| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আহমাদুল্লাহ
আমি ভালবাসি আমার আল্লাহকে,প্রিয় রাসুল এবং আমার দেশকে। খোলামেলা কথা পছন্দ করি। অল্পতে কষ্ট পেয়ে বসি, আবার অল্পতেই ভুলে যাই সব দুখঃ। তবে কারো উপকার-অবদান ভুলতে পারিনা জীবনভর। পছন্দ করি উদার, স্বচ্ছ ও খোলামনের মানুষকে, ঘৃণা করি গোঁড়া ও অহংকারীকে। সবচেয়ে বেশি ভাবি দেশের নাস্তিক ও আধানাস্তিকদের নিয়ে।
মুফাক্কিরে ইসলাম হযরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী হাসানী নদভী রহ. ছিলেন স্বীয় গুণ বৈশিষ্ট্যে স্বাতন্ত্রের অধিকারী এক সমুজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তাঁর সমগ্র জীবনের প্রতিটি স্তরে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত সুস্পভাবে নজরে পড়তো। সেটা ছিল তাঁর ঈমানী দূরদর্শিতা ও তীক্ষèতা। এই ঈমানী দূরদৃষ্টিই ছিল তাঁর এমন সব ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-গবেষণা প্রকাশের উৎস, যা কখনো কখনো অপরাপর দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবীদের চিন্তাধারার বিপরীত হতো। এরা স্বীকৃত বাস্তব তাঁর স্বভাবগত কোমলতা, আন্তরিক উদারতা ও মহানুভবতা, ধৈর্য ও সহনশীলতা, অন্যের প্রতি খেয়াল ও মূল্যায়ন, বিনয় ও নম্রতা এবং প্রবীন ও মুরব্বীদের মতামতের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাশীলতা সীমাহীন ছিল। তবে মানবতা ও মুসলিম মিল¬াতের গুরুত্বপূর্ণ যুগসন্ধিক্ষণে এবং পরীক্ষার মুহূর্তে বিজয় অবস্থানে আপসহীন ও অমননীয় নীতি অবলম্বন করতেন। অন্যান্য চিন্তাবিদ ও গবেষকদের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি তাকে স্বীয় অবস্থান হতে টলাতে বা মনোবলে ভাঙ্গতে পারতো না। এ ধরনের ঘটনা তার বর্ণাঢ্য জীবনে বহুবার ঘটেছে। সাধারণ নেতৃবৃন্দ ও ব্ুিদ্ধজীবীগণ প্রাথমিকভাবে তাঁর কোন কোন মতের বিরোধিতা করেছেন এবং জোরালোভাবে তার খণ্ডন ও প্রত্যাখ্যান করেছেন, কিন্তু পরবর্তীকালীন ঘটনাপ্রবাহ তাঁর মতামতের সমর্থন এবং অবস্থানের যথার্থতা প্রমাণ করেছে।
ভারত বিভক্তির পর কোন কোন নেতা ভারতীয় কৃষ্টি অনুকরণ ও ভারতীয় প্রতœতাত্ত্বিক পূরাকীর্তির প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আওয়াজ তুলে দিলেন। এর মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী স¯প্রীতি মূলোৎপাটন করেছিল এবং ইসলামী কৃষ্টি-কালচার হতে বিমুখতা ও উদাসীনতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তখন হযরত মাওলানা রহ. বিষয়টি অনুভব করেছিলেন এবং বিশেষ করে ভারত বিভাগের পর এর ক্ষতি ও অনিষ্ট সম্পর্কে বেশি অবগত হতে পেরেছিলেন। ভারত বিভক্তির কারণে মুসলমানদের বিরাট একটি অংশ পাকিস্তান চলে গিয়েছিল। অন্তর্দলীয় সা¤প্রদায়িক কোন্দল মুসলমানদের উদ্যম ও শক্তি দুর্বল করে দিয়েছিল। অপর দিকে ইরতিদাদ বা ধর্মান্তরের নতুন তুফান শুরু হয়েছিল। ভারতের কোন কোন স্থানে (শারদ আনন্দ নামক ব্যক্তি কর্তৃক মুসলমানদেরকে হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করার মানসে প্রতিষ্ঠিত) ‘শুদ্ধি আন্দোলন’ এর প্রভাব ছিল। তখন হযরত মাওলানা রহ. সেই মহা সংকট হতে উত্তরণের জন্য পূর্ণশক্তিসহ হন এবং উক্ত আন্দোলনের লিজার প্রশোতম দাস টেন্ডন ও সম্পোরন আনন্দের নামে পত্র লিখেন এবং মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি ও স্থাপন, শরীয়ত অনুকরণের উৎসাহদান এবং মুসলমানদের ধর্মীয় স্থানসমূহের সংরক্ষণের জন্য পুস্তিকা রচনা করেন।
তিনি ভারত স্বাধীনতার পর চিন্তাগত বক্রতা ও ভ্রান্তি, চারিত্রিক বিকৃতি ও অধঃপতন, মানবতার ভূলুণ্ঠন ও পতন এবং বস্তুবাদের উত্থানের মোকাবেলা করেছেন তাঁর প্রজ্ঞা, তীক্ষ্মতা ও দূরদৃষ্টি দ্বারা। তিনি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভঙ্গিতে মুসলমান ও দেশবাসীকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং বাতিল বিবর্তনসমূহের বলিষ্ঠ সমালোচনা করেন। এখানে তাঁর বক্তব্যের কিয়দাংশ উলে¬খ করা হচ্ছে। প্রাক ভারতীয় কৃষ্টি ও কালচারের প্রতিষ্ঠা এবং পুনঃপ্রচলনের ডাক সম্পর্কে তিনি কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘এখন সর্বত্র সকল স¤প্রদায়ের মধ্যে প্রাচীন কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পুনঃপ্রচলনের চেতনা প্রসার হচ্ছে। কেউ কেউ দুই হাজার বছরের পুরাতন কালচার জিন্দা করার চেষ্টা করছেন। আবার কিছু লোক চার হাজার বছর পূর্বের খৃস্টীয় সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার অহেতুক কর্মে লিপ্ত। অত্যন্ত ঘটা করে ও আঁটঘাট বেঁধে এসব দেশে উক্ত শে¬াগান তোলা হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কবল থেকে সবেমাত্র স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, তথাপি আজ সা¤প্রদায়িক ও গোত্রীয় কট্টরতার প্রভাব বিদ্যমান। আর এই বাতিল স¤প্রদায়িকতার ব্যাধির ভ্রান্ত ধারণা হলো তাদের সংস্কৃতিও অন্যদের চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ।’
ভাষা ও কৃষ্টির ভিত্তিতে বিভাগ ও বিভক্তিকে জাতীয় সমস্যাবলীর আস্থাপূর্ণ নিরসন ও সমাধান মনে করা হয়। কিন্তু হযরত আলী মিয়া রহ. এটাকে মানবতা ও জাতীয়তার জন্য সমস্যা মনে করতেন। আরব দেশগুলোতে বিদ্রোহ ও বিপ¬বের পর জাতীয়তার ডাক ব্যাপক হয়েছে। উক্ত ডাকের পতাকাবাহী ছিল ইউরোপীয় দেশগুলোতে শিক্ষা লাভকারী আরবের খৃস্টান যুবকগণ। তাদের মধ্যে মিশেল আফলাফ সবচেয়ে বেশি অগ্রসর ছিল। এই ডাক মিশর, সিরিয়া ও ইরাকে অনেক বিস্তার লাভ করে। তখন হযরত মাওলানা ‘আলমে আরবীকে লিয়ে ছবছে বড়া খতরা’ বা আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা নামক একটি পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। তাতে আরব জাতীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে তিনি লিখেন, ‘অমুসলিম গবেষণগণ জাতীয়তার দর্শনকে অত্যন্ত চাতুর্য ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের সাথে সাজিয়েছেন এবং বৈজ্ঞানিকনির্ভর সৃষ্টি করেছে। এতে একজন শিক্ষিত আরবী যুবকের জন্য যে উন্নয়নের ভাবনার উম্মাদ হয়ে আছে) যে আকর্ষণ রয়েছে, তা মিশেল আফফাক কর্তৃক রচিত فى سبيل البعثগ্রন্থ থেকে নির্বাচিত উক্তিসমূহ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়। উক্ত গ্রন্থটিকে এই আন্দোলন ও ডাকের জন্য সহীফা বা ধর্মগ্রন্থ বলা চলে। ইসলাম আরব জাতির চিরন্তন ও আসমানী চেতনার সর্বোত্তম প্রকাশ ও বিশে¬ষক। আর এই দৃষ্টিতে ইসলাম সেটা প্রকৃত পক্ষে আরবীয় এবং স্বীয় আদর্শ লক্ষ্য উদ্দেশ্যের দিক বিবেচনায় মানবিক। সুতরাং মূলতঃ ইসলামের পয়গাম হলো মানবিক আরবীয় চরিত্র। এ কারণেই ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ যুগে এবং উন্নতি ও বিবর্তনের এই সূক্ষ্ম মঞ্জিলে ইসলাম যে অর্থ ও মর্ম প্রকাশ করছে সেটা হলো সর্বশক্তি আরবীদের শক্তিবুদ্ধির জন্য এবং তাদের উন্নয়নের জন্য ব্যয় করতে হবে। আর এ সকল শক্তি আরব জাতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকবে।
আরব জাতীয়তাবাদের এই চেতনা ও আন্দোলন আরবদেরকে ইসলাম পূর্ববর্তী (আরবীয় জাহিলিয়াত) যুগের দিকে নিয়ে যেতে চায়, যে যুগে না তাদের নিকট নতুন দীন এসেছিল, আর না তারা হযরত রাসূলুল¬াহ সা. এর বদৌলতে আল¬াহ তাআলা সর্বশেষ বারতা এবং তাঁর শরীয়তের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছিল। এই উক্ত দর্শন জাহেলী যুগের পুরাকীর্তিকে নিজেদের গর্বের বস্তু মনে করে। আরবের জাহেলী যুগের কাব্যচর্চায় এবং ইতিহাসে যাদের নাম গুরুত্বের সাথে উলে¬খ হয়েছে, আরবীয় জাতীয়তাবাদের দর্শনে বিশ্বাসীরা তাদেরকে নিয়ে অহংকার করে এবং তাদের নাম জিইয়ে রাখার দীক্ষা দেয়। এই চেতনার সদস্যগণ ইসলাম থেকে নিজেদের সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেদের জীবনের জন্য এক নতুন সংবিধান ও জীবনদর্শন রচনা করেছে। যা স্বাধীন আরব জাতীয়তাবাদ এবং রাজনৈতিক ও বস্তুবাদী লক্ষ্য উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামাঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন হযরত মাওলানা আলী মিয়া রহ. ঐতিহ্যবাহী ও মর্যাদাপূর্ণ ইসলামের ইতিহাসের ধারক সিরিয়ায় বাছপার্টির শাসনের আশ্রয় ও অধীনে বাছী দর্শনের প্রতিক্রিয়া ও ঘটনাপ্রবাহের পর্যালোচনা করতে গিয়ে লিখেনÑ‘নির্বিঘেœ মসজিদসমূহ ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। দীনদার ও ওলামায়ে কেরামকে দেশছাড়া হতে হয়েছে এবং ইসলামপ্রিয় দল ও আন্দোলনসমূহের ওপর নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অনুরূপ ইরাকী আক্রমণের পর কুয়েতেও এই পার্টির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। একই পরিণতি ও শঙ্কা সেসব দেশের বেলায়ও যারা আল¬াহ না করুন তাদের অনুবর্তী হয়েছে।’
হযরত মাওলানা রহ. তাঁর ঈমানী তীক্ষèতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন, জামাল আব্দুল নাছের এবং মোস্তফা জামাল আতাতুর্কের বিরুদ্ধে তাঁর মতামতের অনুরূপ কর্নেল মুয়ান্নার গাদ্দাফির পলিসিসমূহের বিরুদ্ধেও তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেন।
এ নেতৃবৃন্দ প্রথমে কোন কোন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। আর লোকেরা কর্নেল গাদ্দাফী গংদের নামধারী সংস্কারসমূহের বিষাক্ত ছোবল অনুভব করতে না পেরে তাদেরকে সাম্রাজ্যবাদের শত্র“, ইসলামের পথপ্রদর্শক এবং ইসলাম ও মুসলমানদের মুক্তির দিশারী বলে জ্ঞান করে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সাধারণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সকলের মতামত পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। পরবর্তী সময়ে এই শ্রেণীর লোকেরা হযরত মাওলানা রহ. এর অবস্থানের যথার্থতা এবং ঈমানী দূরদর্শিতার প্রবক্তা হয়ে গিয়েছেন।
অনুরূপ পশ্চিমা কৃষ্টি সম্পর্কেও তাঁর মতামত ও অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ভিন্ন। তাঁর চিন্তাধারা অপরাপর ওলামায়ে কেরাম ও চিন্তাবিদগণের দৃষ্টিভঙ্গির বিলকুল বিপরীত ছিল। যার বিশে¬ষণ হলো পশ্চিমা কৃষ্টির সকল গ্রহণযোগ্য বিষয়কে মেনে নিতে হবে যেগুলো মুসলিম সমাজের জন্য উপকারী এবং ইসলামী দর্শন ও বিশ্বাসের সঙ্গে সামাঞ্জ্যপূর্ণ। তবে ইসলামের মূলতত্ত্ব ও শিক্ষার পরিপন্থী বিষয়াবলী অবশ্যই অকাট্যভাবে পরিহার্য থাকবে। হযরত মাওলানা রহ. পশ্চিমা কৃষ্টির ব্যাপারে মধ্যম পন্থা অবলম্বনের আহ্বান করেছিলেন। যেমন তিনি তার জগদ্বিখ্যাতগ্রন্থ ‘মুসলিম মামালিক মেঁ ইসলামিয়াত আওর মাগরিবিয়াত কী কাশমকাশ’ অর্থাৎ মুসলিম দেশসমূহে ইসলাম ও পশ্চিমা কৃষ্টির সংঘাত এ পশ্চিমা কালচারের প্রতি বিশে¬ষণ ও অনুসন্ধানী দৃষ্টি ফিরানোর পর তার ফলাফলসমূহের ব্যাপারে আলোচনা করার পর লিখেনÑ‘ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও মুসলিম মিল¬াতের অস্তিত্বের জন্য পশ্চিমা কৃষ্টি ভয়ঙ্কর হওয়ার অর্থ এই নয় যে, জীবনের সুবিধাসমূহ হতে উপকৃত হওয়া এবং পশ্চিমাদের আবি®কৃত সায়েন্স ও টেকনোলজী এবং উদ্ভাবন, বিলাস ও উন্নয়নের সামগ্রীকে ব্যাপকভাবে হারাম বলে দেওয়া হবে আর এর পথ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হবে। বরং ইসলাম সব সময়ই অত্যন্ত প্রশস্ত চেতনার ধারক ও অধিকারী এবং সকল ভালো ও উপকারী বস্তু হতে উপকৃত হওয়ার ব্যাপারে প্রশস্তমনা ও উদার ছিল এবং থাকবে। তবে এক্ষেত্রে পশ্চিমা কৃষ্টির অর্থ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান উদ্ভাবন আবিষ্কার ও জীবনের উপকারী অভিজ্ঞতাসমূহ থেকে উপকৃত হওয়ার চেয়েও ব্যাপক ও বি¯তৃত। পশ্চিমা কৃষ্টি কালচারের ভিত্তিমূল যেসব চিন্তা-চেতনা, মর্ম-তত্ত্ব ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে সেগুলোও পশ্চিমা কৃষ্টির আওতাধীন। সমগ্র জীবনকে পশ্চিমা বিশ্বের তাহযীব-তামাদ্দুনের পরিচয়ের অধীন করানো এবং ইসলামের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা, সাম্য ও মধ্যমপন্থার মূল তত্ত্বের পরিপন্থী জীবনাদর্শকে মেনে নেওয়া শরীয়তের রীতি-নীতি এবং সুন্নতে নববীর ওপর আমল করার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং ইসলামী জীবনাদর্শ থেকেও অনেক দূরে ঠেলে দেয়।’
হযরত মাওলানা রহ. কোন কোন প্রেক্ষাপট ও বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতেন। তাঁর সে কঠোরতা ও গুরুত্বদান সম্পর্কে তার নিকটতম ব্যক্তিবর্গও অনুমান করতে পারতেন না। যারা তাঁর চিন্তাধারা ও দর্শনের বিশ্বাসী এবং তাঁর তত্ত্বাবধানের অধীন ছিল, তাদের সকলের আদর্শিক ভাবনা হলো সংযত ও মধ্যম পন্থা এবং যে কোন বিষয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করা এবং ধীরস্থীরতা ও অবকাশের পন্থাবলম্বন করা উত্তম ও যথার্থ। শক্ত ও কঠোর স্থান গ্রহণ তাঁর এবং তার অধীনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানসমূহের লক্ষ্য ও স্বার্থবিরুদ্ধ এবং অশুভ পরিণামের অগ্রদূত প্রমাণিত হবে। যেমন ‘বঙ্গে মাতরম’ এর ব্যাপারে তাঁর অবস্থান ছিল কঠিনতম অবস্থানসমূহের একটি। কল্যাণ সিং এর সরকার যখন মূর্তিপূজা সম্বলিত সঙ্গীত ও স্বরসতী মূর্তির সামনে সকল শিক্ষার্থীকে মাথানত করার জন্য বাধ্য করেছে তখন তিনি সরকারী স্কুল থেকে মুসলমানদের শিশুদেরকে নিয়ে যেতে বলেছিলেন।
মূলতঃ হযরত মাওলানা রহ. স্বীয় ঈমানী দূরদর্শিতার দ্বারা সঠিক ও যথার্থ অনুমান করতে পেরেছিলেন যে, যদি এ বিষয়ে শৈথিল্য করা হয় তাহলে মুসলমানদের পরবর্তী প্রজন্ম পৌত্তলিক ধ্যান-ধারণা নিয়ে বড় হবে। এ ধরনের শিক্ষাসংক্রান্ত শঙ্তা ও আপদ থেকে মুসলমানদেরকে রক্ষা করার লক্ষ্যে তিনি দীনী শিক্ষা কাউন্সিলের উদ্যোগসমূহে অংশগ্রহণ করেছেন এবং দীর্ঘকাল পর্যন্ত এর প্রাণপুরুষ ছিলেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি ছোট ছোট গ্রাম ও মহল¬াসমূহে মকতবের জাল বিছিয়ে ফেলার জন্য অনেক জোর দিতেন। সন্দেহাতীতভাবে এই মকতবসমূহ বড় বড় জামেয়া মাদরাসাসমূহ থেকে বেশি উপকারী ও ফলদায়ক প্রমাণিত হবে। ‘পয়ামে ইনসানিয়াত’ নামক আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করা হযরত মাওলানার ঈমানী দূরদর্শিতার জীবন্ত সাক্ষর। অথচ কোন কোন মুসলিম নেতা এই আন্দোলনটির ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন যে, তা সকল ধর্মের ঐক্য আন্দোলন পরিণতি হতে পারে এবং ইসলামের দাওয়াতী কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। অথচ এটা এখন স্বীকৃত বাস্তব যে, এ সংগঠনটি মানবীয় কর্মকাণ্ড ও আচার-আচরণের সংশোধন এবং সকল ধর্মের সর্বসম্মত বিষয়াবলীর মধ্যে স্বভাব-চরিত্রের মূল্যায়ন ও গুরুত্বারোপের সর্বোত্তম সংরক্ষক স্টেজ প্রমাণিত হয়েছে। তাছাড়া উক্ত সংগঠনটি বস্তুবাদ, অর্থ ও পদের লিপ্সা এবং স্বার্থপরতা ও সুবিধাপ্রিয় সোসাইটির সংশোধনের জন্য অবশ্য প্রয়োজন এবং বর্তমান সময়ের দাবী। এ কারণেই সে সংঘটন সকল শ্রেণী ও স¤প্রদায়ের পক্ষ হতে প্রশংসা কুড়িয়েছে। উলি¬খিত মানবিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ ছাড়াও মুসলিম ও বিধর্মীদের মধ্যকার ইস্পাতকঠিন প্রাচীর উৎপাটল অতীশয় ফলপ্রসূ ও উপকারী সাব্যস্ত হয়েছে এবং একে অপরের সাথে বসার সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যেন ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধবাদী ও মুসলিম সংগঠনসমূহের শত্র“গণ তাদের ব্যাপারে যেসব সংশয় ও শঙ্কা এবং ষড়যন্ত্র জন্ম দিয়েছে তার শেকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়। তাছাড়া উক্ত সংঘটন ইসলামের স্বচ্ছ-পরিচ্ছন্ন ও প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার কার্যকর উপায় প্রমাণিত হয়েছে।
‘পায়াসে ইনসানিয়াত’ বা মানবতার পয়গাম নামক সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনবগতি ও এই সংগঠনের হীতাকাক্সক্ষী ও কর্মীদের নিয়ত-নিষ্ঠা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে ইসলাম প্রচারের কোন কোন উদ্যমী ও বলিষ্ঠ কর্মী এবং নিষ্ঠাবান ওলামায়ে কেরাম সে সংগঠনে জোরালো উদ্দীপনার সাথে অংশগ্রহণ করেননি। আর হযরত মাওলানা রহ. এর পরম শ্রদ্ধাভাজন কতিপয় পথপ্রদর্শক মুরব্বীও তাঁর কাছে সে সংঘটনটির ব্যাপারে নিজেদের আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি এই পথে নিজের চেষ্টা-প্রচেষ্টা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছেন এবং সেই সংগঠনের কর্মীদের উৎসাহ দান করতেন এবং মনোবল বৃদ্ধি করতেন। আর তাঁর শুভ সাধনা সব সময় প্রয়োগ করতেন এবং সংগঠনের সকল গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন।
হযরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী হাসানী নদভী রহ. এর জীবনের উলি¬খিত কয়েকটি দিক এমন ছিল যে, সেসব বিষয়ে তিনি অন্যান্য দীন প্রচারক আলেম, চিন্তাবিদ ও গবেষকদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র ছিলেন। হযরত মাওলানা রহ. এর এসব দর্শন ও চিন্তাধারাসমূহ প্রকৃতপক্ষে তাঁর ঈমানী দূরদর্শিতা, অত্যন্ত দ্রুততার সাথে যে কোন বিষয়ে গভীরে চলে যাওয়ার যোগ্যতা এবং যে কোন কর্ম ও তৎপরতার উৎস এবং ফলাফলের সঠিক ধারণা ও অনুধাবনের কাছে ঋণী এবং তার দূরদর্শিতা ও অন্তদৃষ্টির ফলশ্র“তি। নিঃসন্দেহে এসব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গিসমূহের গুরুত্ব ও কল্যাণকারিতা তাঁর জীবনের অপরাপর ইলমী ও আমলী কীর্তিসমূহের চেয়ে কোন ক্রমে কম নয়।
অনুবাদ : মাওলানা আহমাদুল্লাহ¬(ছদ্বনাম-বাস্তববাদী)
মূল লেখক : মাওলানা ওয়াজেহ রশীদ নদভী
ডীন-আরবী বিভাগ, দারুল উলূম নদওয়াতুল ওলামা, ভারত।
অনুবাদক : সাবেক মুহাদ্দিস-মাদরাসা দারুর রাশাদ, ঢাকা।
©somewhere in net ltd.