে নামাযে ইমামের পিছনে কেরাত পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। জবাবে যায়েদ ইবনে সাবিত [রাযি] বলেছিলেন, মুক্তাদি কোন নামাজেই ইমামের সংগে পড়বে না। [সহিহ মুসলিম-১/২১৫]
৫-ইবনে আব্বাস [রাযি] বলেন- ইমামের কেরাত তোমাদের জন্য যথেষ্ট, সেখানে ইমাম নীরবে পড়ুক অথবা জোরে পড়ুক। [দারা কুতনী ১/৩৩১]
------------
বর্তমানে একদল লোক একটি হাদিসকে সামনে রেখে প্রয়াস চালাচ্ছে যে মুক্তাদিরও নাকি সূরা ফাতিহা পড়তে হবে হাদিসটা হল- রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “ যে ব্যক্তি সুরা ফাতিহা পড়ল না,তার নামায হল না।"
দেখুন এই হাদিস কি জামাতের নামাজ কথা বলা হয়েছে?? জামাতে নামাজ কিভাবে পড়তে হবে তাতো উপরে বর্ণিত কুরআন-সহিহ হাদিসের বাণীতে তা স্পষ্ট করে বলাই আছে। আর সকলেই বলেন একাকী নামাজ পড়লে সূরা ফাতিহা পড়তে হবে, অথচ তারা এই একাকী নামাজ পড়ার বিধানকে কোন প্রমান ছাড়াই জামাতে নামাজের বেলায়ও প্রয়োগ করতে যায় অথচ দেখুন উপরে কুরআন-সহিহ হাদিসের বাণীতে জামাতে কিভাবে নামাজ পড়তে হবে তা স্পষ্ট করে বলা আছে যে মুক্তাদি সূরা পড়ার দরকার নেই।
আর সাহাবায়ে কিরামের বক্তব্য দেখুন তাহলে এই হাদিসটা মর্ম আরো সহজেই বুঝা যাবে-
৬- জাবির [রাযি] বলেনঃ নামাযের কোন এক রাকাতে যে সূরা ফাতিহা পড়ল না যে যেন নামাযই পড়ল না। তবে যদি ইমামের পিছনে নামাজ আদায় করলে এর ব্যাতিক্রম।[ অর্থ্যাৎ সূরা ফাতিহা পড়া লাগবে না।] [তিরমিযী শরীফ-১/৭১, মুয়াত্তা মালিক পৃ২৮]
এই হাদিসে জাবির [রাযি] সূরা ফাতিহা সম্পর্কে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, একা নামায আদায় কারী প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা পড়বে। আর যে জামাতে নামায পড়ে সে সূরা ফাতিহা পড়বে না।
৭-মালিক নাফে [রহ] থেকে বর্ণনা করেন যে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর [রাযি] কে প্রশ্ন করা হত, মুক্তাদি ইমামের পিছনে কুরআন পাঠ করবে কিনা? তিনি বলতেন, তোমাদের কেউ যখন ইমামের পিছনে নামায পড়ে তখন ইমামের কেরাতই তাহার জন্য যথেষ্ট। তবে যখন সে একা একা নামায পড়বে তখন কুরআন পাঠ করবে।
বর্ণনাকারী নাফে [রহ] বলেন যে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর [রাযি] নিজেও ইমামের পিছনে কুরআন পাঠ করিতেন না। [মুয়াত্তা মালিক- পৃ২৯]
আল্লাহর কাছে দোয়া করি তিনি সকলকে সঠিক বুঝ দান করেন, পবিত্র কুরআন এবং সহিহ হাদিস বুঝে সেই অনুযায়ী নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করার তৌফিক দান করেন।
©somewhere in net ltd.